kalerkantho

শনিবার । ২৪ শ্রাবণ ১৪২৭। ৮ আগস্ট  ২০২০। ১৭ জিলহজ ১৪৪১

ফুটবলের অন্দরে ক্ষুধার জ্বালা

সনৎ বাবলা   

৪ জুলাই, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



ফুটবলের অন্দরে ক্ষুধার জ্বালা

ক্ষুধার জ্বালা কী ভয়ংকর! যন্ত্রণা সইতে না পেরে কেউ ভেবেছিলেন আত্মঘাতী হওয়ার কথা! কেউ বা শখের মোবাইল বিক্রি করে সংসার সামলাচ্ছেন। কোনো কোনো ফুটবলার হয়ে গেছেন দিনমজুর। চ্যাম্পিয়নশিপ লিগ, প্রথম বিভাগ, দ্বিতীয় বিভাগের আরো অতলে গেলে মিলবে হয়তো আরো মর্মান্তিক কাহিনি। এগুলো পাশাপাশি সাজালে স্পষ্ট হয়ে ওঠে ফুটবলে হাহাকারের ছবিটা। এটা ভেতরকার ছবি। প্রিমিয়ার লিগ ও জাতীয় দলের খেলোয়াড়দের সঙ্গে বাফুফের সভায় দেখা যায় ফুটবলের উপরিভাগটাই। সেটা তুলনামূলক ঝকমকে হলেও অন্দরে ভয়ংকর ক্ষুধার জ্বালা।

প্রিমিয়ার লিগের বাইরের ফুটবলারদের অবস্থা খুব করুণ। করোনার আকালে তাঁদের জীবন চরম সংকটের মুখে। তাই খালিশপুরের হাসান আল মামুন জীবন শেষ করে দেওয়ার চরম সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথাও ভেবেছিলেন! শেষ পর্যন্ত বিকল্প পেশা ইজি বাইকে তাঁর জীবনের চাকা কোনো রকমে ঘুরলেও চাঁপাইনবাবগঞ্জের রুবেল রহমান এখনো বিকল্প কিছু খুঁজে পাননি, ‘আমি অন্য কাজ খুঁজছি। কিন্তু লকডাউনে কাজ নেই কোথাও, চারদিকে অভাব। কী করব জানি না। তোফা চাচা (চাঁপাইনবাবগঞ্জ ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি) একটা তালিকা তৈরি করে ঢাকায় পাঠিয়েছিলেন, কিন্তু ফেডারেশন থেকে কোনো সাহায্য পাইনি।’ ফেডারেশনের দেওয়া একটা তালিকা অনুযায়ী ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী এক শ ফুটবলারকে দিয়েছেন ১০ হাজার টাকা করে সাহায্য। সে তালিকায় তিনি পড়েননি, তাঁর মতো অনেক ফুটবলারের নাম ছিল না। গত বছর ওয়ান্ডারার্সে খেলা এই ফুটবলারের সংসার চলত খেপ খেলে। ঢাকার বাইরে চট্টগ্রাম, যশোর, রাজশাহীসহ অন্যান্য জায়গায় খেপ খেলে তাঁর বছরে লাখ চারেক টাকা আয় হতো। মাঠে ফুটবল না ফেরা পর্যন্ত সেই আয়ের পথ রুদ্ধ।

ওদিকে দ্বিতীয় বিভাগের মোহন আকন্দের জীবনে করোনার সঙ্গে হানা দিয়েছিল আম্ফান। এই ঘূর্ণিঝড়ে সুন্দরবনের পাশে শ্যামনগর থানার তাঁদের সেই বাড়ি গুঁড়িয়ে গেছে। এখন সরকারি আশ্রয়কেন্দ্রে থাকলেও গৌরীপুর স্পোর্টিংয়ে খেলা এই ফরোয়ার্ড খাওয়ার টাকা জোগাড় করতে পারেন না, ‘প্রতিবন্ধী মা আর ছোট ভাইকে নিয়ে আমি খুব অসহায় অবস্থায় আছি। কোথাও যে কুলি-মজুরের কাজ করব, সেটাও খুঁজে পাই না। খাওয়ার টাকা জোগাড় করাই কঠিন হয়ে গেছে।’ আগে ফুটবলে ভর করে চলত মা-ছেলের ছোট জীবন। ঢাকায় দ্বিতীয় বিভাগ লিগের পাশাপাশি অন্যান্য জেলায় খেপের টাকায় খুব আয় না হলেও ১০-১৫ হাজার টাকায় মাস চলত। এখন কোচরা মাঝেমধ্যে সামান্য সাহায্য পাঠান। সর্বশেষ নিজের মোবাইল ফোনটা বিক্রি করেই খাওয়ার টাকা জোগাড় করেছেন, ‘কোচরা খবরাখবর নেন। দুদিন আগে পাঁচ হাজার টাকায় অ্যান্ড্রয়েড ফোনটা বিক্রি করেছি, এই টাকা দিয়ে আর কয়েক দিন যাবে।’ এরপর কিভাবে চলবে, তিনি জানেন না।

করোনায় ফুটবল চলে না, তাই থমকে গেছে ফুটবলারদের জীবনের চাকাও। এই অচলায়তনের খবরও রাখে না ফুটবল ফেডারেশন। চ্যাম্পিয়নশিপ লিগ থেকে শুরু করে তৃতীয় বিভাগ পর্যন্ত দেড় হাজার ফুটবলারের জীবনে ক্ষুধার জ্বালা প্রকট। প্রথম বিভাগের শাহজাহান সম্রাটের জীবনেও হানা দিয়েছে অভাব। আত্মসম্মানের ঢাল দিয়ে অভাবের জীবনকে কত দিন আড়াল করতে পারবেন জানেন না কসাইটুলি যুব সংঘের সম্রাট, ‘বউ-বাচ্চা নিয়ে সংসার আর চলে না। সামনে কী অপেক্ষা করছে জানি না। লোকলজ্জার কারণে অনেক কাজ করতেও পারি না।’ অথচ নারায়ণগঞ্জের এই মিডফিল্ডার দিচ্ছেন সঙ্গী-সাথিদের পেশা বদলের খবর, ‘আমাদের এখানকার বেশির ভাগ খেলোয়াড় কুমিল্লা, নরসিংদী, টাঙ্গাইল, গাজীপুরে খেপ খেলে জীবন চালাত। এতেই আমরা অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছিলাম। গত চার মাস ধরে কোনো খেলা না থাকায় সবার অবস্থা বেশ খারাপ। কেউ কেউ গার্মেন্টে দিনমজুরের কাজ করছে। নরসিংদীতে আমার কয়েকজন বন্ধু আম-লিচু বিক্রি করছে।’  

এসব ফুটবলারের জীবনে অভাব এমন আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে গেছে যে তাঁরা ফুটবল ছেড়ে হয়ে যাচ্ছেন দিনমজুর, ফল বিক্রেতা কিংবা রিকশাচালক! এ নিয়ে ফুটবল ফেডারেশনের কোনো ভাবনা-চিন্তা নেই। করোনার আকালে প্রতিটি ক্রীড়া ফেডারেশন তার খেলোয়াড়দের পাশে দাঁড়ালেও বাফুফে সেটা করেনি। তারা বলেছিল নিজেদের সংকটের কথা। সঙ্গে অবশ্য ফিফার করোনা ত্রাণের মুলা ঝুলিয়ে রেখেছিল। সেটা নেহাত কম নয়, ১০ লাখ ডলার দিচ্ছে ফিফা। এবার নিশ্চয়ই দুর্ভাগা ফুটবলারদের ভাগ্যে কিছু জুটবে। কিন্তু এই আশা করেন না সাতক্ষীরার মোহন, ‘শুনেছি ফিফার টাকা আসবে, তবে ওসব আমাদের পর্যন্ত আসে না।’ এটা শুধু একজনের কথা নয়, এই আশঙ্কা অনেকের। ফুটবলারদের ক্ষুধার জ্বালা কি তবে টের পায় না বাফুফে!

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা