kalerkantho

শুক্রবার । ৩০ শ্রাবণ ১৪২৭। ১৪ আগস্ট ২০২০ । ২৩ জিলহজ ১৪৪১

‘মনের বাঘ’ বনে পাঠানোর দাওয়াই

মাসুদ পারভেজ   

১৩ জুলাই, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



‘মনের বাঘ’ বনে পাঠানোর দাওয়াই

ব্যাটিংয়ে নামছেন কোনো একজন ব্যাটসম্যান। ড্রেসিংরুমের দরজার সামনে বসে থাকা ম্যানেজার খালেদ মাহমুদ তাঁকে শুধু ‘গুডলাক’ বললেন। কিন্তু তাঁর জানানো শুভ কামনাই যে ওই ব্যাটসম্যানের কাছে দুর্ভাগ্যের সনদ হয়ে উঠবে, মাহমুদের বোধ হয় আজও তা অজানাই!

২০১৯ বিশ্বকাপে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে নিজেদের প্রথম ম্যাচে দ্রুতই আউট হওয়া ওই ব্যাটসম্যান মনে করে বসলেন, মাহমুদের মুখে ‘গুডলাক’ শোনাই তাঁর ভাগ্য বিড়ম্বনার কারণ। ব্যস, পরের ম্যাচ থেকে ব্যাটিংয়ে নামার আগে ম্যানেজারের অবস্থান চিহ্নিত করার বাড়তি দায়িত্বও চাপিয়ে নিলেন নিজের পিঠে। কিন্তু মাহমুদ ম্যানেজার যখন, তখন দলের কাছাকাছিই থাকেন। একেবারে সামনাসামনি না থাকলেও দূর থেকে ‘গুডলাক’ বলতেও ভোলেন না। আর বলা মাত্রই ওই ব্যাটসম্যান ধরে নিতেন, ‘আজও গেলাম!’

সত্যি সত্যিই তিনি উইকেটে গিয়ে বেশিক্ষণ স্থায়ী হতে পারতেনও না। আসরজুড়ে রানে ফিরতে মরিয়া ব্যাটসম্যান এভাবেই নিজের তৈরি করা কুসংস্কারে ডুবে থেকে হারিয়ে খুঁজেছেন নিজেকে। মাঠে নামার আগেই অদৃশ্য এক ঘাতক কল্পনায় দাঁড় করিয়ে গেছেন। যে ঘাতক তাঁর নিজ সামর্থ্যের ওপর আস্থাও গিলে খেয়েছে প্রতিনিয়ত। করোনা-পরবর্তী পৃথিবীতে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ফেরার আগে তাই এই মানসিক রোগেরও দাওয়াই দরকার বাংলাদেশ দলের নির্দিষ্ট সেই ব্যাটসম্যান কিংবা তাঁর মতো কারো। যাঁদের শেষ করতে প্রতিপক্ষের বোলার লাগে না। ‘মনের বাঘ’ই তাঁদের আত্মঘাতী বানিয়ে ছাড়ে!

২০১৯ বিশ্বকাপে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে নিজেদের প্রথম ম্যাচে দ্রুতই আউট হওয়া ওই ব্যাটসম্যান মনে করে বসলেন, মাহমুদের মুখে গুডলাক শোনাই তাঁর ভাগ্য বিড়ম্বনার কারণ।

এ রকম মনোরোগে নিজের খেলোয়াড়ি জীবনে আক্রান্ত হতেন হাবিবুল বাশারও। কাজেই এই সাবেক অধিনায়কের কাছেও এর চিকিৎসা থাকবে না স্বাভাবিক, ‘‘আপনি যে ঘটনাটির কথা বললেন, ঘটনাচক্রে সেটি আমার কানেও এসেছে। আমি নিজেও একসময় ‘গুডলাক’ বলতাম। একদিন খেয়াল করলাম, ওটা বলার পর ব্যাটসম্যান রান করেনি। পরের দিন আরেকজনকে বলেও দেখলাম রান করছে না। পরে নিজে থেকেই কাউকে ওটা বলা বাদ দিলাম।’’ এই নির্বাচক বরং মনে করেন, নিজের মনে চেপে না রেখে ওই ব্যাটসম্যান বিষয়টি নিয়ে মাহমুদের সঙ্গে আলাপেই সমাধান বের করতে পারতেন, ‘আমার মতে ওই খেলোয়াড়ের ম্যানেজারকে বিষয়টি খুলে বলা দরকার ছিল। সুজন ভাই (মাহমুদ) নিজেও খেলোয়াড় ছিলেন। কাজেই আমি নিশ্চিত উনি মন খারাপ করতেন না। ড্রেসিংরুমে সবাই কোনো না কোনো সংস্কারে বিশ্বাস করে। কেউ তা নিয়ে হাসি-ঠাট্টা করে না। সবাই সবার সংস্কারকে শ্রদ্ধাই করে।’

তাতে ক্ষণিকের সমাধান বের হতো, কিন্তু নিজের তৈরি করা জীবাণু থেকে যেত বলে মানেন হাবিবুলও। সেটি নিঃশেষ করার জন্য স্থায়ী মনোবিদের প্রয়োজনীয়তাই অনুভব করেন তিনি, ‘মানসিক সমস্যা কিন্তু সব সময়ই তৈরি হতে পারে। সেই সময় কাউকে পাশে পেলে ভালো হয়। এ জন্য স্থায়ী মনোবিদ থাকা দরকার।’ বাংলাদেশে অবশ্য মাঝেমধ্যেই আনা হয় মনোবিদ। কিছুদিনের মধ্যে মনোবিদের ক্লাসে বসানোর কথা অনূর্ধ্ব-১৯ ও নারী দলের ক্রিকেটারদেরও। সুফল পেলে পর্যায়ক্রমে জাতীয় দলের ক্রিকেটারদেরও আনা হবে এর আওতায়। আপাতত আওতার বাইরে থাকা জাতীয় ক্রিকেটারের মানসিক সমস্যায় বড় মঞ্চে তাঁর আক্রান্ত হওয়ার গল্প তো শুনলেনই। যেটিকে গুরুতর সমস্যাই মনে করেন কানাডাপ্রবাসী পারফরম্যান্স সাইকোলজি কোচ আলী খান, ‘সমস্যাটি খুবই ক্ষমতাধর। এটি আপনার মানসিকতা, প্রত্যাশা এবং আত্মবিশ্বাসকেও প্রভাবিত করে। এত কষ্টের পারফরম্যান্স, এত সাধনায় তৈরি করা দক্ষতা কারো ছোট্ট একটি কথায় চলে যাবে? দেখুন, বিশ্বাসের কত শক্তি।’ সেই শক্তি খর্ব করার উপায়ও বাতলে দিলেন আগেও বাংলাদেশ দলের সঙ্গে কাজ করা এই মনোবিদ, ‘কুসংস্কার একধরনের নেতিবাচক বিশ্বাস ছাড়া আর কিছুই নয়। এটি তাড়ানোর জন্য শুধুই ইতিবাচক কথা বললে হয় না। এটি ব্যক্তির অবচেতন মনে গেড়ে বসে থাকে। সেখান থেকে উপড়ে ফেলতে হলে আপনার কুশলী হওয়া প্রয়োজন। পরিস্থিতি ও ব্যক্তির ওপর নির্ভর করে ভিন্ন ভিন্ন থেরাপি দেওয়া হয় এবং ভবিষ্যতে যাতে এ রকম জিনিসকে সে পাত্তা না দেয়, সে জন্য আমরা তাকে সচেতন ও শিক্ষিত করি।’

তাতে যদি ‘মনের বাঘ’কে বনে পাঠানো যায়!

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা