kalerkantho

মঙ্গলবার ।  ২৪ মে ২০২২ । ১০ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯ । ২২ শাওয়াল ১৪৪৩  

ডাউন দ্য উইকেট

ইচ্ছা ক্রিকেট!

সাইদুজ্জামান

২৭ জানুয়ারি, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



ইচ্ছা ক্রিকেট!

চন্দিকা হাতুরাসিংহের মেজাজ-মর্জির ঠিক ছিল না। যাকে-তাকে বকাঝকা করাতেও জড়তা ছিল না। সাকিব আল হাসান, তামিম ইকবালদের মতো তারকাদের গায়েও আঁচ লেগেছিল। তবু তাঁর সম্পর্কে খুব খারাপ কিছু কখনো শোনা যায়নি।

বিজ্ঞাপন

অন্দরমহলের খবর, হেড কোচের অকাট্য যুক্তির সামনে তাঁদের ইগো মাথা তুলে দাঁড়াতে পারেনি কখনো।

সে এক কাল ছিল বটে!

এখন রাসেল ডমিঙ্গো বাংলাদেশ দলের প্রধান কোচ। গত বছর জিম্বাবুয়ে সফরের একটি ঘটনা নিয়ে যিনি এখনো দ্বারে দ্বারে অনুযোগ জানিয়ে যাচ্ছেন। একজন সিনিয়র ক্রিকেটার ‘দুর্ব্যবহার’ করেছিলেন। সেটির বিচারপ্রার্থী ডমিঙ্গো। অবশ্য একই ঘটনায় কোচের বিরুদ্ধেও অভিযোগ আছে ওই সিনিয়র ক্রিকেটারের। সম্ভবত এই অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগের কারণেই ঘটনার ‘আগুনে’ হাত পোড়াতে চাচ্ছেন না বোর্ডের কেউ!

তামিম ইকবাল টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়েছিলেন। এসংক্রান্ত একটি ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন তিনি। নিজের অনুপস্থিতিতে যাঁরা দুঃসময়ে দলকে সার্ভিস দিয়েছিলেন, তাঁদের বিশ্বকাপের উড়োজাহাজ থেকে নামিয়ে দিতে চাননি তামিম। খুবই উদার সিদ্ধান্ত, প্রশংসাও করেছিলেন বিসিবি সভাপতি। কিন্তু পেশাদার কি? ব্যাখ্যায় পরে যাচ্ছি।

নিউজিল্যান্ডের কঠিন কন্ডিশনে টেস্ট সিরিজ খেলতে যাবে বাংলাদেশ দল। কিন্তু পারিবারিক কারণ দেখিয়ে ছুটি নিয়েছিলেন সাকিব আল হাসান। দলের সেরা ক্রিকেটারের এমন সিদ্ধান্ত যেভাবে গ্রহণ করেছে বোর্ড, সেটিতেও পেশাদারি নেই।

পেশাদারি নেই টিম ম্যানেজমেন্ট থেকে শুরু করে বোর্ডরুম পর্যন্ত। শুরুটা অবশ্য বোর্ডরুমেই হয়। যে যত গুরুত্বপূর্ণ ক্রিকেটার, তাঁর ইচ্ছা তত বেশি গুরুত্ব পায় বোর্ডকর্তাদের কাছে। এর প্রভাব পড়ে টিম ম্যানেজমেন্টের ওপরও। এটা নিয়ে দলের ভেতরে অসন্তোষ আছে। সেটি বোঝা গেছে নিউজিল্যান্ড সফরে। নিউজিল্যান্ড সফরে এ দেশে সিনিয়র ক্রিকেটার বলতে যাঁদের বোঝায়, তাঁদের মধ্যে একজনই ছিলেন—মুশফিকুর রহিম। দলীয় সূত্রে জানা গেছে, তারকাদের এই অনুপস্থিতি স্বস্তির সুবাস ছড়িয়ে দিয়েছিল মমিনুল হকদের ড্রেসিংরুমে।

এমন অগুনতি ঘটনার উল্লেখ করা যায়, যেসবে পেশাদারি নেই। মনে হচ্ছে ইচ্ছার ভেলায় চড়ে বসেছে দেশের ক্রিকেট। যাঁর পালে হাওয়ার জোর বেশি, ক্রিকেট এগোতে থাকে তাঁর মতো করে।

তামিম ইকবালের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ স্কোয়াডে না থাকার বিষয়টি দিয়ে শুরু করা যাক। চোটের কারণে এর আগে কয়েকটি টি-টোয়েন্টি সিরিজ খেলেননি তিনি। এটাকে বর্ম বানিয়ে বিশ্বকাপ স্কোয়াড গঠনের আলোচনার টেবিলে তামিমের বিপক্ষে সওয়াল তুলেছিল টিম ম্যানেজমেন্ট। দল নির্বাচনী সভার খুঁটিনাটি বাঁহাতি ওপেনারের কানে পৌঁছে যায় যথারীতি। স্বভাবতই সেসব আলোচনা ভালো লাগেনি তামিমের, কয়েক দিন পর নিজেকে প্রত্যাহারের ঘোষণা ফেসবুক পেজে দিয়ে দেন। কিন্তু এটা কি গ্রহণযোগ্য? তিন ফরম্যাটেই খেলবেন বলে চুক্তি করেছেন তামিম। তাই টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ তিনি খেলবেন কি খেলবেন না, এই সিদ্ধান্ত তো নেওয়ার কথা নির্বাচক কমিটির। নাকি সেই কমিটিও তামিমকে বিশ্বকাপে চায়নি? আর যদি না-ই চেয়ে থাকে, তবে তামিম কেন নিজে থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিয়ে হৈচৈ ফেলে দিলেন? চুক্তিবদ্ধ ক্রিকেটারদের আচরণবিধি বলে তো একটা কথা আছে! নাকি সবার জন্য সেটি কার্যকর নয়?

অবশ্য ভেতরের খবর, ফিট হয়ে ওঠা তামিমকে স্কোয়াড থেকে বাদ দেওয়া কঠিন হতো নির্বাচকদের। বোর্ড সভাপতিও কথা বলেছিলেন তামিমের সঙ্গে। কিন্তু অভিমানাহত তামিম নিজের সিদ্ধান্তে অটল থেকেছেন, বিশ্বকাপে তাঁকে ছাড়াই গেছে বাংলাদেশ দল।

বিশ্বকাপ চলাকালেই দেশে রটে যায়, পাকিস্তানের বিপক্ষে একটি টেস্ট খেলেই যুক্তরাষ্ট্রে পরিবারের কাছে চলে যাবেন সাকিব আল হাসান। নিউজিল্যান্ডের কঠিন কন্ডিশনে তাঁর সার্ভিস পাবে না বাংলাদেশ দল। বোর্ড কিংবা সাকিবের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো ঘোষণা আসার আগেই বিষয়টি রটে গিয়েছিল। তো, একদিন সাকিব বোর্ডকে চিঠি দিয়েছেন। সেটি অনুমোদিতও হয়েছে। অথচ তিনিও তিন ফরম্যাটের জন্য বোর্ডের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ। সেই অনুপাতে বেতন পাচ্ছেন ঠিকই।

এরই প্রেক্ষাপটে নতুন আলোচনা শুরু হয়ে গেছে। ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগ (আইপিএল) আর বাংলাদেশের দক্ষিণ আফ্রিকা সফর একই সময়ে। এখন যদি দল পেয়ে যান, তবে সাকিবকে কি ছাড় দেবে বিসিবি? যথারীতি ‘ধরি মাছ না ছুঁই পানি’ টাইপ উত্তর কর্তাব্যক্তিদের। বাংলাদেশ দলের টিম ডিরেক্টর খালেদ মাহমুদ মিডিয়াকে জানিয়েছেন, ‘এই বছর সাকিবকে সব ফরম্যাটে খেলতে অনুরোধ করব। ’

পরদিন মাহমুদকে ফোনে ধরে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, ‘অনুরোধ করবেন কেন? টানা ক্রিকেট খেলা খুবই ক্লান্তিকর। বায়ো-বাবলের কারণে আরো কঠিন। তাই সাকিবের অবশ্যই বিশ্রাম দরকার। কিন্তু সেই বিশ্রামের সূচি তো বোর্ডের করে দেওয়ার কথা। কোন সিরিজে সাকিবকে দরকার, সেটি টিম ম্যানেজমেন্ট আর ক্রিকেট অপারেশন্স ঠিক করবে। সাকিব কিংবা কোনো ক্রিকেটার নন। ’ অজনপ্রিয় কাজ করে অভ্যস্ত মাহমুদও এই ব্যাপারে সংযত, ‘আসলে আমাদের বসতে হবে। জালাল ভাইসহ (জালাল ইউনুস, ক্রিকেট অপারেশন্স চেয়ারম্যান) আমরা বসে ঠিক করব। ’

‘ঠিক’ হওয়ার সম্ভাবনা অতি ক্ষীণ। বোর্ড সভাপতি নিজে প্রকাশ্যে একাধিকবার বলেছেন, ‘কাউকে জোর করা হবে না। খেলতে না চাইলে জোর করব না। ’ আসলেও জোর করে কারো কাছ থেকে ভালো কিছু আদায় করা যায় না। তবে এই ছাড় যদি বরাদ্দ থাকে সবার জন্য, তাহলে বেতন দেওয়াও বন্ধ করে দিক বিসিবি। চুক্তি করার দরকার কী? চুক্তির বাইরে থেকে জাতীয় দলে ঢোকা ক্রিকেটারের নিয়মে বেতন-ভাতা দেওয়া হোক সবাইকে।

নিয়মটা খুব সহজ। চুক্তির বাইরে থাকা কেউ জাতীয় দলে ডাক পেলে সিরিজজুড়ে মাসিক বেতন দেওয়া হয় ওই ক্রিকেটারকে। গ্রেডিংও নির্ধারিত হয় প্রচলিত নিয়মে। এই নিয়ম চালু করলে কিছু অর্থ সাশ্রয় যেমন হবে, তেমনি ‘ইচ্ছা’ থেকেও মুক্তি পাবে দেশের ক্রিকেট। অবশ্য বোর্ড এই পথে হাঁটার ‘দুঃসাহস’ দেখাবে বলে মনে হয় না। বিচিত্র কারণে ক্রিকেটারদের মন জুগিয়ে চলাতেই যেন কর্তাদের আনন্দ!

যাক, বোর্ডকর্তারা আসবেন এবং যাবেন। কিন্তু তারকারা রয়ে যাবেন ক্রিকেটের মাঠে এবং ইতিহাসে। মাঠের জীবন আর কত দিনের? ইতিহাসের পাতায় ঠাঁই পাওয়া ক্রিকেটারের জীবন অনন্ত।

এত গভীর জীবনবোধের কথা বলে লাভ নেই। তবে সাম্প্রতিক একটি ঘটনায় বিচলিত বোধ করছি।

সেটি অবশ্য একভাবে বলাও হয়েছে। এবার বিস্তারিতই বলা যাক। মাউন্ট মঙ্গানুইতে ঐতিহাসিক জয়ের পর একাধিক বোর্ড পরিচালকের উল্লাস কানে এখনো বাজে। মহাতারকারা নেই বলেই নাকি বাকিরা খোলা মনে ক্রিকেট খেলে এমন বিজয় ছিনিয়ে এনেছেন। তখন গুরুত্ব দিইনি। ভেবেছিলাম স্রেফ বিদ্বেষ থেকে এসব বলা। পরে বুঝেছি, এবার ঘটনা অন্য রকম।

টিম হোটেলের উদযাপনে ম্যানেজমেন্টকে বাইরে রেখেছিলেন মমিনুল হকরা। পরে জানা গেছে, ওটা একটা বার্তা ছিল বয়োজ্যেষ্ঠদের জন্য। দেশে ফেরার পর সফরসঙ্গী কয়েকজনের কাছ থেকেও জানা গেছে যে, মহাতারকাদের না থাকার বিষয়টি স্বস্তি দিয়েছে নিউজিল্যান্ডে টেস্ট সিরিজ ড্র করে ফেরা দলকে।

অবিশ্বাস্য মনে হচ্ছে? মোটেও না। এর অনেকগুলো কারণ আছে। তারকা ক্রিকেটারদের প্রতি যতটা যত্নশীল বোর্ড, ততটাই উপেক্ষিত ড্রেসিংরুমের বাকিরা। শুধু বেতন, ঐচ্ছিক ছুটিই তো নয়, ক্রিকেটীয় গণ্ডির বাইরে অযাচিত অনেক সুবিধাও বরাদ্দ থাকে তারকা ক্রিকেটারদের জন্য। এর প্রভাব পড়ে টিম ম্যানেজমেন্টে। এঁরাও তারকাতোষণ করেন। একই ড্রেসিংরুমে বাকি যাঁরা থাকেন, তাঁদের কাছে এমন পক্ষপাত প্রীতিকর নয়। তাতে অপ্রীতিকর বিভাজন ঘটে যাচ্ছে দলের ভেতরে।

পরিস্থিতি যা, তাতে আজকের ‘আইকনে’র জন্য স্বস্তিদায়ক ভবিষ্যৎ দেখা যাচ্ছে না। আর কয়েকটা দলীয় ভালো পারফরম্যান্স কিন্তু সেই ভবিষ্যতের সামনে দাঁড় করিয়ে দিতে পারে তারকাদের।

একজন ক্রিকেটার অবসরজীবনে সবচেয়ে বেশি মিস করেন ড্রেসিংরুম। সেই ড্রেসিংরুম আপনাকে যথাযথ সম্মান করবে তো? নাকি আপনি বেরিয়ে যেতেই ছিটকিনি তুলে উদযাপন করবে অনাগত ভবিষ্যৎ?

একবার ভাববেন প্লিজ। এই ইচ্ছা ক্রিকেট না আবার বুমেরাং হয়ে আক্রমণ করে আপনাকে, আপনার নিজের ঘর (ড্রেসিংরুম) থেকেই!



সাতদিনের সেরা