kalerkantho

সোমবার । ৩ মাঘ ১৪২৮। ১৭ জানুয়ারি ২০২২। ১৩ জমাদিউস সানি ১৪৪৩

ডাউন দ্য উইকেট

ক্রিকেট-রোগ

সাইদুজ্জামান

২ ডিসেম্বর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



ক্রিকেট-রোগ

ক্রিকেটে অনেক দিন কোনো ‘বিরোধী দল’ নেই। কালেভদ্রে সাবের হোসেন চৌধুরী তির্যক টুইট করেন। সাবেক এই বোর্ড সভাপতি ছাড়া দেশের ক্রিকেট ফ্র্যাটার্নিটি মানেই ‘দশে মিলি করি কাজ, হারি জিতি...’—গর্বিত এবং সুখী সংসার। কিন্তু সর্বশেষ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের পর সেই সংসার রোগাক্রান্ত। সেই রোগটা আচমকা আত্মসমালোচনায় সবার ব্যস্ত হয়ে পড়া। আত্মসমালোচনার ভালো এবং মন্দ দুটো দিক আছে। আত্মসমালোচনা সর্বক্ষেত্রেই আরো উন্নতির সিঁড়ি। তবে সেই আত্মসমালোচনা যদি লোক-দেখানো হয়, তবে সেটা রোগ। হাবে ভাবে মনে হচ্ছে এ দেশের ক্রিকেটে চিরকালীন ক্রিকেট-রোগটা আবার ফিরে এসেছে!

পাকিস্তানের বিপক্ষে ঢাকা টেস্টের জন্য ঘোষিত দল দিয়েই শুরু করা যাক। ওপেনাররা পারছেন না। তাই নাঈম শেখকে অন্তর্ভুক্ত করেছেন নির্বাচকরা। এই বাঁহাতি তরুণ ২১ মাস আগে শেষ প্রথম শ্রেণির ম্যাচ খেলেছেন। সব মিলিয়ে ছয়টি ম্যাচ। তবে সাদা বলের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে নিয়মিত। প্রধান নির্বাচক মিনহাজুল আবেদীন যুক্তি দিয়েছেন যে, আন্তর্জাতিক ক্রিকেট যখন খেলছেন নাঈম তখন লাল বলেও তাঁর ওপর বাজি ধরা যায়। অথচ এই কদিন আগেই শেষ হয়েছে দেশের প্রধান প্রথম শ্রেণির আসর জাতীয় লিগ। অন্য যেকোনো দেশে বিকল্প খোঁজা হয় ঘরোয়া আসরে নির্দিষ্ট ফরম্যাটের নৈপুণ্য দিয়ে, কিন্তু মিনহাজুলরা সে পথে হাঁটেননি। তার মানে ঘরোয়া আসরের ওপর আস্থা নেই তাঁদের।

ঘরোয়া ক্রিকেটে নির্বাচকদের আপাত এই অনাস্থা দেশের ক্রিকেট-কঙ্কাল বেরিয়ে যাওয়ার মতো ব্যাপার। সেরা মানের খেলোয়াড় তৈরিই হন ঘরোয়া ক্রিকেটে। অথচ খেলোয়াড় তৈরির একমাত্র মঞ্চটিকে গুরুত্বই দিচ্ছে না বাংলাদেশ। ভাবা যায়, টেস্ট মর্যাদা প্রাপ্তির ২০ বছর পেরিয়ে যাওয়ার পরও একটি দেশের ঘরোয়া ক্রিকেটে আস্থা রাখতে পারেন না নির্বাচকরা! বর্তমান নির্বাচক কমিটির তিনজনের খেলোয়াড়িজীবনেও এমন অনাস্থার কথা শোনা গেছে। তাঁরা নির্বাচক হওয়ার পরও অবস্থার কোনো উন্নতি হয়নি।

কিন্তু এত দিন এমন ঘটা করে ঘরোয়া ক্রিকেটের দুরবস্থার ছবি তুলে ধরা হয়নি। সময়ে সময়ে ঘরোয়া ক্রিকেটের ভিত্তি যে কত মজবুত—এ জাতীয় প্রচারণায় অংশ নিয়েছেন নির্বাচকরা। আসলে ঘরোয়া ক্রিকেটের নিরিখে জাতীয় দল নির্বাচন একটি গোলকধাঁধা। কারো ঘরোয়া ক্রিকেটের নৈপুণ্য নির্বাচক কমিটি গুরুত্ব দেয়, কারো বেলায় দেয় না। তেমনি দল নির্বাচনের আরেকটি মানদণ্ড অভিজ্ঞতার ক্ষেত্রেও দ্বৈতনীতি অনুসরণ করেন নির্বাচকরা। কারো অভিজ্ঞতা মহামূল্য, কারোটার গুরুত্বই নেই। আসলে ঘরোয়া ক্রিকেটের মানকে নতুন করে প্রশ্নের মুখে ফেলে দেওয়া কিংবা দল নির্বাচনে অভিজ্ঞতাকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করার মধ্যে কোনো নতুনত্ব নেই। বাংলাদেশ জাতীয় দলের ফল খারাপ হলে ঘরোয়া ক্রিকেটের শাপ-শাপান্ত হয়, আর ভালো করলে ঘরোয়া ক্রিকেটের স্তুতি হয়। একই ব্যক্তি ভিন্ন ভিন্ন পরিস্থিতিতে ভিন্ন ভিন্ন ব্যাখ্যা দেন।

দল নির্বাচন নিয়ে বেশি কথা বলে লাভ নেই। নির্বাচক কমিটির নির্বাচনী ব্যাখ্যায় আজকাল যুক্তি তেমন একটা খুঁজে পাওয়া যায় না। হতে পারে, দুঃসময়ে তাঁরা স্নায়ুচাপে ভুগছেন। নইলে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে যে কমিটি ১৬ জনের স্কোয়াড গড়েছিল, সেটিই কিনা পাকিস্তানের বিপক্ষে দ্বিতীয় টেস্টের জন্য ডেকেছেন ২০ জনকে! একটা ম্যাচের জন্য ১১ জনের বিকল্প ৯ জন কেন, অনুমান করাও মুশকিল। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, অস্থিরতায় ভুগছে বর্তমান নির্বাচক কমিটি। নির্বাচিত দল মাঠে খারাপ করলে সমালোচনা তাড়া করে নির্বাচক কমিটিকেও। তাতে মিনহাজুল আবেদীনরা আক্রান্ত বোধ করতেই পারেন। এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াতেই কি এমন সব সিদ্ধান্ত নিচ্ছে মিনহাজুলের নেতৃত্বাধীন নির্বাচক কমিটি?

আবার ঘরোয়া ক্রিকেটে ফিরে আসি। এটি আয়োজনের দায়িত্বে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি)। তাই এই মানহীনতার দায়ও বিসিবির। কিন্তু দল ভালো করলে এই বিষয়টি নিয়ে কেউ প্রশ্ন তোলেন না। খারাপ করলে প্রশ্ন ওঠে এবং সিংহভাগ দায় বর্তায় খেলোয়াড়দের ওপর। কিভাবে?

ঘরোয়া ক্রিকেটের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আসর প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট, জাতীয় লিগ (এনসিএল) এবং বাংলাদেশ ক্রিকেট লিগ (বিসিএল)। এগুলো অবশ্য কেতাবি কথা। কার্যকারিতায় এই দুটি খেলোয়াড় তৈরির আসরকে কোনোকালেই অগ্রাধিকার দেয়নি বিসিবি। নিম্নমানের উইকেট, সবচেয়ে কম আর্থিক সুবিধা এবং অব্যবস্থাপনায় বিপন্ন এ দেশের দীর্ঘ পরিসরের ক্রিকেট। খেলোয়াড়দের উপার্জন বেড়েছে, তবে সেটি বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগ (বিপিএল) এবং ঢাকা প্রিমিয়ার লিগের (ডিপিএল) তুলনায় নগণ্য। উইকেটের মান কেমন, সেটির প্রামাণ্য দলিল এবারের জাতীয় লিগ। দেড়-দুই দিনে শেষ হয়েছে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক ম্যাচ।

অভিযোগ আরো আছে। জাতীয় লিগের দল গঠনের প্রক্রিয়াটাই ঘোলাটে। নির্বাচক কমিটি দল গড়েন বিধায় আঞ্চলিক কর্মকর্তারা সেই দলের প্রতি শ্রদ্ধাশীল নন। ইদানীং পাল্টা অভিযোগ আঞ্চলিক কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে, তাঁরা পক্ষপাতদুষ্ট! পরের অভিযোগটাই এখন বেশি বেশি শোনা যায়। তাই একাদশে জায়গা পেয়েই খুশি—এমন ক্রিকেটারের সংখ্যা ক্রমান্বয়ে বাড়ছে, কমছে মাঠের প্রতিদ্বন্দ্বিতা। ফলশ্রুতিতে এনসিএল কিংবা বিসিএল খুব একটা গুরুত্ব পায় না দল নির্বাচনী সভায়।

সাম্প্রতিক ক্রিকেট-রোগের আরেকটি উপসর্গও কম আকর্ষক নয়। টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে বিপর্যস্ত হওয়া জাতীয় দলের ক্রিকেটাররাও ঘরোয়া আসরে যে ধরনের উইকেটে খেলা হয়, সেসবের সমালোচনা করছেন। এমন ধীরগতির উইকেটে খেলে যে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে বেশি দূর এগোনো যাবে না, সেটি উপলব্ধি করতে পারছেন তাঁরা। যদিও বৈশ্বিক আসরটির দিন পনেরো আগেও মিরপুরের উইকেটের পক্ষে নানা যুক্তি তুলে ধরেছিলেন ক্রিকেটাররা। তবু ভালো যে একটি ব্যর্থতা সত্যের সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে তাঁদের।

মুশকিল হলো, অতীতে চোখ ফেললেই এমন আত্মোপলব্ধির অসংখ্য উদাহরণ খুঁজে পাওয়া যাবে। এমন কত ব্যর্থতার পরই তো ক্রিকেটকে ঢেলে সাজানোর শোর উঠেছিল অতীতে। কিন্তু কিছুই বদলায়নি। সেই ধীরগতির উইকেটেই খেলা হয়ে আসছে।

সবচেয়ে বিস্ময়কর ঘটনা ঘটে বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগে (বিপিএল)। বিশেষ কারণে টি-টোয়েন্টির এই আসরটি সবচেয়ে বেশি চাঞ্চল্য তৈরি করে বোর্ড কর্তা থেকে শুরু করে খেলোয়াড় মহলে। এমন না যে দেশের একমাত্র এই ফ্র্যাঞ্চাইজি আসর খেলোয়াড় তৈরির সূতিকাগার। টি-টোয়েন্টির অনুশীলন মঞ্চ বড়জোর। তবে শানশওকত আছে। সে কারণেই কিনা মুখে কর্তারা যতই এনসিএলকে গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলুন না কেন, বিসিবির প্রিয়তম আসর বিপিএল। সেটির প্রচার এবং প্রসারের জন্য আত্মনিবেদনে ঘাটতি থাকে না কারোর। এই যেমন, পাকিস্তানের বিপক্ষে দ্বিতীয় টেস্টের দল নির্বাচনের ক্ষেত্রে মিনহাজুলরা অনায়াসে জাতীয় লিগের নৈপুণ্য উপেক্ষা করেছেন। কিন্তু টি-টোয়েন্টির দল গড়ার ক্ষেত্রে বিপিএলকে অবহেলা করতে পারবেন কি?

পারবেন না, কারণ এটির অবমূল্যায়ন সরল চোখে দেখবে না বিসিবি। এই আসরের ফ্র্যাঞ্চাইজির সঙ্গে বোর্ড কর্মকর্তাদের কয়েকজন প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষভাবে জড়িয়ে। এই আসরে সরাসরি আগ্রহ আছে ক্রিকেটের অন্দরমহলের অনেকের। তাতে অন্তত বিপিএলের জন্য ভালো উইকেট তৈরি হওয়ার কথা। কিন্তু ক্রিকেটারদেরই মুখেই শোনা, ২০১২ সালে প্রথম আসরের পর কোনোবারই ভালো উইকেট পাননি তাঁরা।

এ এক রহস্য। সবচেয়ে পছন্দের টুর্নামেন্টের জন্যও ভালো উইকেট তৈরি করতে অনিচ্ছুক কিংবা অপারগ সংশ্লিষ্টরা।

এই ব্যাপারটা আজকে নয়, ঘটছে অনেক দিন ধরে। এমন ঘটা করে না হলেও উইকেট এবং এর সূত্র ধরে ঘরোয়া ক্রিকেটের মান প্রশ্নবিদ্ধ দীর্ঘকাল। তবু বিষয়গুলোর কোনো সুরাহা হলো না কেন? কোনো প্রকার চেষ্টাও দৃশ্যমান নয়। শুধু জাতীয় দল খারাপ করলে বদলে ফেলার অঙ্গীকার শোনা যায়।

এই অঙ্গীকার আর পূরণ হয় না। কারণ এক-দুটি সাফল্যে ঢাকা পড়ে যাবে ঘরোয়া ক্রিকেট কিংবা উইকেটের মান নিয়ে যাবতীয় প্রশ্ন। অবধারিতভাবে আবার কোনো একদিন ব্যর্থতা জাপটে ধরবে, এই সমস্যাগুলোই নতুন করে সামনে আসবে...কর্তারা প্রতিশ্রুতি দেবেন এবং ভুলেও যাবেন।

ক্রিকেটের এই রোগ আর সারবে বলে মনে হয় না। এত দিনেও তো সারেনি।



সাতদিনের সেরা