kalerkantho

শুক্রবার । ৩ বৈশাখ ১৪২৮। ১৬ এপ্রিল ২০২১। ৩ রমজান ১৪৪২

ন ডরাই-এর ‘নায়িকা’ এখন

কক্সবাজারের সমিতিপাড়ায় নাসিমা কাটাচ্ছেন আটপৌরে জীবন। ছোট দুটি টিনের ঘরে স্বামী ও দুই সন্তান নিয়ে তাঁর সংসার। একসময় সমুদ্রের বড় বড় ঢেউ জয় করা মেয়েটিই এখন হাবুডুবু খাচ্ছেন সংসার নামের নতুন সমুদ্রে।

রাহেনুর ইসলাম, কক্সবাজার থেকে ফিরে   

১ মার্চ, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৩ মিনিটে



ন ডরাই-এর ‘নায়িকা’ এখন

সমুদ্রের উত্তাল জলরাশি, সার্ফিং আর ভয়ডরহীন এক জলকন্যা নাসিমা আকতার। সব বাধা পেরিয়ে যাঁর স্বপ্ন ছুটেছে সার্ফিংয়ের গতিতেই। এই সমুদ্রকন্যাকে দমাতে পারেনি সমাজ কিংবা পরিবারের রক্তচোখও। সামাজিক, পারিবারিক প্রতিবন্ধকতা পেরিয়ে হয়ে উঠেছেন  বাংলাদেশের নারী সার্ফারদের আদর্শ।

জীবিকার তাগিদে একটা সময় কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে ঝিনুক কুড়াতেন নাসিমা। পর্যটকদের কাছে বিক্রি করতেন খাবার। ৯ বছর বয়সে একটি সার্ফিং ক্লাবে যোগ দিয়ে জীবনকে দেখতে শুরু করেন নতুনভাবে। হন দেশের প্রথম নারী সার্ফার। মেয়েদের পাশাপাশি ছেলেদেরও হারিয়ে জিততে থাকেন একের পর এক শিরোপা। নাসিমা বাংলাদেশের রক্ষণশীল সমাজের প্রচলিত প্রথা ভেঙে অন্য তরুণীদেরও শিখিয়েছেন সার্ফিং। অনুপ্রেরণা, উৎসাহ দিয়ে আগ্রহী করে তুলছেন সবাইকে। ইংল্যান্ডের ‘দ্য সানডে টাইমস’-এ তাঁকে নিয়ে করা প্রতিবেদন নজরে আসে ক্যালিফোর্নিয়ার চলচ্চিত্র নির্মাতা হিদার কিসিঞ্জারের। নাসিমাকে নিয়ে তিনি তৈরি করেন প্রামাণ্যচিত্র ‘দ্য মোস্ট ফিয়ারলেস’। এ ডকুমেন্টারিতেই উঠে এসেছে অদম্য নাসিমার এগিয়ে চলার অসামান্য গল্প।

২০১৯ সালে নাসিমার জীবনী অবলম্বনে বাংলাদেশেও নির্মিত হয় চলচ্চিত্র ‘ন ডরাই’। নাসিমার জীবনের ছায়া অবলম্বনেই করা হয়েছিল আয়েশা চরিত্রটি। এই সিনেমা ২০১৯ সালের সেরা চলচ্চিত্রসহ জিতে নেয় ছয়টি বিভাগে জাতীয় পুরস্কার। অভিনেতা, অভিনেত্রীসহ চলচ্চিত্রটির অর্জন অনেক। কিন্তু কক্সবাজারের সমিতিপাড়ায় নাসিমা কাটাচ্ছেন আটপৌরে জীবন। ছোট দুটি টিনের ঘরে স্বামী ও দুই সন্তান নিয়ে তাঁর সংসার। একসময় সমুদ্রের বড় বড় ঢেউ জয় করা মেয়েটিই এখন হাবুডুবু খাচ্ছেন সংসার নামের নতুন সমুদ্রে।

তাঁর স্বামী পেশায় রাজমিস্ত্রি। নাসিমাকে সার্ফিং থেকে দূরে রাখতে চান তিনি। এ নিয়েই সংসারে লেগে থাকে অশান্তি। স্বামীর অনুমতি ছাড়া বাইরের কারো সঙ্গে কথা বলা বারণ। যাঁকে নিয়ে তৈরি হলো ‘ন ডরাই’ মানে ভয় পাই না সিনেমা, সেই তাঁরই বসবাস এখন ভয়ের সঙ্গে। নাসিমার আফসোস, ‘জীবনের ঢেউ এমন বাঁকে নিয়ে ফেলবে কল্পনাও করিনি। দোয়া করবেন আমার জন্য।’

‘ন ডরাই’ সিনেমায় তিন দিন সার্ফিংয়ের জন্য শুটিং করেছেন নাসিমাও। এ জন্য সম্মানী দেওয়া হয়েছে ৩০ হাজার টাকা। সিনেমা মুক্তির আগে পরিবারসহ জানানো হয়েছিল আমন্ত্রণ। প্রাপ্তি বলতে এটুকুই। যদিও এই সিনেমার নামে কক্সবাজারে করা হয়েছে একটি সার্ফিং ক্লাব। এ নিয়ে প্রযোজক মাহবুবুর রহমান রুহেল জানালেন, ‘কক্সবাজারে আমাদের একটি সার্ফিং ক্লাব আছে, যার নাম বদলে ন ডরাই রাখা হয়েছে। এই ছবি শুধু সার্ফিং নয়, একটি মুভমেন্টের নাম। সামাজিক ও পারিবারিক প্রতিবন্ধকতা পেরিয়ে নাসিমার সার্ফিংয়ের আদর্শ হয়ে ওঠার গল্প।’

জীবিকার তাগিদে নাসিমা চাকরি করতেন হোটেল সায়মন বিচ রিসোর্টে, যার ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাহবুবুর রহমান রুহেলই। তবে তিন মাস পর চাকরি হারান নাসিমা। একটা সময় অভাবের তাড়নায় স্কুলের পথ উপেক্ষা করে হাতে খাবারের পোঁটলা নিয়ে বিক্রি করতে যেতেন পর্যটকদের কাছে। তবে সার্ফিংয়ের সুবাদে শিখে ফেলেছেন ইংরেজিটা। শাশুড়ি, ননদের সামনে পরিবারের অশান্তি নিয়ে কথা বলছিলেন ইংরেজিতেই!

ঝিনুক কুড়ানো শত কিশোর-কিশোরীকে সার্ফিং শিখিয়েছেন নাসিমা, দেশ-বিদেশের নানা টুর্নামেন্টে ভালোও করছে তারা। সঙ্গে তাদের পড়াশোনার তাগিদ দিলেন তিনি, ‘পড়াশোনা জানা থাকলে একটা চাকরি নিয়ে জীবিকা চালিয়ে নিতে পারতাম আমি। তাই মন দিয়ে পড়াশোনার জন্য অনুরোধ করছি সবাইকে।’

মন্তব্য