kalerkantho

বুধবার । ১ বৈশাখ ১৪২৮। ১৪ এপ্রিল ২০২১। ১ রমজান ১৪৪২

ডাউন দ্য উইকেট

ফ্র্যাঞ্চাইজি-ভাইরাস

সাইদুজ্জামান

২৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



ফ্র্যাঞ্চাইজি-ভাইরাস

প্রচণ্ড জ্বর থেকে উঠলেও জিভে তিতকুটে ভাব আরো কয়েকটা দিন থেকে যায়। খুবই বিরক্তিকর ব্যাপার। শ্রীলঙ্কা সিরিজের চেয়ে ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগের (আইপিএল) প্রতি সাকিব আল হাসানের অধিক আগ্রহের খবরটা এর চেয়েও বিরক্তিকর। জ্বর-টর থেকে কিভাবে সারা জীবন নিরাপদ থাকা যায়; সে কৌশল এখনো চিকিৎসাবিজ্ঞান আবিষ্কার করতে পারেনি। তবে জাতীয় দল বাদ দিয়ে ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেট খেলা বন্ধের অব্যর্থ ‘টিকা’ কিন্তু আছে। সেটি শেষে বলছি।

আমরা আমজনতা সাকিবের এহেন সিদ্ধান্তে কেউ ক্ষুব্ধ, কেউ বা বাকরুদ্ধ এমনকি বিশ্বসেরা অলরাউন্ডারের একনিষ্ঠ ভক্ত ইনিয়ে-বিনিয়েও ঠিকঠাক সাফাই গাইতে পারছেন না। স্মৃতি হাতড়ে বুঝলাম ভারতীয় জুয়াড়ি দীপক আগরওয়ালের সঙ্গে দীর্ঘকাল যোগাযোগের বিষয়টি গোপন রাখার অভিযোগে নিষিদ্ধ হওয়ার খবরেও সম্ভবত এতটা সাকিববিরোধী হাওয়া বয়ে যায়নি এ দেশের ক্রিকেট সমাজে। একটু অবাক করা ব্যাপারই। যে আমরা ক্রিকেট জুয়ায় জড়িয়ে পড়া ক্রিকেটারের জন্য উথালপাথাল আবেগে মথিত হই, সেই আমরাই কিনা কিছু বাড়তি উপার্জনের জন্য আইপিএল বেছে নেওয়া সাকিবের পিণ্ডি চটকাচ্ছি!

আমার বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া ভাগ্নে তুমুল উত্তেজিত, ‘মামা, সাকিব এটা কোন কাজ করল?’ জ্বরে কাতর আমি খুব বিরক্ত। তবু ও বলেই যাচ্ছে, ‘আইপিএলে কেন যাবে? দেশের কথা একবারও ভাবল না।’ বুঝলাম ভাগ্নের তরুণ রক্ত অহেতুক দেশপ্রেমে টগবগ করে ফুটছে। ওকে শান্ত করার জন্য বললাম, ‘ক্রিকেটটা ওদের পেশা। উপার্জনের জন্যই খেলে। টাকা বন্ধ করে দিলে কেউ ক্রিকেট খেলবে না। যা, এবার ভাগ!’

এই প্রজন্মের বিশেষ করে ক্রিকেট-প্রজন্মের সমস্যাটা মূলত এখানেই। সবাই ঢালাওভাবে ধরে নেয়, লাল-সবুজের পতাকা বিশ্বের দরবারে পতপত করে ওড়ানোর জন্যই সাকিব থেকে শুরু করে নাঈম হাসানরা ক্রিকেট খেলেন। কেউ একবার ভাবেও না যে, ১৮ কোটি দেশের মাত্র এই কজনকেই কেন দেশপ্রেমের ঝাণ্ডা ওড়াতে হবে? দেশপ্রেম প্রত্যেকটা নাগরিকের রক্তে মিশে থাকার কথা। শীর্ষ ব্যক্তি থেকে শুরু করে দেশের প্রতি ভালোবাসা একজন নিম্ন আয়ের মানুষেরও দায়িত্বশীলতার প্রথম শর্ত হওয়ার কথা।

তাই সাকিবের দেশপ্রেম নেই—এ আলোচনাতেই যেতে চাই না। বরং দেশপ্রেম যদি ইস্যু হয় তবে আইপিএল খেলার ইচ্ছা প্রকাশ নয়, ভয়ংকর প্রশ্নবিদ্ধ তাঁর ভারতীয় জুয়াড়ির সঙ্গে যোগাযোগের তথ্য গোপন করার বিষয়টি। জাতীয় দল ফেলে ভিনদেশি কোনো অর্থকরী ক্রিকেটে অংশ নেওয়ার বিষয়টি নিঃসন্দেহে দায়বদ্ধতার বরখেলাপ। কিন্তু ক্রিকেট জুয়ায় প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষ যোগসাজশ স্রেফ প্রতারণা, একটি দল এবং দেশের সঙ্গেও।

তাই শ্রীলঙ্কা সফরে না গিয়ে সাকিবের আইপিএল খেলতে যাওয়ার ইচ্ছার খবরে তাঁর মতো একজন তারকার দায়বদ্ধতা নিয়েই প্রশ্ন জেগেছে আমার মনে। তাঁর দেশপ্রেম আছে কি নেই—সে প্রশ্ন একবারও মনে জাগেনি।

দায়বদ্ধতার প্রশ্নে ২০০৮ সালের একটা ঘটনা মনে পড়ে গেল। ১৫ জনের একটি দল ভারতে যাচ্ছে—বিলুপ্ত ইন্ডিয়ান ক্রিকেট লিগ খেলতে। এ নিয়ে পুরো দেশ তোলপাড়। বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) তৎকালীন কর্মকর্তারা বেকায়দায় পড়ে আইসিএলগামী ক্রিকেটারদের দেশপ্রেমকে প্রশ্নবিদ্ধ করার পাশাপাশি ‘ষড়যন্ত্র’ থিওরি বাজারজাতকরণে ব্যস্ত। তবে যত দূর জানি, তাঁদের নাকের ডগাতেই আইসিএলের রোডম্যাপ তৈরি হয়েছিল। যাক, সেসব কাসুন্দি ঘেঁটে লাভ নেই। তো, বিমানবন্দরে সংবাদমাধ্যমের প্রশ্নের উত্তরে ‘বিদ্রোহী’ সেই দলটির এক ক্রিকেটার হুট করে বলে বসলেন, ‘এই জাতিকে আমার আর দেওয়ার কিছু নেই।’ এতে আগুনে ঘি ঢালার মতো প্রতিক্রিয়া হলো দেশজুড়ে। সে আগুনের আঁচে বিসিবি পুরো দলটিকে প্রথমে আজীবনের জন্য নিষিদ্ধ করে। এরপর কমিয়ে ১০ বছর এবং এখন সবই অতীত।

সে তুলনায় ভাগ্যবানই বলতে হবে সাকিব আল হাসানকে। বোর্ড সভাপতি নাজমুল হাসান খবরটি দেওয়ার দিন ভগ্ন হৃদয়ে বলেছেন, ‘যে চিঠি দেবে, তাকেই ছুটি দিয়ে দেব। মুস্তাফিজ (রহমান) চাইলে ওকেও দেব।’ তার মানে, সাকিবের অসিলায় এখন বিসিবির বাতাসে অনাপত্তিপত্র উড়বে। সেটি নিয়ে যে কেউ আইপিএল কিংবা অন্য কোনো ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগ খেলে যখন সময় পাবেন, তখন জাতীয় দলের জার্সিতে খেলতে পারবেন ক্রিকেটাররা। নাজমুল হাসান অবশ্য একটা শর্ত দিয়েছেন যে চুক্তির আগে ক্রিকেটারদের লিখিত দিতে হবে কোন কোন ফরম্যাটে তিনি খেলতে আগ্রহী। তাতে আর ভবিষ্যতে ‘যখন খুশি তখন খেলা’র দাবি জানাতে পারবেন না।

কিন্তু এটাই কি একমাত্র সমাধান? আধুনিক ক্রিকেটের যে গতিবিধি তাতে তো সহসাই বিসিবিতে একগাদা ক্রিকেটার শুধু সাদা বলে খেলার ইচ্ছা জানিয়ে চিঠি দেবেন! তখন টেস্ট ক্রিকেট খেলবেন কারা? যাঁদের সীমিত ওভারের ক্রিকেটে জায়গা নেই, সম্ভবত শুধু তারাই। বাংলাদেশ জাতীয় দলের হয়ে খেলা কি তবে এতটাই ঐচ্ছিক?

অনেকে ফুটবলের উদাহরণ টানতে পারেন। মেসি-রোনালদোরা তো বছরের ৯ মাসই ক্লাব ফুটবল খেলেন। আঞ্চলিক কিংবা বৈশ্বিক ফুটবল আসর ছাড়া তাঁদের জাতীয় দলের জার্সিতে দেখা যায় না। কথা সত্য। তবে ফুটবল আর ক্রিকেটে বিস্তর ফারাক আছে। ফুটবলারদের সিংহভাগই তৈরি হন কোনো না কোনো ক্লাবের একাডেমিতে। মেসি আর্জেন্টাইন হলেও তাঁকে তৈরি করেছে বার্সেলোনা। কিন্তু মেসিভক্ত সাকিবকে তৈরি করেছে কে? শুরুতে বিকেএসপি এবং বাকিটা বিসিবির ছায়াতলে। বিকেএসপিতে যে আধুনিক সুবিধাদি সাকিব কিংবা অন্য উঠতি ক্রীড়াবিদরা পেয়ে থাকেন, সেসব নিশ্চিত হয় এ দেশের জনগণের টাকায়। আর একজন সাকিব কিংবা তামিম ইকবালকে তারকাজগতে প্রবেশের অনুকূল পরিবেশ তৈরি করে দেয় বিসিবি।

বিসিবির কাছে আপামর ক্রিকেটারদের দায়বদ্ধতার জায়গাটা এখানেই। যেকোনো ক্রিকেটারেরই পেশাগত কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে বিসিবির অভিমত অনুসরণ বাধ্যতামূলক। সাকিব কিংবা মুশফিকুর রহিম আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলে বাংলাদেশকে কোনো বিশেষ সুবিধা দিচ্ছেন না। বাস্তবে এটাই তাঁদের পেশা। দীর্ঘ মেয়াদে বিনিয়োগের ডিভিডেন্ড বোর্ড পায় দলীয় সাফল্যের সূত্রে। একজন সাকিব আল হাসানের আশায় হাজারটা সম্ভাব্য সাকিবের পেছনে বিনিয়োগ করতে হয় বোর্ডকে। ঠিক এ কারণেই সাকিব ইস্যুতে বিসিবি সভাপতির অসহায়ত্ব বেমানান মনে হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে কঠোর অবস্থান প্রত্যাশিত ছিল নাজমুল হাসানের কাছে।

অবশ্য তাঁর অসহায়ত্বের পেছনে অনেকগুলো প্রভাবক আছে। যেমন—সাকিবকে আইসিসি এক বছরের নিষেধাজ্ঞার সময়েও তো আমজনতা বলেছিল, সব নাজমুলের চক্রান্ত! এখন আইপিএলে যেতে না দিলে যদি আবার উগ্র আক্রমণ হয়। এমনিতেই টানা হারে ইমেজ সংকটে বিসিবি। বরং একটু ছাড় দিয়ে সাকিবের কাছ থেকে অদূর ভবিষ্যতে আরেকটু ভালো সার্ভিস পাওয়ার কুটিল চিন্তাও থাকতে পারে বোর্ডের।

তবে এই সিদ্ধান্তে একটা ট্রেন সম্ভবত যাত্রা শুরু করে দিল এ দেশে। তবু ভালো যে সাকিবের সেই ট্রেনে প্রথম যাত্রী হিসেবে এখনই উঠে পড়েননি মুস্তাফিজুর রহমান। আপাতত আইপিএলের আগে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটকে রেখেছেন তিনি। ২০১৩ থেকে টাইমলাইন ধরলে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের জন্য গোটা পাঁচেক ভিনদেশি ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেট খেলতে পারেননি তামিম। মুস্তাফিজকেও একাধিকবার অনুমতি দেয়নি বিসিবি। মাহমুদ উল্লাহ, মুশফিকুর রহিম এমনকি তরুণ আফিফ হোসেনকে একবার ক্যারিবিয়ান প্রিমিয়ার লিগ (সিপিএল) খেলার অনুমতি দেয়নি বিসিবি।

তবে এবার সম্ভবত আগল খুলে দেওয়া হলো। ক্রিস গেইলদের মতো বোর্ডের সঙ্গে চুক্তিপত্রে স্বাক্ষর না করলেই আপনি ফ্রি এজেন্ট, যখন খুশি আইপিএল-পিএসএল খেলে বাংলাদেশের জার্সিতে ‘দেশপ্রেমিক’ হয়ে উঠতে পারবেন।

পেশাদারি জগতে ঠিকানা বদল নিয়মসিদ্ধ। কিন্তু একজন বেসরকারি চাকুরে আর ক্রিকেটারের পেশাগত দায়বদ্ধতা একই সমান্তরালে নয়। বেসরকারি প্রতিষ্ঠান কর্মী নিয়োগ দেয়, তৈরি করার দীর্ঘমেয়াদি ব্যয় বহন করে না। কিন্তু একজন ক্রিকেটার বিকশিত হন ক্রিকেট বোর্ডের পরিচর্যায়। বাংলাদেশে তো আরো বেশি বিসিবি-নির্ভর ক্রিকেট ক্যারিয়ার। এখানে কোনো ক্লাবেরই একাডেমি কিংবা যুব দল নেই। সেই স্কুল পর্যায় থেকেই বিসিবির নজরদারিতে বেড়ে ওঠেন একজন সাকিব আল হাসান। সেই তিনি কিনা হুট করে ‘চললাম’ বলে দেবেন!

অনন্যোপায় আমিও যেতে হয়তো দিতাম। তবে বিদায়ের আগে শর্ত জুড়ে দিতাম—জনাব, আমার এত দিনের বিনিয়োগ ফেরত দিয়ে তবে যাবেন।

এই টিকায় এ দেশের ক্রিকেট থেকে ফ্র্যাঞ্চাইজি-ভাইরাস প্রতিরোধ অসম্ভব নয়!

মন্তব্য