kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ৭ মাঘ ১৪২৭। ২১ জানুয়ারি ২০২১। ৭ জমাদিউস সানি ১৪৪২

ডাউন দ্য উইকেট

আর কোনো ম্যারাডোনা?

সাইদুজ্জামান

৩ ডিসেম্বর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



আর কোনো ম্যারাডোনা?

আমার বাবার পর্যবেক্ষণশক্তি ছিল অসাধারণ, কিন্তু মিতবাক। তাই আমার তারুণ্যের ছটফটানি দেখে অভিব্যক্তিতেই বুঝিয়ে দিতেন—প্রজন্মটা উচ্ছন্নে গেছে। বুঝেও গা করতাম না। ওল্ড ম্যানকে কে পাত্তা দেয়!

এখন আমি নিজেই বাবা। সন্তানদের দিকে তাকিয়ে দেখে আমার নিজের বাবার মতোই ভাবি। নিশ্চিত বুঝি সন্তানরাও আমাকে ওল্ড ম্যান তকমা দিয়ে নিজের প্রজন্মের পতাকা ওড়াচ্ছে। এই পরিবর্তন ভালো না মন্দ সে বিতর্কে গিয়ে লাভ নেই। চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাবে না যে! বরং ভোটাভুটি হলে বাবাদের হার নিশ্চিত। নইলে বার্সেলোনা বনাম ওসাসুনা ম্যাচ চলাকালে ভোটাভুটিতে মেসির কাছে ৮১-১৯ ভোটে হারবেন কেন ম্যারাডোনা! যেখানে সদ্যঃপ্রয়াত কিংবদন্তির এপিটাফে ‘ফুটবল ঈশ্বর’ চিরকালের জন্য লেখা হয়ে গেছে। এপিটাফের লেখা নিয়ে জীবন্ত জনতার সঙ্গে তর্ক করা যায় না। ভোটের ফলটা মেনে নিইনি, তবে সয়ে নিয়েছি। ভোটে হেরেছি, কিন্তু হার স্বীকারও করিনি। আমার কাছে ম্যারাডোনা একজনই।

খেলাধুলা মানে নিখাদ বিনোদন। ম্যারাডোনা মাপের এন্টারটেইনারকে আমি ফুটবল খেলতে দেখিনি। যদিও জন্মকাল থেকে ব্রাজিলের সমর্থক আমার বুকে ১৯৯০ বিশ্বকাপের দ্বিতীয় রাউন্ডে ম্যারাডোনার ডিফেন্সচেরা সেই থ্রু পাসটি গেঁথে আছে। সেটি ধরে ক্যানিজিয়া বিশ্বকাপ থেকেই বের করে দিয়েছিলেন ব্রাজিলকে। সে কাঁটা ফুলের, ম্যারাডোনা ফুলের! মনের সে কাঁটাই আমার তরফ থেকে ডিয়েগো আরমান্ডো ম্যারাডোনার প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি।

জন্মের পর থেকেই তীব্র বঞ্চনা, উগ্র বর্ণবাদের শিকার হয়েছেন ম্যারাডোনা। আবার সেই তিনিই প্রতিপক্ষের মাঠে হাততালি কুড়িয়েছেন। আবার ঘৃণার স্রোত তাঁকে ভাসিয়ে নিয়ে গেছে অন্ধকার জগতে। তবু মানুষ তাঁকে ভালোবেসে গেছে। মেসি-রোনালদোদের জমানায় কিছুটা বিস্মৃত হলেও মৃত্যুতে জানান দিয়ে গেলেন— ফুটবলের ভগবান একজনই।

ডিয়েগো ম্যারাডোনার মৃত্যুর পরের কয়েক দিন ধরে এ নিয়েই পড়ে আছি। কী দুর্দান্ত ফুটবলার, সমান আকর্ষক তাঁর দৈনন্দিন জীবন। ৫ ফুট ৫ ইঞ্চি উচ্চতা নিয়ে কেমন কাঁপিয়ে দিয়ে গেলেন গোটা বিশ্বকে। তাও ১৯৯৪ সালে শেষ আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলার এতগুলো বছর পর! সেই থেকে ভেবেই চলেছি ক্রীড়াজগতে ম্যারাডোনার মতো প্রভাব আর কে রেখে গেছেন কিংবা যেতে পারেন?

স্মৃতি হাতড়াচ্ছি, ইউটিউব-গুগল ঘাঁটাঘাঁটি করছি আসলে অনেক দিন ধরেই। ২০১৬ রিও অলিম্পিক উপলক্ষে যখন স্বপ্নের দেশ ব্রাজিলে গেলাম, খোঁজাখুঁজির শুরুটা তখনই। কৈশোরে পাঠ্য বইয়ে ‘ফুটবলের রাজা পেলে’ পড়ে মনে স্থির বিশ্বাস হয়েছিল যে তাঁর মতো ফুটবলার আর আসবে না। কিন্তু ব্রাজিলে প্রায় চার সপ্তাহ থেকে জানলাম, তিনটি বিশ্বকাপ জেতা পেলে তাদের হাতে গড়া ফুটবল মনুমেন্ট মাত্র, ফুটবল-রোমান্স আসলে গ্যারিঞ্চার সঙ্গে। আরো সোজাসাপ্টা বললে; পেলে নন গ্যারিঞ্চা ব্রাজিলিয়ানদের কাছে ম্যারাডোনা কিংবা তার চেয়েও বড় কিছু। কারণ মাঠে দর্শক যেতেন বিনোদনের খোঁজে। গ্যারিঞ্চা নিজেও ফুটবলটা খেলেছেন স্রেফ বিনোদন ভেবেই। খেলোয়াড়ি জীবনে নিজে দুহাতে ফুটবল থেকে বিনোদন লুটেছেন এবং অভাবিত ড্রিবল দিয়ে নিজ দলের তো বটেই, প্রতিপক্ষ দলের সমর্থকদেরও নিয়মিত আমোদিত করেছেন। গ্যারিঞ্চা আর ম্যারাডোনার আরেকটি অন্তমিল আছে—নানা অনিয়ম অকালেই কেড়ে নিয়েছে তাঁদের। আর অমিল হলো; শ্রেষ্ঠত্বের মুকুটটা মৃত্যুর আগেও ম্যারাডোনারই ছিল। আর মাঠ ছাড়ার পর অনিয়মে ডুবে থাকা গ্যারিঞ্চা আবার ফুটবলপ্রেমের প্রতীক হয়ে ওঠেন মৃত্যুর পরে।

ক্রীড়াঙ্গনে এমন আর কয়টা সর্বগ্রাসী চরিত্র আছে, যাঁরা নিজ নিজ খেলায় বিনোদনের প্রতিভূ হয়ে চিরভাস্বর হয়ে আছেন কিংবা থাকবেন? ফুটবল ব্রাজিলের ‘ধর্ম’ হলেও প্রয়াত ফর্মুলা ওয়ান রেসার আয়ের্টন সেনার বীরগাথায় এখনো ধুলো জমেনি। ফুটবলের ছকেই পরিবর্তন ঘটিয়ে ডাচ কিংবদন্তি ইয়োহান ক্রুয়েফের নাম অমোচনীয় কালিতেই ইতিহাসে লেখা থাকবে। মোহাম্মদ আলী, জেসি ওয়েন্স, মাইকেল জর্ডান, উসাইন বোল্ট, মাইকেল ফেলপস—এমন কিছু নামও প্রাতঃস্মরণীয়।

ক্রিকেটমুখী বাংলাদেশি ক্রীড়ামোদীদের কাছে স্যার ডন ব্র্যাডম্যান, জোয়েল গার্নারের নেতৃত্বে বিখ্যাত ক্যারিবীয় পেস কোয়ার্টেট, পাকিস্তানের টু ডাব্লিউস, ভিভ রিচার্ডস, শচীন টেন্ডুলকার, ব্রায়ান লারা, স্টিভ ওয়াহ, শেন ওয়ার্ন, কোর্টনি ওয়ালশ থেকে শুরু করে একালের বিরাট কোহলি, স্টিভেন স্মিথ—এমন অগুনতি মুখও ভেসে উঠবে। কিন্তু এঁদের মাঝে ম্যারাডোনার ফ্রেমে কাকে ফেলা যায়?

তার আগে আসলে জানা দরকার ‘ম্যারাডোনা কী’? একটা নাম অবশ্যই, যিনি ফুটবলে সেরাদের অন্যতম। আবারও বলে নিই, আমার কাছে তিনিই সেরা। মাত্র ২৫ বছর বয়সে তাঁর কাঁধে বিশ্বজয়ের স্বপ্ন চাপিয়ে দিয়েছিল আর্জেন্টিনা। সে স্বপ্ন তিনি পূরণও করেছেন। ঋণ জর্জরিত নাপোলিকে বলা হতো ইতালির ভাগাড়। রেলিগেশনে ধুঁকতে থাকা সেই ক্লাবটিকেই ইতালি এবং ইউরোপের মুকুট জিতিয়েছিলেন। স্পোর্টসের একমাত্র মেগাস্টার তিনি, যিনি বৈশ্বিক রাজনীতি নিয়েও প্রকাশ্যে মন্তব্য করেছেন, সেসব যতই তথাকথিত এস্টাবলিশমেন্টের বিপক্ষে যাক না কেন। মাঠে এবং মাঠের বাইরে অদম্য ম্যারাডোনার দুঃসাহসিক ছাপ আর কারো মাঝে সেভাবে দেখিনি।

অবশ্য এখনকার এস্টাবলিশমেন্ট ভীষণ কুশলী। উইঘুরের মুসলিমদের প্রতি সমবেদনা জানিয়ে মেসুত ওয়েজিল তো আর্সেনালের একাদশেই জায়গা পাচ্ছেন না, ব্যক্তিগত এন্ডোর্সমেন্টের বাজারেও বেকার এ জার্মান! তবে আমার কেন যেন মনে হয় এমন পরিস্থিতিতেও যুদ্ধ চালিয়ে যেতেন ম্যারাডোনা। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের দাপুটে সময়েই তো তিনি ফিদেল কাস্ত্রোর সঙ্গে বন্ধুত্ব গড়েছেন। তবু ওয়েজিলকে ধন্যবাদ, মিলিয়ন ডলারের ক্যারিয়ার ফিরে পেতে উইঘুর নিয়ে উল্টো বিবৃতি দেননি। ফুটবল দক্ষতায় ম্যারাডোনার ধারেকাছেও নন ওয়েজিল, তবে দ্রোহের আগুনটা নিভিয়ে ফেলেননি।

বর্তমান বাস্তবতায় ওয়েজিল ব্যতিক্রম। বাকি প্রায় সবাই সময়ের সঙ্গে আপস করে নিয়েছেন। ক্রিকেটে তো পরিস্থিতি সবচেয়ে ভয়ংকর। স্পর্শকাতর কোনো বিষয়ে ক্রিকেটারদের মন্তব্য পাওয়া যায় না। আবার একেবারে যে করেন না, সেটিও নয়। তবে পরিস্থিতি বুঝে, লাভক্ষতির অঙ্কটা করে প্রতিক্রিয়া দেন। এখন তাঁদের শুধু এস্টাবলিশমেন্টকে মান্য করলেই চলে না, ফ্যানবেজকেও চাঙ্গা রাখতে হয়। সোশ্যাল মিডিয়ায় যত ফলোয়ার, এন্ডোর্সমেন্ট মার্কেটেও ততই কদর ক্রিকেটারের। এই যে অক্টোবরে কলকাতার একটি পূজামণ্ডপে উপস্থিতির প্রতিক্রিয়া দেখে বিচলিত হয়ে সাকিব আল হাসান ফেসবুক লাইভে এসে যে গোলমেলে ব্যাখা দিয়েছেন, তার কারণও ফ্যানবেজকে শান্ত রাখা।

ম্যারাডোনার মৃত্যুর খবর স্তব্ধ করে দিয়েছিল। আর সাকিবের ভিডিও ব্যাখ্যায় যারপরনাই অবাক হয়েছিলাম। নিজের সমালোচনায় বিচলিত হতে তো তাঁকে কখনোই দেখা যায়নি। অতঃপর আশা ছেড়ে দিয়েছি। বিচ্যুত বাণিজ্যিক বাজারে সেরকম কোনো চরিত্র আর দাঁড়াবে বলে মনে হয় না।

আবার একেবারে যে কেউ নেই, তা-ও নয়। যেমন মাইকেল হোল্ডিং। স্বর্ণযুগে ক্যারিবীয় পেস কোয়ার্টেটের মাঝে উইকেট নিয়ে কাড়াকাড়ি হতো। সেসময়ও ৬০ টেস্টে ২৩.৬৮ গড়ে ২৪৯ উইকেট নেওয়া হোল্ডিং ক্রিকেটের হল অব ফেমে নাম লিখিয়েছেন। তবে সিস্টেমের স্রোতে গা ভাসাননি। বরং প্রাতিষ্ঠানিক ভুল ধরিয়ে দেন বিধায় সব জায়গায় ধারাভাষ্য দেওয়ার সুযোগ পান না তিনি। কোনো কোনো আসর নিজে থেকেই এড়িয়ে যান হোল্ডিং। খেলোয়াড়ি জীবনের মতো কমেন্ট্রি বক্সেও তিনি সেরাদের কাতারে। সঙ্গে সত্য বলার সৎ সাহস মাইকেল হোল্ডিংকে অনেকের বিরাজভাজনও করেছে। কিন্তু তাঁকে অশ্রদ্ধা করার দুঃসাহসও কারোরই নেই। আকর্ষণীয় রান আপের মতো ক্রিকেটার মাইকেল হোল্ডিং তাই বেঁচে আছেন শুদ্ধতার প্রতীক হয়ে, যিনি এস্টাবলিশমেন্টের ভুলভ্রান্তি পাশ কাটিয়ে যান না।

তবু ম্যারাডোনার সঙ্গে উচ্চতায় তাঁর মেলে না। যদিও শারীরিক উচ্চতায় আর্জেন্টাইনের চেয়ে প্রায় এক ফুট লম্বা হোল্ডিং। তবু কোনো উন্মাদও ম্যারাডোনার ছায়ায় হোল্ডিংকে মাপবেন না। অতিশয় ভদ্রলোক হোল্ডিং নিজে তো ননই।

নাহ, ম্যারাডোনা একজনই। যদি তাঁর তুল্য কেউ থাকেন, তবে জানাবেন প্লিজ। তবে আগেই বলে নিচ্ছি, মেসি ৮১ ম্যারাডোনা ১৯—এই ভোট আমি মানি না, মানব না!

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা