kalerkantho

সোমবার । ৯ কার্তিক ১৪২৮। ২৫ অক্টোবর ২০২১। ১৭ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

ডাউন দ্য উইকেট

নাদির শাহর কফিন

সাইদুজ্জামান

১৬ সেপ্টেম্বর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



নাদির শাহর কফিন

এই প্রজন্মের ক্রিকেটারদের নাদির শাহকে দেখার সুযোগ হয়নি। একুশ শতকের আম্পায়ার নাদির শাহর কর্তৃত্ব দেখার সুযোগও মিলেছে সামান্যই। আর মানুষ নাদির তো এই প্রজন্মের কাছে দূর আকাশের তারা, গত শুক্রবার থেকে তো ঘনিষ্ঠজনদের কাছেও তিনি পরবাসী হয়েছেন।

ছয় দিন আগে থেকে সব মিডিয়া আউটলেটে প্রয়াতের যে আবেগঘন ছবি আঁকা হয়ে গেছে, তাতে নাদির শাহ সম্পর্কে অন্তত ধারণা মিলেছে সবার। কিন্তু সব কি আর বলা যায়? নাদির নিজেও তো কখনো নিজের দুঃখের কথা বলে বেড়াননি। তাঁর কাছে জীবন মানেই ছিল উপভোগ করো, মন্দ কিছু নিয়ে ভাবতে নেই।

এই যেমন মৃত্যুশয্যায় তাঁকে দেখতে গেছি। তিনি হৈহৈ করে উঠলেন, ‘আরে মিয়া, বাইরে দাঁড়িয়ে কেন? ভেতরে আসো! আমার যে রোগ হইছে, মিয়া তুমি কি এর চেয়ে কঠিন কোনো রোগ নিয়ে আসছ নাকি?’ হাত বাড়িয়ে দেন স্নেহবশে। ছোট্ট কক্ষে তিনি হুইলচেয়ারে, কোলের ওপর রাখা প্লেট থেকে রুটি আর সবজি খাচ্ছেন। আমি তাঁর সামনে, রোগীর অ্যাটেনডেন্টের জন্য বরাদ্দ একচিলতে বিছানায় বসে কথা শুনছি।

আজকের লেখার সূত্রপাত সেদিনের আড্ডার একটি অংশ। নিশ্চিতভাবেই বেঁচে থাকলে নাদির শাহ হয়তো প্রসঙ্গটি তোলার জন্য আমাকে বকাঝকা করতেন। কিন্তু তিনি তো আর নেই। নাদিরের হয়ে প্রতিবেদককে আপত্তি জানানোরও কেউ নেই। শেষ জীবনের অনেকটা সময় ধরেই তিনি একা। পৈতৃক সূত্রে ধানমণ্ডিতে দুটি ফ্ল্যাট পেয়েছিলেন। একটিতে থাকতেন, অন্যটি ভাড়া দেওয়া। নাদির শাহর ক্রিকেটে অবদান, মর্যাদা এবং সর্বোপরি তাঁর জীবনধারার তুলনায় যা অতি নগণ্য।

নিজের অঙ্ক করে বলছিলেন সেদিন—

‘আমার তো বাড়িভাড়া লাগে না। আরেকটা থেকে মাসে ৪০ হাজার পাই। বোর্ডের বেতন মিলিয়ে ৯০ হাজারের মতো। অ্যাকাউন্টে এখন সাড়ে তিন লাখ টাকা আছে। আমার ওই পুরনো গাড়িটা দেখছ না... ওটা বেচে দিছি। ওই টাকাটাই শুধু আছে।’

শুনে আমার মন খারাপ হয়ে যায়। ৯০০ কোটি টাকার সঞ্চয়পত্রের মালিক বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের এক নামি আম্পায়ারের জীবন কেন এমন নস্যি হবে।

কিন্তু নাদির শাহর মুখের হাসি মোছে না।

‘চিকিৎসা খরচ তো নাই। বোর্ডই সব দিচ্ছে। মেয়ে আমেরিকা থেকে খবর পাঠিয়েছে যেন দ্রুত ওর কাছে যাই। সেখানে চিকিৎসা ভালো এবং ফ্রি-ও। সে জন্যই গাড়িটা বেচে দিয়েছি। প্লেনের টিকিট মল্লিক ভাই (বিসিবি পরিচালক ইসমাইল হায়দার) দেবেন। বোর্ডের আরো অনেকে খোঁজ নেয়, টাকা দিতে চায়। দরকার হলে নেব। চিন্তা কোরো না মিয়া। সব ঠিক হয়ে যাবে। আবার আম্পায়ারিং করব।’

এর চার দিন পর নাদির শাহ পৃথিবীর মাঠ থেকেই হারিয়ে গেলেন। মানুষের মৃত্যু সব সময় কষ্টের। প্রয়াতের জন্য কষ্টের সীমানা পেরিয়ে সামনে আসে তাঁর ওপর নির্ভরশীল মানুষগুলোর মুখ। নাদির শাহ এই দিক থেকে দুর্ভাগ্যক্রমেই ভাগ্যবান, তাঁর কোনো পোষ্য নেই। শুক্রবারের পর থেকে সম্ভবত তাঁর সার্বক্ষণিক সঙ্গী যে কেয়ারটেকার যুবকটা, তিনি ছাড়া আর কাউকে ভাত-কাপড়ের চিন্তা করতে হচ্ছে না। সবার জীবনই আগের মতোই মসৃণ, শুধু তাঁর শূন্যতা হয়তো থেকে যাবে কিংবা সেটাও মিলিয়ে যাবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে। মৃত্যুবার্ষিকীতেই শুধু স্মরিত হবেন নাদির।

আচ্ছা, নাদির শাহর ঘরে যদি স্ত্রী থাকতেন, সঙ্গে গোটা দুই স্কুল-কলেজগামী সন্তান? এই খ্যাতিমানের প্রয়াণে তাঁরা কি শুধুই শোক করতেন, নাকি ভবিষ্যৎ চিন্তায় উদ্বিগ্নও হতেন? এই প্রশ্ন নিয়ে দেশের একজন আম্পায়ারের শরণাপন্ন হতেই তিনি দুশ্চিন্তায় ব্যাকুল, ‘আমি হুট করে মরে গেলে আমার বউ-বাচ্চা কদিন পরই আমাকে হয়তো অভিশাপ দেওয়া শুরু করবে!’ নিকটাত্মীয়রা তো আর অভিশাপ দেন না। তবে সংসারের কর্তার শূন্য অ্যাকাউন্ট অসহায় নিকটাত্মীয়দের জন্য স্বস্তিরও নয়।

নাদির শাহ তো তবু বিসিবির শীর্ষ ক্যাটাগরির আম্পায়ারদের একজন। মাসে ১৫ হাজার টাকা সম্মানীতে আম্পায়ারিং করছেন দেশের বেশির ভাগ আম্পায়ার। পাশাপাশি অন্য চাকরি কিংবা পেশায় আছেন তাঁরা প্রায় সবাই। এর পরও সব মিলিয়ে দেশের একজন আম্পায়ার যা আয় করেন, তাতে নাদিরের মতো পৈতৃক সূত্রে ফ্ল্যাট না পেলে ঢাকায় মাথা গোঁজাই কঠিন। ভবিষ্যৎ চিন্তা তো কয়েক আলোকবর্ষ দূরের কথা।

না, এটা কোনো মানবিক গল্প নয়। আম্পায়ারিং এমন একটি পেশা, যার গুণগত মানের ওপর ক্রিকেটারদের ভবিষ্যৎও অনেকাংশে নির্ভর করে। কিভাবে? নিচু মানের আম্পায়ারিংয়ের কারণে একজন প্রতিশ্রুতিশীল ক্রিকেটার শুরুতেই হতোদ্যম হয়ে পড়ে। আবার আম্পায়ারের পক্ষপাত পেয়ে আরেকজন তরতরিয়ে সিঁড়ি বেয়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে গিয়ে হোঁচট খায়। তবে ঝরে পড়ার সংখ্যাই বেশি।

উপার্জনের সঙ্গে আম্পায়ারিং মানের উত্থান-পতন আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে। বোর্ড নির্ধারিত স্কেলে ভিন্নতা থাকলেও ম্যাচ ফি কিন্তু সবার সমান। তার মানে ম্যাচে শীর্ষ ক্যাটাগরির আম্পায়ারের সমান দক্ষতা প্রদর্শন করতে হবে ১৫ হাজার টাকা স্কেলের আম্পায়ারকে।

অবশ্য নাদির কিংবা বর্তমানে দেশের শীর্ষ আম্পায়ার শরফুদ্দৌলা ইবনে শহীদের শুরুটাও এমন ছিল। মাঠের দক্ষতা দিয়েই এখন ইন্টারন্যাশনাল আম্পায়ার তিনি। কিন্তু কোনো পেশার মাসিক আয় ১৫ হাজার টাকা জানার পর কে আগ্রহী হবেন সে পেশায়। দুই ধরনের আবেদনকারী খুঁজে পাচ্ছি। একদল আসবেন ক্রিকেটকে ভালোবেসে। নয়তো জীবিকার আর কোনো উপায় নেই বলে। পরেরটির সংখ্যাই বেশি বলে প্রবল জনমত রয়েছে। যুক্তিও অকাট্য, ভালোবাসা আর ১৫ হাজারে তো পেট ভরবে না!

তাই আম্পায়ারিংয়ের মতো মর্যাদাপূর্ণ পেশার চেয়ে বোর্ডের অন্য কোনো চাকরি কিংবা কমিটি-উপকমিটিতে নাম লেখাতে সাবেক ক্রিকেটারদের মধ্যে আগ্রহ বেশি। এর পরও যাঁরা আসছেন, তাঁরা আত্মমর্যাদার জন্য লড়ে যাচ্ছেন আম্পায়ারিং ক্যারিয়ারের শুরু থেকে অদ্যাবধি।

ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যাবে, আম্পায়ারিংয়ের গুরুত্ব বোঝার রীতিই নেই এ দেশে। অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে এখনকার আম্পায়ারদের সুবিধাদি বেড়েছে, কিন্তু মর্যাদার মঞ্চটা তৈরি করা হয়নি। নির্দিষ্ট কোনো নীতিমালাই তো নেই।

এই যেমন আইসিসি আম্পায়ারদের একটি এলিট প্যানেল করেছে। আন্তর্জাতিক ম্যাচে শুধু সেই প্যানেল থেকেই আম্পায়ার নিয়োগ দেওয়া হয়। এলিট প্যানেলে ঢুকতে হলে অনেকগুলো হার্ডল পার হয়ে আসতে হয় একজন আম্পায়ারকে। অথচ বাংলাদেশে আম্পায়ার বরাদ্দের ব্যাপারে নীতিমালা অস্বচ্ছ, উত্তীর্ণ যেকোনো আম্পায়ার ম্যাচ পরিচালনা করতে পারবেন। তার মানে, আম্পায়ারিং পাস করলেই সংশ্লিষ্ট কমিটি চাইলে যেকোনো ম্যাচে যাঁকে খুশি নিয়োগ দিতে পারবে। নিচু স্তরের ম্যাচে সংশ্লিষ্ট দলের কোচ-অধিনায়কের প্রতিবেদনের কোনো গুরুত্বই নেই। ঘরোয়া ক্রিকেটের বিভিন্ন স্তরে আম্পায়ারিং নিয়ে তুঘলকি কাণ্ড হয়, তার সূত্রপাত এই ‘ম্যাচ অ্যালোকেশন’ পদ্ধতির কারণে। নির্দিষ্ট ম্যাচে ‘ক্যাডার’ আম্পায়ার পাঠিয়ে দিয়ে ম্যাচের বারোটা বাজিয়ে দেওয়া হয়। আম্পায়ারিং হয়ে গেছে এজেন্ডা বাস্তবায়নের হাতিয়ার।

অথচ উন্নত আম্পায়ারিং ক্রিকেটের উন্নতির অন্যতম স্তম্ভ। সে কারণেই ভারতের রঞ্জি ট্রফিতে একজন আম্পায়ারের দৈনিক ম্যাচ ফি বিরাট কোহলির প্রায় সমান। ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগে সেই ফি প্রায় তিন লাখ টাকা। সেখানে দেশের প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে একজন আম্পায়ারের ম্যাচ ফি (চার দিনের) ৩৫ হাজার টাকা। বিপিএলের প্রথম আসরে ম্যাচ ফি ছিল ২৮ থেকে ৩২ হাজার। কভিড-১৯ পরিস্থিতির আগে সেটাই ছিল ১৪ হাজার টাকা!

মনে হতে পারে বিশ্বের সবচেয়ে ধনী ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের সঙ্গে তুলনা করা ঠিক না। আসলেই ঠিক না। কিন্তু এ মাসেই শুরু হতে যাওয়া নেপাল প্রিমিয়ার লিগেও আম্পায়ারদের ম্যাচ ফি প্রায় ৫০ হাজার টাকা।

উপার্জনের গুরুত্বটা দুটি কারণে। প্রথমত, আম্পায়ারের হাতে ম্যাচের নাটাই থাকে। সেই নাটাই তিনি তখনই শক্ত হাতে ধরতে পারবেন যখন সম্মানীটা সম্মানজনক হবে। আবাহনী-মোহামেডান ম্যাচও দাপটে পরিচালনা করার মতো একজন ভবিষ্যৎ নাদির তখনই আসবেন যখন আম্পায়ারিং পেশার প্রতি যথেষ্ট যত্নশীল হবে ক্রিকেট বোর্ড।

এটা ঠিক যে ক্রিকেটসংশ্লিষ্ট যে কারোর চিকিৎসাসেবায় ভীষণ আন্তরিক বিসিবি। তবে মৃত্যুপথযাত্রী কারোর চিকিৎসার চেয়ে ম্যাচ অফিশিয়ালদের মানোন্নয়নের পথ খুলে দেওয়াও সমান জরুরি। এটা ক্রিকেটের জন্য ভালো, মানবিকতার দৃষ্টিকোণ থেকেও।

নাদির একটা কফিনে শুয়ে একা চলে গেছেন, সাংসারিক কোনো দুঃখগাথা পেছনে ফেলে যাননি। সবাই কিন্তু নাদির শাহ নন।



সাতদিনের সেরা