kalerkantho

রবিবার। ২৫ শ্রাবণ ১৪২৭। ৯ আগস্ট ২০২০ । ১৮ জিলহজ ১৪৪১

প্লাবিত জনপদে শূন্য ভাতের থালায়...

মাসুদ পারভেজ   

৬ জুলাই, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৩ মিনিটে



প্লাবিত জনপদে শূন্য ভাতের থালায়...

প্লাবিত জনপদের ক্ষুধার্ত সেইসব মানুষের শূন্য ভাতের থালায় দুমুঠো খাবার তুলে দিতেই সেখানকার নোনাজলকে আপন করে নিয়েছেন এক পোশাকি ‘টাইগার’। বাঘের ডোরাকাটা ছাপ দেওয়া পোশাক শোয়েবের শরীরেরই অংশ হয়ে গেছে এখন।

বাঘের থাবায় ক্ষতবিক্ষত মানুষের গল্প শুনে শুনে বড় হয়েছেন তিনি। এখন সুন্দরবন উপকূলের প্রত্যন্ত অঞ্চলের গ্রামে গ্রামে পৌঁছে গিয়ে আরেক ‘টাইগার’ দেখছেন, হিংস্র শ্বাপদের চেয়েও ভয়ংকর বিভীষিকা ধারালো নখ বসায় সেখানকার মানুষের জীবনে!

নিয়মিত বিরতিতেই আসে সে আঘাত। একেকবার একেক নাম নিয়ে। কিছুদিন আগে যেমন এসেছিল ‘আম্ফান’ নামের এক ঘূর্ণিঝড়। সেটি চলে গেলেও রেখে গেছে ধ্বংসের চিহ্ন। কারো ঘরের চালা উড়ে গেছে তো কারো ঘরই ঝড়ে বিলীন। ঝড়ের পর তবু মানুষ ঘুরে দাঁড়ায়। চাষাবাদে খুঁজে নেয় জীবন-জীবিকার নতুন আশ্রয়। কিন্তু খুলনার কয়রা সদর ইউনিয়নের গোবরা, ঘাটাখালি, হরিণখোলাসহ অন্যান্য গ্রামের বাসিন্দাদের নেই সেই উপায়ও। ঝড়ে ভেঙে যাওয়া বাঁধ মেরামতের উদ্যোগ নেই এখনো। তাই প্রতিটি জোয়ারেই আবার নতুন করে তলিয়ে যাচ্ছে গ্রাম। এর পরও বেঁচে থাকার সংগ্রামে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে আছে খাবারের সুতীব্র সংকট।

প্লাবিত জনপদের ক্ষুধার্ত সেইসব মানুষের শূন্য ভাতের থালায় দুমুঠো খাবার তুলে দিতেই সেখানকার নোনাজলকে আপন করে নিয়েছেন এক পোশাকি ‘টাইগার’। বাঘের ডোরাকাটা ছাপ দেওয়া পোশাক যাঁর শরীরেরই অংশ হয়ে গেছে এখন। তামিম-সাকিব-মুশফিক নামের টাইগারদের মতো বিত্তবানও তিনি নন। বরং অনেক জায়গায় চেয়ে-চিন্তে বিদেশের গ্যালারিতে বসে বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের জন্য গলা ফাটানোর অর্থের সংস্থান করতে হয় তাঁকে। বিত্তহীন হলেও হৃদয়বান সেই মানুষটি ট্রেডমার্ক ‘টাইগার’ সমর্থক শোয়েব আলী।

কয়রা লঞ্চঘাট থেকে প্রতিদিনই রান্না করা খাবারের বিশাল হাঁড়ি নিয়ে নৌকা ভাসাচ্ছেন। বিপন্ন মানুষের প্লাবিত উঠানে কোমরজলে ডুবে বিলাচ্ছেন খাবার। তাতে হওয়া শারীরিক ক্ষয়ক্ষতিও খুব সামান্যই মনে হচ্ছে পীড়িত মানুষের পাশে দাঁড়াতে পারার আনন্দের তুলনায়, ‘নোনাজলে দুই পায়ে ফোস্কা পড়ে গেছে। মানুষের ক্ষুধা নিবারণের খুশির কাছে এটা কিছুই নয়।’

তাঁর এ রকম সামাজিক কর্মকাণ্ডের শুরু অবশ্য বাংলাদেশে করোনা থাবা বসানোর পর থেকেই। ঢাকার নিম্ন আয়ের অসহায় মানুষের মাঝে খাবার সরবরাহের মাধ্যমে শুরুর পর একপর্যায়ে ঠেকেও যান। কিন্তু বিশ্বাস ছিল একটি পথ বন্ধ হলেও আরেকটি খুলে যাবে।

খুলে যায়ও, ‘আমি আর আমার বন্ধু নুরু মিলে শুরু করলেও একসময় খরচে আর কুলাতে পারছিলাম না। ফেসবুকে সাহায্য চেয়ে স্ট্যাটাস দিই বাধ্য হয়েই।’ অভাবনীয় সাড়া পান। বলা নিষেধ হলেও শোয়েব কারো কারো নাম না নিয়ে পারলেনও না, ‘ইশতিয়াক ভাই (বিপিএল ফ্র্যাঞ্চাইজি রংপুর রাইডার্সের প্রধান নির্বাহী ইশতিয়াক সাদেক) প্রতিদিন ৫০০-৭০০-৮০০ মানুষের জন্য রান্না করা খাবার পাঠাতেন। এখানেও (খুলনার কয়রায়) উনি শ’পাঁচেক প্যাকেট খাদ্যসামগ্রী পাঠিয়েছেন।’

আরো অনেকের পরিচয় শোয়েবের জানাও নেই, ‘অনেকেই বিকাশে টাকা পাঠাচ্ছেন, কিন্তু তারা কারা, আমি জানি না।’ এবার শুনে নেওয়া যাক ঝড়ে বিধ্বস্ত অঞ্চলেই পড়ে থাকার কারণ, ‘উবার চালানোর জন্য বন্ধুর কাছ থেকে ধারে কেনা গাড়ি আর দুজনের কাছ থেকে ঈদ উপহার হিসেবে পাওয়া ১০ হাজার টাকা নিয়ে ঈদুল ফিতরের পরদিন রওনা হই। ভেবেছিলাম আমার কাছে থাকা ৪০০ প্যাকেট খাবার বিলি করেই ফিরে যাব। কিন্তু এখানে এসে মানুষের কষ্ট দেখে আর ফিরে যেতে ইচ্ছা করছে না। সরকারি ত্রাণও আমি এখানে আসতে দেখিনি। ঠিক করেছি, একজন মানুষের খাবার কেনার টাকা থাকা পর্যন্ত আমি এখানেই রয়ে যাব।’

তাতে প্লাবিত জনপদের কারো না কারো শূন্য ভাতের থালা ভরানোর জন্যও কেউ থাকছেন। তা তিনি একজন হলেও!

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা