kalerkantho

রবিবার । ১৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৭। ২৯ নভেম্বর ২০২০। ১৩ রবিউস সানি ১৪৪২

তাসকিনের পরের স্টেশন ১৫০

একদিন ঠিকই স্পিড গানে ১৫০ তোলার প্রতিজ্ঞাও আছে তাসকিনের, ‘আমার স্ট্রেন্থ এবং স্কিল চার ভাগের এক-দেড় ভাগ হয়েছে। আরো আড়াই ভাগ উন্নতি করতে হবে। তা করতে পারলে আমার স্বপ্নও পূরণ হবে আর আমি বিশ্বমানের ফাস্ট বোলারও হতে পারব।’

মাসুদ পারভেজ   

২৮ অক্টোবর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



তাসকিনের পরের স্টেশন ১৫০

জাতীয় দল যখন গত ফেব্রুয়ারিতে পাকিস্তানে টেস্ট খেলতে যাওয়ার অপেক্ষায়, তখন তিনি স্রষ্টার কাছে নিজেকে সঁপে দিতে পবিত্র মক্কায়। সপরিবারে ওমরাহ করতে গিয়ে তাসকিন আহমেদের মনোজগতে এসে যাওয়া বিশাল পরিবর্তনটি অবশ্য টের পেয়েছেন খুব কম লোকই। এঁদের অন্যতম স্থানীয় পেস বোলিং কোচ মাহবুব আলী। ওমরাহ থেকেই একদিন তাসকিনের ফোনে তিনি শুনতে পান এ রকম আকুতি, ‘স্যার, এভাবে আর ক্রিকেট খেলতে চাই না। খেললে খুব সিরিয়াসলিই খেলতে চাই।’

ওমরাহ থেকে ফিরেই তাই নিজেকে নিংড়ে দেওয়ার শুরু। কিছুদিনের মধ্যেই করোনাভাইরাসের থাবায় সব কিছু বন্ধ হয়ে গেলেও নিজেকে উজাড় করা সে কষ্ট থামেনি। বরং নির্দিষ্ট গণ্ডির ভেতরেই নিজের সীমাকে অতিক্রমের চেষ্টা চালিয়ে গেছেন নিরন্তর, ‘এখন আসলে কথার চেয়ে কাজে বিশ্বাসী হয়েছি বেশি। সরাসরি অ্যাকশনে চলে যাই।’ এরই অংশ হিসেবে রাখলেন ব্যক্তিগত ট্রেনার, যিনি একজন বডিবিল্ডারও, ‘দেবুদার (দেবাশীষ ঘোষ) কাছে আমি কৃতজ্ঞ। ধানমণ্ডিতে উনার মাসল ম্যানিয়া নামের একটি জিম আছে। লকডাউনের মধ্যেও উনি আমাকে একা একা নিয়ে জিম করিয়েছেন। রোজার মাসে তারাবির পর যেতাম। ১২টার দিকে ফিরতাম।’

তাতে ফিরতে শুরু করে ফিটনেসও। বালুতে দৌড়ানোসহ কষ্টকর নানা ড্রিলের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নিজের পেজেও আপলোড করেছেন বলে অনেকেরই তা জানা। তবু অজানা অনেক কিছুও এত দিন নিজের ভেতরেই রেখেছিলেন, ‘আরেকটি কাজও করেছি। যেটি আমি সোশ্যাল মিডিয়ায় দিইনি বা ঘনিষ্ঠদের ছাড়া কাউকেই বলিনি। মাইন্ড ট্রেনিং করেছি আমি। সে জন্য মাইন্ড ট্রেনারও রেখেছিলাম। সাবিথ রায়হান আমার মাইন্ড টিচার।’ তাঁরই দেখানো পথে নিয়ম করে নিয়মিত বিরতিতে আধঘণ্টা-এক ঘণ্টার ধ্যানেও বসেছেন, ক্ষণে ক্ষণে বিচ্ছিন্ন হতে চাওয়া মনকে করেছেন কেন্দ্রীভূতও।

শরীর আর মনকে বশে রাখার পাশাপাশি বোলিংটা ঠিক করার জন্য নিয়মিত শরণাপন্ন হওয়া দুজনের কাছেও অসীম কৃতজ্ঞতা তাসকিনের, ‘স্কিলে উন্নতির জন্য সুজন স্যার (খালেদ মাহমুদ) ও জাকি স্যার (মাহবুব আলী) খুব সহায়তা করেছেন আমাকে। ফোনে বা ভিডিও কলে ওনাদের পরামর্শ নিতাম।’ সব কিছুর যোগফলে সদ্যঃসমাপ্ত বিসিবি প্রেসিডেন্ট কাপে তাঁর বোলিং তাসকিনকে এনে দিয়েছে ‘কামব্যাক ফ্লেয়ার অব দ্য টুর্নামেন্ট’-এর পুরস্কারও। ২৬.২৮ গড়ে ৭ উইকেট নেওয়ার পথে যে বোলিং করেছেন, তাতে পুরনো ছন্দের কিছুটা ধরতে পারার সন্তুষ্টি এই ফাস্ট বোলারের কণ্ঠে, ‘পেস আর অ্যাকুরেসি আগের চেয়ে ভালো হয়েছে।’

আগের চেয়ে ভালো, তবে নিজের স্বপ্নের সমান এখনো নয়। মাঝখানে চোট আর অফ ফর্মের কারণে যেখানে নেমে গিয়েছিলেন, সেখান থেকে উঠে এসেছেন কেবল, ‘মাঝখানে তো গতি ১৩০-১৩২ হয়ে গিয়েছিল। মনে আছে? গত বিপিএলে। ফিটনেস খুব খারাপ হয়ে গিয়েছিল। এবার বড় ভাই যাঁরা ব্যাটিং করেছেন (বিসিবি প্রেসিডেন্টস কাপে), তাঁদের জিজ্ঞেস করেছিলাম। স্পিড গান তো আর ছিল না। তবে খেলে তাঁদের মনে হয়েছে আমি ১৪০ পেরিয়েছি।’ কিন্তু স্বপ্নের সীমাটা তাঁর আরো বড়, ‘সর্বোচ্চ গতি আমি তুলেছিলাম ১৪৮ কিলোমিটার। মিরপুরেই ২০১৬-র এশিয়া কাপে পাকিস্তানের বিপক্ষে। আমার স্বপ্ন ১৫০ কিলোমিটার গতিতে বল করা।’

লকডাউন উঠে যেতেই মিরপুরের একাডেমি মাঠে সেই স্বপ্নের পিছু ধাওয়ার শুরু। কিন্তু সমস্যা হয়ে যায় একটি জায়গায়, ‘‘গতি বাড়াতে গেলেই দেখছিলাম ওভারস্টেপিং হয়ে যাচ্ছে। সে জন্য আমাদের ফাস্ট বোলিং কোচ (ওটিস গিবসন) ‘নো’ ডাকছিলেন। নিশ্চিত জানি উনি গতি বাড়ানো নিয়েও কাজ করবেন। তবে আগে ওভারস্টেপিং নিয়ে কাজ করেছেন (টুর্নামেন্টও ঘনিয়ে আসছিল)। তাতে দারুণ ফলও পেয়েছি।’ পরিসংখ্যানই তাঁকে হাতেনাতে সে ‘রেজাল্ট কার্ড’ ধরিয়ে দিয়েছে, ‘দুই দিনের ম্যাচে একটু বেশিই নো বল হয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু ওয়ানডে টুর্নামেন্টে পাঁচটি ম্যাচে মাত্র একটি নো বল হয়েছে।’

একদিন ঠিকই স্পিড গানে ১৫০ তোলার প্রতিজ্ঞাও আছে তাসকিনের, ‘আমার স্ট্রেন্থ এবং স্কিল চার ভাগের এক-দেড় ভাগ হয়েছে। আরো আড়াই ভাগ উন্নতি করতে হবে। তা করতে পারলে আমার স্বপ্নও পূরণ হবে আর আমি বিশ্বমানের ফাস্ট বোলারও হতে পারব।’ সে জন্য নিজেকে এই নিয়মেই বেঁধে ফেলতে চান, ‘আমি ঘরে ঢোকার সময় সব শক্তি যেন ট্রেনিংয়েই ব্যয় করে আসি। কেউ যেন এই অভিযোগ করতে না পারে যে, ও খাটে না। ওর মধ্যে শৃঙ্খলা নেই।’

মনোজগতে এমন পরিবর্তনের কথা আগেও বলেছেন টিমমেটদের। কেউ বিশ্বাস করেছেন, কেউ করেননি। তবে এবারের পরিবর্তনের যে প্রতিফলন মাঠে দেখিয়েছেন, তাতে পুরনো অবিশ্বাস মুছে যাওয়ার কথা।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা