kalerkantho

সোমবার  । ১৯ শ্রাবণ ১৪২৭। ৩ আগস্ট  ২০২০। ১২ জিলহজ ১৪৪১

চিন্তাটা এখন ভাত-কাপড়ের

সাইদুজ্জামান   

২ জুলাই, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



চিন্তাটা এখন ভাত-কাপড়ের

চার মাস হয়ে গেল ক্রিকেট বন্ধ। কবে মাঠে ফিরবে ক্রিকেট—সে রোডম্যাপও ঝাপসা। তাই ক্রিকেটই যাঁদের রুটি-রুজি, তাঁদের সিংহভাগই কর্মহীন এবং সেই সূত্রে উপার্জনহীন। গ্রেডিং অনুযায়ী দেশের সেরা আম্পায়ার শরফুদ্দৌলা ইবনে শহীদ সৈকত গতকাল দুপুরে টেলিফোনের অপর প্রান্ত থেকে দীর্ঘশ্বাস ফেলেন সে কারণেই, ‘বিশ্বাস করবেন কি না জানি না, শুয়ে শুয়ে ঠিক এ কথাটাই ভাবছিলাম।’

চট্টগ্রাম থেকে আফতাব আহমেদ কিংবা পাবনায় শ্বশুরালয়ে বসেও চিন্তিত ডলার মাহমুদ। সারা দেশের অগুনতি ক্রিকেট কোচের সংসার কী করে চলছে? এভাবে আরো কয়েক মাস ক্রিকেটের দরজা বন্ধ থাকলে তাঁদের আপাতসচ্ছল জীবনও বিপর্যয়ের মুখে পড়বে।

ক্রিকেট ম্যাচের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত স্কোরারদের অবস্থা আরো শোচনীয়। বিসিবির বেতন কাঠামোয় ক্রিকেটারদের মতো কোচ, আম্পায়ার এবং ম্যাচ রেফারিরা আছেন। কিন্তু স্কোরারদের উপার্জন পুরোপুরি ম্যাচভিত্তিক। ম্যাচ হলে পারিশ্রমিক আছে, না থাকলে নেই। স্কোরার খায়রুল আনাম ডালিমেরও ঠিক অভাবের সংসার নয়। ব্যক্তিগত ব্যবসা আছে, যদিও সেটি সিংহভাগ ব্যবসার মতোই করোনা-আক্রান্ত! অবশ্য তাঁর সংসার ঢিমেতালে হলেও চলছে। কিন্তু দেশব্যাপী সমগোত্রীয়দের, বিশেষ করে যাঁদের সংসার চলে স্কোরিং করে, তাঁদের নিয়ে দুর্ভাবনা আছে ডালিমেরও, ‘কিভাবে আর চলবে? বুঝতেই তো পারছেন।’

অথচ ক্রিকেট মৌসুম বাধাগ্রস্ত না হলে পর্দার আড়ালে পড়ে থাকা স্কোরারদের সংসারেও রং লাগত। ঢাকা প্রিমিয়ার লিগে একজনের ম্যাচপ্রতি ৫৩০০ টাকা (ম্যাচ ফি ৩৮০০ + দৈনিক ভাতা ১৫০০) বাংলাদেশের ক্রিকেট অর্থনীতিতে একেবারে কম নয়। জাতীয় লিগের ম্যাচ করলে অঙ্কটা দুয়ে মিলে হয় ২০৬০০ টাকা। বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগ এবং আন্তর্জাতিক ম্যাচ মিলিয়ে ভরা মৌসুমে যা আয় হয়, তা দিয়ে মেরেকেটে সংসার চালিয়ে নেওয়া যায়। আর চুক্তির ব্যাপার যখন নেই, তখন ডালিমের মতো অন্যদেরও এটা-ওটা করার স্বাধীনতা আছে। অনেকে সেটা করেনও। কিন্তু করোনার কারণে স্কোরারদের মূল আয়ের উত্সই এখন বন্ধ।

স্কোরারদের চেয়ে ম্যাচ রেফারি এবং আম্পায়ারদের ম্যাচ ফি বেশি। এঁদের অনেকে আবার বিসিবির পে-রোলেও আছেন। কিন্তু এর বাইরে যাঁরা আছেন, তাঁদের অবস্থা স্কোরারদের মতোই। ঢাকা লিগের তেমনই এক সিনিয়র আম্পায়ারের দুর্বিষহ হয়ে ওঠা জীবনের কথা জানালেন শরফুদ্দৌলা, ‘নাম বলব না, খুব সিনিয়র একজন আম্পায়ার সেদিন ফোন করে সিরাজ ভাইয়ের (বিসিবি পরিচালক এনায়েত হোসেন সিরাজ) নাম্বার চাইলেন। আমাকেও বললেন যদি সম্ভব হয় কিছু সাহায্য করতে। অনেকে হয়তো লজ্জায় এমন ফোন করছেনও না।’

বিসিবি করোনাকালীন ভাতা দিয়েছে স্কোরারদের। ঈদের আগে দেওয়া সেই অর্থের পরিমাণ ৮ থেকে ১০ হাজার। এ অর্থ দিয়ে একটি সংসারের চাকা কত দিন সচল থাকতে পারে, সেটি অনুমেয়। কোচদের অবস্থা আরো করুণ। বিশেষ করে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা কোচদের নিয়ে খেলা ছেড়ে কোচিংয়ে নাম লেখানো আফতাব আহমেদের উদ্বেগ, ‘আমাদের চিটাগংয়েই ২০টির মতো কোচিং সেন্টার আছে। সেখানে পাঁচজন করেও যদি ধরেন, তাহলে ১০০ কোচ এক চিটাগংয়েই বেকার হয়ে গেছে। একটা লোকের মাসের পর মাস কোনো উপার্জন নাই। অথচ লোকটার সংসার আছে! কিভাবে তারা চলে, ভাবলেই মাথা চক্কর দেয়।’

ডলার মাহমুদ খেলা ছেড়ে কোচিংকে পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছেন গত বছর। শুরু হয়েই প্রিমিয়ার লিগ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ক্লাব থেকে পেমেন্ট পাওয়ার ব্যাপারে খুব একটা আত্মবিশ্বাসী নন। তবু করোনার কারণে পাবনায় শ্বশুরবাড়িতে আটকা পড়া ডলার চিন্তিত, ‘আমরা বিসিবির বেতনভুক্ত নই। ঘরোয়া ক্রিকেট থেকেই যা উপার্জন করি। সেটা না হলে খুবই সমস্যা। আমার তবু চলে যাচ্ছে। কিন্তু অনেক কোচ খুবই দুর্দশায় আছে। নিজে থেকে যেটুকু পারি, করি। কিন্তু আর কত দিন?’

অনুদানে তো আর একটি জনগোষ্ঠীর জীবন চলতে পারে না। নিলামে ব্রেসলেট বিক্রি থেকে প্রাপ্ত অর্থের একটি অংশ কোচদের বরাদ্দের ঘোষণা দিয়েছেন সাবেক ওয়ানডে অধিনায়ক মাশরাফি বিন মর্তুজা। তাঁর উত্তরসূরি তামিম ইকবাল চিটাগংয়ের ৫০ জন কোচকে পাঁচ হাজার টাকা করে অর্থ সহায়তা দিয়েছেন। কিন্তু এভাবে কত দিন, প্রশ্ন আফতাবের, ‘আমি তো করোনা পরিস্থিতি ভালো হওয়ার কোনো লক্ষণ দেখছি না। তাই ক্রিকেট পেশায় যারা আছে, তাদের ভালোর জন্যই মাঠে ফিরতে হবে। আল্লাহর রহমতে আমার মতো জাতীয় দলে খেলা ক্রিকেটার যারা কোচ হয়েছি, তাদের সমস্যা একটু কম। কিন্তু এভাবে বড়জোর আরো তিন-চার মাস চলতে পারব। এরপর?’ ডলার মাহমুদ দেখছেন ক্রিকেটীয় সমস্যাও, ‘আমার মনে হয় ঘরে বসে থেকে সবাই আরো অসুস্থ হয়ে যাচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে ফর্ম নিয়ে লড়তে হবে সবাইকে।’

মাঠের লড়াইয়ে নামার আগে সংসারের মরণ লড়াই থেকে মুক্তির অপেক্ষায় ক্রিকেট পেশায় সংশ্লিষ্ট সিংহভাগ খেলোয়াড়; কোচ, আম্পায়ার, স্কোরার। সে মুক্তির পথ একটাই—ক্রিকেটে ফেরা।

মন্তব্য