kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১ নভেম্বর ২০২২ । ১৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৯ ।  ৬ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৪

ডাউন দ্য উইকেট

সংবর্ধনার ঢলে...

সাইদুজ্জামান

২৯ সেপ্টেম্বর, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



সংবর্ধনার ঢলে...

১৯ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ নারী ফুটবল দল দক্ষিণ এশীয় শ্রেষ্ঠত্বের মুকুট জিতেছে। ফাইনালের দিন কয়েক আগে থেকেই বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনের মধ্যমণি হয়ে ছিলেন সাবিনা খাতুনরা। প্রথমবার সাফ শিরোপা জেতার এক দিন পর খোলা ছাদের বাসে চড়ে ঢাকার রাজপথে আনন্দের ঢল নামিয়েছেন তাঁরা। এর পর থেকে চলছে সাবিনাদের সংবর্ধনার ঢল।

বিজ্ঞাপন

সেসব সংবর্ধনা শুকনো মুখে নয়, পাঁচ অঙ্কের চেক উঠেছে প্রত্যেকটি অনুষ্ঠানে। নিঃসন্দেহে এতে অর্থনৈতিক নিশ্চয়তা মিলেছে নারী ফুটবলারদের কয়েকটি পরিবারের।

কিন্তু এমন সংবর্ধনার প্রভাব কতটা পড়ছে দেশের মেয়েদের ফুটবল উন্নয়নে? অর্থ পুরস্কার কিংবা সংবর্ধনা—যা জুটছে, তা শুধু সাফজয়ী দলটির ভাগ্যে। অনন্য এই অর্জনের স্বীকৃতি হিসেবে দেশের নারী ফুটবলের ভাগ্যে কি কোনো পুরস্কার জুটেছে? জোটেনি। এ পর্যন্ত যত ডামাডোল বেজেছে, তা সাবিনাদের ঘিরে। তাতে ধরে নেওয়া যায়, ভবিষ্যতের নারী ফুটবলারদেরও ঠাঁই হবে বাফুফে ভবন। পাশের সিনথেটিক টার্ফে অনুশীলন, সংযুক্ত হবে না আধুনিক কোনো প্রস্তুতির সরঞ্জাম। কারণ বাফুফের আর্থিক সংগতি নেই। মেয়েদের ফুটবল নিয়ে ১৯ সেপ্টেম্বরের আগেও কেউ খুব ভেবেছেন বলে শুনিনি।

গোলের পর গোল করে সাবিনা খাতুন মোটামুটি পরিচিত। বিদেশের লিগে তিনি নিয়মিত, আরো অনেকে খেলেছেন। কিন্তু এত ‘আন্তর্জাতিকতা’র পরও কেন সাবিনাদের নিয়ে এত দিন মাতামাতি হয়নি? এটা আত্মজিজ্ঞাসা আমার নিজের এবং আপনার কাছেও।

মাতামাতি হয়নি একটি কারণে—সারা বিশ্বেই একটি অদৃশ্য বৈষম্য বিরাজমান। পুরুষদের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন কোন দল, চার বছরের পুরনো ঘটনাও চট করে বলে দিতে পারেন ফুটবলের ন্যূনতম খোঁজখবর রাখা মানুষটি। সাবিনারা সাফ জেতার পরদিন ইউরোপিয়ান ক্লাব ফুটবলেরও খুঁটিনাটি জানা কয়েকজনের কাছে প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছিলাম—আচ্ছা, বলুন তো, মেয়েদের বিশ্বকাপ চ্যাম্পিয়ন কোন দল? কেউ উত্তর দেননি। বোঝা গেল, উত্তর জানা নেই তাঁদের। আদতে খবরই রাখেন না। আমার দৃঢ় বিশ্বাস যুক্তরাষ্ট্রের এই দলটির কাছে আরো অজানা সাফ ফুটবলের খবরাখবর। এটি ফুটবল বিশ্বের অতি লো-প্রফাইল একটি টুর্নামেন্ট। এটাই বাস্তবতা—নিষ্ঠুর, বৈষম্যমূলকও বলতে পারেন।

এটুকু পাঠ করার পর মনে হতে পারে, মেয়েদের ঘিরে জমে ওঠা উৎসবে বুঝি বিরক্ত আমি। মোটেও নয়। আমার কাছে মেয়েদের এই সাফল্যে ট্রফি মুখ্য নয়, মুখ্য হলো তাঁদের মুক্তির আনন্দ। ‘ছেলেদের’ এই খেলায় নাম লিখিয়ে অপবাদ থেকে হুমকি—কত কী সহ্য করতে হয়েছে সাবিনাদের। এই জয় হলো সেসব প্রতিবন্ধবতাকে হারানোর সিলমোহর। কোনো অকারণ উগ্রতা কিংবা ঔদ্ধত্য নয়, সাবিনাদের সাফ জয় দেশের সব নারীর জন্য বিশাল অনুপ্রেরণা। নিজের পারদর্শিতা প্রদর্শনে আর পিছপা হবেন না আরো কত শত নারী।  

কিন্তু সংবর্ধনার ঢলে এই সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গিটাই অনুপস্থিত। খেলা নয়, নির্দিষ্ট খেলোয়াড়ের ভাগ্য বদলে মনোযোগ সবার। এটা ঠিক যে, সারা বিশ্বই সাফল্যকে কদর করে। ফুটবল বিশ্বকাপের আগে অংশগ্রহণকারী বিভিন্ন দেশের ফেডারেশনও বিশাল অঙ্কের বোনাস ঘোষণা করবে। সেই বোনাস বিজয়ী দলের সদস্যরাই পাবেন। কিন্তু ফ্রান্স কিংবা বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট ভিন্ন। অঢেল বিনিয়োগের ওপর দৃঢ়ভাবে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে ফুটবল বিশ্বের প্রতিষ্ঠিত দলগুলো। অর্থের অভাবে সেসব দেশের স্কুল প্রগ্রাম কোথাও থেমে নেই, দেশটির শীর্ষ লিগ স্থগিত হয় না মাঠের অভাবে। এসব হয় শুধু বাংলাদেশে। বাংলাদেশের ফুটবল ফেডারেশন বিজয়ীদের কোনো বোনাস দিতে পারে না। অর্থ পুরস্কার যা দেওয়ার দিয়ে থাকেন বিত্তবানরা। ফেডারেশন হাঁ করে থাকে, এই সাফল্যে যদি মন ভজে সরকারের, যদি কোনো অনুদান মেলে! মেলে। তবে এই প্রাপ্তিও সিংহভাগ ক্ষেত্রে জোটে মুষ্টিমেয় ব্যক্তির ভাগ্যে।    

তাই সাবিনাদের সাফল্যকে টপকে যাওয়ার জন্য ভবিষ্যতের যে দল গড়ে ওঠার কথা, সেটি হওয়ার সম্ভাবনা অতি ক্ষীণ। একটি সাফল্যকে স্বীকৃতি দেওয়া আর কিছু পরিবারের ভাগ্যোন্নয়নে ভূমিকা রাখা ছাড়া সংবর্ধনার ছবি থেকে আর কিছু খুঁজে পাইনি।

মেয়েদের ঘিরে উচ্ছ্বাসের ঢেউ দেখে ১৯৯৭ আইসিসি ট্রফি জয়ের ছবি স্মৃতিতে ভেসে উঠছে। সে সময় বিআরটিসি রাজধানীর সবচেয়ে আদুরে গণপরিবহন। সে কারণেই কিনা, আকরাম খানদের ঢাকা বিমানবন্দর থেকে মানিক মিয়া এভিনিউতে নিয়ে যেতে হয়েছিল ট্রাকে চড়িয়ে। কুয়ালালামপুর থেকে দল ঢাকায় পৌঁছানোর আগেই পত্রিকার পাতায় পাতায় সংবর্ধনা আর পুরস্কার ঘোষণার ঢল। জনপ্রতি এক লাখ টাকা অর্থ পুরস্কার থেকে বিনা পয়সায় চুল কাটিয়ে দেওয়ার প্রস্তাবও দিয়েছিল একটি সেলুন! একটু দেরিতে হলেও লাখ টাকার অর্থ পুরস্কার পেয়েছিলেন আকরাম খানরা। কিন্তু ঘোষিত অনেক পুরস্কারই আর হাতে ওঠেনি আইসিসি ট্রফিজয়ী দলের সদস্যদের। প্রতিশ্রুতি ভঙ্গকারীদের দলে সমাজের অনেক কেউকেটার নামও আছে। তাই এ যুগের ক্রিকেটাররা আর আশ্বাসে নয়, নগদ নারায়ণে বিশ্বাসী। আমার এক সহকর্মীর কাছে শুনলাম, কয়েকটি অর্থ পুরস্কার নিয়ে উদ্বেগ আছে নারী দলের অন্দরমহলে। বাফুফে থেকেও নাকি মিডিয়াকে গোপনে অনুরোধ করা হচ্ছে যেন ‘ফলো আপ’ করা হয়। মানে, পুরস্কার ঘোষণাকারীদের সটকে পড়ার শঙ্কা ফুটবলাঙ্গনেও আছে।

অপ্রাসঙ্গিক মনে হতে পারে, তবু একটি গল্প শেয়ার না করে পারছি না। আইসিসি ট্রফি জয়ের পর জমি দেওয়ার ঘোষণা এসেছিল সম্ভবত। কিন্তু বাস্তবে সেই জমি কেউ পাননি। দলের মাত্র দুজন ব্যক্তিগত উদ্যোগে পূর্বঘোষিত জমি বুঝে নিয়েছেন। বাকিরা এ খবরটি জেনেছেন অনেক পরে! বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের ড্রেসিংরুমে বিভাজনের মূলে এই অর্থকড়ি বলেই জানি। অত বিস্তারিত লেখার জায়গা নেই। তাই আবার মেয়েদের ফুটবলে ফিরে আসি।

সাবিনারা নানা জায়গা থেকে অর্থ পুরস্কার পেয়েছেন—এটা ভালো খবর। আরো ভালো লাগত যদি শোনা যেত, কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান নারী ফুটবলের মানোন্নয়নে পদক্ষেপ নিচ্ছে। কিভাবে? সেটা নানাভাবে হতে পারে।

শুধু নারী দল নয়, দেশের নারী ফুটবল ‘অপুষ্টি’তে আক্রান্ত। জাতীয় দলের জন্য যৎসামান্য হলেও একটি বেতন কাঠামো আছে। এটি ৪০-৫০ জনের একটি পুল। এই বেতনের বাইরে জাতীয় দলে খেলার বিনিময়ে বিশেষ কিছু মেলে না সাবিনাদের। তাই নারী ফুটবলারদের আয়ের প্রধান উৎস ঘরোয়া লিগ। এই লিগে বসুন্ধরা কিংসে জাতীয় দলের ১৬ জন খেলেন। এর কারণ, কিংসের অর্ধেক বেতনও অন্য কোনো ক্লাব দেয় না। তাই বলে ক্লাবগুলোর ওপর ঢালাও দায় চাপানো ঠিক হবে না। ঢাকার ক্লাব পরিচালিত হয় শৌখিন ঢঙে। কোনো আয়-রোজগার নেই, চলে পৃষ্ঠপোষকদের দাক্ষিণ্যে। সেখানেও সুনির্দিষ্ট কোনো কাঠামো নেই। যখন যার কাছ যা আদায় করা যায় আর কি!

নারী-পুরুষ, ফুটবল-ক্রিকেট; সব খেলার ক্লাবগুলোই চলে অপেশাদারি মেজাজে। ক্লাবের দল গড়ার কাজ যেসব সংগঠকের ওপর বর্তায়, তাঁদের অভিযোগ—পৃষ্ঠপোষকরা নাকি ক্লাবের সিঁড়ি বেয়ে সমাজের উঁচুতলায় উঠে আর ফিরেও তাকান না। তাই দল হয় নড়বড়ে, খেলোয়াড়দের পকেটও থাকে শূন্য। সে ক্ষেত্রে সাফ সাফল্যের স্বীকৃতি হিসেবে কোনো বিত্তবান যদি মেয়েদের কোনো ক্লাবের এক মৌসুমের দল গঠনের অর্থ জোগান দিতেন, তাহলে বসুন্ধরা কিংসের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলতেন না অন্য কোনো ক্লাবের নারী ফুটবলার।

তার চেয়েও ভালো হতো যদি কোনো পৃষ্ঠপোষক এই সাফল্যে অনুপ্রাণিত হয়ে কিশোরীদের ফুটবলে বিনিয়োগ করতেন। তাতে আরো কত সাবিনা-কৃষ্ণা যে এগিয়ে আসার পথ খুঁজে পেত।

যদি নারী ফুটবলারদের জন্য একটি ফুটবল একাডেমি কিংবা একটি আধুনিক অনুশীলন সুবিধাসম্পন্ন অবকাঠামো নিদেনপক্ষে, একটি আধুনিক জিমনেসিয়ামও গড়ে দিতেন, তাহলে সেই বিনিয়োগ বহুগুণে তুলে নিতে পারতেন সাবিনারা কিংবা তাঁদের উত্তরসূরিরা।

কিন্তু তেমন কিছু হয়নি। অদূর ভবিষ্যতে হবে বলে মনে হয় না। কারণ, নারী ফুটবলের ভবিষ্যতের চলার পথ তৈরি করে দেওয়ার সাফল্য ঘরে তুলতে কত দিন অপেক্ষা করতে হয়, কে জানে! তার চেয়ে হাস্যোজ্জ্বল সাবিনার সঙ্গে একটি ছবির ফ্রেমের তাত্ক্ষণিক বাজারমূল্য অনেক চড়া।

এসব কথার কোনোটিকে পুরস্কারদাতা কিংবা গ্রহীতার প্রতি অবমাননা মনে করার কোনো কারণ নেই। সংবর্ধনার ঢলে না পথ হারিয়ে ফেলে নারীদের ফুটবল—লেখার উপজীব্য এটাই।

ব্যক্তিগত অর্থ পুরস্কার ক্রিকেটকে মোটামুটি গিলে খেয়ে ফেলেছে। খেলার চেয়ে খেলোয়াড় বেশি বড় হয়ে গেছেন। এখন সেসব উগড়ে দিচ্ছে ক্রিকেট। তাই বলে কলসিন্দুরের সাহসী বালিকাদেরও পরিণত বয়সে উগড়ে দেওয়া দেখতে চাই না। বরং দেখতে চাই, শত সাবিনা দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন ফুটবল মাঠে—এমন ক্ষেত্র তৈরি করে দিয়েছেন কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান।

সম্ভবত একই আশাতে সাফজয়ী নারী ফুটবলারদের অর্থ পুরস্কারে অলংকৃত করেছেন পুরস্কারদাতারা। এতে কয়েকজনের ভাগ্যবদলও হয়েছে। কিন্তু মূল খেলাটায়, মানে নারী ফুটবলের অগ্রযাত্রায় তা কতটা ভূমিকা রাখল—পরেরবার এভাবে ভাবার সবিনয় অনুরোধ রইল আপনার এবং আপনাদের প্রতি।



সাতদিনের সেরা