kalerkantho

বৃহস্পতিবার ।  ১৯ মে ২০২২ । ৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯ । ১৭ শাওয়াল ১৪৪৩  

আন্দিজের পাদদেশ থেকে সাগরিকায়

মায়ামিতে বেসবল ম্যাচ দেখতে স্টেডিয়ামে গিয়েই বদলে যায় হাওয়েলের ‘দুই জীবন’ই। ব্যক্তিজীবন যেমন, তেমনি ক্রিকেটজীবনও। গ্যালারিতেই স্ত্রীর সঙ্গে প্রথম পরিচয় থেকে সম্পর্ক গড়ায় পরিণয়ে। আর ক্রিকেটের ব্যাটিং-বোলিংয়ের যত কারিকুরি শেখার শুরুও সেই বেসবল থেকেই।

মাসুদ পারভেজ   

২৮ জানুয়ারি, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



আন্দিজের পাদদেশ থেকে সাগরিকায়

চিলির সীমান্তে আন্দিজ পর্বতঘেরা অনিন্দ্যসুন্দর শহর মেনডোজায় পরিবারের সঙ্গে বড়দিন উদযাপন করতে গিয়ে বেশ বিড়ম্বনায়ই পড়তে হয়েছিল তাঁকে। আর কিছুদিন পরই একের পর এক বিমান বদলানোর ঝক্কি সামলে বিপিএল খেলার জন্য যেতে হবে পৃথিবীর আরেক প্রান্তের শহর ঢাকায়, কিন্তু আর্জেন্টিনার সীমান্তবর্তী শহরে যে ক্রিকেট নামের কোনো খেলার অস্তিত্বই নেই। অনুশীলনের ব্যবস্থা তো দূরের কথা! তাই বলে রংপুর রাইডার্সের হয়ে এর আগে শেষবার বিপিএল খেলে যাওয়ার প্রস্তুতি থেমে থাকেনি বেনি হাওয়েলের। উপায় একটি ঠিক বের করে নিয়ে মাঠে নেমে পড়েছিলেন।

বিজ্ঞাপন

তাতে আবার স্থানীয়দের হাস্যরসের পাত্রও বনে গিয়েছিলেন। গতকাল সকালে ফোনে হাসতে হাসতে সে গল্পই শোনাচ্ছিলেন চট্টগ্রাম চ্যালেঞ্জার্সের হয়ে এবারের বিপিএল খেলতে আসা ইংলিশ ক্রিকেটার।

ফুটবল মাঠে ক্রিকেট অনুশীলনে পিঠব্যাগ আর জুতা জোড়াই ছিল সম্বল, ‘এক পাশে ব্যাকপ্যাক অথবা জুতা (স্টাম্পের বিকল্প) রেখে অন্য পাশ থেকে বোলিং করতাম। দেখে তো লোকে হেসেই খুন! ভাষাগত সমস্যায় ওদের ঠিক বোঝাতেও পারছিলাম না। একেই আমার স্প্যানিশ জ্ঞান সীমিত, আর ওরা প্রশ্নও করছিল স্প্যানিশেই। ’ তুলনায় এবারের বিপিএল প্রস্তুতিটা হয়েছে জমাট। নিজের বর্তমান ঠিকানা ইংল্যান্ডের ব্রিস্টল থেকে এসেছেন বলে দীর্ঘ ভ্রমণক্লান্তিও আগের মতো কাবু করে ফেলেনি ফ্রান্সে জন্ম নেওয়া এই অলরাউন্ডারকে। শুরু থেকেই এবার ব্যাট হাতে ঝড় তুলে চলেছেন। ফরচুন বরিশালের বিপক্ষে উদ্বোধনী ম্যাচেই যেমন ২০ বলে খেলেছিলেন ৪১ রানের ইনিংস। ঢাকার বিপক্ষে ১৯ বলে ৩৭ রানের বিস্ফোরক ইনিংস খেলা হাওয়েল ম্যাচ ভাগ্য গড়ে দেন খুলনা টাইগার্সের সঙ্গে ম্যাচেও। সে ম্যাচে ২০ বলে করেন অপরাজিত ৩৪ রান। আজ থেকে সাগরিকার জহুর আহমেদ চৌধুরী স্টেডিয়ামে শুরু হতে যাওয়া বিপিএলের চট্টগ্রাম পর্বেও হাওয়েলের কাছে মেহেদী হাসান মিরাজের দলের সেই একই রকম পার্থক্য গড়ে দেওয়া ইনিংসের প্রত্যাশা।

বছর তিনেক আগে মেনডোজার ফুটবল মাঠে তাঁর ক্রিকেট অনুশীলনই বলে দিচ্ছে যে দলের প্রত্যাশা পূরণের চেষ্টায় হাওয়েল কমতি রাখেন না কোনো। পারিবারিক বন্ধন মসৃণ রাখতে ছোটাছুটিতেও ক্লান্তিহীন তিনি। মেনডোজায় ছুটে যাওয়াও তো সে কারণেই। কখনো এই দেশ তো কখনো ওই দেশ, তাঁর মুখে এমন দৌড়ঝাঁপের জীবনের ফিরিস্তি শুনলে হাওয়েলকে ‘বিশ্ব নাগরিক’ বলে মনে হওয়াও খুব স্বাভাবিক, ‘ফ্রান্সে জন্মালেও তিন বছর বয়সে ওখান থেকে চলে আসি। আমার বাবা ইংলিশ হলেও মা অস্ট্রেলিয়ান। তাঁরা দুজনই এখন মেলবোর্নে থাকেন। ভাই ফ্রান্সে থাকেন বলে সেখানেও যেতে হয় মাঝেমধ্যেই। ওদিকে আমার স্ত্রী আর্জেন্টাইন। শ্বশুর সেখানে থাকলেও শাশুড়ি আবার থাকেন যুক্তরাষ্ট্রে। ’

যুক্তরাষ্ট্রের মায়ামিতে বেসবল ম্যাচ দেখতে স্টেডিয়ামে গিয়েই বদলে যায় হাওয়েলের ‘দুই জীবন’ই। ব্যক্তিজীবন যেমন, তেমনি ক্রিকেটজীবনও। গ্যালারিতেই স্ত্রীর সঙ্গে প্রথম পরিচয় থেকে সম্পর্ক গড়ায় পরিণয়ে। আর ক্রিকেটের ব্যাটিং-বোলিংয়ের যত কারিকুরি শেখার শুরুও সেই বেসবল থেকেই, ‘বেসবলে দেখলাম ব্যাটারকে থামানোর জন্য পিচার (বেসবলের বোলার) নানা রকম বৈচিত্র্য প্রয়োগ করছে। আবার ব্যাটাররাও পাওয়ার হিটিং করছে। দেখে দেখে খেলাটির প্রেমে পড়ে গেলাম। মনে হলো এসব ব্যাপার তো ক্রিকেটেও নিয়ে আসা যায়। ’ অস্ট্রেলিয়ায় ক্লাব বেসবল খেলতে খেলতে হাত পাকালেন আরো। বিশেষ করে স্লোয়ারে এমন দক্ষ হয়ে উঠলেন যে ডানহাতি মিডিয়াম পেসার হাওয়েলের হাতে বৈচিত্র্যেরও অভাব নেই কোনো, ‘নাকল বলই আছে তিন রকম। স্প্লিট ফিঙ্গার্স দুই রকমের। লেগ স্লাইডার থেকে শুরু করে আরো অন্তত দুই রকমের ডেলিভারি আছে আমার। সেই সঙ্গে অফ-কাটার আর অফ স্পিন তো আছেই। ’ স্লোয়ারের এত বৈচিত্র্য থাকার পরও বাংলাদেশের মুস্তাফিজুর রহমানের সঙ্গে তুলনীয় হতে না চাওয়ার ব্যাখ্যায় বললেন, ‘হয়তো স্লোয়ারের অনেক বৈচিত্র্য আছে আমার। তবে মুস্তাফিজ তো অনেক জোরেও বল করতে জানে। আমি যেটি পারিই না। ’

বল হাতে যা-ই পারেন, সেসবের সফল প্রয়োগের অনুশীলনও থেমে থাকে না তাঁর। হোক সেটি ক্রিকেটহীন আন্দিজ পর্বতের পাদদেশে কিংবা ক্রিকেটময় সাগরিকায়!



সাতদিনের সেরা