kalerkantho

বুধবার । ৫ কার্তিক ১৪২৭। ২১ অক্টোবর ২০২০। ৩ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

ডাউন দ্য উইকেট

সাইদুজ্জামান   

২৪ সেপ্টেম্বর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



ডাউন দ্য উইকেট

আর কত দিন?

শোয়েব আলীকে অনেকেই চেনেন, ক্রিকেটের গ্যালারিতে বাঘের পোশাক পরে চিৎকার-চেঁচামেচি করেন। অতি সাধারণ একজন মানুষ। তবে প্রাণশক্তি তাঁর অফুরান। আমার তো মনে হয় চিন্তাশক্তিতেও অনেককে ছাড়িয়ে গেছেন টাইগার শোয়েব। সবাই যখন করোনা আক্রান্ত মানুষের সেবায় ডুবে, তখন অতি নগণ্য এক মোটর মেকানিক শোয়েব চলে গেছেন উত্তরবঙ্গে। পকেটে টাকা নেই তো কী, ফেসবুক লাইভ করে ‘ডোনার’দের নজর কেড়েছেন। গতকালও দেখলাম সেই অর্থে বন্যার্ত মানুষের মাঝে খিচুড়ি বিতরণ করছেন শোয়েব।

আমাদের মনে আর বিশ্বাস-টিশ্বাস বলে কিছু নেই, ভালো কাজের পেছনেও উদ্দেশ্য খুঁজি। এই যেমন সাহায্যকারীদের ফান্ড শোয়েব ঠিকঠাক ব্যবহার করছেন, নাকি আংশিক মেরেটেরে দিচ্ছেন—এমন প্রশ্নও উঠেছে। আমার কাছে তো প্রমাণ নেই। তবে প্রায় প্রতিদিন বুক সমান পানি ঠেলে শোয়েব আলী যেভাবে ঘরে ঘরে খাবার পৌঁছে দিচ্ছেন, তাতেই আমি আপ্লুত। এই সীমাহীন কষ্ট যিনি করতে পারেন, তাঁকে সন্দেহ করতে আমি খুবই সংকোচ বোধ করি। বরং শোয়েবের দেওয়া খাবারের প্যাকেট হাতে পেয়ে ভাসমান মানুষগুলোর মুখের হাসি দেখে মন ভালো হয়ে যায়।

আচ্ছা, শোয়েব আলীর করোনা হয়নি? করোনার ভয় নেই? পূর্বপরিচয় থেকে বলে দিতে পারি, উত্তরটা কী হবে; আকর্ণ হাসি!

এভাবেই তাঁকে হাসতে দেখেছিলাম ২০১৩ সালে। তখন দেশের ক্রিকেট মানচিত্রে শোয়েব নবাগত। যথারীতি অনেকেই সন্দেহের চোখে তাকান শরীরে বাঘের রেখা এঁকে গ্যালারিতে ‘বাংলাদেশ’, ‘বাংলাদেশ’ অবিরাম স্লোগান তুলে যাওয়া শোয়েবকে। ধান্দা আছে নিশ্চয়! তবে সে বছর হারারেতে টিম হোটেলের রেস্টুরেন্টে শোয়েবকে ব্রেকফাস্ট করতে দেখে ‘ধান্দা’টা ঠিক ধরে ফেললামও, বিদেশ ট্যুরের জন্য এত খাটাখাটনি!

আমি ভুল ভেবেছিলাম। এরপর শোয়েব অনেক দেশ ঘুরেছেন, কিন্তু কোনো দেশে থেকে যাননি, কারো ঘাড়ও মটকাননি। পরিচিতি দিয়ে পৃষ্ঠপোষক ম্যানেজ করে বাংলাদেশ দলের সঙ্গে ঘুরেছেন। আবার ফিরে এসে গ্যারেজের চাকরিতেই ফিরে গেছেন। তাঁর ক্রিকেটপ্রেম তাই প্রমাণিত। এ নিয়ে দেশে-বিদেশে বিস্তর লেখালেখিও হয়েছে।

তবে এ নিয়ে আমার খুব বেশি উচ্ছ্বাস নেই। বরং শুরুতে শোয়েবের যে দুটি গুণের কথা উল্লেখ করেছি, সে দুটিই তাঁর প্রতি আমার শ্রদ্ধাবোধের কারণ—প্রাণশক্তি ও চিন্তাশক্তি।

প্রাণশক্তির একটা উদাহরণ সবার আগে দেওয়া জরুরি। ওই ঘটনার পরই শোয়েব আলীর প্রতি আগ্রহ বেড়েছিল আমার। ২০১৩ সালে বাংলাদেশ দলসহ আমরা পৌঁছে যাওয়ার দিন দুয়েক পরে শোয়েবকে আবিষ্কার করি ব্রেকফাস্টের সময়। ঢাকা থেকে হারারেতে পা রাখার ‘রোমহর্ষক’ কাহিনিতে বুঝে ফেলি, একে রুখবে কে! ঘটনা হলো, জিম্বাবুয়ে অন অ্যারাইভাল ভিসা দেয়। তবে সেটার জন্য দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের লিখিত অনুমতি লাগে। শোয়েব অতশত জানতেন না। জানতে পারেন হারারেতে প্লেন ল্যান্ড করার আগে আগে। বোর্ডিং ব্রিজেই ইমিগ্রেশন পুলিশ দাঁড়িয়ে ছিল শোয়েবকে ফিরতি ফ্লাইটে তুলে দিতে। বুঝতে পেরে বোর্ডিং ব্রিজেই অজ্ঞান হয়ে পড়েন তিনি। সেখান থেকে হাসপাতাল। আর হাসপাতালে গিয়ে মুচলেকা দিয়ে শোয়েবকে টিম হোটেলে নিয়ে আসেন ওই সফরের শেফ দ্য মিশন আহমেদ সাজ্জাদুল আলম ববি। আধমরার ভান করে গোটা দুয়েক ইঞ্জেকশন নিতেও ভয় করেনি শোয়েবের! ফিজিওর ব্যবহারের জন্য বাড়তি রুম থাকে। সেটাতেই টিম বয়ের সঙ্গে থেকেছেন শোয়েব। যা জুটেছে, তা-ই খেয়ে বলেছেন, ‘আলহামদুলিল্লাহ!’

শোয়েবের চিন্তাশক্তির ব্যাপারটা দেখুন। সারা বিশ্বের সঙ্গে বাংলাদেশও কেঁপে ওঠে করোনা আতঙ্কে। অজানা এ রোগের ধাক্কায় সবাই লকডাউনে। নিরন্নের আহার জোগাতে তামিম ইকবাল, মাশরাফি বিন মর্তুজা, সাকিব আল হাসান, মুশফিকুর রহিমের মতো নামিদের পাশাপাশি নাজমুল হোসেন অপুদের মতো অনেকেই চ্যারিটিতে ঝাঁপিয়েছেন। অবশ্যই সাধুবাদ প্রাপ্য তাঁদের। ঠিক সে সময় ঘটনাচক্রে উত্তরবঙ্গে শোয়েব। হঠাৎ করেই ভাবলেন, করোনা সংকট মোকাবেলায় ঝাঁপিয়ে পড়েছে পুরো বিশ্ব। তাতে বন্যার্তদের ভাগে সমবেদনা জুটছে কম। সেই ভাবনা থেকে পকেটের ক্ষুদ্র সঞ্চয় দিয়ে শুরু করা শোয়েব এখন নিয়মিত বিকাশে অর্থসাহায্য পাচ্ছেন এবং সে অর্থে সাধ্যের মধ্যে বন্যার্তদের মাঝে খাবার বিতরণ করছেন। হুম, করোনার ঝুঁকি মাথায় নিয়েই। ধন্যবাদ শোয়েব আলী, গ্যালারি থেকে আপনার সমর্থনের চেয়ে এখন যে কাজটি করছেন, সেটি অনেক বেশি অর্থপূর্ণ জানবেন।

শোয়েবকে নিয়ে এত কিছু বলার আরেকটি কারণ অবশ্যই আছে। এবং সেটি ক্রিকেট সম্পর্কিতই। সেই ১৬ মার্চ থেকে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের অধীনে ক্রিকেট বন্ধ আছে সংগত কারণেই। করোনাভাইরাসের সংক্রমণ থেকে খেলোয়াড়দের বাঁচাতেই এ সতর্কতা। তবু এর মধ্যে কয়েকজনের নমুনায় ভাইরাস ধরা পড়েছে। যদিও নানাবিধ সতর্কতা মেনেই আক্রান্তরা প্র্যাকটিস করেছেন। এখন যাঁরা স্কিল ট্রেনিং করছেন, তাঁদের মধ্যেও অদূর ভবিষ্যতে কেউ আক্রান্ত হতে পারেন। কভিড-১৯ এর চরিত্রটাই কেমন যেন, উন্মুক্ত চলাফেরার পরও শোয়েবের কভিড-১৯ হয় না কিংবা তিনি জানতে পারেন না। অথচ যাবতীয় সুরক্ষাব্যূহ ভেদ করে করোনাভাইরাস ঢুকে পড়ে আবু জায়েদ রাহির দেহে!

এটা শুধু যে ক্রিকেটে হচ্ছে তা নয়, ইউরোপের ফুটবল দল থেকে শুরু করে দূরের বাংলাদেশে যাবতীয় সতর্কতা মেনে চলা সাধারণ মানুষকেও ছুঁয়ে দিচ্ছে করোনাভাইরাস। কে জানে, এমন পরিস্থিতির কারণেই কিনা ভাবনার মোড় বদলাতে শুরু করেছে ক্রিকেট-সংশ্লিষ্টদেরও। করোনা শুনলে যাঁরা শুরুতে ১১ হাজার ভোল্টেজে শক খাওয়ার মতো শিউরে উঠতেন, তাঁরাও বলেন আজকাল, ‘এভাবে আর কত দিন। করোনা একদিন সবারই হবে। আর বসে থাকা যায় না।’

উপায়ও নেই। স্বয়ং সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, করোনার দ্বিতীয় ঢেউ আছড়ে পড়লেও আর লকডাউন নয়। অর্থনীতি পঙ্গু হলে তো যাবতীয় সুরক্ষাই অর্থহীন। তেমনি ক্রিকেটের আর্থিক পাইপলাইনও সংকুচিত হতে চলেছে। গত সাত মাসে আয় নেই এক কানাকড়িও। তবু যথাসময়ে যাবতীয় বোনাস এবং দাক্ষিণ্য করে গেছে বিসিবি। কিন্তু এখন আর দাক্ষিণ্য দেখাচ্ছে না সংস্থাটি। তেমনি শুরুতে মুক্ত হস্তে দান করে যাওয়া ক্রিকেটারদের চ্যারিটির খবর কমেছে। সাধারণ মানুষও আজকাল আর প্রতিবেশীর খোঁজখবর নিচ্ছে না। ফেসবুকে জনসেবার লাইভ আর চোখে পড়ে না। এটাই স্বাভাবিক। সঞ্চয় ভেঙে ভেঙে চ্যারিটি আর কদ্দিন?

দুর্দশার বৈশ্বিক এ মানচিত্রে বাংলাদেশ ক্রিকেটের অবস্থা শোচনীয়। ঘটনাচক্রে মনে হচ্ছে পরিস্থিতি না বদলালে বিশ্বের আর কোনো দেশ বাংলাদেশ দলকে সাদরে গ্রহণ করবে না। নিজেদের করোনা নিরাপদ প্রমাণ করারও দৃশ্যত কোনো উদ্যোগ নেই বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের। নিজেদের নিরাপদ প্রমাণ করার একটাই উপায় বিসিবির সামনে— ঘরোয়া ক্রিকেট আয়োজন। কর্তাব্যক্তিদের কথাবার্তায় বোঝা যায়, শ্রীলঙ্কা সফরের আশা-ভরসার মতোই দুলছে সেটির সম্ভাবনা। মমিনুল হকরা শ্রীলঙ্কায় গেলে তালাবদ্ধই থাকবে ঘরোয়া ক্রিকেট। সফরটি না হলেই শুধু খোলা হবে সেই তালা।

তখন হয়তো শোয়েব আলী ফিরবেন ঢাকায়। তাঁর ফেরাটা মোটেও জরুরি নয়, জরুরি বাংলাদেশের ক্রিকেট মাঠকে নিরাপদ প্রমাণ করা। অন্যথায় চ্যারিটি করেও দেশের ক্রিকেটকে বাঁচানো যাবে না!

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা