kalerkantho

মঙ্গলবার । ৬ ডিসেম্বর ২০২২ । ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৯ । ১১ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৪

ডাউন দ্য উইকেট

ক্রিকেট-কৌতুক

সাইদুজ্জামান

৪ আগস্ট, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



ক্রিকেট-কৌতুক

গল্পটি পুরনো, শুনেও থাকতে পারেন।

নব্বইয়ের দশকে ঢাকা প্রিমিয়ার লিগে নাম জানা-অজানা পাকিস্তানি ক্রিকেটারদের তুমুল দাপট। তো, বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামে ম্যাচ চলাকালে অন্য ক্লাবের এক ক্রিকেটার ঢুকেছেন প্রতিদ্বন্দ্বী একটি দলের ড্রেসিংরুমে। গিয়ে তিনি দেখেন প্রবল হতাশায় প্যাড খুলছেন সদ্য আউট হয়ে ফেরা এক পাকিস্তানি ক্রিকেটার।

বিজ্ঞাপন

এরপর দুজনের কথোকথনের তরজমা এ রকম—

—কী ভাই, মন খারাপ কেন?

ইস, নিশ্চিত সেঞ্চুরি মিস হয়ে গেল!

—তাই? কত করেছ?

৫ রান।

হতভম্ব অতিথি নীরবে ড্রেসিংরুম থেকে বেরিয়ে অট্টহাসিতে ফেটে পড়েন। সেই থেকে দেশীয় ক্রিকেটে আশার বেলুন ফুটো হলেই উপমা হিসেবে গল্পটি ফিরে ফিরে আসে। এই যেমন, জিম্বাবুয়েতে টি-টোয়েন্টি সিরিজে বাংলাদেশ দলের ভাবভঙ্গির সঙ্গে গল্পটি দারুণ মিলে যায়।

না, জিম্বাবুয়ে যাওয়ার আগে দল কিংবা বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) কর্তাব্যক্তিদের পক্ষ থেকে উচ্চাশা ব্যক্ত করা হয়নি। বরং টিম ডিরেক্টর খালেদ মাহমুদ ভরসাই দিয়েছেন দলকে। হোয়াইট ওয়াশ হলেও হতাশ হবেন না বলে জানিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু সেই তিনি ৩-০ না, ২-১ ব্যবধানে হেরেও হতাশ।

ওপরের গল্পের সঙ্গে মাহমুদের হতাশার সাযুজ্য খুঁজে পাচ্ছেন না, তাই তো? মিল আছে। কথায় আর কাজের অমিল দুটি ঘটনার অন্ত্যমিল। দুই অঙ্ক ছুঁতে না পারা ব্যাটারের মুখে সেঞ্চুরির আক্ষেপ কৌতুককর মনে হওয়াই স্বাভাবিক। তেমনি জিম্বাবুয়েতে তিন ম্যাচের টি-টোয়েন্টি সিরিজকে ঘিরে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশ দলের থিংকট্যাংকের পরিকল্পনাও ছিল হাস্যকর। নতুনদের দেখে নেওয়ার যে চিন্তার কথা শোনা গিয়েছিল জিম্বাবুয়ে সফরের শুরুতে, সেই চিন্তা মুখ থুবড়ে পড়ে ‘পাঁচ রানে’! দুই ম্যাচ পরই নতুন ভাবনা ঝেড়ে ফেলে পুরনোতে ফিরে যাওয়া স্রেফ বাকি ‘৯৫ রান’ করতে না পারার আহাজারির মতো কাণ্ডই! এই আহাজারি কৌতুককর মনে করার অধিকার দেশের ক্রিকেট-সমাজের রয়েছে।

অবশ্য জিম্বাবুয়ে যাওয়ার আগে মুখে যা-ই বলুন না কেন, মাহমুদের হতাশায়ই মিশে সিরিজ জয়ের অব্যক্ত আশাবাদ। আর জিম্বাবুয়ের কাছে হারলে তাঁর মন খারাপ হওয়ারই কথা। খেলোয়াড়ি জীবনে সামর্থ্যে পিছিয়ে থাকলেও সব সময় জেতার মনোভাব নিয়ে মাঠে নামতেন মাহমুদ। সেই লড়াকু মেজাজটাই জিম্বাবুয়েতে দেখাতে পারেনি বাংলাদেশ টি-টোয়েন্টি দল। তৃতীয় ম্যাচে সহজ উইকেটে ১৫৮ রান করতে না পারা পোড়াচ্ছে মাহমুদকে। অস্বাভাবিক নয়। এই জিম্বাবুয়ে তো টাটেন্ডা টাইবুর সময়কার মতোও শক্তিধর নয় যে দল নিয়ে ‘পরীক্ষা’ করা যাবে না। বরং ফাটকা লেগে গেলে নতুনের জয়গান উঁচু ভলিউমে বাজানো যেত। কিন্তু সব ভণ্ডুল হয়ে গেছে। উল্টো দ্রুতই নতুন গান ‘ডিলিট’ করে ফেলতে হয়েছে। এরপর সিরিজ শুরুর পরিকল্পনা আর শেষের আক্ষেপ কৌতুককর। কারণ এমন চঞ্চল ভাবনার ফল তো এমনই হওয়ার কথা।

আন্তর্জাতিক মান বিবেচনায় সদ্যঃসমাপ্ত জিম্বাবুয়ে-বাংলাদেশ টি-টোয়েন্টি সিরিজটি অতি সাধারণ। দুটি দলেরই এ ফরম্যাটে বিস্তর সীমাবদ্ধতা রয়েছে। তাই সিরিজের ফল নির্ধারিত হয়েছে একটি দল অপেক্ষাকৃত বেশি খারাপ খেলেছে বিধায়।

বরং হতাশার জায়গা অন্যখানে—দ্রুতই চিন্তার ভোল পাল্টে ফেলা দেশীয় ক্রিকেট সংস্কৃতিতে। এ নিয়ে অবশ্য গত সপ্তাহেই লিখেছিলাম। তখনো সিরিজ শুরু হয়নি। তবে নিশ্চিত ছিলাম, এই নতুন দলের ওপর আস্থা হারিয়ে ফেলবেন নীতিনির্ধারকরা। সিরিজ হারলে হোয়াইট ওয়াশ হওয়ায়ও অনাপত্তিপত্র দিয়ে রাখা কর্তারা বেজায় নাখোশ হবেন। আইসিসির সভা শেষে দেশে ফিরে বোর্ড সভাপতি বিমানবন্দরেই বোলারদের সমালোচনা করেছিলেন। তৃতীয় টি-টোয়েন্টিতে হারের পর ভারপ্রাপ্ত অধিনায়ক মোসাদ্দেক হোসেন ম্যাচের ‘টার্নিং পয়েন্ট’ চিহ্নিত করেছেন নাসুম আহমেদের ৩৪ রান খরচ করা ওভারটিকে। যদিও হারারের ব্যাটিং সহায়ক উইকেটে ১৫৮ রান তাড়া করতে না পারার যাবতীয় ব্যর্থতা ব্যাটারদের। সেখানে একজন বোলারের একটি ওভারকে লাল কালিতে চিহ্নিত করা বিস্ময়কর। অবশ্য মোসাদ্দেককে নেতৃত্বের ভার দেওয়াও কম বিস্ময়কর নয়, যা ঘটিয়েছে টিম ম্যানেজমেন্ট কিংবা বোর্ড।

একই দিনে জোড়া চমক ‘উপহার’ ছিল তৃতীয় টি-টোয়েন্টির আগে। প্রথমটি তো বলাই হয়েছে, নুরুল হাসান চোটের কারণে ছিটকে পড়ায় মোসাদ্দেকের ভারপ্রাপ্ত অধিনায়ক হওয়া। আর দ্বিতীয়টি, মাহমুদ উল্লাহর অন্তর্ভুক্তি। ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরের পর তাঁর টি-টোয়েন্টি ক্যারিয়ার নিয়ে বিস্তর কাটাছেঁড়া হয়েছে। গোপন বৈঠকের পরই মাহমুদকে নেতৃত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়ার পর জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে টি-টোয়েন্টি সিরিজে ‘বিশ্রাম’ দেওয়া হয়। যদিও বিসিবির ক্রিকেট অপারেশনস কমিটির চেয়ারম্যান কালের কণ্ঠকে জানিয়েছিলেন যে জিম্বাবুয়ে সিরিজের জন্য মাহমুদকে বিবেচনা করা হয়নি। এর মানে অভিজ্ঞ এই ক্রিকেটারকে কার্যত বাদ দেওয়া হয়েছে। সেই তাঁকে দুই ম্যাচ পরই ফিরিয়ে আনা হয়েছে দলে। কেন? স্রেফ একটি জয়ের জন্য? যত দূর জানি, আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টি ভাবনায় মাহমুদ আর নেই। তবু হুট করে তাঁকে তৃতীয় টি-টোয়েন্টিতে খেলিয়ে দেওয়া হলো। অনেক অনুসন্ধানেও জানা যায়নি, সিদ্ধান্তটি আসলে কার। তবে বাংলাদেশ দলের টিম ম্যানেজমেন্টের ভাবনার গতি-প্রকৃতি বলে এই সিদ্ধান্ত বাংলাদেশ থেকে গেছে।

তো, এই জোড়া সিদ্ধান্ত কী বার্তা দিল পুরো দলকে?

এক. যে কাউকে যেকোনো সময় খেলিয়ে দেওয়া যায়, তিনি প্রস্তুত থাকুন কিংবা না থাকুন।

দুই. অধিনায়কত্বও এখন কোন নতুনের দিকে আন্তর্জাতিক টুপি ছুড়ে দেওয়ার মতো সহজ! অথবা বোর্ড মনে করে না কিংবা জানে না কার কাঁধে জাতীয় দলের নেতৃত্ব শোভা পায়? দলের বাজে সময়ে নতুন মুখের হিড়িক পড়ে যায়। কিন্তু অতি সম্প্রতি বাংলাদেশ দলের নেতৃত্ব বাছাইকেও মামুলি ব্যাপার বানিয়ে ফেলেছে বোর্ড। তৃতীয় টি-টোয়েন্টি ম্যাচের দিন সাবেক এক অধিনায়ক আক্ষেপ করে বলছিলেন, ‘ক্যাপ্টেন্সিও এখন মুড়ি-মুড়কি নাকি!’

বাংলাদেশ দলের নেতৃত্ব এখন এই সাবেকের খেলোয়াড়ি জীবনের মতো বুকভরা গর্বের নয়, আতঙ্কের বোঝাও! ভবিষ্যৎ নেতা হিসেবে কিছুদিন ধরেই লিটন দাসের নাম শোনা যাচ্ছিল। এরও আগে বোর্ড ভবিষ্যৎ নেতা মনে করত নাজমুল হোসেনকে। কিন্তু ফর্মের কারণে অধিনায়কত্ব দিয়ে নাজমুলকে আরো কঠিন তোপের মুখে ফেলতে চায় না বোর্ড। কিন্তু লিটন দাস? বিসিবির এক কর্মকর্তা দাবি করেছেন, তৃতীয় টি-টোয়েন্টির জন্য নাকি নেতৃত্বের প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়েছেন এই টপ অর্ডার। তাই সিরিজ নির্ধারণী ম্যাচে নেতৃত্ব দিয়েছেন মোসাদ্দেক হোসেন। মাহমুদকেও নাকি ধরে-বেঁধে খেলানো হয়েছে সেই ম্যাচে। তাহলে তাঁকে ‘বিশ্রাম’ কিংবা ‘বাদ’ দেওয়া হয়েছিল কেন? কেন ওয়ানডে দলের সঙ্গে একই সময়ে জিম্বাবুয়েতে থাকা মুশফিকুর রহিমকে অগ্রাধিকার দেওয়া হলো না? নাকি তিনিও লিটনের নেতৃত্বের প্রস্তাবের মতো ম্যাচ খেলতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন?

কোনো প্রশ্নেরই উত্তর নেই। খোঁজ করলে একেকজনের কাছ থেকে একেক রকম উত্তর মিলবে। যেমন লিটনের নেতৃত্ব না পাওয়া নিয়ে দুটি তথ্য আছে বাজারে। নিজের ব্যাটিংয়ে আরো মনোযোগী হতেই নাকি জিম্বাবুয়ে সিরিজে নেতৃত্ব দিতে রাজি হননি লিটন। আরেকটি প্রচার হলো, জিম্বাবুয়ে সিরিজের আগে নেতৃত্বসংক্রান্ত আলোচনায় ঠাঁই না পাওয়ার বেদনায়ই নাকি নুরুলের অনুপস্থিতিতে অধিনায়ক হতে রাজি হননি লিটন দাস!

কোনটি সত্য, কে জানে। তবে আন্দাজ করা যায়, আজকাল যে যার মতো করে খবর ‘বাজারজাত’ করেন। অবশ্যই নিজের সুবিধামতো। অবাধে ‘লাইসেন্স’ দেওয়া হয় কাউকে। আবার সেটি বাজেয়াপ্ত করা হয়। এই হয়তো বলা হলো, নতুন চেহারার দলের কাছে কোনো চাহিদা নেই। কিন্তু দ্রুতই হাওয়া ঘুরে যায়, শীর্ষ কর্তা বেদনাহত হন জিম্বাবুয়ের ২০০ তোলার খবরে। ঢাকায় সভাপতির কথা শুনে দূরের হারারেতে হাহাকার ধ্বনি ওঠে।

আমরা নীরবে হাসি। হাসি এ কারণেই যে এই ঘটনাক্রমের কোনোটিই অভাবিত নয়। নতুন ভাবনা নিয়ম করে ক্রিকেট-বাজারে ঢাকঢোল পেটাবে কিছুদিন। কিন্তু সেই ভাবনা দ্রুতই হারিয়ে যাবে সন্ধ্যার আঁধারে। আবার নতুন ভাবনার সূর্য উঠবে এবং অবধারিতভাবে অস্তও যাবে।

মাঝখান থেকে যুগ পার করে দেওয়া বোর্ড কর্তারা প্রকাশ্যে বলতে শুরু করবেন, বিশেষ এই ফরম্যাট বাংলাদেশ এখনো শিখে উঠতে পারেনি। এই ‘সত্য ভাষণ’ মেনে নেবে জনতা। সবাই যখন মেনেই নিয়েছে, তখন ড্রেসিংরুমও হাঁপ ছেড়ে বাঁচে—যাক, ব্যর্থতার দায় আর নিতে হবে না!

যে সংসারে কোনো দায় নেই, সেই সংসার ভীষণ সুখী। বাংলাদেশের ক্রিকেট-সংসারও বেশ ফুরফুরে মেজাজে আছে। দায় যখন নেই, তখন আয়-উন্নতিরও ব্যাপার-স্যাপার নেই।

নিতান্তই পরিস্থিতি যদি নাজুক হয়, তবে প্রকাশ্যে দুমদাম কিছু একটা বলে দিলেই হবে। পরিস্থিতি নতুন মোড় নেবে, অনুকূলে এসে যাবে!

ক্রিকেটের আমজনতা এখন সেই ‘আওয়াজে’র অপেক্ষায়। দেশের চলতি ক্রিকেট-সংস্কৃতির এটা সাড়া-জাগানো কৌতুক!



সাতদিনের সেরা