kalerkantho

মঙ্গলবার । ১৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৭। ১ ডিসেম্বর ২০২০। ১৫ রবিউস সানি ১৪৪২

ডাউন দ্য উইকেট

আন্দোলনে অবিশ্বাস

সাইদুজ্জামান

২২ অক্টোবর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



আন্দোলনে অবিশ্বাস

বিদ্রোহী ক্রিকেটারদের তুলে ধরা একটি প্ল্যাকার্ডে লেখা, ‘তানভির হায়দারের পদত্যাগ চাই’। প্রয়াত এ ভদ্রলোক অতি সজ্জন ছিলেন। ব্যবসায় যা আয় হতো, তার যেটুকু বিলাস ব্যসনে ব্যয় করতেন তার চেয়ে বেশি মোহামেডান ক্লাব পরিচালনায় ব্যয় করতে কি না, এ নিয়ে সপ্রশংস কানাঘুষা হতো তখন। সাংবাদিক মহলেও জনপ্রিয় ছিলেন তাঁর অনন্য সেন্স অব হিউমারের কারণে। তো, বিক্ষুব্ধ ক্রিকেটারদের সংবাদ সম্মেলনে সেই প্ল্যাকার্ডটিকে ইঙ্গিত করে একজন প্রশ্ন রাখলেন, ‘আপনারা কোন পদ থেকে তানভির হায়দারের পদত্যাগ চান?’

সঙ্গে সঙ্গে পিনপতন নীরবতা। তানভির হায়দার চৌধুরী সেসময়কার বোর্ডের সহসভাপতি এবং বিভিন্ন কমিটি মিলিয়ে গোটা চারেক পদে আসীন। ক্রিকেটারদের মুখ চাওয়া-চাওয়ি শেষে পাশ থেকে একজন হুট করে বললেন, ‘সব পদ থেকে পদত্যাগ চাই!’ তানভির হায়দারকে কোনো পদই ছাড়তে হয়নি। ক্রিকেটাররাও মাঠে ফিরেছিলেন কোনো গোল না দিয়েই! একটা গোল অবশ্য হয়েছিল। আন্দোলনে নামার ‘দায়ে’ পাঁচ সিনিয়র ক্রিকেটারকে পাঁচ বছর মেয়াদে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। আন্দোলনে রফা হয়েছিল তাঁদের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের মধ্য দিয়ে। মুফতে লাভ হয়েছিল মিডিয়ার। কিছুদিন পত্রিকার পাতা রোমাঞ্চকর নিউজ দিয়ে ভরা নিয়ে দুশ্চিন্তা করতে হয়নি। তবে ক্রিকেট চলেছে আগের মতোই—মরা উইকেট, অনুন্নত প্র্যাকটিস সুবিধা, হাতে গোনা টুর্নামেন্ট আর সংগঠক-ক্রিকেটার অবিশ্বাসকে সঙ্গী করে।

গতকাল তেমনই আরেকটি আন্দোলনের বর্ষপূর্তি হলো। ২০১৯ সালের ২১ অক্টোবর সকাল থেকে মিডিয়ায় ফোন, স্টেডিয়ামে আসুন...চমক আছে। সাকিব আল হাসানের নেতৃত্বে ক্রিকেটারদের একটি দল আসলেই চমকে দিয়েছিলেন পুরো দেশকে। আদতে রাষ্ট্রব্যবস্থাকে বলা ভালো। কারণ ১১ দফা আদায়ের দাবি জানিয়ে ক্রিকেটারদের ধর্মঘট ঘোষণা হতেই ফিসফাস; এক পক্ষ বলছে, বিসিবি সভাপতি নাজমুল হাসান আশ্বস্ত করেছেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে। অতএব এই আন্দোলন মাঠে মারা যাবে। আবার ক্রিকেটারদের লবি থেকে গুঞ্জন, সাকিব-তামিমরা প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করতে গেছেন। এবার পাপন (নাজমুল হাসান) গেলেন বলে!

এর সত্য-মিথ্যা কতটুকু জানি না। তবে রাষ্ট্র পরিচালনার মতো মহা গুরুত্বপূর্ণ কাজে দিনমান ব্যস্ত প্রধানমন্ত্রীকে ক্রিকেট বিদ্রোহের মতো ফোলানো বেলুন ফোটাতে কেন জড়াতে হবে, সেটি বোধগম্য নয়।

আন্দোলনকে ফোলানো বেলুন বললে অনেকেই বেজার হবেন জানি। যদি ১৯৯৯-২০০০ কিংবা ২০১৩ সালের মিনি বিদ্রোহের সঙ্গে তুলনা করি, তবে ২০১৯ সালেরটি নিঃসন্দেহে অনন্য। চরম গোপনীয়তা এর শক্ত ভিত। আর ক্রিকেট দলের মতো ১১ জনের ১১ দফা পাঠ করায়ও যথেষ্ট বৈচিত্র্য ও বুদ্ধিমত্তার ছাপ রয়েছে। বলা যায়, বাংলাদেশ ক্রিকেট ইতিহাসের সবচেয়ে গোছানো আন্দোলন। অবশ্য এ দেশে কোনটা শতভাগ ঠিকঠাক হয়? ক্রিকেটারদের ১১ দফার শেষটা তো একেবারেই ব্যক্তিগত চাওয়া। তা ছাড়া পরবর্তী সময়ে যুক্ত হওয়া আরো দুটি দাবিও শুরুর দিনে উল্লেখ করলে ভালো হতো। যাক, অতীতের ক্ষত খোঁচাখুঁচি করা এ লেখার উদ্দেশ্য নয়। তবে এ লেখার ভাঁজে ভাঁজে কেউ না কেউ আহত হবেন হয়তো। তাঁদের উদ্দেশে ‘স্যরি’।

গত দুদিন ধরে আন্দোলনের বর্ষপূর্তির হিসাব মেলানো হচ্ছে মিডিয়ায়। হিসাব মিলাতে গিয়ে দেখা যাচ্ছে, ব্যক্তিগত লাভালাভের বাইরে ক্রিকেটীয় ভবিষ্যতের কোনো উন্নতি হয়নি। তৃণমূলের ক্রিকেট যেখানে ছিল ২০১৯ সালের অক্টোবরে, এখনো সেখানেই আছে। ভাগ্যিস করোনা হানা দিয়েছিল, নয়তো ক্রিকেট অবকাঠামো উন্নয়নের দাবিনামা অপূর্ণ থাকা নিয়ে বিস্তর গালমন্দ শুনতে হতো বিসিবিকে।

ক্রিকেটীয় অবকাঠামো মানেই স্টেডিয়াম আর জিমনেসিয়াম নয়। এগুলো অবশ্যই অনুষঙ্গ। তবে খেলার পরিবেশ তৈরির জন্য আনুষঙ্গিক আরো অনেক উপকরণ জরুরি। অবকাঠামো যা আছে, সেটির সঠিক পরিচর্যা আর সদ্ব্যবহার করা জরুরি। কেউ কি জানেন, কেন বগুড়ার শহীদ চান্দু স্টেডিয়াম খালি পড়ে থাকে? ওটা তো সরকারি অর্থেই তৈরি। কারো পকেট মানিতে গড়ে ওঠা মাঠ না! মিরপুরের কথিত হোম অব ক্রিকেটের গ্যালারি, স্ট্রাকচারের দিকে তাকানো যায় না। অথচ এখানেই বিসিবির সদর দপ্তর। করোনার কারণে কিছু আগাছা উপেক্ষা করা যায়। কিন্তু আমরা তো সেই শুরু থেকেই দেখছি, পরিচর্যা কিংবা সংস্কারের নামে কাজের চেয়ে অকাজই বেশি হয়ে আসছে। নয়তো করোনার আগে থেকেই এমন মলিন দেখাবে কেন দেশের ক্রিকেটের পুণ্যভূমিকে?

অবশ্য সংগঠকদের আর দোষ দিই না এখন। সংগঠক হওয়ার মডেলই বদলে গেছে। পেশাদারিত্বের কারণে এখানে বিসিবির নির্বাহীরাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। এতে বোর্ডের কার্যক্রম আরো গতিশীল হওয়ার কথা। কিন্তু হচ্ছে কি? হলে তো এক বছর আগে ক্রিকেটাররা যেসব দাবি তুলেছিলেন, সেগুলোর সিংহভাগ অনেক আগেই পূরণ হতো। পেশাদারিত্বে তো বিদ্রোহের স্থান নেই বলেই জানি। আলোচনার টেবিলেই সব সমাধান হয়ে যাওয়ার কথা।

কিন্তু হয়নি। ক্রিকেটাররা বলবেন, সংগঠকরা কি আমাদের কথা শুনবেন? কখনো শুনেছেন? শোনেননি। শোনেননি, কারণ আপনারা ক্রিকেটাররা কখনোই একজোট হতে পারেননি। আপনারা সংগঠকদের যতটা অপছন্দ করেন ঠিক ততটাই অবিশ্বাস করেন একই ড্রেসিংরুম শেয়ার করা আরেক ক্রিকেটারকে। টিম গেমে যা অবিশ্বাস্য এক রসায়ন!

আন্দোলনের সহজাত চরিত্র হলো, এ রকম ঘটনা একতাবদ্ধ করে একটি গোষ্ঠীকে। কিন্তু ক্রিকেটাররা কি সেটি অর্জন করতে পেরেছেন? একদমই না; বরং আন্দোলনের বর্ষপূর্তিতে দেশের বেশির ভাগ ক্রিকেটার মনে করছেন এর সুফল গেছে হাতে গোনা কয়েকজনের ঘরে। বর্ষপূর্তিতে সে আন্দোলনের সূতিকাগার ঘাঁটাঘাঁটি করতে গিয়ে দেখা যাচ্ছে, শুধু একজন মাশরাফি বিন মর্তুজা নন, অনেককেই অন্ধকারে রেখেছিলেন রূপকারেরা। এই বিভেদের কারণও পারস্পরিক অবিশ্বাস। যদি কেউ ফাঁস করে দেয়! আরো বড় অবিশ্বাস তো তাঁদের নিজেদের সংগঠনকে ঘিরেই। ক্রিকেটার্স ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (কোয়াব) যাত্রা শুরু করেছিল আশার আলো জ্বালিয়ে। কিন্তু সেই আলো অবিশ্বাসের অন্ধকারে সেই কবে ঢাকা পড়ে গেছে। জাতীয় দলের ক্রিকেটাররা নিয়মিত উপেক্ষা করে গেছেন কোয়াবের নেতৃত্বকে তো বটেই, অস্তিত্বকেও। এর প্রতিফলন দেখা গেছে, ১১ দফা দাবিনামাতেও। শুরুরটাই ছিল কোয়াবের নেতৃত্বে পরিবর্তনের। একভাবে দেখলে এটা চরম উদারতা—আন্দোলনকারীরা প্রথমে নিজের ঘরে নজর দিয়েছেন। কিন্তু ঘরের ঝামেলা নিজেরা না মিটিয়ে ক্রিকেট বোর্ড সমীপে কোয়াবের কমিটি বিলুপ্তির দাবি কেন—ঠিক বোধগম্য নয়। অনেক ঘাম ঝরিয়ে বোর্ডের সামান্য আনুকূল্য আদায় করেছে কোয়াব। তাই বলে কোয়াবের নির্বাচন কিংবা নেতৃত্ব বদলের কোনো অধিকার নেই বোর্ডের। তবু প্রথমেই এ দাবি কেন রেখেছিলেন ক্রিকেটাররা? স্পষ্টতই কোয়াব নেতৃত্বকে বিশ্বাস করেন না বলেই। তাঁদের যুক্তিও আছে। কোয়াবের নেতৃত্বের বেশির ভাগই সরাসরি বোর্ডে সম্পৃক্ত, পে-রোলেও আছেন কেউ কেউ। এমনটা বৈশ্বিক ক্রিকেটে বিরল।

আবার কোয়াবেরও ‘অভিমান’ আছে। সংগঠনের প্রতি শীর্ষস্থানীয়দের যদি আস্থা না থাকে, তবে দাবি আদায় হবে কী করে? ২০১৩ সালের মিনি বিদ্রোহের ঘটনাই ধরুন। প্রায় ৬০-৭০ জন ক্রিকেটারকে নিয়ে মিরপুরে জড়ো হয়েছিল কোয়াব নেতৃত্ব। কিন্তু এক সিনিয়র ক্রিকেটার সপাটে বলে দেন, এসবের সঙ্গে আমি নেই! আন্দোলন ওখানেই শেষ। ড্রেসিংরুম থেকে বেরোনোর পর কোয়াব সেক্রেটারি দেবব্রত পালকে ধরা হলো। তিনি বিব্রত, কী বলবেন বুঝে উঠতে পারছিলেন না।

অথচ কোয়াবেরও দরকার ছিল না। যদি সেই সিনিয়র এবং তাঁর সমসাময়িকরা মিলে বোর্ডের সঙ্গে ক্রিকেটের সামগ্রিক সমস্যাগুলো নিয়ে বসতেন। বসেছেন তাঁরা, তবে সবটাই জাতীয় দল এবং নিজের স্বার্থে। মাশরাফি বিন মর্তুজা, সাকিব আল হাসান, তামিম ইকবাল, মুশফিকুর রহিম আর মাহমুদ উল্লাহ মিলে কোনো দাবি জানিয়েছেন আর সেটি রক্ষা করেনি বোর্ড—এমন নজির নেই। কিন্তু দেশের ক্রিকেট রোডম্যাপ বদলে ফেলার মতো কোনো প্রস্তাব নিয়ে বোর্ড সভাপতির সঙ্গে সভা করেছেন বলে শোনা যায়নি। প্লেয়ার্স বাই চয়েস পদ্ধতির বেতন কাঠামো থেকে তাঁরা সাফল্যের সঙ্গে নিজেদের উন্মুক্ত করেছেন। পৃষ্ঠপোষকের সঙ্গে করা বোর্ডের চুক্তিকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে পণ্যেও দূতিয়ালি করেছেন। প্রয়োজনে এমন অনেক আইনই নিজেদের মতো করে সাজিয়েছেন। সর্বশেষ ১১ দফায় অন্তত দুটি ভিনদেশি ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটে খেলার সুযোগ দাবি যুক্ত করাও ব্যক্তিগত কারণে।

দিনশেষে আন্দোলনের সুফল কিছু ব্যক্তিগত লাভালাভ। ক্রিকেট-ভবিষ্যৎ সেই আগের মতোই বাক্সবন্দি।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা