kalerkantho

মঙ্গলবার  । ২০ শ্রাবণ ১৪২৭। ৪ আগস্ট  ২০২০। ১৩ জিলহজ ১৪৪১

বিদেশি নিষিদ্ধের চিন্তায় বিস্ময়

১২ জুলাই, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



বিদেশি নিষিদ্ধের চিন্তায় বিস্ময়

ক্রীড়া প্রতিবেদক : ঘরোয়া ফুটবলকে বিদেশিমুক্ত করলেই জাতীয় দলের জন্য স্ট্রাইকার তৈরি হবে। দেশি ফুটবলাররা গোল পাবে এবং জাতীয় দল জিতবেও নিয়মিত—এমন অভিমত ফুটবল সংগঠক তরফদার রুহুল আমিনের, বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের (বাফুফে) আগামী নির্বাচনী রেসে যাঁর নাম শোনা যাচ্ছে বেশ জোরেশোরে। তবে তাঁর এ অভিমত শুনে ফুটবলাঙ্গনের অনেকের মনেই প্রশ্ন; প্রতিদ্বন্দ্বিতার পথ বন্ধ করে কি আদৌ শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী তৈরি করা যায়?

পরশু রাতে এক অনলাইন টক-শোতে বাফুফে নির্বাচন সামনে রেখে মুখোমুখি হয়েছিলেন চট্টগ্রাম আবাহনীর ফুটবল কমিটির চেয়ারম্যান তরফদার রুহুল আমিন ও বাফুফের পেশাদার লিগ কমিটির চেয়ারম্যান সালাম মুর্শেদী। একপর্যায়ে রুহুল আমিন আগামী মৌসুমে বিদেশি ফুটবলার পুরোপুরি নিষিদ্ধ করার পরামর্শ দেন লিগ কমিটির চেয়ারম্যানকে। এএফসি কাপকে অধিক গুরুত্ব না দিয়ে তিনি জাতীয় দলের সাফল্যের রাস্তা খুঁজছেন ঘরোয়া ফুটবলকে বিদেশিমুক্ত করে। ফুটবল নিয়ে তাঁর এই ভাবনা দেখে অনেকে হতাশ হয়েছেন। বসুন্ধরা কিংসের প্রেসিডেন্ট ইমরুল হাসান একজন ক্লাব সংগঠকের কাছে এটা আশা করেননি, ‘তরফদার ভাই সজ্জন ব্যক্তি। ফুটবলের উন্নয়নে কাজ করছেন। কিন্তু এই ফুটবল বিশ্বায়নের যুগে বিদেশি বন্ধ করে দেওয়ার মতো নেতিবাচক চিন্তা আমি তাঁর কাছে আশা করিনি। কে বা কারা তাঁকে পরামর্শ দিচ্ছেন, আমি জানি না। তবে এটা ফুটবলের জন্য আত্মঘাতী চিন্তা।’ লিগে বিদেশি নিষিদ্ধ করাই যদি আন্তর্জাতিক ফুটবলে ভালো করার চাবিকাঠি হতো, তবে সেটা ইংল্যান্ডই আগে করত। সেই ১৯৬৬ সালের পর তারা আর বিশ্বকাপের স্বাদ পায়নি। তাই বলে তারা ‘বহুজাতিক’ ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগ তো বন্ধ করেনি, বরং এর ওপরই ভরসা রাখছে দীর্ঘ ৫৪ বছরের অতৃপ্ত ইংলিশ ফুটবল। বিরক্তিকর ইংলিশ ফুটবলেও রং লেগেছে বিদেশিদের ছোঁয়ায়।

কিংস প্রেসিডেন্ট ইমরুল হাসানের কাছে ঘরোয়া ফুটবলেরও যুক্তি আছে, ‘বিদেশি ফুটবলাররা সমস্যা হলে জীবন ও মতিন সর্বশেষ লিগে ২৮ গোল করে কিভাবে? এতগুলো গোল যখন ওরা করেছে তখন মানতে হবে তাদের গোল করার দক্ষতা আছে। কিন্তু জাতীয় দলে গোল না পাওয়ার কারণ ভিন্ন। জাতীয় দল গোল করার খেলা খেলে না, গোল ঠেকানোর খেলা খেলে। তা ছাড়া দলের একাদশ নির্বাচনে কোচ বাদে অন্যদের অযাচিত হস্তক্ষেপের কারণে ফল ভালো হয় না।’

২০১৮-১৯ মৌসুমে জাতীয় দলে আবাহনীর নাবিব নেওয়াজ জীবন দলের দুই বিদেশি ফরোয়ার্ডের সঙ্গে লড়ে করেছেন ১৭ গোল। ওদিকে বসুন্ধরা কিংসের হয়ে ১১ গোল করা মতিন মিয়া লড়েছেন বিশ্বকাপার ড্যানিয়েল কলিনড্রেস ও ব্রাজিলিয়ান স্ট্রাইকার মার্কোস ভিনিসিয়াসের সঙ্গে। বিদেশিদের ভিড়েও উজ্জ্বল এই দুই দেশি ফরোয়ার্ড। বোতলে ছিপি মেরে আটকে রাখা যায় না ফুটবল সুরভি, সামর্থ্য থাকলে সুরভি ছড়াবেই। তাই ব্রাদার্সের সাবেক ফুটবলার ও এখনকার ম্যানেজার আমের খানের চোখে বিদেশি বাদ দেওয়ার প্রস্তাব একদম অযৌক্তিক, ‘আধুনিক ফুটবলের সঙ্গে এই চিন্তা একদম যায় না। এখন বসুন্ধরা কিংসের সুবাদে কলিনড্রেস, বারকোসের মতো চমৎকার খেলোয়াড়দের খেলা দেখার সুযোগ পাচ্ছি, তার আগে রাসেলের সনি নর্দে আমাদের আনন্দ দিয়েছে। এ রকম আকর্ষণীয় ফুটবলার ছাড়া লিগ জমে না। আমাদের সময়ও বিদেশি ছিল, তাদের সঙ্গে আমরা লড়াই করে খেলিনি! নালজেগারদের সঙ্গে খেলে নকীব সেরা গোলদাতা হয়নি?’ একদা প্রেমলালের সঙ্গে খেলা আসলামের গোলেও কিন্তু ভাটা পড়েনি।

মুক্তিযোদ্ধার ম্যানেজার আরিফুল ইসলামের পছন্দ হয়নি বিদেশিহীন মৌসুমের প্রস্তাব। উল্টো এতে করে ক্লাবগুলোর দল গড়া কঠিন হয়ে যাবে বলে মনে করছেন তিনি, ‘বিদেশি বন্ধ করে দিলে ক্লাবগুলো বেশি ভুগবে। আমাদের মতো দলগুলো টাকার অভাবে এখন জাতীয় দলের ফুটবলার নিতে পারি না, তাদের দাম ৪০-৫০ লাখের নিচে নয়। কিন্তু সেই মানের কিংবা তার চেয়ে একটু ভালো মানের বিদেশি পাই ২৫-৩০ লাখ টাকায়।’ তা ছাড়া বিদেশি বন্ধ করে দিলে ৪০ লাখের দেশি ফুটবলার এক কোটিও হাঁকিয়ে বসতে পারেন! আরিফুল তাই  সমাধান খোঁজেন এভাবে, ‘প্রিমিয়ারের নিচের লিগগুলো, জেলা লিগগুলোর প্রতি ফেডারেশনের মনোযোগী হতে হবে। বছরে ৬৪ জেলা থেকে অন্তত ৬৪ জন সেরা ফুটবলার ঢাকায় এলে খেলোয়াড়ের ঘাটতি থাকে না।’ আমের খান মনে করেন, ‘নিচের লিগগুলোতে কোনো লড়াই নেই, ওরকম প্রতিদ্বন্দ্বিতা নেই। তৃতীয় থেকে প্রথম বিভাগ পর্যন্ত তিন-চার বছর প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ফুটবল খেলে একজন স্ট্রাইকার ধারাবাহিকভাবে গোল করুক। এরপর প্রিমিয়ারে অবশ্যই তাকে নিয়ে কাড়াকাড়ি হবে।’

ফুটবলার তৈরির জায়গা নিচের লিগগুলো, কিন্তু সেখানে হয় পাতানো খেলার মহোৎসব। তাই কাড়াকাড়ি পড়ার মতো প্রতিভারও জন্ম হয় না। গলদ আসলে গোড়ায়, ওপরে বিদেশি ছেঁটে কি আদৌ কোনো লাভ হবে?

মন্তব্য