kalerkantho

শুক্রবার । ৭ মাঘ ১৪২৮। ২১ জানুয়ারি ২০২২। ১৭ জমাদিউস সানি ১৪৪৩

‘প্রদর্শনী’ আর ‘পরীক্ষা’র পার্থক্য দেখালেন লয়েড

৯ নভেম্বর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



‘প্রদর্শনী’ আর ‘পরীক্ষা’র পার্থক্য দেখালেন লয়েড

এখন বয়স হয়ে গেছে বলে যখন যা ইচ্ছা খাওয়ার স্বাধীনতাও আর তাঁর নেই। খাবারের তালিকা থেকেও অনেক কিছুই তাই ছেঁটে ফেলতে হয়েছে। একসময়ের আইসক্রিম খাওয়ার প্রচণ্ড নেশা থেকেও নিরাপদ দূরত্বে থাকতে হয়। মিষ্টিজাতীয় যেকোনো জিনিস খাওয়াতে অবলম্বন করতে হয় বাড়তি সতর্কতা।

বিজ্ঞাপন

দেওয়ালির দিন দুবাই ইন্টারন্যাশনাল ক্রিকেট স্টেডিয়ামের প্রেস বক্সে এখানকার ভারতীয়দের আয়োজনে মিষ্টিমুখ করার আগেও যেন ‘খাব কি খাব না’ দ্বিধায় ভুগলেন কিছুক্ষণ।

স্যার ক্লাইভ লয়েড শেষে খেলেনও, তবে একটুখানিই। কমেন্ট্রি বক্স থেকে মিডিয়া ডাইনিংয়ে খেতে আসা এই ক্যারিবীয় কিংবদন্তির প্লেটে খাবারের পরিমাণও তাঁর বিশাল শরীরের সঙ্গে বেমানান। পরিমিত খাবারেই এই ৭৭ বছর বয়সেও সুস্থ থাকার চেষ্টা ওয়েস্ট ইন্ডিজের হয়ে দুটি বিশ্বকাপজয়ী অধিনায়কের। এই সফরে তাঁর সার্বক্ষণিক সঙ্গী রেডিওতে ‘টক ওয়ান হান্ড্রেড পয়েন্ট থ্রি’ অনুষ্ঠানের প্রগ্রাম ডিরেক্টর ডিগবি টেলর বলছিলেন, খাবারের সংযমই এই বার্ধক্যে বেশ ফিট রেখেছে লয়েডকে। লম্বা ভ্রমণেও তাই ক্লান্তিহীন এই সাবেক ক্রিকেটার দূর ক্যারিবীয় দ্বীপপুঞ্জের গায়ানা থেকে হাজার মাইল পেরিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে ছুটে এসেছেন রেডিও কমেন্ট্রি করতে। আইসিসির হয়ে চলতি টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের রেডিও প্রডাকশনের দায়িত্ব পাওয়া চ্যানেল টুর সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হওয়াতে মন খুলে সংবাদমাধ্যমে বিশেষজ্ঞ মত দেওয়াতেও আছে বিধি-নিষেধ।

তবু যে টুকটাক কথা বলছেন না, এমন নয়। তবে এই বিশ্বকাপে বাংলাদেশের হতাশাজনক পারফরম্যান্স নিয়ে কথা বলতে গিয়ে সমালোচনার গণ্ডিতে ঢুকছেন না কিছুতেই। প্রায় সবাইকেই সন্তুষ্ট করতে চাইছেন একই রকম কথায়, ‘বাংলাদেশ ভালো দল অবশ্যই। তবে দিন সব সময় একই রকম যাবে না। কখনো ভালো যাবে, আবার কখনো খারাপ। এবার ভালো করেনি তো কী হয়েছে? সামনে নিশ্চয়ই করবে। তা ছাড়া এমনও নয় যে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ওদের দারুণ কোনো পারফরম্যান্সই নেই। কাজেই ভবিষ্যতে এই ব্যর্থতা ভুলিয়ে দেওয়ার মতো কিছু করার সুযোগ শেষ হয়ে যায়নি। ’

নির্বিরোধ এসব কথার বাইরেও কিছু বের করার চেষ্টা তবু থামে না। কিন্তু বাদ সাধেন তাঁর সঙ্গী ডিগবি টেলর, ‘দেখুন, রেডিওতে প্রচুর কথা বলতে হয় তাঁকে। কাজের বাইরে উনি এখন আর ক্রিকেট নিয়ে খুব একটা কথাও বলতে চান না। দেখি তবু চেষ্টা করে যে একটি সাক্ষাৎকারের ব্যবস্থা করা যায় কি না। ’ অবশেষে ব্যবস্থা একটি করলেন বটে, তবে ডিগবির হোয়াটসঅ্যাপে প্রশ্ন পাঠাতে হবে আগে। সেই প্রশ্ন পাঠিয়ে উত্তরের জন্য অপেক্ষা। সেই অপেক্ষাও ফুরায় একসময়, তবে লয়েডের বাছাইয়ে কাটছাঁট হয়ে যায় শতকরা ৯০ ভাগ প্রশ্নই। ওয়েস্ট ইন্ডিজের সাবেক সর্বজয়ী অধিনায়ক যেন টি-টোয়েন্টির ক্রমবর্ধমান জোয়ারে টেস্ট ক্রিকেটের হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা নিয়ে প্রশ্নেই খুঁজে নেন সর্বাধিক গুরুত্ব।

তা-ই হওয়ার কথা। লয়েড এবং তাঁর সমসাময়িক ক্রিকেটার কিংবা তাঁদের কয়েক প্রজন্ম পরের কাউকেই কখনো টি-টোয়েন্টি নিয়ে উচ্ছ্বসিত হতে শোনা যায়নি। নিউজিল্যান্ডের স্যার রিচার্ড হ্যাডলি যেমন একবার বলেই ফেলেছিলেন যে, ‘এটি কোনো ক্রিকেটই নয়। ’ টি-টোয়েন্টি খেলে স্বল্প সময়ে বাড়তি রোজগারের নিশ্চয়তা থাকায় ক্যারিবীয়দের টেস্ট ক্রিকেট আর তেমন টানছে না বলে লয়েড নিজেও নাখোশ ছিলেন খুব। বিশেষ করে ওয়েস্ট ইন্ডিজের প্রধান নির্বাচক থাকাকালীন কুড়ি-বিশের ক্রিকেট নিয়ে ধকলও তো কম পোহাতে হয়নি তাঁকে। আন্দ্রে রাসেলকে টেস্ট খেলার পরামর্শ দেওয়ার কয়েক দিন পর এই অলরাউন্ডারকে হাঁটুর ব্যথার কথা বলে সরে যেতে দেখার বিরূপ অভিজ্ঞতার মুখেও পড়তে হয়েছে।

বছর তিনেক আগে বাংলাদেশ সফরে যাওয়া আইসিসির সাবেক চেয়ারম্যান শশাঙ্ক মনোহর তো আর এমনি এমনি বলেননি যে ‘টেস্ট ক্রিকেট মারা যাচ্ছে। ’ তবু জোয়ার এমন প্রবল যে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া সাবেকদের অনেকেও এখন তাল মেলাচ্ছেন টি-টোয়েন্টির দুনিয়ায়। টি-টোয়েন্টি যে বার্ধক্যে ঢুকে পড়া অনেকের জন্যও বাড়তি কিছু উপার্জনের দুয়ার খুলে রেখেছে। সেই ২০০৭ সালে আইসিসির ম্যাচ রেফারিং ছেড়ে দেওয়া লয়েডও যেমন টি-টোয়েন্টির কমেন্ট্রিতে দিব্যি মানিয়ে নিয়েছেন।

মানিয়ে নিলেও ভেসে যাননি তিনি। ‘ভয়েস নোট’ আকারে আসা জবাবেও খুঁজে পাওয়া যায় টেস্ট ক্রিকেটকেই শ্রেষ্ঠত্বের সনদ বলে মনে করা লয়েডকে। প্রদর্শনী আর পরীক্ষার পার্থক্য দিয়েই টেস্টকে আলাদা করে রাখতে চাইলেন তিনি, ‘‘টেস্ট ক্রিকেটের টিকে না থাকার কোনো কারণই আমি দেখি না। কারণ এটিই হলো ক্রিকেটের প্রথম ও শেষ কথা। টি-টোয়েন্টি হলো ‘এক্সিবিশন’। আর টেস্ট ক্রিকেট হলো ‘এক্সামিনেশন’। আমিও তাই আশা করব যে টেস্ট ক্রিকেট যেন মরে না যায়। আমিও টেস্ট ক্রিকেটার হিসেবেই (দুটি ওয়ানডে বিশ্বকাপ জেতার পরও) নিজের পরিচয়টা দিতে চাই। ’’

যুগের পালাবদলে এখনকার আন্দ্রে রাসেলদের একই পরিচয়ে পরিচিত হওয়ার সময়টা কোথায়!



সাতদিনের সেরা