kalerkantho

শুক্রবার । ২২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭ । ৫ জুন ২০২০। ১২ শাওয়াল ১৪৪১

ভালো উদ্দেশ্য, কিন্তু করতে হবে সতর্ক হয়ে

নোমান মোহাম্মদ   

৮ এপ্রিল, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



ভালো উদ্দেশ্য, কিন্তু করতে হবে সতর্ক হয়ে

আসি আসি করা করোনাভাইরাস তত দিনে এসেই গেছে। যেকোনো বিপর্যয়ে এই পোড়া দেশে যা হয় বরাবর, এবারও ব্যতিক্রম নয়। মাস্ক, স্যানিটাইজারসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম বাড়িয়ে দেন অসাধু ব্যবসায়ী। তাতে ভীষণ ক্ষুব্ধ ক্রিকেটার রুবেল হোসেন নিজের ফেসবুক স্ট্যাটাসে লেখেন, ‘লোভী ও নির্মম জাতি আমরা। এই লোভী ব্যবসায়ীরাই দেশের আসল করোনাভাইরাস।’

রুবেলের এমন স্পষ্ট উচ্চারণ তখন আলোচিত হয় খুব। দিন কয়েক পর যখন পিকআপ ভ্যান নিয়ে বেরিয়ে রাস্তায় রাস্তায় অসহায় মানুষদের চাল-ডাল বিতরণ করেন, সেটিও প্রশংসা পায় সবার। পরে এই পেসারের পদাঙ্ক অনুসরণ আরো অনেক ক্রিকেটারের। ময়মনসিংহে নিজ এলাকার দুস্থদের মাঝে ত্রাণ বিতরণ করেন মোসাদ্দেক হোসেন। লিটন দাস, এনামুল হক বিজয়ের চাল-ডালের প্যাকেট তৈরির ছবি ভেসে বেড়ায় অন্তর্জালে। নারী ক্রিকেটার জাহানারা আলম, সালমা খাতুনরা হেঁটে হেঁটে সাহায্য করেন গরিবদের।

কিন্তু সেটি করতে গিয়ে তাঁরা নিজেদের বিপদ ডেকে আনছেন না তো? কিংবা ওই অসহায়দের?

ক্রিকেটারদের এই মহৎ উদ্দেশ্যকে কুর্ণিশ করেন বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) প্রধান চিকিৎসক দেবাশীষ চৌধুরীর। কিন্তু তাতে হিতে বিপরীত হচ্ছে কি না, সে উদ্বেগ লুকাতে পারেননি, ‘ক্রিকেটাররা যাঁরা অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াচ্ছেন, তাঁদের উদ্দেশ্য অবশ্যই ভালো। কিন্তু কাজটি ভালো কি না, তা বলা যাচ্ছে না। কারণ এই সাহায্য নেওয়ার জন্য যে লোকগুলো আসছেন, তাঁরা ভিড় করছেন। তাঁদের কোনো একজনের করোনাভাইরাস থাকলে অন্যদের সংক্রমিত হওয়ার ঝুঁকি থাকে; ওই ক্রিকেটারেরও তা হতে পারে। তাহলে খেয়াল করে দেখুন, ভালো উদ্দেশ্য নিয়ে শুরু করা কাজটি শেষে কী মারাত্মক হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকছে!’ আবার বাংলাদেশের বাস্তবতায় যথাযথ সুরক্ষা নিয়ে এ কাজ চালিয়ে যাওয়াও ভীষণ কঠিন বলে মনে হচ্ছে তাঁর, ‘আমাদের ক্রিকেটাররা যদি প্রটেকটিভ গিয়ার পরে, নির্দিষ্ট দূরত্ব বজায় রেখে, সবার স্পর্শ এড়িয়ে এ কাজ করতে পারেন, তাহলে ঠিক আছে; কিন্তু এমন ভিড়ের মধ্যে এসব কিছু মেনে চলতে পারবে ওরা? বাংলাদেশের বাস্তবতায় সেটি প্রায় অসম্ভব।’

তাহলে ক্রিকেটারদের করণীয় কী? একজন সাধারণ নাগরিকের চেয়ে ব্যাট-বলের যোদ্ধাদের আলাদা কিছু করার দেখছেন না বিসিবির প্রধান চিকিৎসক, ‘দেখুন, এসব ব্যাপারে সরকারি গাইডলাইন অনুসরণ করাই সবার জন্য ভালো। সে গাইডলাইন অনুযায়ী, এভাবে ব্যক্তিগতভাবে ত্রাণ না দেওয়ার ব্যাপারে উৎসাহিত করা হয়েছে। সাহায্যটা যেন সিস্টেমের মধ্য দিয়ে হয়। আমি মনে করি, ক্রিকেটারদের এই গাইডলাইন অনুসরণ করা উচিত।’ তবে তাঁদের ওপর কোনো কিছু চাপিয়ে দেওয়ার পক্ষপাতী নন দেবাশীষ, ‘ওরা ক্রিকেটার, সেটি ঠিক আছে; কিন্তু ক্রিকেটের বাইরেও তো ওদের জীবন আছে। ক্রিকেটের ব্যাপারে আমরা পরামর্শ দিতে পারি; কিন্তু ব্যক্তিগত জীবনের ব্যাপারে পারি না। সেটি অনধিকার চর্চা হয়ে যায়। ক্রিকেটারদের এভাবে ত্রাণ কার্যক্রমের ব্যাপারে গণমাধ্যমেই যা দেখার দেখছি। ওরা এখন কেউ সাতক্ষীরা, কেউ নোয়াখালী, কেউ খুলনায়। কেউ যদি স্থানীয়ভাবে এমন কিছু করেন, সে ব্যাপারে আমরা কী করতে পারি!’

করোনাভাইরাসের প্রকোপ ক্রিকেটারদের ওপর আসে কি না, তা নিয়ে ভাবনা দূরে সরানোর উপায় নেই। এ বিষয়ে একটি হটলাইন চালুর উদ্যোগ নিয়েও সেটি থামিয়ে দিয়েছে বিসিবি। সেটি বাস্তবিক কারণে বলেই জানান বোর্ডের প্রধান চিকিৎসক, ‘আমরা চেয়েছিলাম একটি হটলাইন নম্বর থাকবে। সেখানে আমাদের ক্রিকেটার কারো মধ্যে করোনাভাইরাসের সামান্যতম উপসর্গ দেখা দিলে যেন আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। এরপর ওদের কী করতে হবে, প্রয়োজন পড়লে কিভাবে টেস্ট করাব, সব সমন্বয় করতাম আমরা। কিন্তু পরে আলোচনায় এলো এমন হটলাইন থাকলে তো ক্রিকেটাররা শুধু নিজেরা না, নিজেদের আত্মীয়-স্বজন, বন্ধুদের ব্যাপার নিয়েও ফোন করবে। এতটা সামলানোর মতো অবস্থা তো আমাদের নেই।’

করোনাভাইরাসের বিপক্ষে যুদ্ধে ক্রিকেটারদের বিবেচনাবোধই তাই ভরসা বিসিবির। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ক্রিকেটের আইকনরাও হতে পারেন অনুকরণীয়। মাশরাফি বিন মর্তুজা যেমন। জাতীয় সংসদ সদস্য বলে এ করোনাকালে তাঁর দায়বদ্ধতা বেশি। নড়াইলে নিজে এলাকার মানুষদের চাল-ডাল বিতরণ, অ্যাম্বুল্যান্স দেওয়া, ঘরে ঘরে ডাক্তার পৌঁছে দেওয়ার মতো কাজগুলো করছেন ঠিকই। তবে নিজে ঢাকার মিরপুরে একরকম গৃহবন্দি। যুক্তরাষ্ট্রে চলে যাওয়া সাকিব আল হাসান মাঠে না থেকেও এ লড়াইয়ে শামিল। তাঁর ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে আড়াই হাজার পরিবারকে সাহায্য করা, হাসপাতালগুলোতে ২০ লাখ টাকার টেস্টিং কিট দেওয়ার ঘোষণা এসেছে। জাতীয় দলের আরো অনেক ক্রিকেটার এমন কাজগুলো করে চলছেন প্রতিনিয়ত। মাঠ-ঘাটে না থেকে, প্রচারের আলো থেকে দূরে থেকেও।

প্রকোপ বেড়ে যাওয়া করোনাভাইরাস নামের এই অদৃশ্য শক্তির বিপক্ষে লড়াইয়ে তাই এখন ‘অদৃশ্য’ হয়ে যাওয়াই তাই উত্তম। নিজের জন্য যেমন; অসহায়-দুস্থ মানুষগুলোর জন্যও। নইলে ‘ভালো উদ্দেশ্য’ হয়তো ‘ভালো কাজ’ হবে না শেষে!

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা