kalerkantho

সোমবার। ৪ মাঘ ১৪২৭। ১৮ জানুয়ারি ২০২১। ৪ জমাদিউস সানি ১৪৪২

তিনি কিংবদন্তি গণমানুষেরও

ভবিষ্যতে হয়তো ম্যারাডোনার এর চেয়েও যথার্থ ছবি আঁকবেন কেউ। তিনি তো আর শুধুই ফুটবল কিংবদন্তি নন। কথাবার্তায়-আচরণে কিছুটা অসংলগ্ন। কিন্তু কি আশ্চর্য, প্রায়ই মনে হয় তিনি তো আমাদের কথাই বলছেন, যা কোনো সেলিব্রিটি সাহস করে বলেন না!

২৭ নভেম্বর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



তিনি কিংবদন্তি গণমানুষেরও

ক্রীড়া প্রতিবেদক : ২০ অক্টোবর ১৯৭৬। আর্জেন্টাইন ফুটবল লিগে সবচেয়ে কম বয়সে অভিষেক জয়েছে এক কিশোরের। ১০ দিন পর যার ষোলো হবে, সে তো কিশোরই। সেদিনের ৩০ বছর পর হুয়ান ডোমিঙ্গো কারবেরা স্মৃতিচারণা করেছিলেন, ‘ডান পাশ দিয়ে ওর কাছ থেকে বল কেড়ে নিতে গিয়েছিলাম। কিন্তু আমাকে নাটমেগ করে বল নিয়ে চলে গেল ছেলেটা। ঘুরে তাকিয়ে দেখি বহুদূর চলে গেছে!’ তিনি সদ্যঃপ্রয়াত ডিয়েগো ম্যারাডোনা, নিজের প্রথম ম্যাচেই প্রতিপক্ষের দুপায়ের ফাঁক গলে নাটমেগের জাদু দেখিয়েছিলেন।

একালে নাটমেগের রাজা বলা হয় লিওনেল মেসিকে। ফুটবলের সর্বকালের সেরাদের বিতর্কে অবধারিতভাবে আসে তাঁর নাম। বিশ্বকাপ ট্রফি আর গোলসংখ্যায় পেলে এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে। এ দুজনের জীবনই কী সুন্দর গোছানো। কিন্তু বিখ্যাত ফোরফোরটু ম্যাগাজিনের অ্যান্ড্রু মারে ঠিকই লিখে দেন, ‘তবু মুটিয়ে যাওয়া, একদা কোকেনসেবী লোকটির অবস্থান সবার ওপরে। কেন? যদি আপনি তাঁকে ফুটবল পায়ে মাঠে দেখে থাকেন, তবে অবশ্যই একমত হবেন।’

ফুটবল, ক্রিকেট কি কাবাডি—শেষমেশ স্কিলটাই জেতায়। কিন্তু ‘লার্জার দ্যান লাইফ’, জীবনের চেয়েও বড় সেই ক্যানভাসে ম্যারাডোনা একজনই। তাঁর বিশ্বকাপজয়ী দলের সদস্য হোর্হে ভালদানো অকাতরে বলে যান, ‘ম্যাচের আগের রাতে নিশ্চিন্তে ঘুমাতে যেতাম। জানতাম যে হারলে বেশির ভাগ দোষ ম্যারাডোনা নিজের ঘাড়ে নেবে।’ সৈনিক নির্ভার ঘুমিয়ে ময়দানে সেনাপতির জন্য জীবন দিয়ে লড়েছে এবং জিতেছেও। ১৯৮৬ বিশ্বকাপ জয় কিংবা ১৯৯০ ফাইনাল পর্যন্ত ওঠার লড়াইয়ে আর্জেন্টিনার অবিসংবাদিত নেতা তো একজনই ছিলেন—ডিয়েগো আরমান্ডো ম্যারাডোনা।

এই ম্যারাডোনারও নেতা ছিলেন। সেসব নেতা কিন্তু রাজা-মহারাজা নয়। ম্যারাডোনার নেতা ছিলেন গণমানুষের নেতারা। ফিদেল কাস্ত্রো সারা বিশ্বের সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে একা লড়াই করে গেছেন। ম্যারাডোনা বাঁ পাশে কাস্ত্রোর ট্যাটু, ডান হাতে তাঁর নিজের দেশেরই চে গুয়েভারার প্রতিকৃতি। ডাব্লিউ জি বুশ যুদ্ধের দামামা বাজিয়ে রাখতেন। রাজপথে সেসবের তীব্র প্রতিবাদ করেছেন ম্যারাডোনা। ইরানের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক অবরোধের বিরুদ্ধাচরণ করেছেন সব সময়। পোপ জন পল টু-য়ের আমন্ত্রণে ভ্যাটিকান ঘুরে এসে মন্তব্য করেছেন, ‘ওহে, দরিদ্রের সেবা করতে চাইলে আগে সোনায় মোড়ানো সিলিংটা বিক্রি করো!’ রাজনৈতিক মতাদর্শে বামপন্থী ছিলেন ম্যারাডোনা। তাই তাঁর প্রতিটি সাম্রাজ্যবাদবিরোধী বক্তৃতা-আচরণ সমর্থন বাড়িয়েছে তৃতীয় বিশ্বের।

এগুলো নিছকই ফাঁকা বুলি ছিল না ম্যারাডোনার। ১৯৭৬-১৯৮১ আর্জেন্টিনোস জুনিয়র্সে ১৬৭ ম্যাচে ১১৫ গোল করে হৈচৈ ফেলে দেন ম্যারাডোনা। স্বভাবতই আর্জেন্টাইন লিগের চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী বোকা জুনিয়র্স ও রিভার প্লেট ওত পেতে ছিল তাঁকে পেতে। রিভার প্লেট তাদের ক্লাবের সবচেয়ে বেশি বেতন দিতে তৈরি ছিল ম্যারাডোনাকে। কিন্তু বস্তিতে বেড়ে ওঠা ম্যারাডোনার স্বপ্নের ক্লাব যে বোকা জুনিয়র্স। চার মিলিয়ন ডলারে যোগও দেন স্বপ্নের ক্লাবে। বোকা প্রবাসী ইতালিয়ান শ্রমিকদের রক্ত ঘাম করা টাকায় তৈরি ক্লাব। আর রিভার প্লেট বনেদিদের। ম্যারাডোনা তাই টাকার সঙ্গে আপস করেননি, খেলেছেন প্রলেতারিয়েতদের বোকা জুনিয়র্সেই।

সবকিছু মিলিয়েই ডিয়েগো ম্যারাডোনা নিছকই ফুটবল কিংবদন্তি কিংবা সর্বকালের সেরা ফুটবলার নন। তিনি আদতে একটা প্যাকেজ। একজন গণমানুষেরও মুখপাত্র। বরাবর মার্কিনবিরোধী ম্যারাডোনাকে নিয়ে সে দেশেরই হিউস্টন ক্রনিকল নিবদ্ধ লিখেছিল, ‘মাইকেল জর্ডানের অ্যাথলেটিসিজম, বেব রুথের (বেসবল কিংবদন্তি) শক্তি আর মাইক টাইসনের মানসিক দুর্বলতাকে মিলিয়ে ৫ ফুট ৫ ইঞ্চির একজন মানুষকে কল্পনায় আঁকলেই আপনি ম্যারাডোনাকে দেখতে পাবেন।’

ভবিষ্যতে হয়তো ম্যারাডোনার এর চেয়েও যথার্থ ছবি আঁকবেন কেউ। তিনি তো আর শুধুই ফুটবল কিংবদন্তি নন। কথাবার্তায়-আচরণে কিছুটা অসংলগ্ন। কিন্তু কি আশ্চর্য, প্রায়ই মনে হয় তিনি তো আমাদের কথাই বলছেন, যা কোনো সেলিব্রিটি সাহস করে বলেন না!

মন্তব্য