kalerkantho

রবিবার । ১১ আশ্বিন ১৪২৮। ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২১। ১৮ সফর ১৪৪৩

টাচলাইন থেকে

আসল শেখ কামাল

মোস্তফা মামুন

৫ আগস্ট, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



আসল শেখ কামাল

আমাদের এক বন্ধু একদিন হঠাৎ দলবদলের ঘোষণা দিয়ে বসল। আজ থেকে আর মোহামেডান সমর্থন করবে না। সে একজন উল্লেখযোগ্য ফুটবল বিশ্লেষক, স্কুলে বা ক্লাসে আবাহনীর বিপক্ষে তর্কে জেতাতে বিশেষ ভূমিকা রাখে, এখন তার কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে গেলে মোহামেডান সমর্থকদের জন্য মহা দুশ্চিন্তা। মত বদলানো দরকার। বদলাতে গেলে আগে বের করতে হবে কারণ। চাপাচাপির মুখে সে বলল, ‘এখন থেকে আবাহনী সমর্থন করব। বঙ্গবন্ধু আমাদের পরিবারের সবার খুব পছন্দের। এর সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর সম্পর্ক আছে।’

আমরা সম্পর্কটা তখনো খুব পরিষ্কার জানতাম না। ‘কী রকম সম্পর্ক?’

‘শেখ কামাল আবাহনী তৈরি করেছে।’

তাই নাকি! আবাহনীর নামে বয়সী উচ্ছ্বাসে পাগল হলেও ক্লাবটা যে শেখ কামাল করেছেন, সেটা আমাদের জানা ছিল না। এ-ও জানা ছিল না যে ক্লাবের একজন প্রতিষ্ঠাতা থাকতে হয়।

খোঁজখবর শুরু হলো। জানা গেল, ঘটনা সত্য। তাতে আরো কয়েকজন দল বদলানোর চিন্তা করল। কেউ কেউ অবশ্য ওসবের ধারেকাছে গেল না। আওয়ামী লীগ হয়েও আবাহনী হলো না, বিএনপি হয়েও আবাহনীতে রয়ে গেল। ওদের বক্তব্য, খেলা আর রাজনীতি আলাদা। মেলাতে নেই।

তখন অল্প বয়সে অত ভাবার বোধ ছিল না। কিন্তু আজ যখন হিসাব মেলাই তখন এই যে মেরুকরণ তৈরি, খেলা আর রাজনীতির যোগাযোগ-বিরোধ-ঐক্য—এসবের মাধ্যমে বাংলাদেশের আদি ক্রীড়াবোধের নায়ক আসলে শেখ কামাল। অবিশ্বাস্য সাহসী কল্পনায় তিনিই এঁকেছিলেন এ দেশের ক্রীড়া মানচিত্রের প্রাথমিক নকশা। নানা সময় হোঁচট খেয়ে খেয়ে সঠিক জায়গায় হয়তো সব সময় থাকেননি, কিন্তু সেই দায় কামালের নয়। আমাদের। আমরা শেখ কামাল পাঠটা সঠিকভাবে না করায় তাঁর বড়ত্বটা বুঝতে ব্যর্থ হয়েছি। এবং সেই পাঠ আমাদের এটাও জানায়, শুধু খেলায় আটকে রাখলে তাঁকে সংকীর্ণভাবে দেখা হয়। সত্যি বললে, খেলার দেয়াল ভেঙে বৃহত্তর বাঙালি তারুণ্যের ছবিও তিনিই চিত্রিত করেছিলেন। আবার শেখ কামাল না থাকলে, আবাহনী না হলে আজকের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষশক্তি এভাবে বুক ফুলিয়ে ফিরতে পারে কি না সন্দেহ। একটা বড় সময় তাঁর তৈরি ভিতটাই যে ছিল আওয়ামী লীগের আশ্রয়।

মধ্য নব্বই দশকে এক সিনিয়র সাংবাদিক অতীতের গল্প শোনাতে গিয়ে বলছিলেন, ‘আবাহনী সেই সময় খুব ভালো খেলত, কিন্তু তাদের সমর্থক ছিল না শেখ কামালের সময়ে।’

‘কেন?’

‘কারণ, মানুষের প্রতিষ্ঠানবিরোধিতা। প্রধানমন্ত্রীর ছেলের দল বলে একটা বিরোধিতা ছিল। কিন্তু সেই মানুষরাই আবার পরবর্তী সময়ে আবাহনীর নামে পাগল।’

সিনিয়র সাংবাদিকের অভিজ্ঞতাকে সম্মান করে প্রতিবাদ করিনি তখন, কিন্তু বিষয়টা বোধ হয় অত সরলীকৃত নয়। সেই মানুষগুলো সময়ে আবাহনীর দিকে মন দেয়নি, কারণ তখন মন দেওয়ার আরো অন্য অনেক জায়গা ছিল। কিন্তু দুঃসময়ে জায়গা একটাই। ’৭৫-এর পর আওয়ামী লীগ এবং বৃহত্তর অর্থে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষশক্তিই চরমভাবে নিগৃহীত। সেই কঠিন সময়ে বঙ্গবন্ধুর কথা বলা যায় না। আওয়ামী লীগের নাম নেওয়া যায় না। কিন্তু জায়গা আছে একটা। আবাহনী গ্যালারি। ওখানে গেলে শেখ কামালের দলের ফুটবলের পেছনে নাচতে কোনো বাধা নেই। খেলা এখানে অনেকের কাছে পর্দা মাত্র। আড়ালে রাজনৈতিক বোধ-ভালোবাসার অঙ্ক। আবাহনী জেতে। ওরা লাফায়। তাতে আবদ্ধ রাজনৈতিক চিন্তারও একরকম মুক্তি ঘটে। সমাজের আর সব ক্ষেত্রে নিষ্পেষিত আওয়ামী লীগ আবাহনীতে বিলীন হয়ে জেগে থাকে। সবাই হয়তো তা নয়, অনেকে নিছক ফুটবলপ্রেমীই হয়তো, কিন্তু এভাবে আবার বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর সঙ্গে আওয়ামী লীগের সংযোগ টিকে থাকে। আবাহনীর ফুটবলে আবিষ্ট পরের প্রজন্ম অত সব হিসাব জানে  না। কিন্তু আবাহনীর সমর্থক হয়ে ওঠাতে তার প্রতিষ্ঠাতার প্রতি বিষোদগারে সে বিভ্রান্ত হয় না। একবার অন্তত ভাবে, অপপ্রচারকারীরা সত্যি বলছে তো? এবং সেই সূত্রে বঙ্গবন্ধু বা আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে সর্বমুখী প্রচারেও সে বিভ্রান্ত হয় না। আওয়ামী লীগ নেতারা জেলে, বঙ্গবন্ধুকন্যারা বিদেশে টিকে থাকার লড়াইয়ে, ছাত্রলীগ শিক্ষাঙ্গনে পেছনের সারিতে। তবু পরের প্রজন্মের সঙ্গে সংযোগের একটা রেখা যে রয়ে যায়, সেটা এই আবাহনীসূত্রেই।

বার্সেলোনা ক্লাব নিজেদের দাবি করে ‘মোর দ্যান এ ক্লাব’। সেটা  এ জন্যই যে জেনারেল ফ্রাংকোর শাসনামলে কাতালান জাতীয়তা প্রকাশের প্রতীক ছিল বার্সেলোনা। ন্যু ক্যাম্পই ছিল নিজেদের কথা বলার একমাত্র জায়গা। সেই মাহাত্ম্য শুনে আমাদের চোখ ছলছল করে, কিন্তু তাকিয়ে দেখি না আমাদের একটা ক্লাব ইতিহাসের একই রকম ধারা ধরে রেখে দেশের হারিয়ে যেতে বসা পরিচয়কে আগলে রেখেছে কেমন একক চেষ্টায়। না, এটাই শেখ কামাল আর আবাহনী পাঠের ব্যর্থতা। অপপ্রচারে ক্ষতি হয়েছে বিস্তর; সে অসময়ে হবেই। কিন্তু সঠিক সময়ে খণ্ডিত দর্শন, অগভীর রাজনৈতিক স্তুতি আর হাওয়াই গীতে শেখ কামাল আজও যেন অবহেলিতই। প্রাপ্য মর্যাদাবঞ্চিত।

কয়েক বছর আগে আবাহনী নিয়ে দুঃখভরা একটা লেখায় লিখেছিলাম, ‘শেখ কামাল সুযোগ থাকলেও এই আবাহনীর বিজয় উৎসবে যোগ দিতে আসতেন না।’ শক্তি আর ক্ষমতার লাগামহীন চর্চায় আবাহনী আজ টিটকারির লক্ষ্যবস্তু হওয়া আবাহনীকে তো তিনি দেখতে চাইতেন না। যেমন দেখতে চাইতেন না আজকের বাংলাদেশের একমুখী ক্রীড়া চরিত্রকে। তখনকার রীতি অনুযায়ী আবাহনী ফুটবল দলই ছিল কিন্তু ক্রিকেট যখন প্রায় নিষিদ্ধ হওয়ার পর্যায়ে তখন তিনিই রুখে দাঁড়ান। নিজে আবার বাস্কেটবল খেলতেন। অ্যাথলেটিকসে চ্যাম্পিয়ন হয়েছিলেন স্কুল-কলেজে। মানে, এক খেলায় মেতে না থেকে ছিলেন সব খেলারই পক্ষে। আজকের সেই বাংলাদেশ এক খেলায় মত্ত হয়ে বাকি খেলাগুলোকে যে সত্ভাই বানিয়ে ফেলেছে, এটাও কামালের ক্রীড়াবোধবিরোধী। কামালকে স্মরণ এবং শ্রদ্ধা সঠিক করতে দরকার এই একমুখিতা রোধ থেকে বেরিয়ে আসাও। সেই উদ্যোগ না নিয়ে শুধু যারা তাঁর জন্ম এবং মৃত্যুদিন ফুলে ফুলে সাজিয়ে ‘তিনি ছিলেন...’ জাতীয় বকোয়াস করে, এরা সব বকধার্মিক। কীর্তিমানরা খুশি থাকেন তাঁদের স্পিরিটের সঠিক পাঠে। বাজারি ভাষণে তাঁরা বরং মূল্য হারান।

এ-ও তো চেয়েছিলেন স্বাধীন দেশে তরুণরা, খেলার পাশাপাশি সংস্কৃতি চর্চা করবে। দুয়ে মিলে ওদের রক্ষা করা যাবে বিভ্রান্তির পথ থেকে। নিজে অসাধারণ সেতার বাজাতেন, সেটা নাকি এমন মুগ্ধ করা ছিল যে শুনলে মনে হতো তিনি মগ্ন সাধক। কিন্তু সেই সাধনা শেষ করেই আবার বেশ বদলে নাটকে অভিনয়ে নেমে যাচ্ছেন। যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশে তরুণদের মধ্যে দ্রোহ আর নতুনত্বের উন্মাদনা থাকবে স্বাভাবিক। ব্যান্ড আর পপসংগীতের মধ্য দিয়ে এর এ রকম প্রকাশ ঘটত। খেয়াল করুন, সেতারের মতো ধ্রুপদি শিল্পের চর্চাকারী কেউ একজনের এসবে উৎসাহিত হওয়ার কথা না। কিন্তু সেই অংশকেও পৃষ্ঠপোষকতা করে গেছেন অক্লান্তে। এমনকি আমরা যে আবাহনী ক্রীড়াচক্রের কথা জানি, এরও আগের একটা ইতিহাস আছে। আবাহনী সমাজকল্যাণ সমিতি। ষাটের দশকের মাঝামাঝি সেটা তৈরি হয়েছিল তিনটি উইংকে ধরে। খেলা, সংস্কৃতি আর সংগীত। তিনি সঙ্গীদের বলছেন, খেলোয়াড়দের টাকা-পয়সার ব্যবস্থা করতে হবে। শিক্ষায় কোটা রাখতে হবে, যাতে জাতীয় দলের খেলোয়াড়রা সরাসরি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে পারে। ৫০ বছর আগে একজন ভাবছে, যা আজকের পরিপ্রেক্ষিতেও আধুনিক চিন্তা। ভাবা যায়! ভাবা যায়, নেতা বা ক্ষমতাবানদের সন্তানদের লোভ-ভোগই যখন জাতীয় চর্চা, তখন সর্বময় ক্ষমতাবানের ঘরে বসেও সম্পূর্ণ অন্য রকম ছবি আঁকছে এক বিশ-বাইশ বছরের তরুণ! তখন আর তিনি অবশ্য তরুণ থাকেন না, বয়সের সীমা ছাপিয়ে হয়ে ওঠেন এক কালজয়ী দ্রষ্টা। কিন্তু ওই যে বললাম, সঠিক পাঠের অভাবে শেখ কামালকে আমরা ঠিক বুঝলামই না যেন।

আচ্ছা যে অপপ্রচার আষ্টেপৃষ্ঠে ঘিরে রেখেছিল অনেক বছর, সেগুলোর তাহলে কী হবে! উত্তর অনেক দেওয়া হয়ে গেছে, তবু মাত্র কিছুদিন আগে পড়া আবুল ফজলের বইটা থেকে কিছু অংশ উদ্ধৃত করি। ১৯৭৪ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাবিদ আবুল ফজল ঢাকায় এসেছেন একটা অনুষ্ঠানে যোগ দিতে, স্বাগত জানাতে হাজির এক যুবক, বিমানবন্দরে ব্যাগটা তাঁর হাত থেকে টেনে নিজে বয়ে নিয়ে যাচ্ছে। পথে যেতে যেতে জিজ্ঞেস করলেন, ‘তুমি কী করো?’

‘অনার্স পরীক্ষা দিয়েছি, সোসিওলজিতে।’

বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে শারীরিক মিল খেয়াল করে কৌতূহলবশত জানতে চাইলেন, ‘তোমার নাম?’

‘শেখ কামাল।’

‘ও, তুমি আমাদের শেখ সাহেবের ছেলে?’

‘জি।’

জি, ইনিই আসল শেখ কামাল। বাকি যা শুনেছেন, তা নকল।



সাতদিনের সেরা