kalerkantho

বুধবার । ১১ কার্তিক ১৪২৮। ২৭ অক্টোবর ২০২১। ১৯ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

ডাউন দ্য উইকেট

জার্সির আড়ালে...

সাইদুজ্জামান

১৪ অক্টোবর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



জার্সির আড়ালে...

জার্সি নিয়ে এত আলোচনা-সমালোচনা বোধ হয় বিশ্বের আর কোনো দেশে হয় না। বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের একেকটি নতুন জার্সি উন্মোচন হতেই ভার্চুয়াল দুনিয়ায় তোলপাড় শুরু হয়। বেশির ভাগেরই জার্সি পছন্দ হয় না। তীব্র সমালোচনা হয়। আর সেসব দেখেই কিনা জার্সি হাতে গোনা যে কজনের পছন্দ হয়, তারা চেপে যায়। জার্সির প্রশংসা করলে পাছে সমালোচনার শিকার হতে হয়!

কিছুদিন পর নতুন আসর আসে, উন্মোচন হয় নতুন জার্সি। যথারীতি সমালোচনার ঢেউ ওঠে। সেই ঢেউয়ে খড়কুটোর মতো আগের জার্সির প্রশংসাও ভাসে—এর চেয়ে আগেরটা ভালো ছিল। আরো আশ্চর্যের ঘটনা, আপাত ‘অপছন্দের’ এই জার্সি পাইরেটেড হয়ে পথে-ঘাটে দেদার বিক্রি হয়। যারা অফিশিয়াল জার্সি পেয়ে যান ভাগ্যগুণে, তাঁরা সেটি গায়ে ফেসবুক-ইনস্টাগ্রামে গর্বিত ভঙ্গিতে ছবি পোস্ট দেন। এসব দেখে ভেবে পাই না, তাহলে জার্সি উন্মোচনের দিনে এত হৈচৈ হলো কেন?

বাংলাদেশ দলের জার্সি নিয়ে এত কথার কারণ আছে। অতি সম্প্রতি আইসিসি ওয়ার্ল্ড টি-টোয়েন্টির জার্সি উন্মোচিত হয়েছে। ঘটনাচক্রে যে প্রতিষ্ঠানটি বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডকে এই জার্সি সরবরাহ করে থাকে, সেটির কর্ণধারের সঙ্গে পরিচয় আছে। এ মাসের শুরুর দিকে ভদ্রলোক ফোন করেন উদ্বিগ্ন কণ্ঠে

—ভাই, খুব ভয়ে আছি!

কেন?

—১১ তারিখ জার্সি উন্মোচন হবে। হলেই তো খালি সমালোচনা হবে।

এবং সেটিই হয়েছে। রীতি মেনে আর কয়েক দিন ভদ্রলোকের ফোন ধরব না। জানিই তো যে মনের দুঃখ জানানোর জন্যই ফোনটা করছেন তিনি। আবার এটাও জানি, পরের ট্যুরে তাঁর কাছ থেকেই জার্সি নেবে ক্রিকেট বোর্ড। সমালোচকদের জন্য তথ্য সংযুক্তি—জার্সির ডিজাইন অনুমোদন করে বিসিবি, প্রস্তুতকারী কিংবা সরবরাহকারীর স্বেচ্ছাচারিতার কোনো সুযোগ নেই। কিন্তু কী বিচিত্র কারণে যেন সমালোচনার লক্ষ্যবস্তু হয় সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান।

গতকাল পড়ন্ত বিকেলে টি-স্পোর্টসের পর্দায় মালের ফুটবল স্টেডিয়ামের গ্যালারি দেখে জার্সির গোলমেলে ব্যাপারটা মাথায় ঘুরছে। অবাক লাগছিল, মালদ্বীপের গ্যালারির প্রবাসীরা এত সংখ্যক জাতীয় দলের জার্সি পেলেন কোথায়? নতুন-পুরনো মিলিয়ে কয়েকটা ডিজাইনের জার্সি। তাই মনে করার কোনো কারণ নেই যে, গ্যালারির সবগুলো জার্সিই বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের সরবরাহকৃত। বাংলাদেশে নেই। তবে মালদ্বীপ ফুটবলের কোনো ফ্র্যাঞ্চাইজি স্টোর আছে কি না জানি না। সেরকম কিছু থেকে থাকলে হয় সাফ ফুটবলের আয়োজক হিসেবে অংশগ্রহণকারী দলগুলোরও জার্সি স্টোরে জায়গা পেয়ে থাকতে পারে, নয়তো ক্রিকেটীয় জনপ্রিয়তার হাত ধরে বহু আগেই দেশ-বিদেশের বাংলাদেশিদের আলমারিতে জাতীয় দলের জার্সি ঝোলে।

তো, ফুটবলের জার্সি নিয়ে কোনো দিন কোন হৈচৈ শুনিনি। গতকাল যে দু-তিন রকমের জার্সি দেখা গেছে মালে স্টেডিয়ামের গ্যালারিতে, তার একটি দেখেও বিসদৃশ মনে হয়নি। বরং গর্ব হয়েছে, শ্রদ্ধাবনত মনে প্রবাসীদের ধন্যবাদ জানিয়েছে বিদেশের গ্যালারিতে বাংলাদেশের লাল-সবুজ মেলে ধরায়। একবারও মনে হয়নি, এই জার্সিটা এমন কেন? ওটাতে এমন ছোপ ছোপ কেন? জার্সি একটা আবরণ মাত্র, ভেতরের ঝাঁজটা আপনার আসল ব্র্যান্ড।

দেশীয় ফুটবলে সেই ঝাঁজ অনেক দিন ধরেই নেই। সাফ ফুটবলের খতিয়ান বলে, ২০০৫ সালের পর দক্ষিণ এশীয় শ্রেষ্ঠত্বের ফাইনাল মঞ্চে উঠতে পারেনি বাংলাদেশ দল। গতকাল নেপালের কাছে বিতর্কিত রেফারিংয়ের শিকার হওয়ায় ব্যর্থতার এই তালিকা আরো লম্বা হলো। টিভি রিপ্লে দেখে একবারের জন্যও মনে হয়নি ওটা পেনাল্টি ছিল। কিন্তু ভিএআর নেই, রেফারির বাঁশিই শেষ কথা। ভাগ্যজোরে পাওয়া পেনাল্টি থেকে গোল করে বাংলাদেশকে পেছনে ফেলে ফাইনালের টিকিট পেয়েছে নেপাল। গোলের পরই মাঠে ঢুকে শিষ্যদের সঙ্গে উৎসব করেছেন দলটির কোচ—নির্ধারিত সময়ের খেলা শেষ হওয়ার আগে ডাগ আউটের কারোর এমন কিছু করার অনুমোদন নেই।

আরো বিসদৃশ ঠেকেছে ম্যাচের পর রেফারিকে ঘিরে বাংলাদেশ দলের উত্তেজিত প্রতিক্রিয়া। টিভির পর্দায় যেটুকু দেখা গেছে, কোচ অস্কার ব্রুজোন রেফারির সঙ্গে কথা বলছেন। সেসব যে ক্ষোভমিশ্রিত শব্দমালা, বোঝার জন্য ‘লিপরিডার’ হওয়ার দরকার পড়ে না। নিজের প্রথম মিশনে দলের মুঠো থেকে অভাবিত ফাইনালের টিকিট ছিনতাই হওয়ার দৃশ্য তাঁর ভালো লাগবে কেন? কিন্তু এরপর ব্রুজোনের শিষ্যরা যেভাবে ঘিরে ধরেন রেফারিকে, সেসব ফুটবলের সর্বোচ্চ পর্যায়ের সঙ্গে বেমানান। এমন দৃশ্য ঢাকার ফুটবলে অবশ্য দেখা যায়। ম্যাচের পর রেফারিকে হেনস্তা করে শাস্তি ছাড়া আর কোনো প্রতিকার বিশ্বের কোনো ফুটবল দলই পায়নি, পাবেও না। এটা ‘পাবলিক স্টান্ট’ হলে ভিন্ন কথা। এমন দৃশ্যের অবতারণা করলে সমালোচনার বদলে সমর্থকের সমবেদনা মেলে যে! ঘরোয়া ক্রিকেটে কত দেখেছি, তারকা খেলোয়াড় আম্পায়ারের সিদ্ধান্তে অসন্তোষ প্রকাশ করতেই আগুন জ্বলেছে গ্যালারিতে। তাদের কে বোঝাবে যে ভুলটা ব্যাটসম্যানের, আম্পায়ারের নয়।

আমাদের ফুটবলেরও এই সমস্যাটা এবারের সাফে খুব দেখা গেছে। এমন কিছু ফাউল করেছেন ফুটবলাররা, যা বিপজ্জনক। অথচ পরিস্থিতি বিবেচনায় সেসময় এমন আক্রমণাত্মক কিছু করারই দরকার ছিল না। সম্ভবত ঘরোয়া লিগে এমন ফাউল করেও রেহাই পেতে পেতে তাঁরা বিভ্রান্ত। যেমনটা একসময় মনে করা হতো যে তারকা ক্রিকেটারদের এলবিডাব্লিউ দিতেন না আম্পায়ার। তাই আন্তর্জাতিক ম্যাচে গিয়ে সেই তারকার ফুটওয়ার্কের গোলমাল প্রকাশ্য হয়ে যেত। ইদানীং টিভি পর্দা সব ‘ফাঁস’ করে দেওয়ায় সেই প্রবণতা কিছু কমেছে।

নেপাল ম্যাচে ফিরে আসি। অবশ্যই রেফারির পেনাল্টির সিদ্ধান্তটি নির্মমভাবে বাংলাদেশের বিপক্ষে গেছে। কিন্তু এই একটি ভুলের শিকার দিয়ে কি গোটা টুর্নামেন্টের বাংলাদেশ দলকে বিচার করা যায়? টি-স্পোর্টসের কল্যাণে টুর্নামেন্টের সবগুলো খেলা দেখে কিন্তু সেরকম মনে হয়নি। গতকালের ম্যাচে বলের দখল, গোলের সুযোগ—দুটোতেই এগিয়ে ছিল নেপাল। তাই নয় কি? বল দখলের বিষয়টি ট্যাকটিক্যাল কারণে উপেক্ষা করা গেলেও লক্ষ্যে বেশিসংখ্যক শট রেখে বাংলাদেশের সঙ্গে পরিষ্কার ব্যবধান বজায় রেখেছে নেপাল। আগের তিন দ্বৈরথেও জিতেছে নেপাল। এসব বলা রেফারির ভুলকে বৈধতা দেওয়ার জন্য নয়। এসব বলার কারণ, একটি সাফের ফাইনাল দেশের ফুটবলকে কয়েক হাজার মাইল এগিয়ে দেওয়ার নিশ্চয়তা নয় বলেই বলা।

যদি তা হতো, তবে ২০০৩ সালে একমাত্র সাফ জয়ের পর কেন মাত্র একবারই আসরের ফাইনালে উঠেছিল বাংলাদেশ? আসলে কর্তাব্যক্তিরা বাস্তবতাকে খুব একটা গুরুত্ব দেন না। এক-দুটি ভালো ম্যাচেই আত্মতুষ্টিতে ভোগেন তাঁরা।

সেদিন কালের কণ্ঠের যিনি ফুটবলে তীক্ষ চোখ রাখেন, তাঁকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম যে সাম্প্রতিক সময়ে জাতীয় দলের সেরা সাফল্য কী? কয়েক সেকেন্ড ভেবে তিনি উত্তর দিয়েছিলেন, ‘সল্ট লেকের সেই ম্যাচের পর এবারের সাফে ভারতের সঙ্গে ড্র।’

মন খারাপ করে দেওয়া উত্তর। ডিপ্রেশন মোডে চলে গেছি এটা ভেবে যে, গতরাতে রেফারির ভুলে ঠিক আড়াল খুঁজে নেবে এ দেশের ফুটবল। একমাত্র শ্রীলঙ্কা ছাড়া এতদঞ্চলের কোনো দলের বিপক্ষে জয়ের নিশ্চয়তা নেই বাংলাদেশ দলের। কেন? এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা হবে বলে মনে হয় না। সবাই বলবেন, এবারের সাফ ফুটবলের ফাইনালে তো বাংলাদেশ দলকে উঠতে দেননি রেফারি!

এই নিয়ে পড়ে থাকলে ব্যাপারটা ক্রিকেট দলের জার্সি নিয়ে হৈচৈয়ের মতো অন্তঃসারশূন্যই হবে। সেই গল্পটা দিয়েই লেখাটা শেষ করি।

আড়চোখে ভার্চুয়াল জগতে জরিপ চালিয়ে দেখেছি—১৯৯৯ বিশ্বকাপ এবং ২০০৫ সালের ন্যাটওয়েস্ট ট্রফির জার্সি দুটি সবচেয়ে জনপ্রিয়। সম্ভবত প্রথম বিশ্বকাপের দুটি জয় আর কার্ডিফে অস্ট্রেলিয়াকে হারানোর স্মৃতি মনে করিয়ে দেয় ওই দুটি জার্সি। এবারের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের জার্সিতে ন্যাটওয়েস্ট ট্রফির ছাপ। থিম—ছোট ফরম্যাটে বড় শিকারে দলকে অনুপ্রাণিত করা। সেরকম কিছু হলে এবারের জার্সিও ভিন্টেজ মর্যাদা পাবে। এর বেশি কিছু না।

আসলে জার্সি নয়, জার্সির ভেতরের মানুষগুলো ঠিকঠাক তৈরি কি না, কাজ করেছেন কি না—শেষ কথা এটাই।



সাতদিনের সেরা