kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১২ ফাল্গুন ১৪২৭। ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২১। ১২ রজব ১৪৪২

স্বপ্নদ্রষ্টার প্রতি

২১ জানুয়ারি, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



বাদল রায়ের মৃত্যুর পর মোস্তফা মামুন দারুণ একটা ট্রিবিউট লিখেছিলেন। সেই থেকে আমাদের বিভাগের একটা আলোচনা চলছে নিয়মিত। পরিকল্পনাও হয়েছে এই কীর্তিমানদের কীর্তির কথা তাঁদের দেহাবসানের পরে নয়, জীবদ্দশাতেই যেন স্মরণ করি। প্রকারান্তরে একালের পাঠকের কাছে তাঁর পরিচয় তুলে ধরা।

৩১৪ দিন পর গতকাল বাংলাদেশ দলের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ফেরার দিনে আরো বেশি করে মনে হলো, বর্তমানের চেয়ে অতীতচারী হওয়া খুবই জরুরি। হালের সাকিব আল হাসান কিংবা নাজমুল হাসানের কর্মকাণ্ডের খবর সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রতিদিনই আসছে। কিন্তু একজন রাইসউদ্দিন আহমেদের খবর কজন রাখেন? গতকাল বাংলাদেশ-ওয়েস্ট ইন্ডিজ ম্যাচের টসের পরই প্রেসবক্সে খবর আসে; রাইসউদ্দিন আহমেদ আর নেই। একজন রিপোর্টারকে শুনলাম টেলিফোনে খবর দিচ্ছেন অফিসে। ভঙ্গিতে বুঝলাম ও-প্রান্ত থেকে পাল্টা জানতে চাওয়া হয়েছে তিনি কে?

করোনাকালে অবশ্য এমন অভিজ্ঞতা অনেকেরই হয়েছে। বয়োবৃদ্ধ কোনো সাবেক খেলোয়াড় কিংবা সংগঠক প্রয়াত হওয়ার খবরের গুরুত্ব বাড়াতে পত্রিকার ডেস্ক বিভাগকে অনেক বুঝিয়ে বলতে হয়েছে। ওদের দোষ নেই। আমরাই তো আজকাল বাংলাদেশের টেস্ট র্যাংকিং ৯ নাকি ১০ নিয়ে উথালপাথাল করি। একবারও কি খবর করেছি সেই সব মানুষকে নিয়ে, যাঁরা মোমবাতির আলোয় সিকি-আধুলি গুনে খেলা চালিয়েছেন একদা? তাহলে এ প্রজন্ম জানবে কী করে? তবু রাইসউদ্দিন আহমেদের বেলায় এ অপরাধবোধ সামান্য কম। তাঁর জীবদ্দশাতেই তাঁকে নিয়ে পুরো এক পাতা সাক্ষাৎকার করেছিলেন আমার সাবেক সহকর্মী নোমান মোহাম্মদ।

তবু সময়ের পাতায় ধরে রাখা যায়নি। নাকি তিনিই থাকতে চাননি? রাইসউদ্দিনের প্রফাইল ঘাঁটাঘাঁটি করলে যে কারোরই বিশ্বাস হবে প্রশাসনিক যেকোনো ইস্যুতে তাঁর একটি মন্তব্য যেকোনো প্রতিবেদনের মুকুট হওয়ার যোগ্য। কিন্তু তিনি যে নেতিবাচক সব কিছু থেকে সযতনে নিজেকে দূরে সরিয়ে রাখতেন। অন্যের মনে চোট লাগতে পারে, এমন দূরতম সম্ভাবনার পথই মাড়াতেন না তিনি। অথচ সদালাপী এবং স্মিত হাসির ‘রাইস ভাই’য়ের এ দেশীয় ক্রিকেটে অবদান মহামূল্য। স্বীকৃতি পেয়েছেন জাতীয় পুরস্কার, ক্রিকেট বোর্ডের সেক্রেটারি, ভাইস প্রেসিডেন্ট এবং চরম বৈরী বোর্ডও তাঁকে নানা অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি করে ডেকেছে। তাঁর মৃত্যু সংবাদ ছড়িয়ে পড়ায় কয়েক মিনিটের মধ্যেই শোকবার্তা পাঠিয়েছে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি)। দেশীয় ক্রিকেট বিপণনে জড়িত কে স্পোর্টস শোক জানিয়েছে, সে প্রতিষ্ঠানের পরিচালক আশফাক আহমেদ। ‘লাইক ফাদার লাইক সান’, বাবার মতো আশফাকের ঠোঁটেও হাসি লেগে থাকে। অবশ্য গত একটা সপ্তাহ লাইফ সাপোর্টে রোগীর মৃত্যু অবধারিত জানলেও মৃত্যু তো শোক আঁধার ছড়িয়ে দেবেই। সদ্যঃপ্রয়াত সেই জন আবার আশফাকের বাবা। এখন তাঁকে সান্ত্বনা দেওয়ার জন্যও সম্ভবত অনুকূল সময় নয়।

যাক, জীবনের পৃষ্ঠা তো উল্টেই যায়। আমার মতো দূরের মানুষদের কাছে রাইসউদ্দিনের মৃত্যু যুগাবসানের যতিচিহ্ন। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে তাই হজম করে নিয়েছি সে শোক। কিন্তু অন্য একটি দৈনিকের সহকর্মীর মুখ থেকে একটা ঘটনা শুনে গতকালের আকাশের মতোই মেঘাচ্ছন্ন হয়ে আছে মন। ভীষণ সাংঘাতিক রাজনৈতিক কিংবা ক্ষমতার দ্বন্দ্ব না থাকলে বিসিবির সাবেক সভাপতি কিংবা সাধারণ সম্পাদক খেলা-টেলা দেখতে এলে অপমানিত হন না। রাইসউদ্দিনের সেসব সমস্যা ছিল না। কোনো বোর্ডেরই বোর্ডের অনাচার নিয়ে প্রশ্ন করেও তো উত্তর পাওয়া যেত না তাঁর কাছ থেকে। সেই নির্বিবাদী তিনি নাকি একটা কার্ড ছাড়াই ঢুকে পড়েছিলেন মিরপুর স্টেডিয়ামের প্রেসিডেন্ট বক্সে। লোক পাঠিয়ে তাঁকে চলে যেতে বলা হয় এবং বিনা বাক্যব্যয়ে তিনি স্থান ত্যাগ করেন।

কারো কাছে এ নিয়ে রাইসউদ্দিন আহমেদ অনুযোগও করেননি। বিমানের প্রধান প্রশাসনিক কর্মকর্তার প্রটোকল সেন্স থেকেই কি কার্ডহীন নিজেকে অপরাধী ভেবে ঘটনাটি চেপে গেছেন, নাকি লজ্জা-অভিমানে আপাদমস্তক জেন্টলম্যান রাইসউদ্দিন আড়াল নিয়েছিলেন সেদিন—আজ আর জানার উপায় নেই। তবে ঘটনা যা-ই হোক না কেন, এ ঘটনা তাঁর মৃত্যুর চেয়ে বেশি বিষাদের আমার কাছে। বিসিবির প্রেসিডেন্ট বক্সে কত অযাচিত মানুষই তো প্রবেশাধিকার পায়। সেখানে রাইসউদ্দিনকে অনুমোদিত কার্ড না থাকার বিষয়টি কে মনে করিয়ে দিতে গিয়েছিলেন, একবার শুধু লোকটিকে দেখার শখ। ওই সহকর্মীর কাছ থেকেই অবশ্য জানলাম যে, সেই লোকটির দোষ নেই; কলকাঠি নাড়া হয়েছিল পেছন থেকে। মানে, রাইসউদ্দিনকে প্রেসিডেন্ট বক্স ছাড়তে বাধ্য করার পেছনের মানুষটি ঠিকই তাঁর প্রফাইল জানতেন। অবজ্ঞার সৃষ্টি সজ্ঞানে। ঈশ্বর যেন সেই অবজ্ঞাকারীর মঙ্গল করেন!

আন্তর্জাতিক ম্যাচে ফেরার প্রথম দিন। তাই সকাল থেকেই প্রেসবক্স গমগম করছে। এর মধ্যেই রাইসউদ্দিনকে ঘিরে নানা আলোচনা। তাঁকে যে বয়োজ্যেষ্ঠ কর্মজীবনে দেখেছেন তাঁদের কাছে নব প্রজন্মের হাজারো জিজ্ঞাসা। এর মধ্যে একজন টিপ্পনী কাটলেন, ‘রাইস ভাইয়ের সময়কার মতো যদি বিসিবির অ্যাকাউন্টের অবস্থা হতো, দেখা যেত কতজন বোর্ড পরিচালক হওয়ার জন্য এত দৌড়াদৌড়ি করতেন!’ এটা ঢালাও মন্তব্য বলে উড়িয়ে দিচ্ছি। তবে এটা ঠিক যে রাইসউদ্দিনদের আমলে ধরে-বেঁধে এনে প্রশাসনিক দায়িত্ব দেওয়া হতো। তাঁকেও একরকম পাকড়াও করেই তো ক্রিকেট পরিচালনার দায়দায়িত্ব চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল। তবে খেলোয়াড়ি জীবন শেষ হলেও খেলাধুলার প্রতি অগাধ ভালোবাসায় হাসিমুখে দায়িত্ব পালন করেছেন। দেখেছেন সেই স্বপ্ন, যা সিডনিতে ৩৬ রানে অল আউট হওয়া ভারতের সিরিজ জয়ের স্বপ্নের চেয়ে কম অভাবিত নয়। ১৯৭৫ সালে বসে কোনো বাঙালি আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে বাংলাদেশকে দেখছেন শুনে ঘনিষ্ঠজনেরা পাগল বলেও ঠাট্টা করেছেন। রাইসউদ্দিনের জীবনের সেরা অর্জন সম্ভবত এটাই যে জীবদ্দশাতেই সেই স্বপ্ন পূরণ হতেও দেখে গেছেন।

সহকর্মী মাসুদ পারভেজ প্রেসবক্সে আমার পাশে বসেই লিখে চলেছে রাইসউদ্দিনের মৃত্যু সংবাদ। জানতে চাচ্ছে, কী হেডিং ভেবে রিপোর্টটা তৈরি করবে। বললাম—‘লিখ, নিভে গেলেন ক্রিকেটের আলোকবর্তিকা কিংবা চলে গেলেন ক্রিকেটের বাতিঘর।’ শেষমেশ কোনটা ওর পছন্দ হবে জানি না। ভারাক্রান্ত মনে নিজেই কি-বোর্ডে আঙুল চালিয়ে যাচ্ছি তাঁকে নিয়ে।

তাঁর সঙ্গে আমার ঘনিষ্ঠ কোনো স্মৃতি নেই। তবে ক্রীড়া সাংবাদিকদের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে তাঁকে দেখেছি। পরিচয় হলে সসম্মানে পথ ছেড়ে দিয়েছি। একজন স্বপ্নদ্রষ্টার তো সেটাই প্রাপ্য। ‘ও...সাইদুজ্জামান, কেমন আছ? সেদিন তোমার টক শো দেখলাম।’ মুখে প্রশ্রয়ের হাসি। কুণ্ঠিত আমি, ‘জ্বি, রাইস ভাই, ভালো আছি। আপনার শরীর কেমন?’ এরপর পালানোর পথ খুঁজেছি। এমন প্রফাইলের মানুষের সামনে আমি সব সময় জড়তায় আক্রান্ত হই এটা ভেবে যে, ভুলক্রমে তাঁর না অসম্মান হয়ে যায়।

কালে কালে দেখছি, পৃথিবী থেকে রাইসউদ্দিনের মতো মানুষেরা হারিয়ে যাচ্ছেন। সেই সব মানুষ, যাঁদের উপস্থিতি গভীর শ্রদ্ধাবশে সংকুচিত করে দেবে আপনাকে। রাইসউদ্দিনের মতো ক্রিকেট প্রশাসক তো এখনো আছেন। এখন বরং সংখ্যায় বেশি। তাঁরা সবাই অযোগ্য, বিষয়টি এমন নয়। কিন্তু সংকুচিত হই না। বরং কখনো-সখনো তো তাঁদের ওপর ঝাঁজালো প্রশ্নের ঝড় বয়ে যেতে দেখি। সময়ের চাপে প্রবল নেতিবাচকতা থেকেই কি এমন অশ্রদ্ধার জন্ম? কী জানি!

তবে এটুকু নিশ্চিত যে, দীর্ঘ ক্যারিয়ারে স্রেফ ভদ্রতার ক্যাটাগরিতে অন্য অনেকের চেয়ে বহুগুণ এগিয়ে রাইসউদ্দিন আহমেদ। এই যেমন, ক্রিকেট বোর্ডের ক্ষমতা থেকে সরে গেলে কাউকে আর মিরপুরে দেখা যায় না। তাঁরা যে একেবারে ইচ্ছা করে আসেন না, এমন নয়। পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে পরিস্থিতিই তাঁদের ক্রিকেট থেকে দূরে ঠেলে দেয়। তাঁদের আর স্বাগত জানায় না চলমান বোর্ড। তাঁদের অনেকে আবার বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে চলমান ক্রিকেট প্রশাসনের বিরুদ্ধাচরণ করেন। কিন্তু ব্যতিক্রম ছিলেন রাইসউদ্দিন। বর্তমান প্রশাসনের সমালোচনা থেকে দূরে থেকেছেন। আবার ক্রিকেটাঙ্গনে নিজেকে অনাহৃত ভেবেও দূরে সরে থাকেননি।

সম্ভবত মনে মনে নিজস্ব একটা ক্রিকেট-দুনিয়া সৃষ্টি করে জাগতিক ক্রিকেট উত্থান-পতন থেকে নিজেকে দূরে রেখেছিলেন রাইসউদ্দিন আহমেদ। সেই দুনিয়ায় নিজের মতো করেই ক্রিকেটকে লালন-পালন করে গেছেন প্রগাঢ় ভালোবাসায়। এ ভালোবাসায় কোনো খাদ নেই। ক্রিকেট থেকে তিনি নিজে কোনো অর্জন খোঁজেননি। শুধু ক্রিকেটের অর্জনই দেখে যেতে চেয়েছেন সবার প্রিয় ‘রাইস ভাই’।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা