kalerkantho

মঙ্গলবার । ২৩ আষাঢ় ১৪২৭। ৭ জুলাই ২০২০। ১৫ জিলকদ  ১৪৪১

ক্রিকেট সংসারে টানাটানি

সাইদুজ্জামান   

১ জুলাই, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



ক্রিকেট সংসারে টানাটানি

জাহিদ জাভেদ। বাংলাদেশের ‘খেপ’ ক্রিকেটের বাদশা! করোনাকালে অবশ্য এই বাদশার খোঁজ রাখতে হচ্ছে এ জগতের আরো অনেকের, স্বল্পখ্যাত লিগ কিংবা টুর্নামেন্ট খেলে যাঁদের সংসার চলে। করোনার কারণে সবই এখন বন্ধ। তাতে অনেকের ঘরের চুলাও এখন জ্বলে অন্যের এগিয়ে দেওয়া আগুনে মানে অনুদানে।

গতকাল সন্ধ্যায় দিনাজপুর থেকে ফোনে জাহিদ করুণ সে ছবির কিছুটা শুনিয়েছেন, ‘এখন আমরা যারা ক্রিকেট খেলি, তাদের সিংহভাগই চুক্তির বাইরে। তাই বেতন পাই না। তাই লিগ কিংবা খেপ থেকেই যা আয় হয়। এখন তো সবই বন্ধ। নিজের সাধ্যমতো চেষ্টা করি। লিটনও (কুমার দাস) অনেক করছে।’

অথচ ২০১৯-২০ মৌসুমটা সবচেয়ে লোভনীয় ছিল জাহিদদের জন্য। মুজিববর্ষকে ঘিরে সারা দেশেই বঙ্গবন্ধু কাপ ক্রিকেট টুর্নামেন্ট আয়োজনের কথা ছিল। সেসব টুর্নামেন্টে ‘খেপ’ খেলতে যাওয়ার কথাও ছিল জাহিদ এবং দেশের বড় একটি ক্রিকেটার বহরের। ‘আমি প্রায় সারা বছরই ক্রিকেট খেলি। ঢাকায় এক বছর আবাহনীতে খেলেছি। এবার প্রথম বিভাগে অগ্রণী ব্যাংকের ক্যাপ্টেন ছিলাম। এর বাইরে চিটাগং, রংপুর, রাজশাহী, ময়মনসিংহ, বরিশালে লিগ খেলি। সঙ্গে গোটা চল্লিশেক খেপ খেলি। তবে এ বছর সারা দেশেই খেলার সুযোগ ছিল। খেপ খেলেই অন্তত সাত-আট লাখ টাকা আয় করতাম।’ ঢাকা প্রথম বিভাগ ও অন্যান্য লিগ মিলিয়ে ৭০টির মতো ম্যাচে জাহিদের এ অর্থবছরে উপার্জন হতে পারত ২০ লাখ টাকার মতো।

অনূর্ধ্ব-১৫ ও অনূর্ধ্ব-১৭ দলের নিয়মিত এ অলরাউন্ডার ২০১২ সালে নেপালের বিপক্ষে ম্যাচের পরই ছিটকে পড়েন অনূর্ধ্ব-১৯ দল থেকে। তবে ফিবছর ১৫-১৬ লাখ টাকা উপার্জন দিয়ে সংসারের ব্যয় নির্বাহ নিয়ে দুশ্চিন্তা করতে হয়নি প্রায় এক যুগ আগে পিতৃহারা জাহিদ জাভেদের। বরং হাসিমুখে জানালেন, ‘ছোটবেলা থেকেই সংসার চালাই। কিছু সঞ্চয়ও করেছি। তবে এই বছরটা বড় মিস হয়ে গেল!’

তার মানে এখনো অন্যের কাছে সাহায্যের হাত পাততে হয়নি জাহিদকে, সহসা হবে বলেও মনে হয়নি। কিন্তু ২০১৮ যুব বিশ্বকাপ খেলা বাঁহাতি স্পিনার শাওন গাজীর বড্ড দুর্দিন। টেস্ট অভিষেকে ৬ উইকেট নিয়ে শোরগোল ফেলে দেওয়া বাঁহাতি স্পিনার ইলিয়াস সানির কাছে ‘এসওএস’ পাঠিয়েছিলেন তিনি, ‘একদিন শাওন ফোন করে বলল খুব খারাপ অবস্থা। যদি কোনোভাবে সাহায্য করতে পারি। তামিমের (ইকবাল) ফোন নাম্বার চেয়েছিল।’ সানি নিজেও একসময় চুটিয়ে খেপ ক্রিকেট খেলেছেন। তাই জানেন খেপ ক্রিকেটারদের বেশির ভাগেরই বার্ষিক আয়ের মূল উৎস ভাড়াটে ক্রিকেট, ‘সংখ্যাটা অনেক বেশি। এবং এদের বেশির ভাগেরই খেপ খেলে সংসার চালাতে হয়। করোনার কারণে ক্রিকেট বন্ধ হওয়ায় এরা কিভাবে চলছে, কে জানে!’

বিসিবির আর্থিক অনুদানের ‘রাডারে’ অবশ্য এঁদের প্রায় সবাই-ই আছেন। যে ১৬ শ সাবেক এবং বর্তমান ক্রিকেটারকে অনুদান দেওয়া হয়েছে, তাঁদের মধ্যে খেপ জগতের জাহিদ অ্যান্ড কোংয়ের প্রত্যেকে ১০ হাজার টাকা করে পেয়েছেন। কিন্তু মে মাসে পাওয়া সেই অনুদান দিয়ে চার মাস জীবনযাপন অসম্ভব। তাই ক্রিকেট শুরুর কোনো বিকল্প জানা নেই জাহিদের, ‘অনেকের সঙ্গে যোগাযোগ হয়। তাদের অবস্থা না বলাই ভালো। এ অবস্থা থেকে আমাদের উদ্ধারের একমাত্র পথ ক্রিকেট শুরু করা। কবে এবং কিভাবে শুরু হবে সেটা কর্তৃপক্ষ ভালো জানেন। ক্রিকেট শুরু না হলে অনেককে ভিন্ন কিছু করে সংসার চালাতে হবে।’

এই ‘অনেককে’ কিন্তু সংখ্যায় সবচেয়ে ভারী। বিসিবির চুক্তিবদ্ধ ক্রিকেটারের সংখ্যা ৯১। আর বর্তমানে দেশে ‘অ্যাক্টিভ’ ক্রিকেটার হাজার পেরিয়ে। করোনা পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হবে ক্রিকেটারদের বৃহদংশ। তাই ইলিয়াস সানির বিনীত অনুরোধ, ‘এভাবে কত দিন চলবে জানি না। তবে এভাবে চলতে থাকলে একসময় আমাদের কিংবা আমাদের পরের স্তরের ক্রিকেটারদের নতুন করে ভাবতে হবে।’

সম্ভাব্য সেই নতুন ভাবনায় অবশ্যই ক্রিকেট নেই!

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা