kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১২ কার্তিক ১৪২৮। ২৮ অক্টোবর ২০২১। ২০ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

ধ্রুপদি ক্রিকেটপিপাসু চোখ অন্ধকারে

অজস্র ক্রিকেটারের ‘ক্রিকেট গুরু’ই শুধু নন, তিনি ক্রীড়া লেখকদের কাছেও ছিলেন অনুপম এক শিল্পী। যে শিল্পী শব্দ আর বাক্যের জাদুতে মাঠের খেলাকে ফুটিয়ে তুলতেন সাহিত্যের ক্যানভাসে।

মাসুদ পারভেজ   

২২ সেপ্টেম্বর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



ফুলহাতা জামার আস্তিন গুটিয়ে রাখার ব্যাপারটি ছিল তাঁর ট্রেডমার্ক। ক্রিকেট মাঠের শ্রম-ঘামে ভেজা সে আস্তিনে লেগে থাকা নোনা গন্ধে আজীবন এমন বুঁদ হয়ে থেকেছেন যে আরাম-আয়েশের জীবনের হাতছানিও এক তুড়িতে উড়িয়ে দিতে দ্বিধা করেননি কখনো। সেটি হোক তাঁর পেশা বেছে নেওয়ার সেই উদ্দাম যৌবনকাল কিংবা জীবনসায়াহ্নেও।

২০১১ সালে যেমন স্ত্রী মারা যাওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্রে থিতু হওয়া সন্তানরা একরকম জোর করেই তাঁকে নিয়ে গিয়েছিলেন মার্কিন মুলুকে। যত্নআত্তিরও অভাব ছিল না কোনো, তবু সেই জীবন টানেনি তাঁকে। ব্যাট-বলের মধুর শব্দে মজে থাকার উপায় যে সেই জীবনে ছিল না। তাই দেশে ফিরেই আবার মাঠের সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ স্থাপন করেছিলেন। আবার স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম বিসিএসে লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েও সরকারি চাকরির নিশ্চয়তা পায়ে ঠেলে ক্রিকেট কোচিংকে পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন। তা-ও আবার এমন সময়ে, যখন ক্রিকেট খেলাটা এ দেশে খেলা হিসেবে দাঁড়াবে বলে কল্পনাও করেনি কেউ। তাই চাকরিতে না ঢুকে তিনি ছুটেছিলেন ভারতের পাতিয়ালায়, ক্রিকেট কোচিংয়ের ওপর ডিপ্লোমা করতে।

সেটি করে এসে ক্রিকেটার থেকে পুরোদস্তুর কোচ বনে যাওয়া জালাল আহমেদ চৌধুরী ক্রিকেটেই সঁপে দেন তাঁর পুরো জীবন। এক ক্রিকেটেই বিস্তৃত হয়েছে তাঁর আরো অনেক পরিচয়ের ডালপালাও। নিউ নেশন পত্রিকা দিয়ে ক্রীড়া সাংবাদিকতা শুরুর পর ক্রীড়া সম্পাদক হয়েছিলেন টাইমস-এরও। ইংরেজি পত্রিকায় কাজ করলেও সাহিত্যমনস্ক জালালের নিজের ভাষার ওপর দখল এমন ঈর্ষণীয় ছিল যে তা বাংলা ক্রিকেট সাহিত্যেও যোগ করে ভিন্নমাত্রা। তাই অজস্র ক্রিকেটারের ‘ক্রিকেট গুরু’ই শুধু নন, তিনি ক্রীড়া লেখকদের কাছেও ছিলেন অনুপম এক শিল্পী। যে শিল্পী শব্দ আর বাক্যের জাদুতে মাঠের খেলাকে ফুটিয়ে তুলতেন সাহিত্যের ক্যানভাসে। গত জুলাইতে ৭৫-এ পা দেওয়া বার্ধক্যেও রোগ সয়ে সয়েও তাঁর দুই চোখ ক্রিকেটেই শিল্পিত সুন্দর খুঁজে বেড়াত, যা তাঁর নিজের ভাষায়, ‘ধ্রুপদি ক্রিকেটপিপাসু চোখ’। এই সেপ্টেম্বরেই একবার হাসপাতালবাস থেকে ছাড়া পেয়েও ‘বিপন্ন ফুসফুস’ নিয়ে আবার সেখানে যাওয়াই শেষ লিখে ফেলল জালালের, বুজে দিল ক্রিকেট তৃষ্ণায় আমৃত্যু কাতর তাঁর দুই চোখ।

তিনি চলে গেলেও তাঁর কীর্তির এমনই মহিমা যে দূর মেলবোর্ন থেকে বাংলাদেশের প্রথম টেস্ট সেঞ্চুরিয়ান আমিনুল ইসলামকে বলতে শোনা যায়, ‘এমন মানুষ চলে গেলেও আসলে চলে যান না, থেকে যান। কাজ তাঁকে বাঁচিয়ে রাখে।’ ক্রিকেটার থেকে শুরু করে ক্রীড়া লেখক-সাংবাদিক, এমন কেউ নেই যে তাঁর কাজের গুণমুগ্ধ নন। ক্রীড়া সাংবাদিক উৎপল শুভ্র যেমন লিখেছেন, ‘ক্রিকেটের আসল চেতনাটাকে শুধু মুখের বুলিতে সীমাবদ্ধ না রেখে তিনি মর্মে ধারণ করেছেন। অনেক পরিচয় তাঁর। কোচ, সাংবাদিক, লেখক। আমি সব সময়ই তাঁর সম্পর্কে বলি, লেখকদের লেখক।’

আর ক্রিকেটারদের কাছে তিনি কী, তা বুঝতে মাশরাফি বিন মর্তুজার একটুখানি বক্তব্য তুলে দিলেই হচ্ছে, ‘বাংলাদেশ ক্রিকেটে আপনার অবদান যারা দেখেছে, তারা আজীবন মনে রাখবে। অসংখ্য খেলোয়াড়ের গুরু ছিলেন আপনি আর তা হয়েই থাকবেন।’ মাশরাফির জন্মেরও আগে, ১৯৭৯ সালে প্রথমবারের মতো আইসিসি ট্রফি অভিযানেও বাংলাদেশ দলের কোচ ছিলেন জালাল আর ওসমান খান। গর্ডন গ্রিনিজ এসে দায়িত্ব নেওয়ার আগে থেকেই ১৯৯৭ সালের আইসিসি ট্রফিজয়ী দল প্রস্তুত হতে শুরু করেছিল তাঁর নিবিড় পরিচর্যায়ই। কাল ধ্রুপদি ক্রিকেটপিপাসু চোখ বুজে যাওয়ার আগে বিসিবির পক্ষ থেকে সে স্বীকৃতি না পাওয়াই হয়ে থেকেছে জালালের একমাত্র অভিমান।



সাতদিনের সেরা