kalerkantho

বুধবার । ১৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৮। ১ ডিসেম্বর ২০২১। ২৫ রবিউস সানি ১৪৪৩

আনন্দ ভুলে বিষাদের খোলা চিঠি

২২ অক্টোবর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



আনন্দ ভুলে বিষাদের খোলা চিঠি

মাত্রই সুপার টুয়েলভ রাউন্ডে যাওয়ার স্বস্তি অনুপস্থিত তাঁর চোখেমুখে। ওমান ক্রিকেট একাডেমির ইনডোরে সংবাদ সম্মেলনে আসা মাহমুদ উল্লাহকে দেখে এই ধন্দে পড়ে যাওয়াও অস্বাভাবিক নয় যে সত্যিই বাংলাদেশ জিতেছে তো! না হলে প্রতিটি প্রশ্নের জবাবে কেন গলা ধরে আসবে তাঁর? কেন তাঁর চেহারায় ফুটে থাকবে বিষাদের জলছাপ? কেন তাঁকে দেখে মনে হবে যে ভেতরের গোটা দুনিয়াটাই বোধ হয় ওলটপালট হয়ে যাচ্ছে? তাই নিরেট-কঠিন মুখে যখন একটি একটি করে প্রশ্নের জবাব দিয়ে যেতে থাকেন বাংলাদেশের টি-টোয়েন্টি অধিনায়ক, তখন তাঁকে ঘিরেও অনুচ্চারে জমতে থাকে প্রশ্ন।

এক পর্যায়ে তাঁর কাছে ‘শক্ত’ হয়ে থাকার ব্যাখ্যাও জানতে চাওয়া হয়। ওমানকে হারানোর পর ম্যাচসেরা হয়ে আসা সাকিব আল হাসানও সংবাদ সম্মেলনে কোনো কোনো প্রশ্নের জবাবে দেখিয়েছেন ‘ঝাঁজালো’ প্রতিক্রিয়া। মাহমুদের বিষণ্নতাও এরই ধারাবাহিকতা কি না কিংবা তাঁদের কাঠখোট্টা বক্তব্য কোনো বিষয় নিয়ে দুশ্চিন্তায় থাকার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া কি না, মাহমুদ হয়তো অপেক্ষায় ছিলেন এই প্রশ্নটিরও। এর জবাবেই জয়ের আনন্দ ছাপিয়ে বিষাদের এক খোলা চিঠিই যেন পড়তে শুরু করে দিলেন মনমরা অধিনায়ক।

যাতে ফুটে উঠল অন্তর্গত বেদনার পুরোটাই। এমনিতে অন্তর্মুখী স্বভাবের মাহমুদও এখানে পুরোপুরি প্রকাশিত। যাঁর কথায় রাগ-ক্ষোভ মিশে নেই তবে আছে তীব্র অভিমান। জানিয়ে দিলেন, তাঁর এমন মুখ ভার করে থাকায় কোনো অস্বাভাবিকতাই নেই, ‘শক্ত হওয়াটাই মনে হয় স্বাভাবিক। ঠিক আছে আমরাও মানুষ, আমরাও ভুল করি। এই কারণে একেবারে ছোট করে ফেলাও ঠিক না। কারণ এটি আমাদের দেশ, আমরা সবাই একসঙ্গে। আমরা যখন খেলি, পুরো দেশ একসঙ্গেই খেলি। আমাদের থেকে অনুভূতি কারোরই বেশি নয় বলেই মনে করি। সমালোচনা অবশ্যই হবে। কারণ খারাপ খেলেছি। কিন্তু একেবারে ছোট করে ফেলা ঠিক না। এটি আমাদের সবারই খারাপ লেগেছে।’

এখানেই শেষ নয় মাহমুদের খোলা চিঠি। আরো আছে। আপাতত সবার সঙ্গেই যেন ‘আড়ি’ তাঁর দলের। স্কটল্যান্ডের কাছে হারার পর মাহমুদের দলকে ব্যাপক সমালোচনায় বিদ্ধ করেছেন বোর্ড সভাপতি নাজমুল হাসান স্বয়ং। তাতে হাওয়া দিয়েছেন জাতীয় দলের দেখভাল করা কমিটির প্রধান আকরাম খানও। সংবাদমাধ্যমেও হয়েছে সমালোচনা। আর সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে ভক্ত-সমর্থকরাও ছেড়ে কথা বলেনি। কোন পক্ষের কথায় এত আহত মাহমুদরা?

জবাবে মনে হলো সব পক্ষের আচরণই তাঁদের ব্যথিত করার মতো, ‘স্পর্শ সবই করে। আমরাও মানুষ, আমাদেরও অনুভূতি কাজ করে। আমাদেরও পরিবার আছে। আমাদের মা-বাবা ও সন্তানরা টিভি সেটের সামনে বসে থাকে। তারাও মন খারাপ করে। সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম তো এখন হাতের নাগালে, সবারই মোবাইল ফোনসেট আছে। সমালোচনা হবেই। আমরাও চাই হোক, খারাপ তো খেলেছি। কেন হবে না? কিন্তু সমালোচনার মাধ্যমে যখন কেউ কাউকে ছোট করে ফেলে, তখন ওগুলো খুব খারাপ লাগে।’

বিশেষ করে অধিনায়কসহ দলের তিন সিনিয়র ক্রিকেটারের স্ট্রাইক রেট নিয়ে প্রশ্ন তোলায়ই যে মাহমুদরা সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয়েছেন, খোলা চিঠিতে উল্লেখ করে দিলেন সেটিও, ‘অনেক প্রশ্ন এসেছে আমাদের তিনজন সিনিয়র ক্রিকেটারের স্ট্রাইক রেট নিয়ে। আমরা তো চেষ্টা করেছি। চেষ্টার বাইরে কিছু করারও নেই আমাদের। এমন নয় যে আমরা চেষ্টা করিনি। আপ্রাণ চেষ্টাই করেছি। হয়তো ফল আমাদের পক্ষে আনতে পারিনি। সমালোচনা হোক কিন্তু সেটি আরেকটু স্বাস্থ্যকর হলে সবার জন্যই ভালো হয়।’

লোকের কথায় বুকে ব্যথা পুষে যেমন খেলছেন, তেমনি গোটা পৃথিবীকে অজ্ঞাতে রেখে শরীরের ব্যথা নিয়ে খেলার কথাও বলতে ভুললেন না মাহমুদ, ‘বাংলাদেশের জার্সিটা যখন গায়ে জড়াই, তখন আমাদেরও অনুভূতি হয়। দেশের জন্য সবই থাকে—ব্যথা থাকে, কারো কারো অনেক ধরনের চোট থাকে। আমরা ওগুলো নিয়েই খেলি। দিনের পর দিন ব্যথানাশক ওষুধ খেয়েও খেলি। ভেতরের খবর অনেকেই জানে না।’

মাহমুদের সংবাদ সম্মেলনটি তাই শেষ পর্যন্ত বিজয়ী অধিনায়কের আর থাকল না। ২৭ বলে ফিফটির মতো দারুণ পারফরম করা কোনো এক অধিনায়কেরও নয়। বরং জয়ের আনন্দ ছাপিয়ে কালকের মাহমুদ উল্লাহ ব্যথিত এবং মর্মাহত এক নেতাই।



সাতদিনের সেরা