kalerkantho

রবিবার । ১৪ আগস্ট ২০২২ । ৩০ শ্রাবণ ১৪২৯ । ১৫ মহররম ১৪৪৪

ডাউন দ্য উইকেট

ক্রিকেট সংস্কৃতি

সাইদুজ্জামান

৩০ জুন, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



ক্রিকেট সংস্কৃতি

দুঃসময়ে কঙ্কাল বেরিয়ে পড়ে। সেই কঙ্কাল আবার রঙিন পোশাকে আড়াল পড়ে যায় এক-দুটি জয়ে। বাংলাদেশ ক্রিকেটের এই হালচাল সেই ১০ নভেম্বর ২০০০ সাল থেকেই। বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামে আমিনুল ইসলাম বুলবুলের সেঞ্চুরিতে ভারতের বিপক্ষে প্রথম ইনিংসে ৪০০ রান দেখে উচ্ছ্বাসে ভেসেছিল বাংলাদেশ।

বিজ্ঞাপন

কিন্তু পরের ইনিংসের ৯০ অল আউট সেই উচ্ছ্বাস মিইয়ে গিয়েছিল আত্মোপলব্ধিতে—টেস্ট ম্যাচ ক্রিকেটের কঠিনতম পরীক্ষা!

এই পরীক্ষায় সাফল্যের প্রথম শর্ত ‘বেসিক’। মাত্রই প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটের প্রচলন ঘটেছে দেশে। যদিও সেকালের অতি নিম্নমানের উইকেটে ক্রিকেটের প্রাথমিক পাঠ ঠিকঠাক নেওয়ার কোনো সুযোগ ছিল না। দ্বিতীয় শর্ত—টেকনিক ও ফিটনেস। তখন এই দুটি অনেকাংশেই নির্ভর করত ব্যক্তিবিশেষের ওপর। আধুনিক কোচিং পদ্ধতির চল নেই দেশে। ফিটনেসের গুরুত্ব অনুধাবন করা তো বহু দূরের ভাবনা। সব শেষে এবং অতি গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ মনঃসংযোগ। দীর্ঘ পরিসরের ক্রিকেটে অনভ্যস্তদের জন্য যা আরো বড় পরীক্ষা। তাই ভাবলে এখনো অবাক লাগে, এমন অপ্রস্তুত অবস্থায় আমিনুল কী করে প্রায় ৯ ঘণ্টা ব্যাটিং করেছিলেন! ৩৮০ বল খেলাকে ‘ফ্লুক’ বলে চালিয়ে দেওয়ার উপায় নেই। শুদ্ধতম ক্রিকেটের সবগুলো অনুষঙ্গের সম্মিলনেই শুধু সম্ভব। এক মৌসুম পিকনিক মুডে জাতীয় লিগ খেলে আমিনুল এতটা তৈরি হয়ে গিয়েছিলেন বলে বিশ্বাস করি না। দুর্নিবার রোমাঞ্চ আর অদম্য জেদ তাঁকে পরিচালিত করেছিল। রোমাঞ্চ দেশের অভিষেক টেস্ট খেলার। আর জেদ নিজের উইকেটের চড়া মূল্য হাঁকানোর। আধুনিক ক্রিকেটের সূত্র ধরে বাংলাদেশের বর্তমান দলের সবাই যেটিকে বলেন ‘ইনটেন্ট’। যেকোনো ম্যাচের আগে-পরে, সাফল্য-ব্যর্থতার ব্যাখ্যায় এই একটি শব্দ অসংখ্যবার ব্যবহৃত হয়। কিন্তু এই শব্দটি ব্যবহারের অভিপ্রায় নিয়ে বিস্তর ধোঁয়াশা রয়েছে। যেমন—অফস্টাম্পের বাইরের বল চালিয়ে আউট হয়ে আসা ব্যাটারের পক্ষ নিয়ে যদি অধিনায়ক কিংবা কোচ বলেন, ‘ওর ইনটেন্ট কিন্তু ঠিক ছিল’, তাহলে বিসদৃশ লাগতে বাধ্য। বিশেষ করে, সেটি যদি টেস্ট ক্রিকেটে হয়। যদি গোটা কয়েক উইকেট হারিয়ে ধুঁকতে থাকা দলের ব্যাটার ওরকম শট খেলেন।

কিন্তু টেস্ট মর্যাদাপ্রাপ্তির ২২ বছরে আমরা অভ্যস্ত হয়ে গেছি এই ‘ইনটেন্ট’ কিংবা অভিপ্রায়ের কথা শুনতে শুনতে। ম্যাচ পরিস্থিতির সঙ্গে যে অভিপ্রায়ের সখ্য অতি জরুরি, সেটি বলে কোনো লাভ হয় না। ক্রিকেট ব্যাকরণে দলের বিপর্যয়ে ন্যূনতম ঝুঁকি নেওয়ার অধিকার কারোর নেই। তবু দলের অভিজ্ঞতম ব্যাটারও অভ্যস্ত ‘ইনটেন্ট’ থেকে দূরের বলে ব্যাট চালিয়ে দেন। ম্যাচের পর টিম ম্যানেজমেন্টের মুখ থেকে এর পক্ষে নানা যুক্তি তোলা হয়।

এই যেমন, অ্যান্টিগা ও সেন্ট লুসিয়ায় ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ব্যাটিং ব্যর্থতার জন্য ব্যাটারদের দোষ দেখেননি সাকিব আল হাসান। বরং দেশে অনুপস্থিত উপযুক্ত টেস্ট সংস্কৃতির কাঁধে দায় চাপিয়েছেন তিনি। এই টেস্ট অনুপযোগী সংস্কৃতির অংশ হিসেবে তিনি দর্শক দিয়ে শুরু করে সর্বশেষে ব্র্যাকেটবন্দি করেছেন নিজেদের।

অবস্থা অনেকটা ঢাকাই চলচ্চিত্রের মতো। সিনেমা হলে দর্শক যান না, তাই ভালো সিনেমা তৈরি হয় না—বিএফডিসির দেয়ালে কান পাতলে এখনো এই অনুযোগ শোনা যেতে পারে। বাংলাদেশের টেস্ট অধিনায়ক সে তুলনায় সরব। সেন্ট লুসিয়া টেস্টের পর ইংল্যান্ডকে উদাহরণ টেনে যা বলেছেন সাকিব, সেটি ধর্তব্যে নিলে টেস্ট ক্রিকেটে বাংলাদেশের ‘শিওর সাকসেস’ পদ্ধতি হতে পারে গ্যালারি দর্শকে ভরিয়ে দেওয়া।

সোশ্যাল মিডিয়ায় সর্বদা ব্যস্ত এক ফুচকে এ বিষয়ে নির্দয় কটাক্ষ করেছেন গত পরশু, ‘টেস্টের ম্যাচ ফি ছয় লাখ টাকা। তার মানে ১১ জনে মিলে টেস্টপ্রতি পান ৬৬ লাখ। এখন এই টাকাটা দর্শকদের মধ্যে বিলি করার ঘোষণা দেওয়া হোক। তাহলে গ্যালারি ভরবে, বাংলাদেশ দলও জিতবে!’

নাহ, বাংলাদেশ দল নিয়মিত টেস্ট জিতবে—এই আশা কেউ করেন বলে শুনিনি। মাঠে সত্যিকারের ‘ইনটেন্ট’ প্রদর্শনে ক্রিকেটারদের ব্যর্থতাই দর্শকদের মর্মবেদনার কারণ। দলের বিপর্যয়ের মধ্যেও দূরের বল খেলার চেষ্টা কোনোভাবেই সঠিক অভিপ্রায় নয়। একের পর এক ব্যাটার, দিনের পর দিন যখন এভাবে আউট হন, তখন সেটিকে টেস্ট সংস্কৃতির ঘাটতি বলে এড়িয়ে যাওয়ার উপায় নেই। এটি স্রেফ দায়িত্বজ্ঞানহীনতা।

এটাও একটা সংস্কৃতি বটে, যা সম্ভবত শুধু বাংলাদেশেই বিরাজমান। যে যত বড় ক্রিকেটার, তাঁর তত বেশি অধিকার ক্রিকেটকে নিজের মতো করে খেলার এবং ভাবার। সেই তাঁকে নির্দিষ্ট কোনো সিরিজে পাওয়া যাবে কি যাবে না, নির্বাচকদের এই দুশ্চিন্তা থাকে দল গঠনের শেষ দিন পর্যন্ত। এমনও হয়েছে, নির্বাচকরা দল ঘোষণার পর জেনেছেন কোনো এক ক্রিকেটার ছুটি নিয়ে বসে আছেন! তবে একদার এই চর্চা আজকাল আর গুটিকয় তারকা ক্রিকেটারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এই ‘ইচ্ছা রোগ’ ছড়িয়ে পড়েছে গোটা ড্রেসিংরুমে। দলের কনিষ্ঠতম ক্রিকেটারও নাকি এখন বাছবিচার করে খেলতে চান। প্রায়ই অনুমোদনও মেলে। এসব নিয়ে নির্বাচকরা আড়ালে দীর্ঘশ্বাস ফেলেন।

সাকিব দেশের টেস্ট সংস্কৃতি নিয়ে যা বলেছেন, সেটি সাম্প্রতিক কালের। টেস্ট মর্যাদাপ্রাপ্তির পরের দিনগুলো কিন্তু এমন ছিল না। মানে-গুণে সাকিবরা সেকালের ক্রিকেটারদের চেয়ে এগিয়ে। কিন্তু টেস্ট সংস্কৃতি বলতে তিনি যা বোঝাতে চেয়েছেন, সেটি শুরুর দিকে এখনকার চেয়ে অবশ্যই বেশি ছিল। সামর্থ্যের সীমাবদ্ধতা ছিল, তবু মাটি কামড়ে পড়ে থেকে টেস্ট খেলেছেন জাভেদ ওমর। মুলতানে জিততে না পেরে কেঁদে মাঠ ছেড়েছিলেন খালেদ মাহমুদ। একেকটা ইনিংস হারের পর লজ্জায় কুঁকড়ে থাকতেন ক্রিকেটাররা।

এটা ঠিক যে তিন ফরম্যাট মিলিয়ে এখন খেলার সংখ্যা অনেক বেড়েছে। তাই একটা হার নিয়ে পড়ে থাকার সময় নেই। বরং খেলার মাঠে হার-জিতকে খেলোয়াড়ি মনোভাবে আলিঙ্গন করে নিতে পারা দারুণ ব্যাপার। তবু জয়ের মতো হারেরও একটা ‘ফিল’ থাকে। জয়ের অনুভূতি উদযাপনে ফুটে ওঠে। আর হারের যন্ত্রণায় বিদ্ধ হওয়া ক্রিকেটারকে চেনা যায় পরের ম্যাচে, পুরনো ভুল শোধরানোর মরিয়া চেষ্টা করা দেখে। কিন্তু ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে অ্যান্টিগার পর সেন্ট লুসিয়া টেস্টে সেরকম কোনো ‘ইনটেন্ট’ চোখে পড়েনি। হেসেখেলে উইকেট তুলে নিয়েছেন ক্যারিবীয় বোলাররা। এই হতশ্রী চেহারার জন্য বাইরের কোনো ‘অপসংস্কৃতি’ দায়ী নয়। এই দুর্দশা বাংলাদেশ দলের ড্রেসিংরুমে চলমান সংস্কৃতির কারণে, যে শীতাতপ কক্ষের প্রধান কোচ ফিফটি করা ব্যাটারের কাছে সেঞ্চুরি চেয়ে পরোক্ষে তিরস্কৃত হন। যে দলের ব্যাটিং কোচ জানেন না ব্যাটারদের সমস্যাটা আসলে কোথায়! এতে বোঝা যায়, ড্রেসিংরুমের প্রাধ্যক্ষের সে অর্থে কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। কিংবা তিনি কোনো রকমে মাথা গুঁজে চাকরি করে যাওয়াই মনস্থির করেছেন।

মোটকথা, পৌনঃপুনিক ভুলের দায় নিতে সংশ্লিষ্টদের কেউই রাজি নন। বরং এর-ওর কাঁধে দায় চাপিয়ে দিতে পারলেই বাঁচেন। এই যেমন সাম্প্রতিক টেস্ট ব্যর্থতা প্রসঙ্গে বোর্ডের শীর্ষকর্তা ভারত ও নিউজিল্যান্ডের অতীত উপস্থাপন করেছেন। যদিও গোঁজামিলের এই তথ্য-উপাত্ত জনতা পলিটিক্যাল স্টেটমেন্ট বলে নাকচ করে দিয়েছে। সবচেয়ে দ্রুততম সময়ে টেস্ট হারের ‘সেঞ্চুরি’ করে ফেলা যে ব্যর্থতা, সেটি পাবলিক বুঝে গেছে।

সেন্ট লুসিয়ায় ম্যাচ-পরবর্তী সাকিবের উপস্থাপন করা একটি উদাহরণ দিয়েই লেখাটা শেষ করি। ইংল্যান্ডের মাঠে ভরপুর দর্শকের কথা বলেছেন তিনি। সেই গ্যালারিভরা দর্শকরা ওয়েস্ট ইন্ডিজ-বাংলাদেশ সেন্ট লুসিয়া টেস্ট চলাকালীন লিডসে কী দেখেছেন? এক কথায় অবিশ্বাস্য ক্রিকেট! অধিনায়ক বেন স্টোকস আর কোচ ব্রেন্ডন ম্যাককালাম এমন এক ব্র্যান্ড নিয়ে এসেছেন টেস্টে, যা ভয় ছড়িয়ে দিয়েছে গোটা ক্রিকেটবিশ্বে। এমন রোমাঞ্চকর ক্রিকেট দেখার জন্য দর্শকের অভাব হবে কেন?

তো, নিউজিল্যান্ডকে ধরাশায়ী করার পর বেন স্টোকস আরো রোমাঞ্চকর একটি পরিকল্পনার কথা শুনিয়েছেন, ‘পরিসংখ্যান নয়, খেলার ধরন দেখে আমি দল গড়ব। ’ এই খেলার ধরনটাই সত্যিকারের ‘ইনটেন্ট’। টেস্ট খেলতে অনিচ্ছুক কোনো ক্রিকেটার এমনিতেই ইংল্যান্ডে নেই। তবে স্টোকসের চাই দলের প্রয়োজনে জীবনবাজি রাখা চূড়ান্ত আগ্রাসী ক্রিকেটার। আচ্ছা, এই স্টোকসকেই না স্যালুট দিয়ে ড্রেসিংরুমের পথ দেখিয়েছিলেন সাকিব!

অবশ্য টেস্টে আগ্রাসী ক্রিকেট খেলার বিলাসিতা করার অবস্থায় এখনো পৌঁছেনি বাংলাদেশ দল। সাকিবের দলের হাতে জয়ের চাহিদাপত্রও ধরিয়ে দেয়নি কেউ। চাওয়া শুধু একটাই—মন দিয়ে ক্রিকেট খেলুন তাঁরা। এমন কেউ যেন দলের সঙ্গে যুক্ত না হন, যিনি টেস্ট ক্রিকেট উপভোগ করেন না। টেস্ট শেষ হলেই যিনি হাঁপ ছেড়ে বাঁচেন।

শুদ্ধ ক্রিকেটের চর্চা অন্তত শুদ্ধতা দিয়ে হোক! এতে টেস্ট সংস্কৃতি আপনা-আপনি সমৃদ্ধ হবে। এর সূত্র ধরে টেস্ট ম্যাচের গ্যালারি এমন ফাঁকা পড়ে থাকবে না। দায় এড়ানোর জন্য এর-ওর কাঁধও খুঁজতে হবে না।



সাতদিনের সেরা