kalerkantho

রবিবার । ৬ আষাঢ় ১৪২৮। ২০ জুন ২০২১। ৮ জিলকদ ১৪৪২

শুভ জন্মদিন

এখনো খেলতে পারাটাই সেরা উপহার

বর্তমান আর ভবিষ্যৎ চিন্তায় আমরা অতীতকে ভুলেই যাই। কোনো কিংবদন্তির প্রয়াণে মনে পড়ে অতীতকে। তবে কালের কণ্ঠ স্পোর্টস চিরকালীন এ বৃত্ত ভেঙে অতীতের নায়কদের স্মরণ করতে চায় তাঁদের জন্মদিনে। সেই ধারাবাহিকতায় আজ দাবা কিংবদন্তি নিয়াজ মোরশেদ-এর গল্প লিখেছেন রাহেনুর ইসলাম

১২ মে, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৩ মিনিটে



এখনো খেলতে পারাটাই সেরা উপহার

জন্ম ১৩ মে ১৯৬৬

বাংলাদেশের কিছু খেলোয়াড় আছেন যাঁরা নিজেরা হয়ে গেছেন সেই খেলার পরিচয়ের প্রতীক। তেমনই একজন দাবা কিংবদন্তি নিয়াজ মোরশেদ। জাতীয় চ্যাম্পিয়ন ১৩ বছর বয়সেই! ২১ বছর বয়সে হন গ্র্যান্ড মাস্টার। দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম গ্র্যান্ড মাস্টার তিনিই, আর এশিয়ান দাবায় পঞ্চম। আগামীকাল তাঁর ৫৫তম জন্মদিন। সমসাময়িক আর ছোটদের অনেকে সরে দাঁড়ালেও নিয়াজ মোরশেদ খেলে চলেছেন এখনো। জন্মদিনের সেরা উপহারও মানছেন এটা, ‘আমার অনেক ছোটরাও এখন খেলে না, কিন্তু আমি খেলছি বা খেলতে পারছি। জন্মদিনের সেরা উপহার এটাই।’

১৯৭৫ সালে রুশ গ্র্যান্ড মাস্টার আনাতোলি লুতিকভ এসেছিলেন ঢাকায়। প্রেস ক্লাবের প্রদর্শনী ম্যাচে তিনি একসঙ্গে খেলেছিলেন ৩০ জনের বিপক্ষে। ২০ চালের মতো খেলে তাঁর সঙ্গে ড্র করেন ৯ বছরের নিয়াজ। লুতিকভ তখন বলেছিলেন, নিয়াজ একদিন গ্র্যান্ড মাস্টার হবে। স্বপ্নের বীজটি বোনা হয়ে যায় তখনই।

জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপে ১৯৭৮ সালে যৌথভাবে আরো দুজনের সঙ্গে ছিলেন শীর্ষে, কিন্তু টাইব্রেকে হন তৃতীয়। ১৯৭৮ সালে আরেকটি ঘটনা ঘটে। বিবাহবিচ্ছেদ হয়ে যায় তাঁর মা-বাবার। মায়ের সঙ্গে জিগাতলায় ওঠেন ছোট বাসায়। সেখানে মাঠ আর বন্ধু না থাকায় ঘরের ভেতর সারাক্ষণ থাকতেন দাবা নিয়ে। এ জন্যই হয়তো ১৯৭৯ থেকে ১৯৮২ পর্যন্ত জাতীয় চ্যাম্পিয়ন হতে পেরেছিলেন টানা চারবার।

১৯৭৯ সালেই রেটিং পেয়ে যান নিয়াজ। ’৮১-তে সরাসরি হন আন্তর্জাতিক মাস্টার, শারজায়। গ্র্যান্ড মাস্টারের প্রথম নর্ম অর্জন করেন ১৯৮৪ সালে সাবেক যুগোস্লাভিয়ায় অনুষ্ঠিত বেলা ক্রোভা ওপেনে। দ্বিতীয় নর্ম ১৯৮৬ সালে কলকাতায়। আনুষ্ঠানিক গ্র্যান্ড মাস্টারের স্বীকৃতি পান পরের বছর। কিন্তু এরপরই যুক্তরাষ্ট্রে ইউনিভার্সিটি অব পেনসিলভানিয়ায় যান অর্থনীতিতে পড়তে। এটাকে এখন ভুল সিদ্ধান্ত মনে হয় নিয়াজের, ‘ওই সময় ফুটবলাররা ২২-২৩ লাখ টাকা পর্যন্ত পেয়েছে। আর আমি মোহামেডানে পেয়েছিলাম ২২-২৩ হাজারের মতো। বুঝেছিলাম, দাবায় থাকলে খেয়ে-পরে বাঁচা যাবে, তবে উপার্জন খুব ভালো হবে না।’

নিয়াজ দেশে ফেরেন ১৯৯০ সালে। তত দিনে দাবার সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হয়ে গেছে। শুরু করেন রিয়েল এস্টেট ব্যবসা। বিয়ে করেন ’৯৭-তে। দাবার জন্য তেমন কোনো সময়ই আর রইল না দাবার বরপুত্রের। ১৯৯৪ সালে রেনেসাঁ ব্যান্ডের নকীব, পিলুদের সহায়তায় তৈরি করেন গানের অ্যালবাম ‘অথচ একদিন’। একটি মাত্র অ্যালবামের পর ২০০৯ সালে ছদ্মনামে লেখেন একমাত্র কবিতার বই ‘মাত্র এক কুড়ি’। ব্যবসা গুটিয়ে ফেলেন ২০০৬ সালে। পরের বছর ডিভোর্স হয়ে যায় নিয়াজের। আবার তাই দাবায় ফেরেন পূর্ণোদ্যমে। ফেডারেশনে নির্বাচনে দাঁড়িয়ে হারলেও ছাড়েননি খেলাটা। ২০১২ সালে জাতীয় চ্যাম্পিয়ন হন ৩০ বছর পর! ২০১৯ সালে সেরার মুকুট মাথায় ওঠে আরেকবার। ষষ্ঠবার জাতীয় চ্যাম্পিয়ন হওয়া নিয়াজ অনলাইন দাবার বিভিন্ন টুর্নামেন্ট খেলছেন এখন। অ্যাজমার সমস্যা থাকায় করোনায় ঘরবন্দি জীবন নিয়ে জানালেন, ‘গিটার আর গান নিয়ে সময় কাটে। না হলে পাগল হয়ে যেতাম।’

দুই ছেলে পড়াশোনা করছেন যুক্তরাষ্ট্রে। এখন নিয়াজের দিন কাটে ছেলেদের ফেরার প্রহর গুনে।