kalerkantho

বুধবার । ১০ অগ্রহায়ণ ১৪২৭। ২৫ নভেম্বর ২০২০। ৯ রবিউস সানি ১৪৪২

শুধু চেয়ে চেয়ে দেখে বিসিবি

রবিউল সেন্টু ফেসবুকে ভীষণ ব্যস্ত। আইপিএলে সানরাইজার্স হায়দরাবাদে কাজ করছেন থ্রো ডাউন এক্সপার্ট হিসেবে। পদবিতেই জমকালো ভাব আছে। হায়দরাবাদও বিস্তর সমাদর করছে সেন্টুকে। ফ্র্যাঞ্চাইজি অধিনায়ক ডেভিড ওয়ার্নার টুইট করেছেন, ‘অ্যাবসোলিউট লিজেন্ড, সেন্টু’। নিজের হাতে সেদিন চুলও কেটে দিয়েছেন। আর দুবাই থেকে ফোন করে নিজের মেন্টর খালেদ মাহমুদের ফোনে রবিউলের লজ্জিত কণ্ঠ, ‘স্যার, মনীশ পাণ্ডে আমাকে স্যার বলে ডাকে!’

সাইদুজ্জামান   

২৬ অক্টোবর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



শুধু চেয়ে চেয়ে দেখে বিসিবি

ছবিগুলো দেখলে মন ভরে ওঠে, গর্বও হয়। তবে সঙ্গে হতাশার উথাল ঢেউও আছড়ে পড়ে মনে। রবিউল করিম সেন্টু কিংবা মোহাম্মদ জসিমরা তো এ দেশের সেবাই করতে পারতেন, যেখানে তাঁদের সেবার খুব দরকারও!

প্রথমজনের নতুন করে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার দরকার নেই। রবিউল সেন্টু ফেসবুকে ভীষণ ব্যস্ত। আইপিএলে সানরাইজার্স হায়দরাবাদে কাজ করছেন থ্রো ডাউন এক্সপার্ট হিসেবে। পদবিতেই জমকালো ভাব আছে। হায়দরাবাদও বিস্তর সমাদর করছে সেন্টুকে। ফ্র্যাঞ্চাইজি অধিনায়ক ডেভিড ওয়ার্নার টুইট করেছেন, ‘অ্যাবসোলিউট লিজেন্ড, সেন্টু’। নিজের হাতে সেদিন চুলও কেটে দিয়েছেন। আর দুবাই থেকে ফোন করে নিজের মেন্টর খালেদ মাহমুদের ফোনে রবিউলের লজ্জিত কণ্ঠ, ‘স্যার, মনীশ পাণ্ডে আমাকে স্যার বলে ডাকে!’

মনীশ পাণ্ডে সানরাইজার্সের ডাকসাইটে ক্রিকেটার। ভারতের হয়েও খেলেছেন। সেই তিনিও শ্রদ্ধা করেন রবিউলকে, দেশে যাঁর কিংবা তাঁর মতো সবার ভাগ্যেই জোটে তুই-তোকারি। দেশীয় আবহে এতেই রবিউলরা অভ্যস্ত। তাই ভিনদেশি বড় তারকা যখন স্যার বলে সম্বোধন করেন কিংবা চুল কেটে দেন, তখন অভিভূত তো হবেনই।

—কী খবর সেন্টু?

পূর্বপরিচয়ের ঘনিষ্ঠতা এবং সেই সূত্রে দায়বদ্ধতা সত্ত্বেও মেসেঞ্জার কলের ওপার থেকে রবিউলের নম্র উত্তর, ‘ভাই ভালো, আলহামদুলিল্লাহ। কিন্তু দল থেকে নিষেধ আছে এখানকার কোনো খবরাখবর নিয়ে যেন কথা না বলি।’ অতঃপর শুভ কামনা জানিয়েই আলাপ শেষ। দোয়া প্রার্থনা করে রবিউল আশ্বাস দিলেন, ‘দেশে ফিরে অনেক গল্প করব, ভাই।’

গল্প তো রবিউলের জীবনের বাঁকে বাঁকে। অনূর্ধ্ব-১৭ থেকে ক্রিকেটার রবিউলের পথ হারানোর শুরু। প্রথম বিভাগেই শেষ ক্রিকেটার রবিউলের যাত্রা। রাজশাহী থেকে উঠে আসা ভূরি ভূরি ক্রিকেটারের গল্প যেন। ঢাকায় ‘বড় ভাই’ নেই, মাথা গোঁজার ঠাঁই তো নেই-ই। তাই হতাশা নিয়ে ফিরে যাও। রবিউল যাননি। খালেদ মাসুদ তখন ক্লেমন একাডেমির সঙ্গে জড়িত। সেখানেই চাকরি হয় রবিউলের। সেখান থেকে আবাহনী আর বিপিএল দল ঢাকা ডিনামাইটসের থ্রোয়ার হিসেবে তাঁকে রিক্রুট করেন খালেদ মাহমুদ, শয়নে-স্বপনে যাঁকে এখন ‘মেন্টর’ মানেন রবিউল।

মাসুদ থেকে মাহমুদের হাতে উঠে আসার আগে ফার্মগেটে দোকানকর্মী হিসেবেও ক্যারিয়ার গড়ে তোলার চেষ্টা করেছেন রবিউল। প্রকাশ্যে, সেটি বিক্রয়কর্মীর। কিন্তু ঘনিষ্ঠরা বলেন কিছুদিন ফার্মগেট এলাকায় সবজিই বেচেছেন রবিউল। উন্নতির সিঁড়ি বেয়ে সপ্তাকাশে ওঠা মানুষদের দেখে আমরা শ্রদ্ধাবনত হই। রবিউল তাঁর পরিসরে যেন সেরকমই একজন।

‘ওর মতো থ্রো ডাউন আর কাউকে করতে দেখিনি। টানা করে যেতে পারে। এ জন্য ক্রিকেটাররাও ওকে খুব পছন্দ করে’, বলছিলেন খালেদ মাহমুদ। বিসিবির এ পরিচালক রাজশাহীতে বাংলা ট্র্যাকেরও প্রধান কোচ। যথারীতি রবিউলেরও স্থায়ী চাকরির ঠিকানা বাংলা ট্র্যাক।

যদিও বিসিবি সামান্য কাণ্ডজ্ঞানের পরিচয় দিলে রবিউল সেন্টু এখন চলমান প্রেসিডেন্টস কাপেই কোনো না কোনো দলের সঙ্গে যুক্ত থাকতেন। কারণ একটা সময় তারকা ক্রিকেটারদের অনুরোধে জাতীয় দলেও চাকরি হয়েছিল তাঁর, তবে খণ্ডকালীন। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ ডিগ্রি নিয়ে ফেলা রবিউল সংসার চালাতে কেন খণ্ডকালীন চাকরির আশায় বসে থাকবেন? মাহমুদ প্রস্তাব দিতেই যোগ দেন বাংলা ট্র্যাকে। ভাবতে অবাক লাগে, সেই বেতনও মাত্র ৪৫ হাজার টাকা। তার মানে বিসিবি এই পরিমাণ অর্থও দিতে রাজি হয়নি রবিউলকে! আরো বিস্ময়কর, জাতীয় দলের সঙ্গে যুক্ত আরেক থ্রো ডাউন বিশেষজ্ঞ বুলবুলের বেতন মাত্র ১২ হাজার টাকা। সে আবার মূলত ম্যাসাজম্যান। ম্যাচ কিংবা প্র্যাকটিসের পর খেলোয়াড়দের হাত-পায়ের পেশি ঠিক রাখতে হয় বুলবুলকে। আবার সেই একই লোক নেটে ক্রমাগত থ্রো ডাউন করে যান ব্যাটসম্যানদের। বেতন কিন্তু সেই ১২ হাজারই!

ইদানীং থ্রো ডাউনে বুলবুলের চেয়েও ক্রিকেটারদের কাছে বেশি কদর রমজানের। এক তারকা ক্রিকেটার সেদিন বলছিলেন, ‘আইপিএলের কোনো দল খবর পেলে শিওর ওকে (রমজান) নিয়ে যাবে!’ রবিউল সেন্টুর খবর সানরাইজার্স জেনেছে কিন্তু বাংলাদেশ দলের কম্পিউটার অ্যানালিস্ট শ্রীনিবাসের কাছে। করোনা বিপত্তি না হয়ে এলে বুলবুলও এবার আইপিএলে থাকতেন। ভবিষ্যতে রমজানের খবরও পৌঁছে যাবে আইপিএলে।

লিখতে লিখতে জসিমের কথা মনে পড়ল। ২০১০ সালে গুয়ানজোতে এশিয়ান গেমস করতে গিয়ে ভদ্রলোকের সঙ্গে দেখা হয়েছিল। এশিয়ান ক্রিকেট কাউন্সিলের কিউরেটর হিসেবে আসরের উইকেট তৈরির দায়িত্ব পড়েছে তাঁর হাতে, ‘খুব ভালো আছি, দোয়া করবেন।’

রবিউল সেন্টু এখন যেমন দোয়া প্রার্থনা করেন। ভবিষ্যতে হয়তো বুলবুল-রমজানরাও করবেন। আর বিসিবি তাকিয়ে থাকবে, ঘরের রত্নের কদর দেবে না কখনোই!

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা