kalerkantho

শনিবার । ৯ মাঘ ১৪২৭। ২৩ জানুয়ারি ২০২১। ৯ জমাদিউস সানি ১৪৪২

জাদুকরের বিদায়ের বিষণ্নতায়

ফুটবল-সুরভিতে টান পড়ল

সনৎ বাবলা   

২৬ নভেম্বর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



ফুটবল-সুরভিতে টান পড়ল

ডিয়েগো ম্যারাডোনার মহাপ্রস্থানে ফুটবলবিশ্বে ঘটে গেল মহাপ্রলয়। কোথাও চাপা কান্না, কোথাও বা ফুটবলের মহামানবের জন্য আহাজারি। তবে আমার জন্য বিশ্বকাপ ফুটবলের অর্ধেক সুরভিই যেন ফুরিয়ে গেল!  

ফুটবল না থাকলে ডিয়েগো ম্যারাডোনা নামের কোনো চরিত্রের জন্ম হতো না। ম্যারাডোনার জন্ম না হলে ফুটবলের এত রূপ-রস বিশ্বময় ছড়াত না। ম্যারাডোনায় সুরভিত ফুটবল দেখেছি ২০১৪ ব্রাজিল বিশ্বকাপেও! তিনি খেলায় নেই, মাঠের জাদুকরীতে নেই, কিন্তু ভীষণভাবে ছিলেন খেলার আলোচনায়। মাঝেমধ্যে ভ্রম লেগে যেত, পেলের দেশে আর্জেন্টাইন ফুটবল রাজপুত্রের রাজত্ব দেখে। তখন একটা জরিপ করতে খুব ইচ্ছে হয়েছিল, ব্রাজিলে ম্যারাডোনার ভক্তের সংখ্যা কত! 

সেই বিশ্বকাপে ব্রাজিলের রিওতে তিনি একটি আস্তানা গেড়েছিলেন। গোপন আস্তানা। একটি টিভি চ্যানেলের সঙ্গে চুক্তির সুবাদে তাঁর সেখানে অবস্থান। গোপন কেন? পেলে তো নিজেকে অমন গোপন করে রাখেননি। ফুটবলে আলোকবর্ষ পিছিয়ে থাকা এই বঙ্গের সাংবাদিকরা গিয়েও পেলে দর্শন করেছিলেন। এমনকি দু-চার কথা বলারও সুযোগ হয়েছিল। তাহলে ম্যারাডোনা অমন গোপনে থাকবেন কেন? ও’ গ্লোবো অনলাইনের সাংবাদিক বন্ধু লিওনার্দো গোমেজ চমৎকার এক ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন, ‘ম্যারাডোনা হলেন আধুনিক ফুটবলের মহাতারকা। তাঁর কথার গুরুত্ব অনেক বেশি। আর সব সময় প্রতিবাদী এক চরিত্র, যেটা বোঝেন সেটা ভণিতা না করে অকপটে বলে ফেলেন। মেসির সমস্যা থাকলেও সেটা একমাত্র তিনিই বলতে পারবেন। তাই গণমানুষের কাছে তাঁর আবেদন অনেক বেশি, তারা সব সময় এই তারকার কথা শুনতে চায়।’ আসলে তাই, তাঁর ভুবনমোহিনী ফুটবল ও বর্ণাঢ্য চরিত্রের ভেতর যেন মানুষ নিজেকে খুঁজে পায়। তাই তাঁর সেই গোপন জায়গা আর গোপন রাখতে পারেননি। ভক্তরা রিওতে সেই আস্তানা আবিষ্কার করে। প্রায় প্রতিদিনই হাজার হাজার ভক্ত জড়ো হতো সেই বাড়ির সামনে। একসময় আর্জেন্টাইন ফুটবল ঈশ্বরও ব্যালকনিতে এসে হাত নাড়াতেন ভক্তদের উদ্দেশে। 

সেবারই সামনাসামনি ফুটবল ঈশ্বর দর্শন হয়েছিল। আর্জেন্টিনার ম্যাচ থাকলেই তিনি মাঠে যেতেন একদল বডিগার্ড নিয়ে। সে এক অপূর্ব দৃশ্য। চারদিকে বিশালদেহী রক্ষী বাহিনী, স্থূল শরীর নিয়ে ছোট মানুষটি হেঁটে যাচ্ছেন রাজার ভঙ্গিতে। দুই পাশে সাংবাদিকের ভিড়—তাঁর মুখ নিঃসৃত ফুটবল বাণী যদি শোনা যায়। নিজের ইচ্ছা হলে বলবেন, নইলে নয়। বেশি ঘাঁটালেও বিপদ, মেজাজ যে কখন সপ্তমে চড়ে যায়, বলা মুশকিল। স্টেডিয়ামের সাত-আট তলা থেকে হুড়মুড় করে দু-দুবার নেমে তাঁর যাত্রাপথে দাঁড়িয়েও লাভ হয়নি। টুঁ শব্দটিও করেননি। তবে সামনে থেকে ঈশ্বর দর্শনও পুণ্যের কাজ, সঙ্গে হাঁটার সেই রাজকীয় ভঙ্গি এখনো মনে গেঁথে আছে। এটা যেন শুধু তাঁকেই মানায়। আশপাশে কত ফুটবল মহারথী বিভিন্ন মিডিয়ায় বয়ান দিয়ে বেড়াচ্ছিলেন, কিন্তু যেই রাজপুত্রের আবির্ভাব হয়েছে অমনি সবাই ছুটে যাচ্ছে তাঁর দিকে। আসলে তাঁর সঙ্গে কাউকে মানায় না। অনেক আকর্ষণীয় উপাদানে ঠাসা ম্যারাডোনা চরিত্রটি। ফুটবল মাঠে যেমন সুরভি ছড়িয়েছেন, তেমনই মাঠের বাইরেও সব সময় সরব ছিলেন ফুটবল নিয়ে। কখনো পেলে কখনো বা সেফ ব্ল্যাটারকে তুলাধোনা করেছেন। আবার মেসিকে পুত্রস্নেহে আগলে আশীর্বাদ করেছেন।

দুর্ভাগ্য যে মেসির হাতে একটা বিশ্বকাপ তাঁর দেখা হয়নি। নিজে কোচ হয়ে মেসিডোনার জাদুতে আরেকবার আর্জেন্টিনার ফুটবল রাঙাতে চেয়েও পারেননি। তাই আর্জেন্টাইনদের কাছে ফুটবল ঈশ্বরের জায়গাটা শুধু ডিয়েগোর জন্যই। তাঁর পায়ে রাঙানো ১৯৮৬ বিশ্বকাপের অপরূপ ফুটবল স্মৃতিগুলোই তাদের কাছে মহামূল্য। এই বঙ্গেও কি তাঁর আবেদন কিছু কম! সেই বিশ্বকাপের সুবাদে এই দেশের লাখ-কোটি কিশোরের হৃদয়ে প্রোথিত হয়ে যায় ডিয়েগো ম্যারাডোনার নামটি। দূর দেশের মানুষ হলেও তাঁর সঙ্গে যেন আত্মার সম্পর্ক, তাঁর ভালো থাকা না-থাকায় হৃদয় ভারাক্রান্ত হয়। মহানায়কের বিদায়ে সেসব হৃদয় ভেঙে খান খান হয়ে গেল।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা