kalerkantho

রবিবার । ১৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭ । ৩১  মে ২০২০। ৭ শাওয়াল ১৪৪১

অস্ট্রেলিয়ানদের ভঙ্গিতে আমাদের বিজয়ের ঘোষণা

৯ এপ্রিল, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



অস্ট্রেলিয়ানদের ভঙ্গিতে আমাদের বিজয়ের ঘোষণা

৯ এপ্রিল ২০০৬

একেবারে প্রথম দিন থেকেই শুরু করি। যে দিনটি আমরা শেষ করেছিলাম ৫ উইকেটে ৩৫৫ রান নিয়ে। অনেককে সেদিন বলতে শুনেছি, সেটি ছিল স্বপ্নের দিন। কিন্তু আমি বলতে চাই স্বপ্ন পূরণের দিন। বড় ইনিংস খেলব, অস্ট্রেলিয়ার মতো দলকে চাপে রাখব এবং কাবু করব—এর আগ পর্যন্ত আমরা এসব কেবল স্বপ্নেই দেখে এসেছি। সেই স্বপ্নগুলোর প্রতিটি পূরণ হয়েছিল ফতুল্লা টেস্টের প্রথম দিনেই। অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেটারদের শরীরী ভাষাতেই যেন ছিল আমাদের বিজয়ের ঘোষণা।

ভাবতে পারেন ওরা মাত্রই দক্ষিণ আফ্রিকাকে দুমড়ে-মুচড়ে দিয়ে এসে আমাদের সামনে নাস্তানাবুদ! (প্রথমে নিজেদের মাঠে দক্ষিণ আফ্রিকাকে তিন টেস্টের সিরিজে হারায় ২-০তে। পরে ফিরতি সফরে প্রোটিয়াদের করে হোয়াইটওয়াশ)। আর কী দলটিই না ছিল অস্ট্রেলিয়ার! ম্যাকগ্রা আর চোটের জন্য জাস্টিন ল্যাঙ্গার শুধু আসেননি। তাঁদের ছাড়াই অস্ট্রেলিয়া ছিল ইতিহাসের সর্বকালের সেরা দল। এ রকম একটি দলের বিপক্ষে খেলতে নামার আগে অন্য রকম রোমাঞ্চেও ভেসে যাচ্ছিলাম আমি। কারণ ওই ম্যাচেই আমাকে আমার ওপেনিং পজিশন ফিরিয়ে দেওয়া হয়। এর আগে খেলা চার টেস্টে মাত্র একটি ফিফটি করেছিলাম। ওপেনিং থেকে আমাকে চার নম্বরেও নামিয়ে দেওয়া হয়েছিল। টেস্ট দলেও আমার জায়গা পাকাপোক্ত ছিল না। অস্ট্রেলিয়ার মতো দলের বিপক্ষেই ওপেনিংয়ে ফিরতে হবে বলে নার্ভাসনেস এবং ভয়ও কাজ করছিল কিছুটা। সব কিছু ছাপিয়ে যে ওরকম একটি ইনিংস আমি খেলতে পেরেছিলাম, সেটিকে আমি আমার সারা জীবনের সেরা প্রাপ্তি বলে মনে করি। নিঃসন্দেহে আমার জীবনের সেরা ইনিংস। যেটি আজীবনই আমাকে প্রেরণা জুগিয়ে যাবে। ভাসিয়ে যাবে অনাবিল আনন্দেও।

সবচেয়ে বেশি আনন্দিত হই এই ভেবে যে ওই ম্যাচটি টেস্ট ক্রিকেটে বাংলাদেশের যাত্রা অন্য দিকে ঘুরিয়ে দেয়। কারণ ওই সময় বাংলাদেশের টেস্ট মর্যাদা নিয়ে প্রশ্ন উঠে গিয়েছিল। মুলতানে আমরা অল্পের জন্য পাকিস্তানকে হারাতে পারিনি, জিম্বাবুয়েকে হারিয়ে তত দিনে প্রথম টেস্ট জয়ের মুখও দেখেছি কিন্তু এগুলো যেন অনেকের চোখেই ছিল বিচ্ছিন্ন ঘটনা। তাই অনেকেই বলতেন যে আমাদের খামোখাই টেস্ট মর্যাদা দিয়ে রাখা হয়েছে। আমরা যোগ্যতা রাখি না। অনেক সমালোচনাই হচ্ছিল। ওই সময়ে ওরকম পারফরম্যান্স সব সমালোচকের মুখ বন্ধ করে দিয়েছিল। এবং বাংলাদেশকে পুরো বিশ্বের কাছে নতুন করে তুলে ধরতে সাহায্য করেছিল। আলোড়ন তুলেছিল, পুরো বিশ্বের দৃষ্টিভঙ্গিই বদলে দিয়েছিল।

তবে ওই টেস্টে আমাদের আনন্দের সঙ্গে বেদনার যোগও ছিল। আধিপত্য বিস্তার করেও জিততে না পারার হতাশা এখনো কাজ করে। আমরা প্রায় জিতেই গিয়েছিলাম। কিন্তু অস্ট্রেলিয়ানদের একটি ব্যাপার প্রসিদ্ধ। হারার আগে ওরা হারে না। শেষ পর্যন্ত লড়ে যায়। প্রথম ইনিংসে গিলক্রিস্ট আর দ্বিতীয় ইনিংসে পন্টিং হার না মানা মানসিকতায় বুঝিয়েছিলেন কেন তারা এত বড় খেলোয়াড়!  ওই ম্যাচ জিতলে হয়তো টেস্ট ক্রিকেটে বাংলাদেশের উন্নতির গল্পটি অন্যভাবেই লেখা হতে পারত। অস্ট্রেলিয়াকে হারাতে হারাতে আমরা মাঝখানে ১১ বছর পার করে ফেলি। ২০১৭-তে দেশের মাটিতে হারাই। কিন্তু ২০০৬-র অস্ট্রেলিয়া যেকোনো বিচারেই ইতিহাসের সেরা।

প্রথম দিনের শেষে ৫ উইকেটে ৩৫৫ রান! ২০০৬ সালের ৯ এপ্রিলের বিকেলে স্কোরবোর্ডে বাংলাদেশের এই অবস্থা যেন এই ভ্রমও তৈরি করেছিল কিছুটা, ‘স্বপ্ন নয় তো?’ নাহ, পরাক্রমশালী রিকি পন্টিংয়ের অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে সত্যিই ছিল ব্যাপারটি। প্রথম দিনেই শাহরিয়ার নাফীসের ১৩৮ রানের সেই মহাকাব্যিক ইনিংস, তাঁর সঙ্গে ৭৬ রানের ইনিংস খেলা অধিনায়ক হাবিবুল বাশারের দ্বিতীয় উইকেটে ১৮৭ রানের পার্টনারশিপ এবং ব্রেট লি’কে মেরে-ধরে, শেন ওয়ার্নকে ঠেঙিয়ে নাকাল করা ব্যাটিং! তবু ১৪ বছর পর আজও অস্ট্রেলিয়াকে বাগে পেয়েও হারাতে না পারার আফসোসও কম অনুরণন তোলে না। সেই সাফল্য আর ব্যর্থতার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা মজার টুকরো টুকরো কিছু গল্পকেও এক সুতায় গেঁথেছেন মাসুদ পারভেজ

ওরকম দলকে হারাতে পারলে আমরা আরো বেশি আত্মবিশ্বাস পেতাম। দুর্ভাগ্যের ব্যাপার হলো ওই সিরিজের পর এক বছর আমরা কোনো টেস্টই খেলিনি। হতাশা আছে অনাকাঙ্ক্ষিত সেই বিরতি নিয়েও।

সেই হতাশা ভুলে শেষে একটু আনন্দের কথাও বলি। বিশেষ করে ওয়ার্নের সঙ্গে দ্বৈরথে জেতার কথা না বললেই নয়। ছোটবেলা থেকেই তাঁর বোলিং দেখতাম। অ্যাশেজ সিরিজে ইংল্যান্ডকে ছারখার করে দেওয়া বোলিংও টিভিতে দেখেছি। অবশ্য এর আগে আমি অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে দুটি ওয়ানডেও খেলেছি। ওয়ার্ন অবশ্য তখন ওয়ানডে খেলেন না। তাই ছোটবেলায় টিভিতে দেখা বোলারকে প্রথম খেলার সুযোগ ফতুল্লায়ই। তাঁকে খেলার রোমাঞ্চ থাকা ছিল তাই স্বাভাবিক। তবে আরো বেশি রোমাঞ্চকর ছিল স্বপ্নের বোলারকে নাজেহাল করতে পারার ব্যাপারটি। ১৩৮ রানের ইনিংসে ১৯ বাউন্ডারির ১০টিই মেরেছিলাম ওয়ার্নকে। উনি যেখানেই বল ফেলছিলেন, সুবিধা করতে দিচ্ছিলাম না একটুও। সুইপ শটও কী সুন্দর কানেক্ট হচ্ছিল সেদিন! ওয়ার্নকে মারা সুইপ শটগুলো চোখে ভাসে এখনো।

 

শাহরিয়ারের স্মৃতি

অস্ট্রেলিয়ার মতো দলকে চাপে রাখব এবং কাবু করব—এর আগপর্যন্ত আমরা এসব কেবল স্বপ্নেই দেখে এসেছি। সেই স্বপ্নগুলোর প্রতিটা পূরণ হয়েছিল ফতুল্লা টেস্টের প্রথম দিনেই। অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেটারদের শরীরি ভাষাতেই যেন ছিল আমাদের বিজয়ের ঘোষণা।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা