kalerkantho

বুধবার । ১৮ ফাল্গুন ১৪২৭। ৩ মার্চ ২০২১। ১৮ রজব ১৪৪২

ডাউন দ্য উইকেট

‘ভবিষ্যতে’র বাংলাদেশ

সাইদুজ্জামান

২৮ জানুয়ারি, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



নেট দুনিয়ায় তুমুল উচ্ছ্বাস। দোষের কিছু নয়। আইসিসির ওয়ানডে র্যাংকিংয়ে নিজের প্রিয় দলকে দুই নম্বরে দেখলে কার না ভালো লাগে! কিন্তু সমস্যা হলো বাংলাদেশ কেন এখন দুই নম্বরে এবং কেন এ আসন থেকে পিছলে পড়তে পারে অদূর ভবিষ্যতে—সেটি কি আমরা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছি?

আগেই বলেছি, এই উচ্ছ্বাস দোষের নয়। আবছা মনে আছে সেই কৈশোরকালে কুমিল্লা স্টেডিয়ামে কোনো একটি বিদেশি শৌখিন দলের বিপক্ষে বাংলাদেশের দলীয় রান ২৫ হতেই পুরো স্টেডিয়াম দাঁড়িয়ে অভিবাদন জানিয়েছিল—‘কোয়ার্টার সেঞ্চুরি’ পূর্ণ হয়েছিল বলে! ক্রিকেটীয় এই টার্মটা সম্ভবত বাংলাদেশি সমর্থকদের নিজস্ব উদ্ভাবন। এখন ব্যক্তিগত ফিফটিরই খুব একটা কদর নেই, দলীয় ২৫ রান তো কোন ছার! জ্ঞান হওয়ার পর দলীয় শতরান কিংবা পুরো ৫০ ওভার ব্যাটিং করতে পারলেই হাততালি পেয়েছে বাংলাদেশ। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দলের কাছ থেকে প্রত্যাশিত নৈপুণ্যের ব্যারোমিটার চড়েছে আরো। এ শতকের শুরুর কথিত ‘লড়াকু’ হারও মন ভরায় না। বিশ্বকাপ জয়ের ডিমান্ড নোটও ধরিয়ে দেওয়া হয় ক্রিকেটারদের হাতে।

আপত্তিটা এখানেই। বাস্তবতা থেকে আমরা কি যোজন দূরে এগিয়ে কিংবা পিছিয়ে যাচ্ছি। এগিয়ে থাকার কথাটা এ কারণেই বললাম যে, র্যাংকিংয়ের ৭ নম্বরে থাকা দলের কাছে বিশ্বকাপ চাওয়া মানে তো আমরা বাস্তবতার চেয়ে এগিয়ে থাকা আশাবাদী মানুষ। আবার সাতজনের অভিষেক ঘটানো ওয়েস্ট ইন্ডিজকে ৩-০ ব্যবধানে হারিয়ে র্যাংকিংয়ের দুই নম্বরে ওঠার উচ্ছ্বাস বাস্তবতা থেকে পিছিয়ে থাকার ইঙ্গিত। আসন্ন নিউজিল্যান্ড কিংবা কঠিন সব সিরিজে অবস্থান বদলের প্রবল সম্ভাবনার কথা জেনেও আমরা তৃপ্তির ঢেকুর তুলছি। এ তো বাস্তবতা থেকে পিছিয়ে পড়ারই নামান্তর।

আসলে আমরা কোথায়, সেটিই সম্ভবত আমরা জানি না কিংবা জানতে চাইও না। বাংলাদেশ-ওয়েস্ট ইন্ডিজ শুরুর আগেই অস্ট্রেলিয়া-ভারত দুনিয়া কাঁপানো ব্যাট-বলের লড়াই দেখার সুযোগ হয়েছে। অবিশ্বাস্য মানের ক্রিকেট। গোলাপি বলে ভারত ৩৬ রানে নীল হওয়ার পর কেউ যা ভাবেননি, চার টেস্টের বোর্ডার-গাভাস্কার সিরিজটা শেষ হয়েছে তার চেয়েও বহুগুণ বেশি বিস্ময় উপহার দিয়ে।

বহুদিন পর ক্রিকেট যেন তার সবটুকু রোমাঞ্চ ছড়িয়েছে সিডনি থেকে গ্যাবায়। ক্রিকেট ভাণ্ডারের অভাবিত পুঁজি দেখিয়ে ভারত বুঝিয়ে দিয়েছে শুধু অর্থনীতির বাজারই নয়, বাইশ গজেও আগামী দিনগুলোয় সাম্রাজ্য করবে তারা। সেসব আমার আপনার মনঃপূত না হলেই কী! নেট বোলার আর টেস্ট বিবেচনায় নেই—এমন কয়েকজনের নৈপুণ্যে সিরিজ জিতেছে ভারত। টেস্ট বিবেচনাতে না থাকা ক্রিকেটারও কলার উঁচিয়ে অস্ট্রেলিয়াকে দাবড়েছেন গ্যাবায়। ‘নতুন’ ভারতের পেশি দেখানো হয়ে গেছে পুরো বিশ্বকে।

এরই মধ্যে অবশ্য শুরু হয়েছে ‘নতুন’ বাংলাদেশ দলের বিনির্মাণ। ২০২৩ বিশ্বকাপে চোখ রেখে মাশরাফি বিন মর্তুজাকে প্রাথমিক স্কোয়াডেও বিবেচনা করা হয়নি। এটা তো সত্যি যে, পরের বিশ্বকাপে খেলার অনুমতি মাশরাফিকে তাঁর শরীরই হয়তো দিত না। কিন্তু নির্বাচক-টিম ম্যানেজমেন্টের ভবিষ্যৎ চিন্তার ফসল নতুন বাংলাদেশ দলের স্ট্র্যাটেজিতে কি নতুনত্বের দেখা মিলেছে?

মিলেছে। গত বিশ্বকাপে তিন নম্বরে অবিশ্বাস্য নৈপুণ্য দেখানো সাকিব আল হাসান চার নম্বরে খেলেছেন ওয়েস্ট ইন্ডিজ সিরিজে। দীর্ঘ বিরতির পর আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ফিরে ভালোই করেছেন। তবে তিন নম্বরে ভবিষ্যতের ভাবনা থেকে খেলানো নাজমুল হোসেন শান্ত প্রত্যাশা মেটাতে পারেননি। তার মানে এই না যে তাঁর সামর্থ্য নেই। তবে বাংলাদেশ ক্রিকেটে ঐতিহ্য অনুযায়ী আবারও নাজমুলের তিন নম্বরে ব্যাটিংয়ে সুযোগ পাওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ। অবশ্য নিউজিল্যান্ড সফরে পারিবারিক কারণে সম্ভবত যাচ্ছেন না সাকিব। সে ক্ষেত্রে ‘ঐতিহ্য’ ফিরে আসতে আরেকটি সিরিজ সময় লাগবে হয়তো!

নতুনত্বের পথে যে বাংলাদেশ হাঁটছে না, তার আরেকটি নিদর্শন দেখা গেছে দল নির্বাচনে। ঢাকায় সিরিজ জিতে যাওয়া বাংলাদেশ দল চট্টগ্রামে সিরিজের তৃতীয় ও শেষ ম্যাচেও পরীক্ষা-নিরীক্ষার সাহস করেনি। আনুষ্ঠানিকতার চিরায়ত রীতি থেকে টিম ম্যানেজমেন্টের দূরে থাকার কারণ অবশ্য ২০২৩ বিশ্বকাপ। ওই আসরে সরাসরি অংশগ্রহণের টিকিট পেতে পয়েন্ট খুব গুরুত্বপূর্ণ। তাই আনুষ্ঠানিকতার ম্যাচেও প্রাপ্তির ব্যাপার ছিল। কিন্তু এই অর্ধশক্তির ক্যারিবীয়দের বিপক্ষেও টিম ম্যানেজমেন্টের ধুকপুকানি রোগে আক্রান্ত হতে দেখে বুঝতে অসুবিধা হয় না সমস্যা অনেক গভীরে। অবশ্য প্রধান নির্বাচক মিনহাজুল আবেদীন আগেই জানিয়ে রেখেছেন যে, প্রাথমিক স্কোয়াড গঠনে ভবিষ্যৎ চিন্তাকে গুরুত্ব দেওয়া হলেও মাঠের ক্রিকেটে ম্যাচ বাই ম্যাচ পরিকল্পনা করবে বাংলাদেশ। প্রতিটি ম্যাচই ১০ পয়েন্টের। তাই নির্দিষ্ট ম্যাচে উইনিং কম্বিনেশনই শুধু গুরুত্ব পাবে। এখানে ভবিষ্যতের জন্য কাউকে তৈরি করার ঝুঁকি নেওয়া হবে না। তার মানে ২০২৩ বিশ্বকাপ ভাবনায় রেখে গড়া প্রাথমিক স্কোয়াডের কেউ খারাপ করলে ছিটকে পড়বেন। এভাবে চলতে থাকলে দেখা যাবে এই প্রাথমিক স্কোয়াডের অনেকেই নেই পরবর্তী বিশ্বকাপের চূড়ান্ত স্কোয়াড নির্বাচনী ভাবনায়। ‘কোয়ার্টার সেঞ্চুরি’ পূর্ণ করায় হাততালির দিনগুলোয় এমনটিই হতো, যা আজও বহাল আছে।

এখানেই বারবার পিছিয়ে পড়ে বাংলাদেশ। যে টিম ম্যানেজমেন্ট এই ওয়েস্ট ইন্ডিজ দলের বিপক্ষে পরীক্ষা-নিরীক্ষার সাহস করে না, তারা শক্তিধরদের বিপক্ষে নতুন ছক আঁকবেন—বিশ্বাস হয় না। হুম, সেসময় কিছু তরুণকে দেখার সম্ভাবনা আছে। সেটা অন্যদের ব্যর্থতার কারণে ঘটবে। আবার সেই তরুণ ব্যর্থ হলে নতুন কিংবা পুরনো কাউকে টেনে এনে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা হবে। আদ্যিকাল থেকে এমনটাই হয়ে আসছে। তাই হাসান মাহমুদকেও ২০২৩ বিশ্বকাপের স্কোয়াডে এখনই দেখতে পাই না। পরের বিশ্বকাপে শেষমেশ তাঁরাই যাবেন, যাঁরা আগের দুই সিরিজে ভালো করবেন। ব্যর্থতাকে যে ন্যূনতম ছাড় দেন না দেশীয় ক্রিকেট কর্তৃপক্ষ!

প্রতিটি বিশ্বকাপ স্কোয়াড গঠনেই এমন উদাহরণ আছে। সর্বশেষটির কথাই বলি। ইংল্যান্ডের কন্ডিশন বিবেচনায় তাসকিন আহমেদের ওপর বাজি ধরার সাহসই করেনি বাংলাদেশ। পরের বিশ্বকাপ উপমহাদেশীয় কন্ডিশনে ভেবে অফস্পিনার অলরাউন্ডার মেহেদী হাসানকে সদ্যঃসমাপ্ত সিরিজে একটা সুযোগ কি দেওয়া যেত না? তরুণদের জন্য চেনা কন্ডিশনে দুর্বল প্রতিপক্ষ অভিষেকের জন্য আদর্শ মঞ্চ। কিন্তু শরিফুল ইসলামের কথা কেউ সেভাবে ভেবেছেন বলেই মনে হয়েছে।/// যুব বিশ্বকাপজয়ী এ পেসারের অভিষেক হয়তো নিউজিল্যান্ডে হবে। প্রার্থনা করি সুযোগ পেলে কিউই মারদাঙ্গা ব্যাটসম্যানদের দেখে অভিষেকেই ঘাবড়ে না যান! কেউ কিন্তু তখন ঢাল হয়ে দাঁড়িয়ে বলবে না যে ঘরের মাঠে নিউজিল্যান্ড কতটা বিধ্বংসী দল। শরিফুলের কোনো দায় নেই।

নিউজিল্যান্ড প্রসঙ্গ যখন এলোই, তখন কাকতালীয় একটা ব্যাপার উল্লেখ না করলেই নয়। দুই বছর পর পর ছবির মতো সুন্দর দেশটিতে খেলতে গেছে বাংলাদেশ। কিন্তু প্রতিবারই দেখা গেছে পেস বোলিংয়ের নতুন সেট নিয়ে গেছে বাংলাদেশ! যদিও ওখানকার পেস বোলিং সহায়ক উইকেটে পেসারদের ভালো করারই কথা। তবু পেস বোলিং ইউনিটে নিয়ম করেই পরিবর্তন এসেছে। এসেছে কারণ মাঝের সময়টায় ভিন্ন কন্ডিশনে, বিশেষ করে ঘরের মাঠে টেস্ট ম্যাচে পেসারদের ব্যবহারই করা হয়েছে বলের ঔজ্জ্বল্য নষ্ট করার জন্য। তাই পরের নিউজিল্যান্ড সফর আসতে আসতে সেই পেসার চলে গেছেন বাতিলের খাতায়। কামরুল ইসলাম রাব্বির কথা মনে আছে? সর্বশেষ নিউজিল্যান্ড সফরে টেস্টে দারুণ বোলিং করেছিলেন এই পেসার। সেই কামরুলকে সর্বশেষ দেখা গেছে বঙ্গবন্ধু টি-টোয়েন্টি কাপে বোলিং করতে। জাতীয় দলের ত্রিসীমানায় নেই তিনি।

বাংলাদেশ ক্রিকেটের সমস্যাটা এখানেই। যাঁর একটি নৈপুণ্য দেখে উচ্ছ্বসিত হই, তাঁর একটি ব্যর্থতায় শূলে চড়িয়ে দিতে দ্বিধা করি না। আজকে ভবিষ্যতের চারা রোপণ করে পরদিনই মরিয়া ফলের জন্য। তাতে কিছু পয়েন্ট মেলে, কিন্তু ভবিষ্যতের দল তৈরি হয় না। ভবিষ্যতের দল কোনটাকে বলে, জানেন তো? ভবিষ্যতের দল কোনো পরিস্থিতিতে ঘাবড়ে যাবে না। মাঝেমধ্যে হারবে, তবে আত্মসমর্পণ করবে না।

সেদিন হয়তো ওয়েস্ট ইন্ডিজকে হারিয়ে র্যাংকিংয়ের দুইয়ে চড়ার আহ্লাদে আটখানা হবে না জনতা। ‘হাফ সেঞ্চুরি’ উদযাপনের দিন পেছনে ফেলা আসা দর্শক সেদিনের অপেক্ষায়।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা