kalerkantho

শনিবার । ২৫ বৈশাখ ১৪২৮। ৮ মে ২০২১। ২৫ রমজান ১৪৪২

‘বিটকয়েন’ ক্রিকেট

সাইদুজ্জামান   

১৬ এপ্রিল, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



বিটকয়েন কী?

বিটকয়েন এক ধরনের ভার্চুয়াল মানি। আপনার একটি বিটকয়েন অ্যাকাউন্ট থাকবে, সেখানে আপনার নামে বিটকয়েন জমা পড়বে, যদিও এই কয়েন বা মুদ্রা দৃশ্যমান নয়। গতকালের নেট দুনিয়ার খবর অনুযায়ী, একটি বিটকয়েনের মূল্য বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৫৪ লাখ টাকা, কিন্তু এর সঙ্গে ক্রিকেটের কী সম্পর্ক? আছে—গভীর সম্পর্ক গড়ে উঠেছে সাম্প্রতিককালে। অবৈধ লেনদেনের জন্য এটি খুবই সুবিধাজনক। যদিও বিটকয়েন লেনদেনের সব তথ্যই প্রকাশ্য, কিন্তু এই ভার্চুয়াল মানি ট্রান্সফার কে করলেন, কাকে করলেন—সেসব গোপন রাখা যায়। আপনি আপনার বিটকয়েন নম্বর কাউকে না বললেই ল্যাঠা চুকে যায়। কে আপনার অ্যাকাউন্টে কয়টা বিটকয়েন পাঠাল কিংবা বিটকয়েন অ্যাকাউন্টের মালিক কিভাবে যে টাকা খরচ করলেন—কেউ জানতে পারবে না, যদি তিনি নিজের বিটকয়েন নম্বর চেপে যান।

আমরা জানি না, দিল্লির জুয়াড়ি দীপক আগরওয়ালকে নিজের বিটকয়েন নম্বর দিয়েছিলেন কি না সাকিব আল হাসান? এ-ও জানি না, বিশ্বসেরা অলরাউন্ডারের আদৌ বিটকয়েন নম্বর আছে কি না। কারণ দীপক আগরওয়াল বিটকয়েন নম্বর জানতে চাইলে সাকিব তাঁকে হোটেলে দেখা করতে বলেছিলেন। সেই দেখা তাঁদের হয়েছিল কি না, জানা যায়নি। বিটকয়েনের প্রসঙ্গও অমীমাংসিত।

কিন্তু হিথ স্ট্রিক যে একটি বিটকয়েন নিয়েছিলেন এবং সেটি ভাঙিয়ে ৩৫ হাজার ডলার তুলেছেন, সে বয়ান আইসিসির মাধ্যমে ক্রিকেটবিশ্ব জেনেছে। জনৈক ‘মি. এক্স’ বলে উক্ত জুয়াড়িকে উল্লেখ করেছে আইসিসি। তবে এ দেশের উত্সুক ক্রিকেট জনতা দুয়ে দুয়ে চার মিলিয়ে মি. এক্সকে দীপক আগরওয়াল বলেই ধরে নিয়েছে এবং এই জুয়াড়ির সঙ্গে সাকিবকে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন সন্দেহে স্ট্রিককে দোষারোপও করছে অনেকে। তারা মনে করছে, স্ট্রিক বদমায়েশিটা না করলে বিপথে পা বাড়াতেন না সাকিব আল হাসান। কিন্তু আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে এখন দুধের শিশু থাকার উপায় নেই। পদে পদে খেলোয়াড়-কর্মকর্তাদের স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয় জুয়াড়ির আক্রমণের গতিপথ। সেই বয়সভিত্তিক ক্রিকেট থেকে শুরু করে প্রতিটা সিরিজ-আসরের আগে অংশগ্রহণকারীদের সামনে সতর্কতাবিধি উপস্থাপন করা হয়। অসংখ্য চিহ্নিত জুয়াড়ির ছবিসহ নামধাম জানিয়ে দেওয়া হয় সবাইকে। দীপক আগরওয়াল সম্পর্কেই যেমন বাংলাদেশের ক্রিকেটাররাও অবগত ২০১৭ সাল থেকে। জেনেও যদি কেউ ওই ভারতীয়ের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখেন, তবে সেটি তাঁর সমস্যা এবং তিনি অবশ্যই শিশু নন যে কারো হাত ধরে ক্রিকেট-জুয়ার কাদাজলে নামতে হবে তাঁকে।

আইসিসির জন্য বরং একটু মায়া হয়। একজন জুয়াড়িকেও ভাশুরের সন্মান দিতে হচ্ছে আজকাল, নাম মুখে আনতে পারছে না! এই যেমন ‘মি. এক্স’ বলছে স্ট্রিকের কাছ থেকে গোপনে দলীয় তথ্য কেনা লোকটিকে। বিচারকের রায়ে কখনো এমনটা দেখেছেন? কিন্তু আইসিসির দুর্নীতি দমন বিভাগের (আকসু) ক্ষমতাই এটুকু। নানা তথ্য-প্রমাণ হাতে থাকলেও ক্রিকেটের বাইরের কাউকে সাজা দেওয়ার এখতিয়ার নেই। এমনকি কোনো জুয়াড়ির নামও রায়ে উল্লেখের সুযোগ নেই, সাজা কিংবা গ্রেপ্তার তো দূরের কথা। শোনা যায়, দীপক আগরওয়ালের মোবাইল ‘ছিনতাই’ করেই সাকিবের যোগসূত্র পেয়েছিল আকসু।

আহমেদ সাজ্জাদুল আলম ববি, বিসিবির পরিচালক খুবই মর্মাহত। হিথ স্ট্রিকের মতো এমন সজ্জন এমনটা করতে পারেন?

কী নেই স্ট্রিকের? জিম্বাবুয়ের সর্বকালের সেরার লড়াইয়ে তিনি এবং অ্যান্ডি ফ্লাওয়ারের আশপাশে কেউ নেই। ১৯৮০ সালে জিম্বাবুয়ের স্বাধীনতার পর সম্পত্তি বণ্টন হওয়ার পর বুলাওয়েতে পূর্বপুরুষরা যে র‌্যাঞ্চ রেখে গেছেন, সেটিও কম নয়। সর্বোপরি ২০১৩ সালে পাহাড়ের ওপর স্ট্রিকের বাড়ির উঠানে বসে আকাশের তারার আলো দেখে মনে হয়নি এ স্বর্গোদ্যান কলুষিত হতে পারে, কিন্তু দুর্নীতির কালো হাত যে অনেক লম্বা!

একটা সময় ধারণা ছিল যারা দলে অনিয়মিত, তারাই বিপথে যায়। হ্যান্সি ক্রনিয়ে আর আজহারউদ্দিনের ঘটনায় জানা গেল, প্রভাবশালী ক্রিকেটারদের প্রতিই জুয়াড়িদের আকর্ষণ বেশি। ‘এভ্রিওয়ান হ্যাজ আ প্রাইস’—একটু বেশি মূল্য চুকিয়ে তাদের বাগে আনতে হয় আর কি। তাই বলে সবাই ক্রিকেট-জুয়ার কাদায় নেমে পড়েছেন, সে দাবি কেউ করেনি, কিন্তু ক্রিকেট যে ঘুণে খেয়ে ফেলছে, এটি অনুভব করা যায়।

ক্রিকেটের আত্মরক্ষার একটাই উপায়—আরো বেশি বেশি ঘটনা সামনে তুলে আনা। এমনিতেই বিশ্বাস উঠে যাচ্ছে ক্রিকেট থেকে। আইপিএলের অফিশিয়াল ফেসবুক পেজে ভারতীয়দের কমেন্ট পড়লেই শিউড়ে উঠতে হয়। বিশ্বের সবচেয়ে ধনী কিংবা নামি ক্রিকেটাররাও আর সন্দেহের ঊর্ধ্বে নন। সম্ভবত ক্রিকেটই এখন একমাত্র খেলা, যেটিকে ঘিরে অবিশ্বাসের এমন দোলাচল।

ডাব্লিউ ডাব্লিউ এফ-কে নিয়ে বোধ করি আর আলোচনার দরকার নেই।



সাতদিনের সেরা