kalerkantho

বুধবার । ৫ কার্তিক ১৪২৭। ২১ অক্টোবর ২০২০। ৩ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

টাচলাইন থেকে

মোস্তফা মামুন   

১ অক্টোবর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



টাচলাইন থেকে

জাতীয়-বিজাতীয়

আগে জানতাম খেলা হলেই তবে খেলা নিয়ে আলোচনা অনুষ্ঠান বা টক শো হয়। এবার দেখলাম খেলা না হলে বরং এই নিয়ে বেশি বেশি টক শো করা যায়। গত কয়েক মাসে ফেসবুক লাইভ, ইউটিউব আলোচনা, জুম মিটিং মিলিয়ে খেলাবিষয়ক এত এত আলোচনা অনুষ্ঠান দেখেছি যে মাঝেমধ্যে মনে হয়েছে খেলা বন্ধ থাকলেই বরং আলোচনায় সুবিধা। খেলা হলে শুধু সেই প্রসঙ্গে আলোচনা করতে হয়। এখানে অবারিত সুযোগ। বিষয়বস্তু বিভিন্ন দিকে গড়িয়ে দেওয়ার অসীম স্বাধীনতা।

তেমনই একটা আলোচনাতে প্রশ্ন, ‘এই যে বাংলাদেশের শ্রীলঙ্কা সফর বাতিল হলো, এটা ভালো হলো না খারাপ হলো?’

এসব আলোচনায় নানামুখী প্রশ্ন আসে বলে সামাল দেওয়ার এক ধরনের প্রস্তুতি থাকে। তবু থমকাতে হলো। খেলা বাতিল হওয়া মানে খারাপ। এর মধ্যে ভালোর কি কিছু থাকতে পারে? মোটামুটি সেভাবে উত্তর দেওয়ার পরও প্রশ্নকর্তা ঠিক সন্তুষ্ট নন। এর মধ্যে ভালো কিছু আছে, এটা শুনে ছাড়বেনই। এবং তখন বিরক্ত হলেও পরে ভেবে দেখছি, এর মধ্যেও চাইলে একটা ভালো ব্যাপার বের করা যায়। একে কোয়ারেন্টিনের জটিল বেড়াজাল, তার ওপর অনেক দিন খেলার বাইরে থাকায় শারীরিক প্রস্তুতির ঘাটতি ইত্যাদি মিলিয়ে বিদেশের মাটিতে প্রতিপক্ষের সঙ্গে ঝামেলাতেই পড়ার কথা। এখন এই সিরিজ বাতিল হওয়াতে ঘরোয়া খেলায় মন দেবে সবাই। জাতীয় দলের খেলা মানে যেখানে ১৫-২০ জনের মামলা, সেখানে লিগ বা অন্য খেলায় অনেক বেশি খেলোয়াড় খেলতে পারবে। আর সত্যি বললে, করোনা মহামারিতে তো এই দ্বিতীয় স্তরের খেলোয়াড়রাই ক্ষতিগ্রস্ত। জাতীয় দলের খেলোয়াড়দের আয় কমেছে। তবু জীবনধারণে এখনই সমস্যা দেখা দিচ্ছে না, যখন সাধারণ খেলোয়াড়দের সেখানেই টান পড়ছে। কাজেই সবাই মিলে ঘরোয়া ক্রিকেট খেলল। বিরতিজনিত ঘাটতিটা ঘুচিয়ে প্রস্তুত হয়েই পরের প্রতিযোগিতায় গেল জাতীয় দল। ওদিকে খেলোয়াড়দের আয়-টায় হওয়াতে ওরাও স্বস্তি পেল। সফর বাতিলে অসুবিধার চাইতে সুবিধা তো কম নয় একটুও। বরং বেশিই।

কিন্তু সমস্যা হলো, এই অঙ্ক কে মানবে? আমাদের কাছে ক্রিকেট মানেই তো আন্তর্জাতিক ক্রিকেট। এবং বাংলাদেশের খেলা। সেটা হলো না মানে আসলে খেলা শুরু হলো না। এক, বিপিএল বাদ দিলে ঘরোয়া খেলায় কে কী খেলল না খেলল তা নিয়ে সাধারণ আগ্রহটা জাম্বিয়া-গাম্বিয়ার জাতীয় নির্বাচন নিয়ে আগ্রহের সমতুল্য। এখানে আমরা অত্যন্ত জাতীয়তাবাদী, দেশপ্রেমিক। এর ভিত্তিতে আবার যখন পুরো ক্রীড়াঙ্গনটাকে বিচার করতে যাচ্ছি, তখন উল্টো ধাক্কা। যে আমরা এত জাতীয়তাবাদী সেই আমরাই আবার হকি, হ্যান্ডবল কিংবা অন্য ছোট খেলায় জাতীয় দলে কে খেলল না খেলল তা নিয়ে ভাবিই না। তাহলে আমাদের ক্রীড়াবোধ দেশপ্রেমতাড়িত নয়। বরং আন্তর্জাতিক ফুটবলের ভিত্তিতে যদি ধরি তাহলে ভীষণ রকম বিজাতীয়। দেশের ফুটবলে যেখানে সাংবাদিক, পুলিশ আর ফুটবলকর্মীরাই শুধু দর্শক, অথচ বিদেশের ক্লাব ফুটবলগুলোকে রাত-দিন জাগিয়ে রাখেন আমাদের দর্শকরা। ঘরে বসে, ফেসবুকেই যে আওয়াজ তাতে এরা মাঠে যাওয়ার সুযোগ পেলে এদের চিৎকারে ইউরোপের বড় বড় স্টেডিয়ামগুলো উড়ে যেত। মানে দাঁড়াচ্ছে, আমাদের ক্রীড়াবোধ আসলে ঠেকেছে দেশের ক্রিকেট আর বিদেশের ফুটবলে। আর এখানে একটা অদ্ভুত বৈপরীত্যের ছবি দেখে মাঝে মাঝে চমকে যাই। বছর বিশেক আগে ব্যাপারটা ছিল পুরো উল্টো। তখন খেলা মানে দেশের ফুটবল আর বিদেশের ক্রিকেট। এটা সব সম্ভবের দেশ। রাজনৈতিক-সামাজিক ক্ষেত্রটাকে মাথায় রেখেই বলা হয়। কিন্তু খেলাতেও বিষয়টা সত্য। আমাদের ক্রীড়াবোধের বিন্যস্ত সংজ্ঞা নেই। তা পরস্পরবিরোধী। বিচিত্র। ধারাহীন।

আর তাই ঘরোয়া খেলা নামের ব্যাপারটা এত তুচ্ছ হয়ে গেছে যে মাঝেমধ্যে মনে হয় আমরা বোধহয় ভাবি যে সর্বোচ্চ পর্যায়ের ক্রিকেটার বা ফুটবলার বা অ্যাথলেট আসলে গাছ থেকে পড়বেন কিংবা মাটি ফুঁড়ে বেরোবেন। ঘরোয়া খেলা দেখব না। পৃষ্ঠপোষকতা দেব না। বড় করে লিখব না। তবু এর মধ্য থেকেই সুপারম্যানরা বেরিয়ে আসবেন। আর সুপারম্যানদের বেরোতেই বা হবে কেন? ঘরোয়া খেলা হবে। মানুষ সম্পৃক্ত হবে। আনন্দ পাবে। এটুকুই মূল। এখান থেকে বড় পর্যায়ের খেলোয়াড় বেরোলে খুব ভালো। নাও যদি বেরোয় কিন্তু স্থানীয়ভাবে আনন্দের জোগান দিতে পারে তাহলেই চলবে। খেলার ইতিহাস-বিজ্ঞান এভাবেই এগোয়। কিন্তু আমাদের ভাবনার রথে সেগুলো এমন পিষ্ট যে মাঝেমধ্যে মনে হয়, এত খেলা-খেলা করি কিন্তু খেলার মৌলিক বিষয়টাই আমরা ধরতে ব্যর্থ। জাতীয় দল শ্রীলঙ্কা যেতে পারবে কি না তাই নিয়ে যত গবেষণা তার এক হাজার ভাগের এক ভাগও যদি ব্যয় হতো খেলা বন্ধ থাকাতে সাধারণ খেলোয়াড়দের জীবনধারণের যন্ত্রণা কিংবা জেলার ফুটবল লিগ না হওয়াতে স্থানীয় দর্শকদের বিনোদনগত বঞ্চনা তাহলেই আমরা ঠিক লাইনে থাকতাম। ঘরোয়া খেলার প্রতি বিমুখতার বেশ কিছু কারণ দেখানো হয়। বেশির ভাগই কুযুক্তি। এসব কূপমণ্ডূকতায় ভরপুর পাণ্ডিত্য বিভ্রান্তিতে সার দেওয়ার কাজ করে চলে। যুক্তি দেখানো হয় মানুষ এখন টিভিতে মেসি-রোনালদোকে দেখে বলে আবাহনী-মোহামেডান আর দেখতে চায় না (যেন মেসিদের দেখার চোখ বাংলাদেশ ছাড়া পৃথিবীর আর কারো নেই। যদি ওদের কীর্তি সত্ত্বেও পৃথিবীর সব দেশে লিগ হয়। মানুষ লাফায়।) এ-ও বলা হবে যে, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সাফল্য নেই তাই ফুটবলে মানুষ আগ্রহী হয় না। (এখানে আবার ফুটবলটাকে ক্রিকেটের চোখে দেখা। ফুটবল ক্লাবভিত্তিক খেলা, আন্তর্জাতিক সাফল্য সেখানে খুব বড় বিচার্যই নয়। বিশ্বকাপ ফুটবল বা ইউরো বাদ দিলে বাকি খেলাগুলো হয় পাড়ার সেলিম-হেলালদের ম্যাচের মুডে।) কিন্তু বিভ্রান্তিগুলো এমন বাজার পেয়ে গেছে যে মানুষও নিজেকে আয়নার সামনে দাঁড় করায় না। ঘরোয়া খেলার প্রতি অনাগ্রহ দেখানো মানুষ ধরে নেয় সে ঠিকই আছে। তার কাজ রিয়াল-বার্সেলোনার খেলা দেখা এবং বাংলাদেশের ক্রিকেট ম্যাচে টিকিট পাওয়ার চেষ্টা করা এবং দেশের কর্তা-সিস্টেম এসবকে গালাগালি করা। ক্রিকেট দেখার সময় সে দেশপ্রেমিক। ইউরোপের ফুটবল দেখার সময় সে ক্রীড়াপ্রেমিক। দুটোই তো হচ্ছে। আসলে কিছুই হচ্ছে না। দেশের খেলার সঙ্গে সংযোগহীনতা বরং তাকে এখানে-ওখানে আশ্রয় নিতে বাধ্য করছে যাযাবরের মতো। কিন্তু দোষ মানুষের নয়। দোষ আসলে আমাদের ক্রীড়াবোধের। যে বোধটা তৈরিতে যাদের পথ দেখানোর কথা তারা বরং আরো বেশি পথ হারানো। পথহারাদের দেখানো পথে চলে মানুষের সঙ্গে দেশের খেলার তৈরি হয় দুঃখজনক দূরত্ব। এবং শেষ বিচারে এর ফলেই কোনো কিছুতেই ঠিক দাঁড়ানো যায় না। সেটা নিয়ে আবার হৈচৈ হয় খুব। কেন হারলাম? কেন পরের প্রজন্ম তৈরি হচ্ছে না? কেন র‌্যাংকিংয়ে অত পেছনে? ওই যে, রোগ ধরা পড়লে সবাই ডাক্তার। অথচ অপুষ্টি-অখাদ্যই যে এর মূলে এবং তাতে যে আমাদের প্রত্যেকেরই অল্প-বিস্তর অবদান রয়েছে সেটা কেউ দেখতে চাই না। 

এবং এই যখন অবস্থা, যখন ঘরোয়া খেলা নিয়ে ন্যূনতম আগ্রহ নেই, যখন দেশের ফুটবল দেখানোর জন্য তপস্যা করতে হয় তখনই অদ্ভুত কাণ্ড। ফুটবল ফেডারেশনের নির্বাচন নিয়ে ফেসবুকে প্রায় ইউরোপিয়ান ফুটবলের উন্মাদনার সমতুল্য আওয়াজ। আমরা ফুটবল ফেডারেশনের নির্বাচনের প্রার্থীদের নিয়ে খুব নিন্দা করি। খেলা নিয়ে কোনো ভাবনা নেই, অথচ নির্বাচন এলে এত জোরে দামামা বাজে! এবার তো দেখছি সেই একই অপরাধে আমরাও দায়ী। কই আমরাও তো ফুটবল দেখতে মাঠে যাই না। কিন্তু নির্বাচনের সময় ঠিকই অমুককে হঠাও, তমুককে জেতাও স্লোগানে দিন-রাত এক করে দিচ্ছি। তাদের জন্য একটা সুপরামর্শ। নির্বাচনে যে-ই জিতুক ফুটবলের উন্নতি হবে না, করার মতো সামর্থ্যবান-দূরদর্শী কাউকে দেখি না। তবু একটা আশা দেখতে পাই। এই আওয়াজধারীদের দেখেই আশা। যদি এরা মাঠে যায়... ম্যাচ দেখে... তাহলেই হয়ে যাবে। দর্শক থাকলে খেলোয়াড়দের উত্তেজনা থাকবে। কর্তাদের চাপ থাকবে। স্পন্সরদের লোভ থাকবে। ব্যস, সমাধান। এটা রকেট বিজ্ঞান না। তুচ্ছ সাধারণ জ্ঞান।

ও, হ্যাঁ, যে বা যাঁরা নির্বাচন করছেন, ওদের নিয়ে আশা করি না এ জন্য যে সেই আন্তর্জাতিক সাফল্য-সেই র‌্যাংকিং এসব ক্যাসেট বাজাচ্ছেন। যেদিন কেউ সাহস করে বলবে, র‌্যাংকিং-সাফল্য ওসব চুলোয় ফেলে আমি ঘরোয়া খেলায় গুরুত্ব দেব। মানুষ, খেলা আর আনন্দ—এই তিনকে নিয়ে আমার মিশন, সেদিনই বলব, ওয়েলকাম ম্যান।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা