kalerkantho

শুক্রবার । ১৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭ । ২৯  মে ২০২০। ৫ শাওয়াল ১৪৪১

৫০ টাকার স্বাস্থ্যসেবা থেকে ঘরের দুয়ারে

মাসুদ পারভেজ   

৭ এপ্রিল, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



৫০ টাকার স্বাস্থ্যসেবা থেকে ঘরের দুয়ারে

মাশরাফি নড়াইল জেলায় কর্মরত ডাক্তারদের এসএমএস পাঠিয়েছিলেন। সুদীপ বিশ্বাস ও স্মৃতিকণা সরকার দম্পতি সাড়া দেন। তাঁরা জানান, প্রয়োজনে ২৪ ঘণ্টা সার্ভিস দেবেন।

কখনো কখনো রোগীর এমন উপচে পড়া ভিড় হয় যে এক শয্যায় দুই থেকে তিনজন করে শিশুও রাখতে হয় নড়াইল জেলা সদর হাসপাতালে। যেখানে শিশুদের তিনটি ইউনিট মিলিয়ে মোট শয্যাসংখ্যা মাত্র ১৮ হলেও জ্বর-সর্দি-কাশির মৌসুমে ঠাঁই দিতে হয় শতাধিক রোগীও। এখন সেই মৌসুম হলেও গতকাল সাত সকালে শিশু ওয়ার্ডে একরকম শূন্যতাই দেখে বেরিয়েছেন ডাক্তার আলিমুজ্জামান, ‘আমি আজ সকালে মাত্র ছয়জন রোগী রেখে এসেছি।’

তাহলে কি শিশুরা এই সময়ে অসুস্থ হচ্ছে না? এই শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ নিজেই সে প্রশ্নের উত্তর পেয়ে গেছেন দুপুর না গড়াতেই। মাশরাফি বিন মর্তুজার ‘নড়াইল এক্সপ্রেস ফাউন্ডেশন’-এর উদ্যোগে ভ্রাম্যমাণ স্বাস্থ্যসেবায় অংশ নিতে গিয়ে এই চিকিৎসক দুপুর ৩টা পর্যন্ত তাঁর দেখা শিশু রোগীর পরিসংখ্যানও তুলে ধরেছেন, ‘সকাল থেকে এ পর্যন্ত ৫০ জনের বেশি শিশুকে দেখলাম। আরো অনেক ফোন এসেছে। মনে হয় আজকেই ১০০ পার করে ফেলব।’

হ্যাঁ, ফোন করলেই ডাক্তার পৌঁছে যাচ্ছেন রোগীর ঘরের দুয়ারে। তাও আবার কোন সময়ে? যখন করোনাভাইরাস আতঙ্কে অসুস্থ শিশুকে হাসপাতালে নিয়ে যাবেন কি না, তা নিয়ে অভিভাবকরা দ্বিধাগ্রস্ত। যখন হাসপাতালে গিয়ে চিকিৎসাসেবা পাওয়া নিয়েও আছে সংশয়। এই অবস্থায়ও বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের সাবেক অধিনায়ক ও নড়াইল-২ আসনের সংসদ সদস্য মাশরাফির চিকিৎসাসেবা প্রচেষ্টা থেমে নেই। ঝুঁকিপূর্ণ এই সময়ে যিনি নিজেও ঝুঁকিমুক্ত নন। যেহেতু শ্বাসকষ্টের সমস্যা আছে তাঁরও। তবু ঢাকায় পরিবার নিয়ে গৃহবন্দি মাশরাফির নিজ এলাকার কর্মকাণ্ডও চলমান। আবার ভ্রাম্যমাণ স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রমে যে অভাবিত সাড়া পেয়েছেন, বলার উপায় নেই তাও। কারণ স্বাস্থ্যঝুঁকি তো চিকিৎসকদেরও আছে। মাশরাফি নিজ উদ্যোগে তাঁদের জন্য পর্যাপ্ত পিপিই’র (পারসোনাল প্রটেকটিভ ইকুইপমেন্ট) ব্যবস্থা করলেও ভ্রাম্যমাণ স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম মুখ থুবড়ে পড়ার আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছিল না।

কিন্তু সব সংকটেই ‘পথ দেখানো’ কিছু চরিত্রও খুঁজে পাওয়া যায়। পেয়েছেন মাশরাফিও। সেই গল্পই বলছিলেন নড়াইল জেলা আওয়ামী লীগের তরুণ নেতা সৌমেন বসু, ‘এ রকম কিছু করতে চেয়ে মাশরাফি নড়াইল জেলায় কর্মরত ডাক্তারদের এসএমএস পাঠিয়েছিলেন। এক চিকিৎসক দম্পতি সাড়া দেন। তাঁরা জানান, প্রয়োজনে ২৪ ঘণ্টা সার্ভিস দেবেন। আসলে আর কোনো ডাক্তার নামতে চাননি। তাঁরা ভয় পেয়েছিলেন।’ কিন্তু সুদীপ বিশ্বাস ও স্মৃতিকণা সরকার দম্পতি মাঠে নেমে পড়তেই সেই ভয় কেটে গেছে অন্যদেরও।

কাল কার্যক্রমের দ্বিতীয় দিনে তাই যুক্ত হয়েছেন আলিমুজ্জামানসহ আরো চার চিকিৎসক। স্মৃতিকণা সদ্য পাস করা ডাক্তার। আর সুদীপ কর্মরত জেলা ডায়াবেটিক সমিতিতে। নৈতিক অবস্থান থেকেই এলাকার সংসদ সদস্যের ডাকে সাড়া দিয়েছেন বলে জানালেন এই চিকিৎসক, ‘মাশরাফি যেমন তাঁর এলাকার জন্য করছেন, তেমনি আমিও তো আমার এলাকার জন্যই করছি। আমার কাছ থেকেও রোগীর কিছু পাওনা আছে। আমি একজন চিকিৎসক হয়ে তো ঘরে বসে থাকতে পারি না।’

এই দুঃসময়ে ঘর ছেড়ে বের হওয়া সুদীপ অবশ্য আরো আগে থেকেই যুক্ত ‘নড়াইল এক্সপ্রেস ফাউন্ডেশন’-এর অন্য আরেকটি কার্যক্রমে। করোনা পরিস্থিতি সেটিকেও অচল করে দিয়েছে, ‘৫০ টাকায় স্বাস্থ্যসেবার যে প্রকল্প ফাউন্ডেশনের, সেটিতেও আমি যুক্ত আছি। বিশেষজ্ঞ ডাক্তারদের মাধ্যমে এটি পরিচালিত হয়। আমরা প্রচুর মেডিক্যাল ক্যাম্প করেছি। সেসব ক্যাম্পে রোগী দেখার জন্য আমরা টোকেন হিসেবে ৫০ টাকা নিতাম। সংকটকালে ফাউন্ডেশনের এই স্বাস্থ্যসেবাও স্তিমিত হয়ে পড়েছে। লোকজন নেই। রোগীরাও ভয়ে বাড়ি থেকে বের হচ্ছে না।’ তাই ৫০ টাকার স্বাস্থ্যসেবা থেকে ফাউন্ডেশন এবার পৌঁছে যাচ্ছে রোগীর ঘরের দুয়ারে। নির্দিষ্ট দুটো নম্বরে ফোন করলেই হচ্ছে। কলাগাছি, রায়গ্রাম, নলদি, মিঠাপুর... যেখানেই হোক, চিকিৎসকদের নিয়ে পৌঁছে যাচ্ছে ফাউন্ডেশনের মাইক্রোবাস। এ রকম উদ্যোগ আন্দোলিত করছে জাতীয় দলে মাশরাফির সতীর্থ মাহমুদ উল্লাহকেও, ‘সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতার কথাই বলি। তখনো ঢাকা প্রিমিয়ার লিগের খেলা চলছিল (তত দিনে করোনার দামামাও বেজে ওঠার অপেক্ষা)। তখনই ওনার অনেকগুলো উদ্যোগের কথা আমাকে বলেছিলেন। যার প্রতিটিই ছিল প্রশংসনীয়। ভ্রাম্যমাণ চিকিৎসাসেবা দারুণ ব্যাপার। এই দুঃসময়ে এ রকম উদ্যোগে নড়াইলবাসীরা খুব উপকৃত হবেন। ওনার জন্য আমার মন থেকে দোয়া থাকে। আশা করি নড়াইলবাসীরাও তাঁর জন্য দোয়া করবেন।’

৫০ টাকার স্বাস্থ্যসেবা থমকে গেলেও ঘরের দুয়ারে চিকিৎসা পৌঁছে দেওয়া মাশরাফি নিশ্চয়ই তা পাবেনও!

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা