kalerkantho

মঙ্গলবার । ৩ কার্তিক ১৪২৮। ১৯ অক্টোবর ২০২১। ১১ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

অনন্তের কাছে আবেদন

মোস্তফা মামুন

২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ১২ মিনিটে



অনন্তের কাছে আবেদন

জালাল ভাইয়ের সঙ্গে প্রথম যোগাযোগ একটা ভুল দিয়ে। প্রেস বক্সে শুভ্রদা আমাকে একজনকে দেখিয়ে বললেন, ‘জালাল ভাইকে বলে আসুন, আমি এখানে আছি।’

আমি জালাল ভাইকে চিনি না। কিন্তু তখন নবীন ক্রীড়া সাংবাদিক তার এই অক্ষমতার কথাটা দাপুটে ক্রীড়া সম্পাদককে বলতে পারে না। তা ছাড়া সিনিয়র কাউকে সঠিকভাবে শনাক্ত করতে পারাও পারফরম্যান্সের একটা অংশ। আমি নিজের অনুমান ক্ষমতার ওপর ভরসা করলাম এবং ভয়ংকর ভুল করলাম।

যাঁকে জালাল ভাই ভাবলাম, তিনি উৎপল শুভ্র তাঁকে মনে করছেন শুনে এমন ব্যস্ততা দেখাতে শুরু করলেন যে আমি একটু অবাক। জালাল ভাই তো শুনেছি খুবই গুণী একজন, উৎপল শুভ্র ডাকছেন শুনে তিনি এমন উতলা কেন? সাংবাদিকটি শশব্যস্ত হয়ে উঠতে গেলেন। ব্যস্ততার ধাক্কায় চেয়ারে পা লেগে একটা চোটও পেলেন। অগ্রাহ্য করে উঠে গিয়ে শুভ্রদার সামনে বিনীত হয়ে বললেন, ‘শুভ্রদা, আমাকে ডেকেছেন?’

কিছুক্ষণের মধ্যেই ভুলটা ধরা পড়ল। তখন ভুল করার বয়স। ভুল করি, ধরা পড়ি, বকা খাই। এই স্বাভাবিক নিয়তির মধ্যে শুভ্রদার একটা কথা কানে স্থির হয়ে বেজে চলল, ‘জালাল ভাইকে না চিনলে বাংলা ভাষায় খেলা নিয়ে লেখালেখি হবে না!’

তখনো জালাল আহমেদ চৌধুরীকে চিনি না। লেখাও সেভাবে পড়িনি। কিন্তু আমার কাছে যিনি বাংলাদেশে খেলার লেখালেখির নায়ক তিনি এমন নত হয়ে আছেন যাঁর কাছে সেই জালাল ভাই কত বড় পাহাড়! কত উচ্চতা তাঁর। ততক্ষণে জালাল ভাই বেরিয়ে গেছেন। ধূমপান করতেই সম্ভবত। দেখা হলো না। ভুলের চোটটা তাই রয়ে গেল।

তাঁর মতো করে বাক্যকে পোষ মানাতে পারেনি কেউ। শব্দ ছিল খেলনার মতো। মনে হতো, তিনি লেখেন না। কলমের ডগায় শব্দ মাখিয়ে ম্যাজিক দেখান। আবার শুধুই ম্যাজিশিয়ান নন। ম্যাজিশিয়ানরা তো বিভ্রান্তি তৈরি করে। তিনি শেষ পর্যন্ত বোধে-ভাবনায় গভীর বস্তুনিষ্ঠ।

জালাল ভাই সম্পর্কিত সব আড্ডায় এই গল্পটা আমি সব সময় বলি। যাঁকে জালাল ভাই বলে ভুল করেছিলাম, তিনি জিব কাটেন। বলেন, ‘হায় হায়। আপনি আমাকে জালাল ভাই ভেবেছিলেন...কী লজ্জার কথা!’ এই লজ্জার মধ্য দিয়ে অনুচ্চারে যেন এই কথাটাও প্রকাশ পায়। ইশ, যদি জালাল ভাইর মতো হতে পারতাম। এবং এটা তাঁর একার নয়। বাংলাদেশের সিংহভাগ ক্রীড়া লেখকের মনের কথা বোধ হয় এই। যদি, জালাল ভাইয়ের মতো লিখতে পারতাম। পারে না। পারি না। জালাল ভাই একজনই। উচ্চাঙ্গের বোধ, শুদ্ধ জীবনদর্শন, পরিমিতিবোধের স্নিগ্ধতা, ব্যক্তিত্বের ব্যাপ্তিতে এমনই আকাশ যে সেই আকাশের কাছে যে-ই যেতেন ছোট্ট বিন্দুর মতো দেখাত।

দ্বিতীয় দফা জালাল ভাই দর্শন মিরপুরের পল্লবী মাঠে। অনূর্ধ্ব-১৯ দলের একটা প্র্যাকটিস ম্যাচ কাভার করতে গেছি। সেদিন রাতেই দল মালয়েশিয়া যাবে, ওদিকে জাতীয় দল কোথাও খুব জঘন্য খেলে এসেছে মাত্র। তরুণদের কারো কারো মধ্যে পারফরম্যান্সের ঝিলিক আর নিবেদনের মাত্রা দেখে বেশ উত্তেজনা নিয়ে ছোটাছুটি করছি। এর-ওর কোট নেওয়ার চেষ্টা করছি। চেয়ারে বসে গভীর মনোযোগে খেলা দেখতে থাকা জালাল ভাইয়ের দৃষ্টি আকৃষ্ট হলো। সস্নেহে ডেকে ছোট্ট একটা পরামর্শ, ‘লেট দেম অ্যাচিভ সামথিং ফার্স্ট।’

ব্যস এটুকুই। সামান্য কথার কথা। কিন্তু পরের ২০-২৫ বছর কথাটা মন্ত্রের আলো নিয়ে পথ দেখিয়েছে। যখনই কোনো খেলোয়াড় বা কারো মধ্যে সম্ভাবনার আঁচ দেখে কলম ভাসিয়ে দিতে গেছি তখনই মনে পড়েছে, ‘লেট দেম অ্যাচিভ সামথিং ফার্স্ট’।

নিজেকে প্রশ্ন করেছি, ‘সে কি সত্যিই কিছু অর্জন করেছে?’ উত্তর, ‘না’ হলে কলমে লাগাম টানতাম। উচ্ছ্বাসের মধ্যে সতর্কতা ভরে সীমানার মধ্যে থাকার যে শিক্ষা সেটা সেই ১৯৯৭ সালের এক বিরস দুপুরে জালাল ভাইয়ের একটা শাণিত বাক্যের শক্তিতে।

জালাল ভাই শুয়ে আছেন নিস্তব্ধ কফিনে। সংস্কারকাজের নামে বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামের বিচ্ছিরি চেহারা। বৃষ্টি লুকোচুরির মতো দুষ্টুমিতে মত্ত। পরিবেশের মধ্যে জালাল ভাইসুলভ শুভ্রতার বদলে একটা অগোছালো অস্থিরতা। জালাল ভাইয়ের বিদায়ি ক্ষণের সঙ্গে এমন বেমানান যে হারানোর বেদনার সঙ্গে মেজাজের তিক্ততাও যোগ হলো। আবার তখনই মনে হয়, এ-ই হয়তো ঠিক। তিনি তো নিয়ে চললেন ক্রীড়াঙ্গনের লাবণ্যটুকু। তাঁর অনুপস্থিতিতে শিল্প-সুন্দর এগুলোর ঘাটতি বেড়ে অসুন্দরের দাপাদাপি আরো প্রতিষ্ঠিত হবে। শুদ্ধ মানুষদের বিদায় আর শূন্যতায় অশুদ্ধতার ছবিই তো বড় হবে।

অশান্ত শেষ দুপুরে ভিড়ের বিদায়ি হাহাকার এড়িয়ে বুকে ভিড় করে জাগতিক কিছু অঙ্ক। আমরা ক্রীড়া লেখক সমিতি থেকে যে প্রতিবছর সেরা সাংবাদিক বাছাই করি, এখন থেকে তার মুখ্য বিচারক কে হবেন? জালাল ভাই বিচারক প্যানেলে থাকা মানেই তো এর একটা গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হয়ে যেত। এই সেদিনও বাংলাদেশের ইতিহাসের ৫০ সেরা ক্রীড়াবিদ বাছাই করতে গিয়ে সবার আগে তাঁর দ্বারস্থ। বিনীতভাবে বললেন, ‘শোনো, ক্রিকেট ছাড়া তো আর খেলাগুলো সেভাবে অনুসরণ করি না। আমার বিচার কি সঠিক মাপে পৌঁছাবে।’ অনেক কষ্টে রাজি করাতে হলো। তালিকাটা দিয়েও দিলেন। কথা ছিল, সবার তালিকা পেলে আবার বসব। সময়টাই মিলল না।

বসা হবে না আর কোনো দিন। হলে জানতে চাইতাম, ৫০ জনের তালিকায় ক্রিকেটারদের একটু বেশি মূল্যায়ন করলেন কি না! এই একটা জায়গায় তাঁর পক্ষপাতিত্ব দৃষ্টিকটুভাবে বেরিয়ে পড়ত। ক্রিকেট এবং ক্রিকেটার। কয়েক বছর আগে একটা টিভি শোতে বসা জালাল ভাইয়ের সঙ্গে। পাশে আরেকজন অভিজ্ঞ মানুষ, যিনি ফুটবলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। সেই আমলের ফুটবলের মানুষেরা ক্রিকেটকে খুব গুরুত্ব দিতে চান না, আড়ালে-আবডালে বলেন, ‘কয়েকবার খেয়ে যে খেলাটা খেলতে হয় সেটা কি আবার খেলা নাকি’ কিংবা ‘১০ দেশের মধ্যে...।’ সেই ভদ্রলোক এমন কিছু বলে জালাল ভাইয়ের দিকে তাকালেন। আর আমাদের সজ্জন-হম্বিতম্বিতে অনভ্যস্ত জালাল ভাই রেগে আগুন। ‘আপনি এসব বলছেন কেন? ক্রিকেটের আপনি কতটা জানেন?’

জালাল ভাইয়ের এই অভূতর্পূব চেহারায় ভদ্রলোকও অবাক। ভেবেছিলেন, ক্রিকেটবিরোধী দু-একটা কথা বলে নিজের মহলে শাবাশি নেবেন। জালাল ভাই তখনো গর্জাচ্ছেন, ‘ক্রিকেটকে ছোট করে আপনারা বড় হতে পারবেন না। ক্রিকেট তো আপনাদের দিনে আপনাদের ছোট করার চেষ্টা করেনি।’

অবস্থা এমন যে আমাকে টিভি শোর বিরতির সময় শান্তিরক্ষীর ভূমিকায় নামতে হলো। অনুষ্ঠান শেষেও খেদটা যায়নি। এমনই যে চিরন্তন সঙ্গী সিগারেটটার কথা ভুলে গেলেন। পরে সিগারেট জ্বলল। একটু ঠাণ্ডা হয়ে বললেন, ‘ক্রিকেটের গণ্ডির ক্ষুদ্রতা এরা দেখল, সৌন্দর্যটাই দেখল না!’

আরেকবার বিকেলবেলা ভোরের কাগজ অফিসে ক্ষুব্ধ ভঙ্গিতে হাজির। ভাবলাম, ক্রিকেট প্রশাসন বা ব্যবস্থাপনা নিয়ে অভিযোগ। লিখতে চান হয়তো।

ভেঙে পড়া গলায় বললেন, ‘কবি আমার সঙ্গে এ রকম করে কেন বলো তো?’

কবি মানে কে আমরা জানতাম। তাঁর বন্ধু বাংলা একাডেমি পুরস্কারপ্রাপ্ত সানাউল হক খান। দুজনের কাব্যিক বৈরিতা এমন উচ্চাঙ্গের বিনোদন দিত যে আমরা জালাল ভাইয়ের দুঃখ ভুলে সেই হাসিমাখা বিষয় জানতেই উদগ্রীব।

‘কবি কী করলেন?’

‘বলে, ক্রিকেটে বাংলাদেশের কিছু হবে না।’

তখন ভারতের একটা ত্রিদেশীয় টুর্নামেন্টে বাংলাদেশ হারছে। কবি সানাউল হক খান ক্রিকেট ভালোবাসলেও বন্ধুকে খেপানোর সুযোগ নিতে ক্রিকেটবিরোধী বনে যান তাঁর সঙ্গে বিতর্কে।

বললেন, ‘বাংলাদেশ ক্রিকেটে জিতলে তাঁর খোঁজ পাওয়া যায় না। কিন্তু হারলে...’

‘হারলে আপনি তাঁকে এড়িয়ে চলবেন।’

‘পারা যায় না। রিকশা করে বাসায় চলে আসে। লুকিয়ে থাকার চেষ্টা করি। পারি না। খুুঁজে বের করে ফেলে।’

অসহায় দেখায় জালাল ভাইয়ের মুখ। আমরা তবু মুখ টিপে হাসি। এই শত্রুতার আড়ালে কবি বন্ধুর প্রতি গভীর ভালোবাসার কথাও জানি। যাঁকে নিয়ে তিনি লেখেন, ‘ব্যায়ামপুষ্ট শরীরে ফুটে আছে শুদ্ধ শিল্পবোধ। ক্রীড়া লেখনীতেও তাঁর সেই শুদ্ধতার লড়াই চলমান, বড্ড অমসৃণ এক মাঠ চষে বেড়াতে হলেও। রুক্ষ-শুষ্ক আর এবড়োথেবড়ো সেই মাঠে আমাদের কবি যেন এক অনন্ত চাষা।’

এমন লেখার শক্তি এই দেশে কার কলমের আছে! বড় লিখিয়ে-সাহিত্যিক তো কম দেখলাম না, কিন্তু তাঁর মতো করে বাক্যকে পোষ মানাতে পারেনি কেউ। শব্দ ছিল খেলনার মতো। মনে হতো, তিনি লেখেন না। কলমের ডগায় শব্দ মাখিয়ে ম্যাজিক দেখান। আবার শুধুই ম্যাজিশিয়ান নন। ম্যাজিশিয়ানরা তো বিভ্রান্তি তৈরি করে। তিনি শেষ পর্যন্ত বোধে-ভাবনায় গভীর বস্তুনিষ্ঠ। ভাষার খেলায় ভাসাতেন। কবিতা বা চিত্রকর্মের দ্যোতনায় একটা ঘোর তৈরি করে এগিয়ে নিতেন, কিন্তু নিজে ঘোরগ্রস্ত হতেন না। লেখা শেষ হলে একদিকে শিল্পের আচ্ছন্নতা, অন্যদিকে সত্যের বাস্তবতা। কত লেখা পড়ে গায়ের রোম খাড়া হয়ে গেছে। ঘোরলাগা নাটকের শেষে যেমন থিয়েটার ছেড়ে বেরোতে ইচ্ছা হয় না, তেমনি রসটা এমন লেগে থাকত যে আবার শুরু থেকে শুরু করতাম।

আমিনুল ইসলাম অভিষেক টেস্টে সেঞ্চুরি করলেন। প্রায় অলৌকিক কীর্তি। সঠিকভাবে ফুটিয়ে তুলতে জালাল ভাইয়ের কলমই একমাত্র ভরসা। সেই প্রাক-মোবাইল যুগে কোনোভাবেই তাঁকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। হঠাৎ বিস্ফোরণ। জালাল ভাই নিজেই অফিসে হাজির লেখা নিয়ে। সেই লেখা, যাতে ছিল অমর এই লাইন, ‘আজ রাতে শবেবরাতের (সেদিন ছিল শবেবরাত) যত মোমবাতি জ্বলবে এ দেশের ঘরে ঘরে তাতে আলো বাড়াবে আমিনুলের এই কীর্তি...’ (হুবহু কপিটা পেলাম না, মূল সুরটা এ রকমই ছিল)।

কত অমর বাক্য। কত চিরন্তন শব্দমালা। যখনই কোনো অবিশ্বাস্য ক্রিকেটকীর্তি হয় কোথাও, তখনই ভেসে উঠতেন তিনি। আমরা সবাই এক রকম লিখি। ভালো-খারাপ। তিনি ভালো-খারাপের এই সাধারণ সীমাবহির্ভূত। অন্য সীমানার। অন্য স্তরের। বাংলাদেশের প্রিন্ট মিডিয়ার এই ঘাটতি তাই চিরকালীন হয়ে গেল। বাংলাদেশ টাইমস থেকে নব্বইয়ের দশকে অবসর নেওয়ার পর তিনি মূলধারার সাংবাদিকতায় ছিলেন না। হয়ে ছিলেন গেস্ট আর্টিস্ট। সেই গেস্ট আর্টিস্ট যে সামান্য সময়ের রোল দিয়ে মূল আর্টিস্টদের ছায়ায় ঢেকে দেয়। ও, হ্যাঁ, তিনি মূলধারার সাংবাদিকতায় ছিলেন ইংরেজিতে। যাঁর বাংলা নিয়ে আমরা অত উচ্চকিত, তিনি ছিলেন পুরোদস্তুর ইংরেজি ভাষার পত্রিকার ক্রীড়া সম্পাদক। ক্ষমতা কত বহুমুখী হলে এমন সর্ববিস্তারী হওয়া সম্ভব।

জানাজার পর স্বল্পপরিসরের স্মরণ আয়োজনে গাজী আশরাফ হোসেন লিপু একটা গল্প বলছিলেন। আশির দশকে লিপু ফুটবল ম্যাচ দেখতে বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামের গ্যালারিতে। কেউ একজন এসে তাঁর হাতে একটা খাম ধরিয়ে দিয়ে বলল, ‘জালাল ভাই দিয়ে গেছেন।’

তত দিনে জালাল ভাই চলে গেছেন পাতিয়ালায় কোচিং কোর্স করতে। কিন্তু যেতে যেতে ভোলেননি প্রিয় শিষ্য লিপু একটা সেঞ্চুরি করেছে। খামে ভরে সেই প্রীতি জানিয়ে গেছেন। লিপু খুলে দেখেন লেখা, ‘গিফট ফর ইওর সেঞ্চুরি।’ ১০০ টাকা সঙ্গে, সেই আমলে অনেক মূল্যবান কিন্তু এর চেয়ে অনেক গুণ বেশি মূল্য এই ভালোবাসার।

নিজের ছেলে হওয়ার খবর শুনেছেন জাতীয় দলের ড্রেসিংরুমে বসে। বাংলাদেশ দল তখন সফরকারী হায়দরাবাদের ডেকান ব্লুজের সঙ্গে খেলছে। ঘোষণা করলেন, যে আজ সবচেয়ে ভালো ব্যাট করবে তার নামেই ছেলের নাম রাখবেন। ভারতীয় দলে ছিলেন কিংবদন্তি লেগস্পিনার চন্দ্রশেখর, তরুণ নাজিম সিরাজী দুরন্ত কিছু শট খেললেন অসামান্য সাহসিকতায়। আর জালাল ভাইয়ের ছেলের নাম হয়ে গেল নাজিম জালাল চৌধুরী।

কোচ হিসেবে তিনি শিষ্যদের পুষছেন-শাসন করছেন গভীর মমতায় আবার ড্রেসিংরুম ছেড়ে টেবিলে গিয়ে হাতে যখন কলম তখন অন্য অস্তিত্ব। এবং এভাবেই আরেকটি অনন্যতা। চিন্তায়, সংস্কৃতিতে, বোধে আলোকিত ছিলেন বলে লেখার সঙ্গে মিশে যেত জীবনের বিস্তৃতি। ক্রিকেট খেলার মোড়ক ছেড়ে ছড়িয়ে পড়ত বৃহত্তর আঙ্গিকে। খেলোয়াড়রা তাঁদের শরীরী সীমানা পেরিয়ে হয়ে উঠতেন লার্জার দ্যান লাইফ চরিত্র। আবার এভাবে তিনি ক্রিকেট প্রশাসন আর ক্রিকেট লেখালেখির সংযোগকারীও। সাধারণত ক্রিকেট আর ক্রিকেট সাংবাদিকরা দুই মেরুতে থাকেন। একটা মুখোমুখি জায়গায়। জালাল সেই দুই মুখকে এক করে রাখতেন। আমরা দেখি আমাদের জায়গা থেকে, জালাল ভাই দুই জায়গা থেকে দেখতে পেতেন বলে কখনো কখনো আমাদের বিচ্যুত ভাবনাকে বিন্যস্ত করতেন। এভাবেই তিনি একটা ক্রিকেটীয় সেতু। এবং আমরা আবার ছিলাম তাঁরও একটা সেতু।

জালাল ভাইয়ের লেখা উচ্চাঙ্গের বলে সাধারণ পাঠকরা অনেক ক্ষেত্রে তার রসটা ধরতে পারতেন না। আমরা জালাল ভাইয়ে নিজেদের সমৃদ্ধ করে তাঁর ভাবনাকে সহজপাঠ্য করে পরিবেশন করতাম। সাধারণ পাঠকরা তাৎক্ষণিক ক্ষতিটা বুঝবে না। ক্ষতিটা হবে আমাদের ক্ষয়ে। আমাদের স্থবিরতা একসময় একঘেয়ে হয়ে আঘাত করবে তাদের। তারা জানবে, এরা সব পুরনো হয়ে গেছে। আমরা জানব, জালাল ভাই চলে গেলেন বলে আমরা নিজেদের আর নবায়ন করতে পারছি না।

দুঃখভরে কোনো কোনো ক্রীড়া লেখক লিখছেন, সুযোগ থাকলে জালাল ভাই হতে চান। কিন্তু ক্রিকেটের জন্য অন্য সব জাগতিকতাকে ত্যাগ করে মগ্ন সাধক হওয়ার শক্তিই আমাদের বেশির ভাগের নেই। সেটা সম্ভবই নয়। বরং চাইব, অন্য জন্মেও জালাল ভাই আলোর মশাল হাতে অভিভাবক হয়ে পাশেই থাকুন।

অনন্তের কাছে শেষে এই আবেদন, এই বটগাছটাকে সে সময়ও আমাদের মতো পূজারিদের মাথার ওপরেই রেখো।

এমন বটগাছ একজনই হয়। এবং একজন হলেই চলে। তাঁর ছায়াতেই বাকিদের জীবন চলে যায়!



সাতদিনের সেরা