kalerkantho

মঙ্গলবার । ৫ জুলাই ২০২২ । ২১ আষাঢ় ১৪২৯ । ৫ জিলহজ ১৪৪৩

ডাউন দ্য উইকেট

হ্যালো ক্রিকেট!

সাইদুজ্জামান

২৩ জুন, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



হ্যালো ক্রিকেট!

‘মিয়া, কাপ্তান বানোগে?’

রাজ সিং দুঙ্গারপুরের এই উক্তিটি ভারতীয় ক্রিকেটের লোকগাথায় ঠাঁই করে নিয়েছে।

১৯৮৯ সালের এই উক্তি আছড়ে পড়েছিল বাংলাদেশেও। তবে একুশ শতকে স্মৃতিকাতরতার সমাদর নেই। এত দিনে আলোড়ন তোলা উক্তিটি বিস্মৃত হয়ে গিয়ে থাকতে পারে।

বিজ্ঞাপন

তাই মনে করিয়ে দেওয়া জরুরি।

ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের সাবেক প্রধান রাজ সিং দুঙ্গারপুর। আর বেঁচে নেই, তবে ভারতীয় ক্রিকেট তাঁকে অমরত্ব দিয়েছে। আভিজাত্য এবং ভিন্ন উচ্চতার ক্রিকেট রোমান্টিসিজমে আসক্ত একজন মানুষকে কি ভুলে যাওয়া যায়?

তো, দুঙ্গারপুরের আলোচিত উক্তিটি কাকে উদ্দেশ করে, সেটি অনেকেরই জানা। ভারতীয় দলে তারকার অভাব নেই, তবে শান্তিও নেই। মহিন্দর অমরনাথ বিদ্রোহ করে বসেছেন। কেউ কারোর নেতৃত্ব মানতেও রাজি নন। দেশটির তৎকালীন প্রধান নির্বাচক দুঙ্গারপুর সেই অস্থির সময় পেছনে ফেলেছেন অভাবিত এক সিদ্ধান্তে।

‘মিয়া, কাপ্তান বানোগে’, প্রধান নির্বাচকের কাছ থেকে এমন প্রস্তাব পেয়ে মোহাম্মদ আজহারউদ্দিন সমান বিস্মিত হয়েছিলেন ভারতীয় ক্রিকেট সমাজের মতো। কেউ যে তখনো ভাবেইনি যে হায়দরাবাদের তরুণ ব্যাটার নেতৃত্ব দেবেন ভারতকে। বিস্মিত ভারতীয়রা ঘুণাক্ষরেও আঁচ করতে পারেননি তখন যে প্রায় এক দশক আজহাররাজ দাপটের সঙ্গে টিকে থাকবে।

ভারতীয় ক্রিকেটের এই ঘটনাটির কথা গত পরশু থেকে খুব মনে পড়ছে। মনে পড়ছে বাঁহাতি তরুণ পেসার শরীফুল ইসলামের একটি উক্তির কারণে। ফিটনেসের কারণে আপাতত শুধু সাদা বলের ক্রিকেটে নেওয়া হয়েছে তাঁকে। তবে আকস্মিক সেই সিদ্ধান্ত পাল্টে শরীফুল সেন্ট লুসিয়ায় পৌঁছেছেন টেস্ট স্কোয়াডের সঙ্গে। পূর্বনির্ধারিত ২৪ জুনের চার দিন আগে নিজের উড়াল দেওয়ার পেছনের কারণ জানিয়ে গেছেন শরীফুল, “গতকাল রাতে জেনেছি। পাপন স্যার (বিসিবি সভাপতি নাজমুল হাসান) ফোন দিয়েছিলেন। আমি বলেছি, ‘জি স্যার, যাব। ’”

মোহাম্মদ আজহারউদ্দিনের ভারতের অধিনায়ক হওয়া এবং শরীফুলের আগেভাগে ওয়েস্ট ইন্ডিজে যাওয়ার ঘটনায় কোনো মিল নেই। বরং অমিলই দুটো ঘটনাকে বিশেষত্ব দিয়েছে। প্রধান নির্বাচক হিসেবে আজহারকে অধিনায়ক হওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিলেন রাজ সিং দুঙ্গারপুর। আর শরীফুলকে প্রস্তাব দিয়েছেন বিসিবি সভাপতি, কোনো নির্বাচক নন। গঠনতন্ত্র কিংবা রীতি—যেটাই বলুন না কেন, এ জাতীয় সিদ্ধান্ত; নিদেনপক্ষে প্রস্তাবনা নির্বাচকদের পক্ষ থেকেই ওঠার কথা। বিরাট কোহলিকে টেস্ট নেতৃত্ব থেকে সরানোর প্রস্তাবও ভারতের বর্তমান নির্বাচক কমিটির, সেটি শুধু অনুমোদন দিয়েছেন বিসিসিআই সভাপতি সৌরভ গাঙ্গুলি। সারা বিশ্বে এমনটাই হয়। পাকিস্তানের মতো ‘বিশৃঙ্খল’ ক্রিকেট সমাজেও এই চর্চা বলবৎ আছে। নেতৃত্ব বদল কিংবা দল নির্বাচন নিয়ে রমিজ রাজাকে উদ্যোগী হয়ে কোনো মন্তব্য করতে হয় না। দল জিতলে কিংবা হারলে সেসব দেশের বোর্ড সভাপতি ‘ফোকাল পয়েন্ট’ হয়ে ওঠেন না।

কিন্তু বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট ভিন্ন। অবস্থাদৃষ্টে মনে হতে পারে ক্রিকেট বোর্ডের চাল-নুনের খবরও নাজমুল হাসানকে রাখতে হয়। অতি সাম্প্রতিক অদলবদলের কথাই ধরুন। মমিনুল হকের টেস্ট নেতৃত্ব ঘিরে তোলপাড়ে তিন সদস্যের নির্বাচক কমিটির কারো বক্তব্য সেভাবে শোনা যায়নি। কিংবা মিডিয়ায় তাঁরা সেভাবে গুরুত্ব পাননি, আরো নির্দয়ভাবে বললে, গুরুত্ব পান না। এর কারণও আছে। দল নির্বাচন কিংবা স্কোয়াডে অদলবদলের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এমন জায়গা থেকে আসে যে নির্বাচকদের স্রেফ সাক্ষীগোপাল বলে মনে হয়। মূল স্কোয়াড নির্বাচনী সভায় তাঁরা উপস্থিত থাকেন। এরপর ছোটখাটো যে পরিবর্তন হয়, সেটি অনেক ক্ষেত্রে তাঁদের অগোচরেই হয়। এই যদি পরিস্থিতি হয়, তাহলে নির্বাচক কমিটির কলেবর আরো বড় করে কি কোনো লাভ হবে? নাকি জনবল বাড়িয়ে নির্বাচক কমিটিকে দিয়ে প্রতিভা অন্বেষণ আরো বিস্তৃত করতে চাচ্ছে বিসিবি? নির্বাচকরা দল নির্বাচনী সভার টেবিলে একগাদা নাম রাখবেন, সেখান থেকে চূড়ান্ত স্কোয়াড গঠন করবেন ক্ষমতাবানরা।

এই ‘ক্ষমতাবান’রা অনধিকার চর্চা করছেন, এমনটি বলায় অবশ্য আইনি বাধা আছে। কারণ ক্রিকেট বোর্ডের গঠনতন্ত্রে আছে, অধিনায়ক কিংবা নির্বাচকদের গঠিত স্কোয়াডের চূড়ান্ত অনুমোদন দেবে বোর্ড। বোর্ডের অনুমোদন যখন বাধ্যতামূলক, তখন নির্বাচকদের গড়া দলে হস্তক্ষেপ করার অধিকার অবশ্যই নীতিনির্ধারকদের আছে। এই অধিকার অবশ্য সব দেশের বোর্ড সভাপতিরই আছে। শ্রীলঙ্কায় এই অনুমোদন নিতে হয় আবার ক্রীড়া মন্ত্রণালয় থেকে। তবু সেসব দেশে নির্বাচকদের গড়া দলে কাটাছেঁড়া হয় না। দল গঠনসংক্রান্ত সব প্রশ্নের উত্তর নির্বাচক কমিটির কোনো প্রতিনিধিই দিয়ে থাকেন। বেতন-ভাতা তো আর এমনি এমনি দেওয়া ঠিক নয় কাউকে!

এসব নিয়ে বিস্তর আলোচনা-সমালোচনা হয়েছে। ক্রিকেটের যাবতীয় সংকটের নিষ্পত্তি কেন একজন বোর্ড সভাপতিই করবেন? তাহলে সংশ্লিষ্ট কমিটি কী কাজ করছে? নাকি তাঁদের কোনো কমিটি পরিচালনার সক্ষমতা নেই? এমন নানা প্রশ্ন আছে দেশের ক্রিকেটাঙ্গনে। এসব প্রশ্নের ক্লেদ বোর্ডরুমের অনেককে ছুঁয়ে যাওয়ার কথা। কমিটির সিদ্ধান্ত গ্রহণের সামর্থ্য অনেকেরই আছে। কিন্তু অভাবিত এক চর্চা শুরু হয়েছে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডে। যেকোনো ব্যাপারেই সভাপতির দ্বারস্থ হন কমিটির সদস্যরা।

এই চর্চা এত দিন কর্মকর্তা পর্যায়েই সীমাবদ্ধ ছিল। এখন সেটি ছড়িয়ে পড়েছে ক্রিকেটের অন্য সব সেক্টরেও। অন্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের সঙ্গে মিডিয়ার কাছে দলের হারজিতের কারণ সবিস্তার বর্ণনা করতে হয় নাজমুল হোসেনকে। সে তুলনায় ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের সভাপতি সৌরভ গাঙ্গুলি অভাগা। সাবেক অধিনায়ক হওয়ার সত্ত্বেও তাঁর কাছ থেকে ক্রিকেটীয় কোনো ব্যাখ্যা খোঁজে না দেশটির মিডিয়া। তিনিও আগ্রহী নন বলেই শুনেছি। ২০১৯ সালে ইডেনে পিংক টেস্ট কাভার করতে গিয়ে কলকাতার পূর্বপরিচিত এক সাংবাদিককে বলেছিলাম, ‘তোমার তো পোয়াবারো...দাদা এখন প্রেসিডেন্ট!’ অধিনায়ক সৌরভের সঙ্গে তাঁর বিস্তর খাতির ছিল। কিন্তু সেই তিনি হতাশ, ‘দূর, বোমা মেরে একটা কথা বের করা যায় না!’ তার মানে, দুঃসাহসী অধিনায়ক সৌরভ বোর্ড চালাচ্ছেন নীরবে। একদার ঘনিষ্ঠ সাংবাদিকেরও ঘাম ছোটে একটি উক্তির জন্য।

সে তুলনায় এ দেশের সাংবাদিকরা ভাগ্যবান! সহজেই বোর্ড সভাপতির বক্তব্য পাওয়া যায়। সেসব বক্তব্যে খবরের উপাদানও থাকে ভরপুর। আবার বিভ্রান্তিও ছড়ায়। এই বিভ্রান্তি নতুন খবরের জন্ম দেয়। সোশ্যাল মিডিয়ার তপ্ত উনুনে সেসব খবর ভাজা ভাজা হয়! এ নিয়ে বোর্ডের অন্দরমহলে উষ্মার ফুলকি ছোটে। বিষোদগার করা হয় মিডিয়ার, অতিরঞ্জনের দায়ে। একজন কর্মকর্তার বক্তব্য যদি ‘অতিরঞ্জিত’ হয়ে থাকে, সেই দায় মোটেও সংবাদমাধ্যমের নয়।

অবশ্য আজকাল নতুন ট্রেন্ড দেখা যায়। কোনো খেলোয়াড় কিংবা প্রশাসক বেফাঁস মন্তব্য করলে সেই দায় বর্তায় সংবাদকর্মীর ঘাড়ে—কেন এমন প্রশ্ন করলেন সংবাদকর্মী! এমন প্রশ্ন হয়েছে বলেই তো কর্তা অমন বেফাঁস কথা বলেছেন। এমনটা শুনে আশ্চর্য হই। সংবাদকর্মীর কাজই বিষয়ভিত্তিক প্রশ্ন করা, সেটি যত বিতর্কিতই হোক না কেন। উত্তরদাতার কাজ হলো, সেই প্রশ্ন ঠিকভাবে সামাল দেওয়া। এটা তো আউট হওয়ার পর ব্যাটার নয়, বোলারের নিন্দা করার শামিল! প্রশ্ন অবান্তর হলে কিংবা বিতর্কিত হলে সেটি এড়িয়ে যাওয়ার এখতিয়ার উত্তরদাতার আছে। কিন্তু খেয়াল করে দেখেছি, গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের মতো অবান্তর ও বিতর্কিত প্রশ্নও আজকাল যথেষ্ট গুরুত্ব পায়। মনে হয় সবাই কেন যেন সার্বক্ষণিক আলোচনায় থাকতে পছন্দ করেন। সেই আলোচনা প্রশংসাসূচক হলে তো কথাই নেই, নেতিবাচকতাতেও আপত্তি নেই!

রাজ সিং দুঙ্গারপুরকে দিয়ে শুরু করেছিলাম। আলোচনার শেষটায় এসে সাবেক বিসিবি সভাপতি আলী আসগার লবির কথা মনে পড়ে গেল। ক্রিকেটে তাঁর যোগসূত্র খুবই দুর্বল বলেই কি না, ক্রিকেট বিষয়ে মিডিয়ায় কিছু বলতেন না। প্রশাসনিক বিষয়েও সংশ্লিষ্ট কমিটির কাছে যাওয়ার পরামর্শ দিতেন আলী আসগার। অবশ্য মিডিয়াও তখন অনেক বেশি খেলোয়াড় এবং সংশ্লিষ্ট কমিটিমুখী। মোটকথা, সেভাবে মিডিয়ায় দেখা যেত না তাঁকে। তবে একবার একটি ঘটনায় তীব্র সমালোচিত হয়েছিলেন তৎকালীন বোর্ড সভাপতি। নাভানা টাওয়ার কার্যালয়ে দেখা হওয়ার পর হাসিমুখে বলেছিলেন, ‘অ্যানি পাবলিসিটি ইজ পাবলিসিটি!’ প্রচারণার এটি একটি স্বতঃসিদ্ধ কৌশল। সে সময় মিডিয়া আউটলেটের সংখ্যা বর্তমানের তুলনায় অতি নগণ্য ছিল। এখন সংখ্যা বেড়েছে, প্রচারণাও স্রোতের গতি পেয়েছে। সেই স্রোতে ভেসে ক্রিকেট এখন একমুখী। শরীফুলকে তাই ফোন করতে হয় নাজমুল হাসানকেই!



সাতদিনের সেরা