kalerkantho

শনিবার । ১৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৭। ২৮ নভেম্বর ২০২০। ১২ রবিউস সানি ১৪৪২

১২ বছরেও নেই নতুন গ্র্যান্ডমাস্টার

২০০৮ সালে ২৭ বছর বয়সে গ্র্যান্ডমাস্টার হন এনামুল হোসেন। দেশের পঞ্চম এবং সর্বশেষ। এনামুলের বয়স এখন চল্লিশ ছুঁতে চলেছে। গত ১২ বছরে আরেকজন নতুন গ্র্যান্ডমাস্টার পায়নি বাংলাদেশ। কেন? সেই প্রশ্নই রাখা হয়েছিল এনামুলসহ পাঁচ গ্র্যান্ডমাস্টারের কাছে। তাঁরাই পেছন ফিরে দেখেছেন ঘাটতি ছিল কোথায়, ভুল হয়েছে কী? পাঁচজনের সঙ্গেই কথা বলেছেন শাহজাহান কবির

২৪ অক্টোবর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



১২ বছরেও নেই নতুন গ্র্যান্ডমাস্টার

২০ বছর ধরেই ভাটা

সমস্যাটা আসলে আরো লম্বা সময়ের। ২০০২ থেকে ২০০৮ পর্যন্ত যে চার গ্র্যান্ডমাস্টারকে আমরা পেয়েছি, তারা তৈরি হয়ে গেছে কিন্তু নব্বইয়ের দশকেই। ১৯৯৮ সালে এই টিমটা নেদারল্যান্ডসকে হারিয়েছে। অলিম্পিয়াডেও খুব ভালো করেছে। ভাটাটা তাই ১২ বছরের না, বলা যায় ২০ বছরের। আমরা এখনো সেই নব্বইয়ের দাবাড়ুদের নিয়েই চলছি। সবাই চল্লিশোর্ধ্ব। এরপর কয়েকজন এসেছে, তারা সেই প্রতিভাটা কাজে লাগাতে পারেনি। তবে ওই কয়েকটি নামই তো সব নয়। বাস্তবতা হলো আমাদের পাইপলাইনে খেলোয়াড় খুবই কম। অনেক খেলোয়াড় থাকলে তাদের মধ্য থেকে কেউ না কেউ বেরিয়ে আসেই। কিন্তু এখানে তা হচ্ছে না। চট করেও তো এই অবস্থার পরিবর্তন হবে না। এটা মূলত সাংগঠনিক ব্যর্থতা, এই সময়ে যাঁরা ছিলেন তাঁরা আসলে দাবার চেয়ে অন্য স্বার্থ নিয়ে কাজ করেছেন। এখানে রাজনীতি ঢুকেছে। এখনকার কমিটির মধ্যে ভালো করার সামর্থ্য আছে। তবে ওদেরও সময় লাগবে।

 

বিমানের মতো স্পন্সরের অভাব

পরিবেশটা যদি ঠিক থাকে, অর্থাৎ সব রকম সুযোগ-সুবিধা থাকে, তখন যাঁদের মধ্যে গ্র্যান্ডমাস্টার হওয়ার প্রতিভাটা আছে তাদের মধ্যে ওই অনুপ্রেরণাটাও তৈরি হয়। আমার মধ্যে প্রতিভা ছিল সেটা সেই ’৯৪ সালেই বোঝা গিয়েছিল, তারপর চেষ্টার পর ২০০২-এ গিয়ে হলো। ফেডারেশনের সাপোর্ট ছিল, আমার নিজের চেষ্টা তো ছিলই, তা ছাড়া বাংলাদেশ বিমানে খেলতাম তখন, তাদের একটা বড় ভূমিকা ছিল আমার ইউরোপে গিয়ে নিয়মিত খেলতে পারার পেছনে। তা ছাড়া তখন টুর্নামেন্টগুলোতে প্রাইজমানি, পারিশ্রমিক যথেষ্ট ছিল, ভালো খেলতে পারলে তা দিয়েই আমরা চলতে পারতাম। এখন সে পরিমাণটা তুলনামূলক অনেক কমে গেছে, তা দিয়ে চলাটা কঠিন, কিছু বাঁচিয়ে যে আরো টুর্নামেন্ট খেলব, সেটা সম্ভব হয় না। ফাহাদ, সাগররা কিভাবে পারবে! দেশের এই ছোটখাটো টুর্নামেন্টে তো ওদের হবে না, ইউরোপে খেলতে হবে। ভারতে গিয়ে আসলে হয় না, ওরা কমার্শিয়াল টুর্নামেন্ট করে। বড় টুর্নামেন্টগুলোতে আবার আমাদের ডাকে না।

 

মোকাদ্দেসের সময় থেকেই পেছাচ্ছি

আমাদের পর আর সেভাবে দাবাড়ু তৈরি হয়নি। কারণ খেলোয়াড় তৈরি হওয়ার জন্য প্রাতিষ্ঠানিকভাবে যে সুযোগ-সুবিধা দরকার ছিল তা ছিল না। মাঝে মাঝে কেউ কেউ ভালো করেছে, কিন্তু আর এগোতে পারেনি। সাগর, শাকিল, নাসিরের কথা বলতে পারি। শুধু ভালো মানের টুর্নামেন্ট খেলার অভাবে ওরা এগোতে পারেনি। সবচেয়ে খারাপ সময় গেছে ২০০৯—মোকাদ্দেস  হোসেন যখন সাধারণ সম্পাদক হয়ে এলেন। রাজিব তখন মাত্র জিএম হয়েছে, সেখান থেকে আমাদের দাবাটা যে গতিতে এগোনোর কথা ছিল তা নষ্ট হয়ে গেল। শাকিল, সাগর ২০১১-তে আইএম হয়ে পড়ল ওই খারাপ সময়টার মধ্যে। তখন থেকেই ফেডারেশনে আর দাবার লোক ঢোকেনি। যদিও গত কয়েক বছরে কিছুটা উন্নতি দেখছি, শামীম ভাই ভালো করতে চান, সভাপতিও আগ্রহী। তবে আমাদের আমূল পরিবর্তন লাগবে। অনেক নতুন খেলোয়াড় চাই। যেটা এশিয়ান নেশনস কাপে আমরা অন্য দলগুলোর মধ্যে দেখেছি।

 

জিএম নয়, ভিত গড়তে হবে

আমাদের লক্ষ্যটা মনে হয় ভুল পথে যাচ্ছে। আরেকজন গ্র্যান্ডমাস্টার বের করাটা আসলে কোনো কথা না। একজন বের হলেই কী সার্থকতা। আবার কবে আরেকজন পাব? এভাবে আসলে হয় না। এখানে দাবার প্রচার, প্রচলন, চর্চাটাই নেই। বিশাল মাঠের মধ্যে একটা গাছ, একজন গ্র্যান্ডমাস্টার চাওয়া নয়। আমাদের দরকার একটা শস্যক্ষেত্র, সেখানে একঝাঁক ফিদে মাস্টার থাকবে, একঝাঁক আন্তর্জাতিক মাস্টার থাকবে, সেখান থেকে বছর বছর গ্র্যান্ডমাস্টার বের হবে। সেই পরিকল্পনা তো আমাদের নেই। এটা ভারতে আছে, ইরানে হয়েছে। ইরানে ২৫ বছর দাবাই হয়নি। নব্বইয়ের দশকে নতুন করে শুরু করে শুধু পরিকল্পনার মাধ্যমে ওরা এখন এশিয়ার বড় শক্তি। আমি জুনিয়র চ্যাম্পিয়নশিপ খেলতে গিয়েছিলাম তখন ওখানে মাত্র দুজন আইএম, কিন্তু তারা কোচ করেছে কারপভকে। অর্থাৎ তখনই তারা বড় পরিকল্পনা নিয়ে ফেলেছিল। এখন আর ওদের জিএমের জন্য তাকিয়ে থাকতে হয় না, আপনাতেই তা হচ্ছে সেখানে।

 

আমাদের তো আইএম- নেই

গ্র্যান্ডমাস্টার তো দাবার সর্বোচ্চ খেতাব। এই খেতাব পেতে হলে তো আন্তর্জাতিক মাস্টার, ফিদে মাস্টার... এভাবে হয়ে আসতে হবে। যেহেতু আমাদের মাঝখানের ওই পর্যায়েই তেমন খেলোয়াড় নাই। তাই গ্র্যান্ডমাস্টার পাওয়ার আশা করাটাও তো ঠিক না। এখন প্রশ্ন হওয়া উচিত আইএম কেন হচ্ছে না। যেখানে পাঁচজন জিএম সেখানে আইএম তিনজন, এমন উল্টো পিরামিড আপনি কোথাও দেখবেন না। এটা হয়েছে কারণ ১০ বছরে দাবা তো ভালো চলেনি। আমরা এর প্রতিবাদও করেছিলাম খেলাটার সঙ্গে সংশ্লিষ্টতাহীন লোকদের ফেডারেশনে দেখে। কারণ আমরা জানতাম ১০ বছর পর এমনটাই হবে। নতুন খেলোয়াড় তৈরি হবে না, হয়ওনি। শীর্ষ খেলোয়াড়দের দেশ-বিদেশে নিয়মিত খেলার সুযোগ থাকতে হবে, মাঝারি সারির জন্য দেশেই ভালো টুর্নামেন্ট লাগবে। ছোটদের আন্তর্জাতিক বিভিন্ন টুর্নামেন্টে পাঠাতে হবে। আমাদের এখানে সেই ধারাটাই নেই। সিঙ্গাপুর, ইন্দোনেশিয়া কত দ্রুত এগিয়েছে, আমরা সেখানে পিছিয়েছি।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা