kalerkantho

শনিবার । ৫ আষাঢ় ১৪২৮। ১৯ জুন ২০২১। ৭ জিলকদ ১৪৪২

ডাউন দ্য উইকেট

ক্রিকেট উগ্রতা!

সাইদুজ্জামান

৬ মে, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



ক্রিকেট উগ্রতা!

‘জঙ্গি’, ‘জঙ্গিবাদ’ এসব এখন ভয়ানক সব শব্দ। উচ্চারণ করলেও বিপদের ঝুঁকি আছে!

অথচ বাংলাদেশের নামি এক ক্রিকেটারের আদুরে নাম ‘জঙ্গি’। তার মানে সেকালে জঙ্গিবাদ মানেই আত্মঘাতী হানা ছিল না, অপ্রতিরোধ্য একাগ্রতার বিলাসী বিশেষণ ছিল। বলিউডে তখন এ সংক্রান্ত কী একটা গানও সুপারহিট।

একই টাইমলাইন ঘাঁটলে দেখা যাবে, ‘ব্যাটা কম্যুনিস্ট’—পশ্চিমাদের ক্রমাগত প্রচারণার পরও কথাটা স্রেফ গালামন্দ নয়। এ কটাক্ষে মধু মিশে থাকত। বাঙালির চায়ের আড্ডা, লাইব্রেরি, মিছিলে কম্যুনিজমের প্রভাব অপরিসীম। কিন্তু কালের অতলে কম্যুনিজম কিংবা সাম্যবাদ হারিয়ে গেছে। এখন এঁদের আকুতিও টিভি ‘টক শো’র বাইরে কোথাও শোনা যায় না। সেকালের তারকা ক্রিকেটারটিকেও কেউ এখন জঙ্গি বলেন বলে মনে হয় না, কে কখন আবার কী ভাবে!

কিন্তু জঙ্গিবাদ নানা ফর্মে টিকে আছে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে এর বিনাশ নেই, বরং ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগের মতো সর্বগ্রাসী হতে চলেছে। কেউ ভাববেন না ক্রিকেটের এই জঙ্গিবাদ বুঝি যত্রতত্র বোমা-টোমা ফেলা। না, এই জঙ্গিবাদ আভিধানিক অর্থে সীমাবদ্ধ; চরমপন্থা কিংবা উগ্রপন্থা। বৈশ্বিক জঙ্গিবাদ বলতে আমরা জানি টুইন টাওয়ারে বোয়িংসহ ঢুকে পড়া কিংবা সুইসাইড ভেস্ট পরে কোনো শপিং মল থেকে শুরু করে মসজিদ-মন্দির উড়িয়ে দেওয়ার হঠকারিতা। এগুলো প্রাণসংহারী—শান্তির পরিপন্থী। নিঃসন্দেহে এর সঙ্গে ‘ক্রিকেট জঙ্গিবাদে’র তুলনা চলে না। এই খেলাটা কয়টা দেশই বা খেলে!

তবু আলোচনাটা তুলতে হচ্ছে ক্রিকেটের কারণেই। ক্রিকেট যদি আকস্মিকভাবেও এ পৃথিবী থেকে মুছে যায়, কয় শতাংশ মানুষের জীবনে তা গভীর প্রভাব ফেলবে? বাস্তবতা হলো, জাতিসংঘে কেউ এ নিয়ে শোক প্রস্তাব তুলবে না। আরে, অলিম্পিকেই তো এখনো নাম লেখাতে পারেনি ক্রিকেট!

এ কারণেই চিন্তা হয় উগ্রতার মাত্রা যদি বাড়তে থাকে, তাহলে না একদিন ক্রিকেট ‘মরে’ই যায়। এই মৃত্যু মানে মুছে যাওয়া নয়। রেসলিং নামের একসময়ের তুমুল জনপ্রিয় খেলাটি কিন্তু এখনো হয়। কে বা কারা দেখেন, কেন দেখেন—অতশত বিশ্লেষণে না যাওয়াই ভালো। তার চেয়ে ক্রিকেটেই থাকি। বাংলাদেশের ক্রীড়া মানচিত্রের রাজধানী তো এই ক্রিকেটই।

কিন্তু ক্যাপিটল সিটির অবস্থা ভালো নয়। আইসিইউতে ঢুকে বেরিয়ে এসে আবার ঢুকে পড়ে। কবে ‘লাইফ সাপোর্টে’ যায়, এই আশঙ্কায় ক্রিকেটের অন্দরমহলের সবাই। অন্দরমহল বলতে ক্রিকেটের সব স্টেকহোল্ডারকে বুঝিয়েছি, খেলাটির সঙ্গে যাঁদের সামাজিক প্রতিপত্তি ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিও জড়িত। দেশের অর্থনীতিতে ক্রিকেটের অবস্থান সম্ভবত ফিফা র‍্যাংকিংয়ে বাংলাদেশ ফুটবলের সমান। বছরে দুই শ কোটি টাকাও বাজেট না যে ইন্ডাস্ট্রির, সেটির অর্থনৈতিক প্রভাব তো এমনই হওয়ার কথা। কিন্তু ক্রিকেটের সামাজিক প্রতিপত্তি প্রভূত। উগ্রপন্থার সূত্রপাত এরই সূত্র ধরে।

আবারও মনে করিয়ে দেওয়া, এই উগ্রপন্থা কিংবা জঙ্গিবাদ আভিধানিক অর্থের সঙ্গে কেউ গুলিয়ে ফেললে লেখক দায়ী নন। তবে উপমাটি যে ইতিবাচকতা থেকে প্রয়োগ করা হয়েছে, তেমনটিও নয়। অতি উন্মাদনা তো আর ভালো কিছু নয়। কেন যেন মনে হয় আমরা সামগ্রিকভাবেই ক্রিকেট নিয়ে বেশি উদ্বেলিত, যা খেলাটার উপকারের চেয়ে অপকারই বেশি করছে।

এই অতি উন্মাদনার ক্ষেত্র অবশ্য বদলেছে। করোনার কারণে এখন তো আর মাঠে যাওয়ার উপায় নেই। লকডাউনের কারণে ঘরবন্দি জীবনের ব্যস্ততা টিভি হয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। পরের মাধ্যমটিই সবচেয়ে বিপজ্জনক, অসহিষ্ণু এক জনপদের দখলে মার্ক জুকারবার্গের ‘অনন্য’ আবিষ্কার। সবারই বলার অধিকার আছে। ফেসবুক নিজের মনের জানালা যখন, তখন সে অধিকারের ব্যাপ্তি আরো বেশি। যদিও ডিজিটাল আইন সে অধিকার কিছুটা হনন করেছে। কিন্তু ক্রিকেট নিয়ে বলাবলি করে কেউ ডিজিটাল অ্যাক্টে মামলা খেয়েছেন বলে শুনিনি। তবে আড়ালে যত অভিযোগ শুনি, তাতে এই আইনে ক্রিকেটসংশ্লিষ্টদেরই বেশি মামলা করার কথা। কিন্তু তাঁরা করেন না। আবার কোন ‘শনি’ ভর করে, সেই ভয়ে!

একজন নাজমুল হাসান পাপনকে ব্যঙ্গ করে যা বলা হয়, সেসব তিনি ধর্তব্যে নিলে অসংখ্য আদালতের ব্যস্ত সময় কাটত তাঁর মামলাগুলো ফয়সালা করতেই। জানা-অজানা কত অভিযোগ যে তাঁর বিরুদ্ধে! খালেদ মাহমুদ সুজন আরেকজন। বেশ কিছুদিন ধরে বাজারে চাউর বোর্ড থেকে প্রতি মাসে ৩০ লাখ টাকা বেতন পান তিনি। আমার এক উচ্চশিক্ষিত বন্ধু ফোন করেছে একদিন, ‘এই তোদের সুজন একটা...! বোর্ড থেকে ৩০ লাখ টাকা নেয়। লোভী একটা!’

আমি মাথা ঠাণ্ডা রেখে ওর খবরের উৎস জানতে চাইলাম।

—কেন? ফেসবুকে দেখলাম!

এমন উড়ো আরো অনেক খবরে ক্রিকেট বাজার সরগরম, যার ৯৯ শতাংশেরই উৎস সোশ্যাল মিডিয়া। বেশ কিছুদিন হলো প্রাতিষ্ঠানিক সংবাদমাধ্যমের ওপর পাঠকের আর বিশ্বাস নেই। কেন নেই, সেটা আলোচনা করার জায়গা এটা না। তবে ফেসবুক জনতার ক্রিকেটের অন্দরমহলে যাওয়ার অধিকার নেই। তবু তারা কী করে জানলেন যে খালেদ মাহমুদ প্রতি মাসে ৩০ লাখ টাকা বেতন নেন, এ এক বিস্ময়। এবং আশঙ্কার জায়গা হলো, ফেসবুকের সে তথ্যই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকের মতো উচ্চশিক্ষিতও বিশ্বাস করছেন!

যাক, অতি সম্প্রতি একটি ‘অলৌকিক’ ঘটনা ঘটেছে বাংলাদেশের ক্রিকেট পরিমণ্ডলে। প্রথমে সাকিব আল হাসান এবং পরে মাশরাফি বিন মর্তুজা তাঁদের বিস্ফোরক দুটি সাক্ষাৎকারে ক্রিকেট প্রশাসনের বিস্তর সমালোচনা করলেও ফেসবুকে সবচেয়ে ধিকৃত দুই ক্রিকেট ব্যক্তিত্ব নাজমুল হাসান এবং খালেদ মাহমুদের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। প্রথমজন পথে-ঘাটে ড্রেসিংরুমের কথাবার্তা বাইরে বলে ক্রিকেটার মহলে তীব্র সমালোচিত। পরেরজন মানে খালেদ মাহমুদ তো বাংলাদেশ দলের সিনিয়র গ্রুপের চক্ষুশূল ছিলেন! এমন হাওয়া বদল কেন এবং কী করে হলো, সে বিস্ময় এখনো কাটাতে পারিনি মন থেকে।

খুব বেশিদিন আগের কথা নয়। ২০১৯ বিশ্বকাপের সময়ও মাহমুদের বিষোদগার শুনেছি। সুসম্পর্কের সূত্র ধরে বিশ্বকাপ শুরুর আগে তাঁকে অনুরোধও করেছিলাম, সবার সঙ্গে দূরত্ব কমিয়ে ফেলতে। অনেকে অপছন্দ করে—কথাটা শোনার পর মনে হলো কেঁদেই না ফেলেন মাহমুদ! পরের ঘটনা জানি না। তবে বিশ্বকাপ যত গড়িয়েছে, দলে ততই মাহমুদের গ্রহণযোগ্যতা বাড়তে দেখেছি। তাই বলে সাকিব এবং মাশরাফির কাছে তিনি শত নম্বর পেয়ে উতরে যাবেন, সেটা ওই দুজনের সাক্ষাৎকার না শোনা পর্যন্ত বুঝতে পারিনি!

ধরে নিচ্ছি, ২০১৯ অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপ জয়ে মাহমুদের মাস্টারমাইন্ডকে তাঁরা প্রাপ্য সম্মানটুকু দিয়েছেন। ধরে নিলাম, আর যা-ই হোক নাজমুল হাসান তো ক্রিকেটারদের ন্যায়-অন্যায় কোনো আবদারই ফেলে দেননি। তাই প্রশংসা তাঁর অবশ্যই প্রাপ্য, অন্তত ব্যক্তিগত দৃষ্টিকোণ থেকে। কিন্তু এতে সত্যিকার অর্থে ক্রিকেটের কী লাভ? নাজমুল আর মাহমুদের কিছু লাভ অবশ্য হয়েছে। ফেসবুকে তাঁদের বিরুদ্ধে আগের মতো ঢালাও সমালোচনায় কিছুটা ভাটা পড়েছে। ভাটা পড়েছে কারণ, এ দেশের ক্রিকেটজাতি যে দুজনকে সত্যিকারের ‘ভয়েস’ মনে করে, সেই মাশরাফি আর সাকিব যখন প্রশংসা করেছেন, তখন হুটহাট মন্তব্য করা বোধ হয় ঠিক হবে না। বলা যায়, আগামী কিছুদিনও ফেসবুক জনতার কাছে ‘বেনিফিট অব ডাউট’ পাবেন। এরপর আবার শুরু হবে। মাশরাফির মতো সাকিবেরও তো সময় ফুরাবে একদিন!

এই অন্ধপ্রেমই সম্ভবত আমাদের পরের ধাপে উঠতে দিচ্ছে না। ‘টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ খেলার প্রস্তুতি আইপিএলে নেব’ বলে সাকিবের চলে যাওয়া সমর্থন করে গেলেন সিংহভাগ। শ্রীলঙ্কায় দুটি টেস্ট জিতলেও কি আইসিসি টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপে আমাদের কোনো সম্ভাবনা আছে—সাকিবের এই কথার ঢোলেও বাড়ি দিলেন অনেকে। মজার ব্যাপার, সেই তাঁরাই আবার শ্রীলঙ্কায় টেস্ট হারের পর দলের মুণ্ডপাত করছেন!

পরিশেষে, শিরোনামের জঙ্গিবাদকে কেউ ভুল পড়বেন না। এটা প্রতীকী। আমাদের ক্রিকেট সমর্থনের অধারাবাহিকতা কারোর জন্যই মঙ্গলজনক নয়। ক্রিকেটের জন্য তো নয়ই। খেলাটাকে খেলার মতো করে দেখাতেই তো সবচেয়ে আনন্দ। দৈনন্দিন জীবনের জটিল অঙ্কে ক্রিকেটের কুটিল হিসাব-নিকাশ বাদ দিলে কেমন হয়? আমার তো মনে হয় অক্সিজেন স্যাচুরেশন কিছু হলেও বাড়বে!



সাতদিনের সেরা