kalerkantho

বুধবার । ৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৮। ১৯ মে ২০২১। ৬ শাওয়াল ১৪৪

নিজের পায়ে দাঁড়ানোর ঘোষণাও

মাসুদ পারভেজ   

২২ এপ্রিল, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



নিজের পায়ে দাঁড়ানোর ঘোষণাও

চুরি হয়ে যাওয়া প্রিয় চায়না ফোনিক্স সাইকেলটির কথা তাঁর মনে পড়ে সব সময়ই। বিশেষ করে ক্রিকেটীয় যেকোনো অর্জনের পরপরই মনের দরজায় উঁকি দিয়ে যায় তা। ক্যান্ডির পাল্লেকেলে স্টেডিয়ামে প্রথম টেস্ট সেঞ্চুরির অনির্বচনীয় আনন্দের মাঝেও নিশ্চয়ই দুই চাকার সেই বাহনটির কথা মনে পড়েছে নাজমুল হোসেন শান্তর। সেটি যে ছিল তাঁর ক্রিকেটার হওয়ার স্বপ্নের বাহনও।

গল্পের শুরুটা রাজশাহীর প্রত্যন্তের রণহাট গ্রাম থেকে। সেখান থেকে রাজশাহী শহরের ক্লেমন ক্রিকেট একাডেমি ২২ কিলোমিটার দূরে। গ্রাম থেকে শহরের দূরযাত্রায় প্রথমে চেপে বসতেন নিজের সাইকেলেই। পুরো পথ যাওয়া যেত না। কাটাখালি নামের জায়গায় গ্যারেজে সাইকেল রেখে চড়তেন বাসে। নামতেন রেলগেট বাস স্টেশনে। এরপর ইজি বাইকে করে এগোতেন আরো কিছুদূর। পথের শেষ সেখানেই নয়। পায়ে হেঁটেও যেতে হতো অনেকটা পথ। একাডেমির আঙিনায় ক্রিকেটার হওয়ার জন্য নাজমুলের নিত্যদিনের এই শ্রম-ঘামের গল্পে তাই অঙ্গাঙ্গিভাবেই জুড়ে আছে যাওয়া-আসার ক্লান্তিকর সেই ধকলও। কষ্টের সেই সব দিন সুফলও দিয়েছিল। দূর গ্রামের কিশোরকে বয়সভিত্তিক পর্যায়ের ক্রিকেট দাঁড় করিয়েছিল নিজের পায়েও।

এমন পারফরম্যান্সের ফুল ফুটিয়েছিলেন যে এর সৌরভে মাতোয়ারা ছিলেন বয়সভিত্তিক ক্রিকেটসংশ্লিষ্ট প্রায় সবাই। এঁদের অন্যতম নাজমুল আবেদীন ফাহিম বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) ছেড়েছেন আরো আগেই। এখন বিকেএসপির ক্রিকেট উপদেষ্টা সাকিব আল হাসানের ‘ক্রিকেট গুরু’ নাজমুলকে নিয়েও উচ্ছ্বসিত ছিলেন ভীষণ, ‘শান্ত ওর দিকে চোখ রাখতে আমাদের বাধ্য করেছিল। বয়সভিত্তিক ক্রিকেটে কেউ একটি সেঞ্চুরি করলেই আমরা ধরে নিতাম, পরেরটি করতে আরো অনেক ম্যাচ লাগবে। কিন্তু শান্ত একবার অনূর্ধ্ব-১৮ জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপে (২০১৩ সালে) পর পর দুই ম্যাচে ১৮৫ ও ২১৩ রান করল। দুই ইনিংসেই সে অপরাজিত। তখনই আমরা বুঝলাম, এই ছেলেটির বড় ইনিংস খেলার সামর্থ্য আছে। ওই দুই ইনিংসেই সে ওই পর্যায়ের ক্রিকেটের জন্য একটি মানদণ্ড নির্ধারণ করে দিয়েছিল।’

এ রকম পারফরম্যান্সের পর দেশের ক্রিকেটের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় তাঁর ঢুকে যাওয়াই ছিল স্বাভাবিক। দেশের মাটিতে ২০১৬-র যুব বিশ্বকাপ খেললেন। ওই পর্যায়ের ক্রিকেটে ইতিহাসের সর্বোচ্চ রান নিয়ে যুব ওয়ানডে ক্যারিয়ারও শেষ করলেন। ভবিষ্যৎ ভাবনার অংশ হিসেবে ২০১৭-র নিউজিল্যান্ড সফরেও নিয়ে যাওয়া হলো তাঁকে। উদ্দেশ্য দলের সঙ্গে থেকে শিখবেন। খেলার কথাই ছিল না। কিন্তু চোট-আঘাতজর্জর দল ক্রাইস্টচার্চে তাঁকে টেস্ট অভিষেক করিয়ে দিতে বাধ্য হলো। তেমন কিছু করতে পারলেন না। তবে যেহেতু ভবিষ্যৎ বলে ভাবা হচ্ছে তাঁকে, নিয়মিত বিরতিতে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর সুযোগও করে দেওয়া হচ্ছিল নাজমুলকে। কিন্তু গত বছর দেশের মাটিতে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে খেলা ৭১ রানের ইনিংসটি ছাড়া টেস্টে আর কোনো ফিফটি নেই। টেস্টই শুধু নয়, না পারছিলেন ওয়ানডেতে, না পারছিলেন টি-টোয়েন্টিতে। মাঝখানে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ওয়ানডে সিরিজে সাকিব আল হাসানকে সরিয়ে ব্যাটিংয়ের মহাগুরুত্বপূর্ণ তিন নম্বরে জায়গা করে দেওয়া হয় তাঁকে। সুবিধা করতে না পারা নাজমুল ক্যারিবীয়দের বিপক্ষে দুই টেস্টের চার ইনিংসেও করেন মাত্র ৪০ রান। তবু সুযোগ পেয়ে যেতে থাকা এই তরুণকে নিয়ে সমালোচনা যখন ক্রমেই আরো উচ্চকিত হচ্ছে, তখনই পাল্লেকেলের এই সেঞ্চুরি দিয়ে সামর্থ্যের জানান দিলেন তিনি। এটি যেন আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর ঘোষণাও। যদিও নাজমুল নিজে প্রমাণ করার কিছু ছিল বলে মনে করেননি, ‘নিজেকে প্রমাণ করার কিছু নেই। আমার বিশ্বাস ছিল যে আমি রান করতে পারব। কারণ গত পাঁচ-ছয় মাসে আমি অনেক পরিশ্রম করেছি। হ্যাঁ, ফল আসেনি কিন্তু ওই বিশ্বাসটি ছিল যে আমি বড় রান করতে পারব।’

বিশ্বাসে তা মিললও। এবং ক্যান্ডি টেস্টের প্রথম দিন শেষে অপরাজিত ১২৬ রানের ইনিংসটি অন্তত আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তাঁকে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর ভিতও দিল।



সাতদিনের সেরা