kalerkantho

রবিবার । ১৪ আগস্ট ২০২২ । ৩০ শ্রাবণ ১৪২৯ । ১৫ মহররম ১৪৪৪

ডাউন দ্য উইকেট

অভিনন্দন মমিনুল

সাইদুজ্জামান

২ জুন, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



অভিনন্দন মমিনুল

হাবিবুল বাশার মানতে পারেননি। যদিও সময়কাল বিবেচনায় বাংলাদেশের সেরা বিশ্বকাপ ২০০৭ সালেরটি। কিন্তু ভারতের বিপক্ষে অসাধারণ জয়ের পরও প্রশ্ন উঠেছিল অধিনায়ককে নিয়ে। এরপর অধিনায়কত্ব হারাতে হয়েছিল হাবিবুলকে।

বিজ্ঞাপন

বিষয়টি স্বভাবতই ভালো লাগেনি তাঁর।

২০০৩ বিশ্বকাপ ভরাডুবির পর অধিনায়ক হয়েছিলেন খালেদ মাহমুদ, ক্রিকেটীয় যুক্তির পেছনে দল পুনর্গঠনের ব্যাপারটাই অগ্রাধিকার পেয়েছিল। একই বছরের শেষ ভাগে ঘরের মাঠে ইংল্যান্ড সিরিজের পর তাঁকে সরিয়ে দেওয়া হয় নেতৃত্ব থেকে। সেই থেকে নিজের ‘ক্রিকেটগুরু’ ফারুক আহমেদের সঙ্গে মাহমুদের সম্পর্কের উষ্ণতা আর ফিরে আসেনি। তখন প্রধান নির্বাচক ছিলেন ফারুক।

ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যাবে এ দেশের কেউই হাসিমুখে অধিনায়কত্ব ছাড়েননি। অধিনায়কত্ব চলে যাওয়ার বিষয়টিও মেনে নিতে পারেননি। এটা মানবিক কোনো ত্রুটি নয়। ‘আমি আর পারছি না’—এটা মেনে নেওয়া সত্যিই কঠিন। এই মানদণ্ডে মমিনুল হককে লাল কার্পেট বিছিয়ে ‘গার্ড অব অনার’ দিতে চাই। স্বেচ্ছায় মুকুট ফিরিয়ে দিতে চাচ্ছেন যে তিনি।

বলে রাখা ভালো, ২০১৯ বিশ্বকাপের পর মাশরাফি বিন মর্তুজার ওয়ানডে অধিনায়কত্ব ছাড়া আর মমিনুলের টেস্ট অধিনায়কত্ব করতে না চাওয়ার ঘটনায় কিছু পার্থক্য আছে। মাশরাফির বিদায়ে চাপা মান-অভিমান মিশে আছে। মমিনুল সেখানে বলেছেন, ‘আমি যদি সৎ থেকে চিন্তা করি, তাহলে মনে হয় না করাটাই (অধিনায়কত্ব) ভালো। ’ তার মানে, কোনো অভিমান নেই মমিনুলের।

মমিনুলের ঘটনার সঙ্গে দুই সাবেক অধিনায়কের নেতৃত্ব হারানোর প্রসঙ্গ টানার কারণ অভিন্ন—দুজনেই বর্তমানে ক্রিকেটের নীতিনির্ধারণী ভূমিকায় আছেন। হাবিবুল বাশার নির্বাচক কমিটির সদস্য। আর খালেদ মাহমুদ একাধারে বোর্ড পরিচালক ও টিম ডিরেক্টর। পুরো ঘটনাক্রমে এঁদের সম্পৃক্ততা তাই কমবেশি আছে।

হাবিবুল বাশার সরাসরি জড়িত। ২২ মে ওয়েস্ট ইন্ডিজগামী ঘোষিত বাংলাদেশ দল গঠন করেছে নির্বাচক কমিটি। হাবিবুল সেই কমিটির অন্যতম সদস্য। ঘোষিত টেস্ট দলে অধিনায়ক রেখেছেন মমিনুলকেই (এখনো সিদ্ধান্ত পাল্টায়নি)। শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ঢাকা টেস্টের সময় টেস্ট অধিনায়কত্ব নিয়ে চারদিকের চিল-চিৎকারের মধ্যেও তিনি বলেছিলেন, ‘ওয়েস্ট ইন্ডিজে যে টেস্ট দল যাচ্ছে, সেটার অধিনায়ক তো মমিনুলই আছে! এরপর গ্যাপ আছে। তখন দেখা যাবে। ’ প্রাথমিকভাবে এটাই ছিল টেস্ট অধিনায়কত্ব নিয়ে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) নীতি। কিন্তু মমিনুল স্বেচ্ছায় নেতৃত্ব ছাড়ার ইচ্ছার কথা বলায় পরিস্থিতি নতুন মোড় নিয়েছে।

এই মোড় নেওয়ার শুরু ঢাকা টেস্টে। ব্যাটে রান নেই, দলও হেরেছে। পরিসংখ্যান বলছে, মাঝে একটি বাদে চার টেস্টের তিনটিতেই হেরেছে বাংলাদেশ দল। ৫৩ ও ৮০ রানে আউট হওয়ার বিপর্যয় ঘটেছে। আর এই ম্যাচগুলোয় চূড়ান্ত ব্যর্থ ব্যাটার মমিনুল। একদার ‘বাংলার ব্র্যাডম্যান’ রান পাচ্ছেন না অধিনায়কত্বের চাপে—তত্ত্বটা বাজার পেয়ে যায় দ্রুত। ঢাকা টেস্টের পর প্রায় প্রতিদিনই দেখা গেছে বোর্ডের কেউ না কেউ মিডিয়ায় এই তত্ত্বের পক্ষে মনস্তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা দিচ্ছেন। পদাধিকারের কারণে খালেদ মাহমুদ এবং বিসিবির ক্রিকেট অপারেশনস কমিটির চেয়ারম্যান জালাল ইউনুসের বক্তব্য গুরুত্ব পেয়েছে সর্বাধিক। দুজনের বক্তব্যেই অভিন্ন সুর—আমরা মমিনুলের ব্যাটে রান চাই। ভালো কথা। ব্যাটারের কাছে রান সবাই-ই চাইবে। কিন্তু নির্দোষ এই বক্তব্যের সঙ্গে ‘মমিনুলের যদি অধিনায়কত্ব চাপ মনে হয়, তাহলে ব্যাপারটা ভাবতে হবে’—এই বাড়তি কথা বলা কি খুব জরুরি ছিল? জালাল ইউনুস যেখানে কাগজে-কলমে জাতীয় দলের প্রধান অভিভাবক। আর টিম ডিরেক্টর পদে থাকা মাহমুদেরও ড্রেসিংরুমের কারোর মনোজগৎ আমজনতাকে জানানো উচিত কি না, ভাবা উচিত।

অবশ্য বর্তমান যুগ ‘লাইক’ আর ‘কমেন্টে’র। প্রচারণার লোভ সামলাতে পারেন না অনেকে। তাই স্পর্শকাতর বিষয়েও কেতাদুরস্ত পোশাকে কর্তাদের দেখা যায় মিডিয়ায় নানা মন্তব্য করতে। এতে জট খোলে না, বরং আরো জটিল আকার ধারণ করে পরিস্থিতি।

ধন্যবাদ মমিনুলকে, নিজে বলিদান দিয়ে সেই পরিস্থিতি আপাতত সামাল দিয়েছেন। গুলশানে বোর্ড সভাপতির বাসভবন থেকে বেরিয়ে অবশ্য নতুন সংকট তৈরি করতে পারতেন মমিনুল, যদি বলতেন স্বেচ্ছায় নয় চারপাশের চাপে বাধ্য হয়েই নেতৃত্ব ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি।

এটা ঠিক, কিছুদিন হলো ব্যাটে রান নেই। এমনটা বিশ্বসেরা ব্যাটারের ক্যারিয়ারেও আসে। অথচ মমিনুলকে মূল্যায়ন করা হলো চার টেস্টের ব্যর্থতা দিয়ে। মনে হতে পারে, এই চার টেস্টে বাকি ব্যাটাররা রানের বন্যা বইয়ে দিয়েছেন। লিটন দাস ও মুশফিকুর রহিম ছাড়া আর তেমন কাউকে তো চোখে পড়ছে না। আবার শুধু অধিনায়কত্বের চাপ দিয়েই যদি দুঃসময় বিচার করা হয়, তাহলে বাংলাদেশের আরো অনেক অধিনায়কের নিজে থেকে অধিনায়কত্ব ছেড়ে দেওয়া উচিত ছিল।

একটা দৃশ্য কল্পনায় দেখতে পাচ্ছি। ওয়েস্ট ইন্ডিজে মমিনুল রান করলেই জোর উল্লাসধ্বনি শোনা যাবে। তখন অনেকের মনে হবে, অধিনায়কত্ব না ছাড়লে এ জীবনে আর রান পেতেন না বাংলাদেশের পক্ষে সবচেয়ে বেশি টেস্ট সেঞ্চুরির মালিক মমিনুল!

ক্রিকেটে অবশ্য মনস্তত্ত্ব চলে আসে। সম্প্রতি টেস্ট অধিনায়কত্ব নিয়ে তুলকালাম আলোচনা হচ্ছিল চারপাশে। এর জেরে মমিনুল নেতৃত্ব আর দিতে চান না। মমিনুলের জন্য এই সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ। কারণ, টেস্ট অধিনায়কত্ব তিনি চেয়ে নেননি, বরং বোর্ড চাপিয়ে দিয়েছিল। নেতৃত্বের মুকুট আগলে রাখার জন্যও কখনো মরিয়া মনে হয়নি তাঁকে। বোর্ড অধিনায়ক পদে বহাল রাখা সত্ত্বেও নেতৃত্ব করতে না চাওয়ার সিদ্ধান্ত জানিয়েছেন তিনি।  

টাইমলাইন বলছে, সর্বশেষ দুটি সিরিজের আগে অধিনায়ক মমিনুল গ্রহণযোগ্য ছিলেন। মাউন্ট মঙ্গানুইয়ে অবিস্মরণীয় জয়ের ম্যাচে তাঁর দারুণ একটি ইনিংসও আছে। কিন্তু দক্ষিণ আফ্রিকায়, বিশেষ করে পোর্ট এলিজাবেথ টেস্ট চলাকালে বেশুমার ট্রলের শিকার হয়েছেন তিনি। সেটি শুধু ব্যাটে রান নেই বলে নয়, প্রোটিয়া ক্রিকেটারদের নির্মম ‘স্লেজিং’ নিয়ে দুই ধরনের মন্তব্য করার কারণে। প্রথমে সেসবের নিন্দা জানিয়ে পরে উল্টো কথা বলেছিলেন মমিনুল, যা তীব্র সমালোচিত হয়েছে। কিন্তু কেউ কি নিশ্চিত করে জানেন যে স্লেজিং নিয়ে মিডিয়ায় ওসব স্বেচ্ছায় বলেছিলেন তিনি? মাঠে মনপ্রাণ সঁপে ব্যাটিং ছাড়া কখনোই কোনো কিছু ভাবেননি মমিনুল। সত্যিটা হলো, স্লেজিং নিয়ে সংবাদ সম্মেলনে মন্তব্য করতে বাধ্য হয়েছিলেন তিনি। বরং মাঠে ওসব হয়েই থাকে—পরে করা মন্তব্যটাই মমিনুলের মনের কথা।

এখন প্রশ্ন উঠতে পারে, অধিনায়ক কেন চাপে নতজানু হবেন? এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার দরকার নেই। বাংলাদেশের ক্রিকেট সংস্কৃতি সম্পর্কে ন্যূনতম খোঁজখবর যাঁরা রাখেন, তাঁরা এই প্রশ্নের উত্তর জানেন।

ঠিক মনে করতে পারছি না, অধিনায়কত্বকালে কোনো দল কিংবা একাদশ মমিনুল হক নিজের মতো করে পেয়েছেন। সময়ে সময়ে তিনি তো স্কোয়াড ঘোষণার পরও জানতেন না যে সাকিব আল হাসানকে পাওয়া যাবে কি না! অধিনায়ককে দীর্ঘ মেয়াদে পরিকল্পনা করতে হয়। টেস্ট খেলা নিয়ে একাধিক ক্রিকেটারের গড়িমসির কারণে মমিনুলের টেস্ট ভাবনা ছিল স্রেফ বর্তমানকেন্দ্রিক। কুড়িয়ে বাড়িয়ে যে দল পেতেন, সেটা দিয়েই কাজ চালাতে হয়েছে তাঁকে। এমনকি মুস্তাফিজুর রহমানকে পেলে টেস্টের পেস বোলিং আক্রমণ আরো ধারালো হয়—এমন নির্দোষ মন্তব্যও এড়িয়ে যেতে হয়েছে মমিনুলকে। এমন যখন অবস্থা, তখন বাংলাদেশ দলের টেস্ট অধিনায়ক হওয়াটা এক অর্থে অভিশাপ।

তাই খোঁজাখুঁজি করেও টেস্ট অধিনায়ক পাওয়া যায় না। বোর্ডের সংক্ষিপ্ত তালিকায় দুজন আছেন—সাকিব ও তামিম ইকবাল। দুজনেই খুব ইচ্ছুক বলে শোনা যায়নি। ভবিষ্যৎ চিন্তায় লিটন দাস ও মেহেদী হাসান মিরাজের নাম আছে। তবে এমন কত ভবিষ্যৎ নেতাই তো কালের গর্ভে হারিয়ে গেছেন। আর যদি এমন ভাবনাই থাকত, তবে কেন এত দিন কাউকে সহ-অধিনায়কের দায়িত্ব দিয়ে ভবিষ্যৎ নেতা তৈরির চিরায়ত পথে হাঁটেনি বিসিবি? নাকি ভবিষ্যতের কোনো নেতার প্রতি আস্থাই নেই কর্তাব্যক্তিদের? মমিনুলের মুকুট সাকিব কিংবা তামিমকে সাধাসাধি করা দেখে তেমনটাই মনে হচ্ছে।

পরিশেষে, স্বেচ্ছায় অধিনায়কত্ব করতে না চাওয়ার কথা জানিয়ে দেশের ক্রিকেট সমাজে ‘শান্তি’ ফিরিয়ে আনার জন্য মমিনুল হককে ধন্যবাদ। আর অভিনন্দনবার্তা তো শিরোনামেই আছে।



সাতদিনের সেরা