kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ৮ আশ্বিন ১৪২৮। ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২১। ১৫ সফর ১৪৪৩

দুর্বোধ্যই আছেন ‘কুইক স্পিনার’

মাসুদ পারভেজ   

৬ আগস্ট, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



দুর্বোধ্যই আছেন ‘কুইক স্পিনার’

ছয় বছর আগের সেই রাতে সদ্য ফোটা এক ফুল নিয়ে সংবাদ সম্মেলনে এসেছিলেন মাশরাফি বিন মর্তুজা। একটু আগেই এর সৌরভে বাংলাদেশ মাতোয়ারা হলেও প্রতিপক্ষ ভারত ছিন্নভিন্ন হয়েছিল সেই ফুলের কাঁটায়। সবচেয়ে ধারালো যে কাঁটা, সেটি ভারতীয় ব্যাটসম্যানদের মধ্যে তৈরি করেছিল অদ্ভুত এক বিভ্রমও। ওয়ানডে অভিষেকেই পেসারের চেহারায় তাঁর স্পিনারের কারিকুরি ধন্দেই ফেলে দিয়েছিল রোহিত শর্মাদের। ম্যাচ শেষে ম্যাচসেরা বাঁহাতি পেসারকে পাশে বসিয়ে বাংলাদেশ অধিনায়ক মাশরাফিও সে দ্বিধার অবসান ঘটাতে পারেননি, ‘ওর যে স্লোয়ার কাটার আছে, কোনো ব্যাটসম্যানের জন্যই খেলা সহজ নয়। ওর ওই বল স্পিনারের চেয়েও বেশি টার্ন করে। অনেক ব্যাটসম্যানই আগে ব্যাট ঘুরিয়ে ফেলেছে বলে ব্যাটের কানায় লেগেছে।’

২০১৫ সালের ১৯ জুন রাতে পেসারের মধ্যে লুকিয়ে থাকা সেই স্পিনার মুস্তাফিজুর রহমান ওয়ানডে অভিষেকেই হৈচৈ ফেলে দিয়েছিলেন। ৫ উইকেটের ৪টিই স্লোয়ার কাটারে তুলে নিয়েছিলেন। সুবাদে বাংলাদেশকে তিন ম্যাচ সিরিজে ১-০-তে এগিয়ে দেওয়ার নায়ককে নিয়ে কোনো পূর্বধারণাই ছিল না ভারতীয় শিবিরের। তবে দ্বিতীয় ম্যাচের আগে কম্পিউটার বিশ্লেষকের ল্যাপটপে বিস্তর কাটা-ছেঁড়াও পারেনি কোনো সমাধান দিতে। বরং ৬ উইকেট নিয়ে সিরিজ জয়ের নায়কও সেই ‘কাটার মাস্টার’ই। বিশেষ করে ভারত অধিনায়ক মহেন্দ্র সিং ধোনিকে রীতিমতো বোকা বানানো ডেলিভারির ঘোর কাটতে সময় লেগেছিল ওই ম্যাচে কমেন্ট্রি বক্সে থাকা ভারতের সাবেক পেসার ভেঙ্কটেশ প্রসাদেরও। তেমন গতিশীল বোলার না হলেও কাটার দিয়েই নিজের খেলোয়াড়ি জীবনে সফল হয়ে আসা প্রসাদের মুগ্ধতা ভাষা খুঁজে নিয়েছিল এভাবে, ‘‘ওর বোলিংয়ে অত্যন্ত পরিণত মানসিকতার ছাপই আমি দেখেছি। ‘ফ্লুক’ এক ম্যাচে হয়ে যেতে পারে। তাই বলে টানা দুই ম্যাচে কখনোই হবে না। এর ওপর প্রথম ম্যাচের অভিজ্ঞতায় ভারতীয়রাও ওকে নিয়ে গবেষণা করেই নেমেছিল। কিন্তু গতিবৈচিত্র্য দিয়ে ও ঠিকই ব্যাটসম্যানদের চমকে দিয়েছে। ধোনি তো ওর বলটা পড়তেই পারল না। এককথায় অসাধারণ।’

সাধারণের সীমানা পেরিয়ে ক্যারিয়ারের প্রথম দুই ওয়ানডেতেই নিজের উপস্থিতি জানান দেওয়া মুস্তাফিজ আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ছয় বছর পার করে দেওয়ার পরও যেন আছেন একই রকম দুর্বোধ্য। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে পাঁচ ম্যাচ সিরিজের প্রথম দুই টি-টোয়েন্টিতে তাঁর স্লোয়ার কাটার রহস্যের কূলকিনারা করতে ব্যর্থ সফরকারী দলের ব্যাটসম্যানরাও। তিনি পেসার না স্পিনার, সেটিও যেন হয়ে উঠেছে অসমাধানযোগ্য এক ধাঁধাই। না হলে কি আর ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলনে অ্যাস্টন অ্যাগারকে নিজ দেশের এক সাংবাদিকের কাছ থেকে এমন প্রশ্ন শুনতে হয়, ‘মুস্তাফিজ কুইক স্পিনার নাকি স্লো পেসার?’ অ্যাগারের জবাবেই খুঁজে নেওয়া যাচ্ছে এই সিরিজে অস্ট্রেলিয়ানদের জন্য আতঙ্কের প্রতিশব্দ হয়ে ওঠা মুস্তাফিজকে, ‘ডিফিকাল্ট কাস্টমার’।

কতটা? অ্যাগারের চেয়ে ভালো তা আর কে জানে! দ্বিতীয় ম্যাচে মুস্তাফিজের কাটার অ্যাগারের গ্লাভসে ছোবল দিয়ে খুঁজে নেয় উইকেটরক্ষক নুরুল হাসানকে। বিস্ময়ে হতবাক হয়ে যাওয়া এই অস্ট্রেলিয়ান বলছিলেন, ‘স্লো মোশনে যদি তাঁর স্লোয়ার বলটি দেখেন, দেখবেন যে বেশির ভাগটাই কবজি আর আঙুলের ব্যবহার। অবিশ্বাস্য স্কিল। তার স্লোয়ারটা অসাধারণ। যা আবার খুব একটা ধীরগতিরও নয়, আবার এই ডেলিভারিতে অনেক কিছু হয়েও যায়।’

হয়ে যায় বিশেষত এমন উইকেটে, যেখানে বল গ্রিপ করে। গতির হেরফের থাকা ধীরগতির উইকেটে মুস্তাফিজের কার্যকারিতা আরেকবার প্রমাণিত এই সিরিজে। ছয় বছর আগে মিরপুর শের-ই-বাংলা স্টেডিয়ামে ভারতকে চমকে দেওয়া পেসাররূপী স্পিনার এবার একই ভেন্যুতে নাকাল করে ছাড়ছেন অস্ট্রেলিয়ান ব্যাটসম্যানদেরও। এখানকার উইকেটই যে তাঁর জন্য বেশি অনুকূল, সেটি আইপিএলে তাঁর সঙ্গে এক মৌসুমে একই দলে খেলা মোয়েজেস হেনরিক্সও বুঝেছেন, ‘দ্বিতীয় ম্যাচে সে একটি বলও গতি দিয়ে করেনি। ২৩ বা ২৪টি বলই স্লোয়ার করেছে বলে মনে হচ্ছে আমার। আইপিএলে অবশ্য এমনটি করতে দেখিনি। অর্ধেক বল স্লোয়ার করলে বাকি অর্ধেক গতি দিয়েই করে।’ 

মিরপুরের অনুকূল উইকেট পেলে গতি কমিয়ে শুধুই স্লোয়ারে নির্ভর করা এই পেসার মাঝখানে চোট-আঘাতে ভুগেছেন। ধার আর ছন্দও হারিয়েছেন অনেক সময়ই। তবে আসল কাঁটাটি ঠিক আগের মতোই আছে। আগের মতোই ধারালো এবং সুচালো। ছয় বছর আগে যেমন, ছয় বছর পরও ঠিক তা-ই।



সাতদিনের সেরা