kalerkantho

শনিবার । ১০ ডিসেম্বর ২০২২ । ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৯ । ১৫ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৪

টেনিসরাজের অশ্রুসজল বিদায়

২৫ সেপ্টেম্বর, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



টেনিসরাজের অশ্রুসজল বিদায়

কারো কারো বিদায় হৃদয়কে নিঃস্ব করে চলে যায়। মনকে নিক্ষেপ করে যন্ত্রণার ঘূর্ণাবর্তে। দুঃখ-যন্ত্রণার পরিমাপই করা যায় না। রজার ফেদেরারের টেনিস থেকে বিদায় নেওয়াটা ঠিক তা-ই।

বিজ্ঞাপন

নইলে তাঁর চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী রাফায়েল নাদাল কেন চোখের জল মুছবেন ফেদেরারের পাশে বসে? কল্পনা করুন, ডিয়েগো ম্যারাডোনার অবসরে পেলে ফুঁপিয়ে কাঁদছেন! কিংবা মোহাম্মদ আলীর বিদায়ে জো ফ্রেজিয়ার ভেঙে পড়েছেন। সেটা হয়তো হয়নি, কিন্তু দুই প্রতিদ্বন্দ্বী নাদাল আর নোভাক জোকোভিচের কাঁধে চড়েই বিদায়টা বললেন ফেদেরার। সঙ্গে যোগ দিয়েছিলেন অন্য প্রতিদ্বন্দ্বীরাও। ক্রীড়াঙ্গনের ইতিহাসে ছবিটা থাকবে অমলিন হয়ে।

লন্ডনের ওটু অ্যারেনায় এমন আবেগময় বিদায়ই হলো টেনিসের রাজা ফেদেরারের। লেভার কাপ খেলে অবসরের পৃথিবীতে যাওয়ার ঘোষণাটা দিয়েছিলেন আগেই। শেষ ম্যাচে দ্বৈতে সঙ্গী চেয়েছিলেন নাদালকে। ইচ্ছাটা পূরণ হয়েছে, তবে শেষ ম্যাচটা জয়ের রঙে রাঙাতে পারেননি। টিম ওয়ার্ল্ডের জুটি ফ্রান্সিস তিয়াফো ও জ্যাক সক তীব্র উত্তেজনার ম্যাচটি জিতেছেন ৪-৬, ৭-৬ ও ১১-৯ গেমে। ২০ গ্র্যান্ড স্লাম জয়ী কিংবদন্তি ফেদেরার চোটের জন্য ম্যাচটি শেষ করতে পারবেন কি না ছিলেন সেই শঙ্কায়। এ জন্য বিদায়ি ম্যাচে হারলেও কোনো আক্ষেপ নেই তাঁর। চোখের জল মুছতে মুছতে বললেন, ‘আমি আনন্দে কাঁদছি। এটা আনন্দের কান্না। আমরা যেকোনোভাবে এটা কাটিয়ে উঠব (কষ্টের সময়)। দারুণ একটা দিন। সবাইকে বলছি আমি খুশি, দুঃখিত নই। অসাধারণ লাগছে এখানে থাকতে পেরে। ’

টেনিসে ফেদেরারের চেয়ে বেশি গ্র্যান্ড স্লাম আছে রাফায়েল নাদাল ও নোভাক জোকোভিচের। তাঁর চেয়ে বেশি দিন র‌্যাংকিংয়ের শীর্ষে ছিলেন জোকোভিচ। তবু কেন ফেদেরারকেই সর্বকালের সেরা মেনে নেন খোদ জোকোভিচ? সেরাদের সেরা বলেন নাদাল? আসলে গত দুই যুগ ধরে ফেদেরার হয়ে উঠেছিলেন টেনিসের একটা অধ্যায়। তাঁর র‌্যাকেটটা কখনো মনে হতো লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি বা পিকাসোর তুলি। ফোরহ্যান্ড, ব্যাকহ্যান্ড শটগুলো যেন অসাধারণ সব ছবি। আবার কখনো টেনিসের র‌্যাকেটটা হয়ে উঠত হ্যারি পটারের জাদুদণ্ড। সম্মোহিত করে রাখতেন সবাইকে।

ফেদেরারের রাজত্বটা ছিল টেনিসের শ্রেষ্ঠ টুর্নামেন্ট উইম্বলডনে। ২০০১ সালে তখনকার শীর্ষ খেলোয়াড়  পিট সাম্প্রাসকে উইম্বলডনের সবুজ গালিচায় হারিয়ে দিয়েছিলেন আগমনী বার্তা। ২০০৩ থেকে ২০০৭ পর্যন্ত টানা পাঁচটি উইম্বলডন জিতে যুবরাজ থেকে তিনিই হয়ে ওঠেন রাজা। তাঁর ২০ গ্র্যান্ড স্লামের আটটিই উইম্বলডন। কাকতালীয়ভাবে ফেদেরারের অবসরের কদিন আগে পৃথিবীর মায়া ছেড়েছেন রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ। রাজপরিবারের উত্তরাধিকার ঠিক ছিল আগেই, রাজা হয়েছেন তৃতীয় চার্লস। কিন্তু ফেদেরারের বিদায়ে লন্ডনের উইম্বলডনের উত্তরাধিকার কে? এই উত্তরটাই জানার অপেক্ষা এখন।

ফেদেরার চ্যাম্পিয়ন হলে উৎসবে মাতত উইম্বলডনের পুরো গ্যালারি। এখানেই এমন বিজয় উৎসব করেছেন ১০৫ বার। সর্বশেষ শিরোপাটা ২০১৭ সালে। বয়স তখন ৩৫ বছর ছাড়িয়েছে। এত বেশি বয়সে এই শিরোপা জয়ের কীর্তি নেই কারো। কিন্তু প্রিয় উইম্বলডনেই ২০২১ সালে অখ্যাত হুবার্ট হুরকাজের কাছে হেরেছিলেন তিনি। শেষ সেটটা আবার ৬-০তে, টেনিসের পরিভাষায় যা ব্যাগেল। অথচ পুরো ক্যারিয়ারে মাত্র তিনটিই ব্যাগেল ফেদেরারের। বছর দেড়েক আগের সেই হারের পর কি শেষ দেখে ফেলেছিলেন ফেদেরার? ভক্তদের চিৎকার, ‘লেটস গো রজার’-এ সেদিন কোনো অনুপ্রেরণা পাননি। শরীর চলছিল না, গতি কমে গিয়েছিল, খেলছিলেন সব ভুলভাল শট। শিল্পীর শেষ তুলির আঁচড় পড়ে গিয়েছিল আসলে তখনই। এরপর গত ১৮ মাসে হাঁটুতে তিনটি অস্ত্রোপচারের ধকল সামলে উঠতে পারেননি আর। কিংবদন্তি হলেও মানুষ তো? পরশু শুধু ছিল যন্ত্রণা নিয়ে অন্য গ্রহে চলে যাওয়ার আনুষ্ঠানিকতা।

টেনিস দুনিয়া শেষের ছবিগুলোর জন্য নিশ্চয়ই মনে রাখবে না ফেদেরারকে। বরং তিনি অনন্য হয়ে থাকবেন গত দুই যুগে টেনিসে শিল্পের অবস্থানকে স্থায়ী করার জন্য। র‌্যাকেট দিয়েই একেকটা প্রজন্মকে নেশাতুর করে রাখার জন্য। এটাই ফেদেরারের তৈরি পরম্পরা। এটাই ফেদেরারের তৈরি সভ্যতা। একটা সময় তিনি মাথা গরম করতেন, মেজাজ হারিয়ে র‌্যাকেট ভাঙতেন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পরিণত হওয়া ফেদেরার সেই অধ্যায়টা পেছনে ফেলে হয়ে উঠেছিলেন ভদ্রতার অপর নাম। তাই খেলাটার গণ্ডি ছাড়িয়ে বক্সার মোহাম্মদ আলী, ফুটবলার পেলে-ম্যারাডোনা, গলফার টাইগার উডসের সঙ্গে তুলনা হয় তাঁর। হয়ে ওঠেন সর্বকালের অন্যতম সেরাদের মুখ। এই ফেদেরারকে আর কোর্টে দেখা যাবে না।

তাই হাহাকার। তাঁর মতো আর কেউ আসবেন তো? এএফপি



সাতদিনের সেরা