kalerkantho

শনিবার । ২৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭ । ৬ জুন ২০২০। ১৩ শাওয়াল ১৪৪১

ইয়াসিনের অনুপ্রেরণা স্টিভ জবস

নোমান মোহাম্মদ   

৫ এপ্রিল, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



ইয়াসিনের অনুপ্রেরণা স্টিভ জবস

নোয়াখালী থেকে উঠে আসা এ পেসার বিকেএসপির ট্রায়ালে প্রথমবার টেকেননি। জেদ করে পরেরবার নিজের জায়গা করে নেন ঠিকই। আর এটি তো জাতীয় দলে খেলার ব্যাপার। একজন ক্রিকেটারের সারা জীবনের স্বপ্ন। দুইবার সে স্বপ্নপূরণের অত কাছে গিয়েও খেলতে না পারার আক্ষেপ নিয়ে নিশ্চয়ই পড়ে থাকবেন না ইয়াসিন আরাফাত!

স্বপ্নের ঘুড়ি উড়তে না উড়তেই দুঃস্বপ্নের ভোকাট্টা। জাতীয় দলে ডাক পাওয়ার পরপরই যে ধরা পড়ে টাইফয়েড! সময়ে আবার ঘুড়ি ওড়ে, অসময়ে আবার কাটে। এবার ইনজুরি। যে কারণে মাস ছয়েক ধরে মাঠের সঙ্গে আড়ি।

তবু হাল ছাড়েন না ইয়াসিন আরাফাত। আশৈশবের আশা যে বাংলাদেশ জাতীয় দলে খেলা, তা পূরণে প্রতিজ্ঞাটা বরং আরো শাণিত হয় এ পেসারের। প্রথমবার হয়নি, দ্বিতীয়বারে না—দান দান তিন দানে হবে নিশ্চয়ই।

লম্বায় ছয় ফুটের ওপর। বলে গতির ঝড়। এমন একজনকে তো অনেক দিন ধরে খুঁজছে বাংলাদেশ ক্রিকেট। গত বছর আফগানিস্তান-জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ত্রিদেশীয় সিরিজে জাতীয় দলে ডাক পান ইয়াসিন। ফতুল্লায় জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে বিসিবি একাদশের হয়ে অনুশীলন ম্যাচটি ছিল তাই নিজেকে আরেকটু ঝালিয়ে নেওয়ার উপলক্ষ। কিন্তু সেখানেই তো ইনজুরির আগুনে ঝলসে গেলেন! পিঠের ব্যথায় দুই ওভারের বেশি বোলিং করতে পারেন না ইয়াসিন। এমআরআই করার পর তেমন কিছু ধরা পড়ে না। কিন্তু সিটি স্ক্যানে কোমরে স্ট্রেস ফ্র্যাকচারের দুঃসংবাদ। ছয় মাসের জন্য চলে যেতে হয় বিছানা-বিশ্রামে।

‘কী কষ্ট যে হয়েছে এ সময়টায়! বিশ্বাস করবেন কি না, বল ছাড়া ঘুমাতে পারতাম না। জেগে থাকা সময় প্রায় সারাক্ষণ তাতে হাত বুলাতাম। কিন্তু সান্ত্বনা পাই না। শুধু ভেবেছি, কবে ছয় মাস শেষ হবে। কবে মাঠে ফিরব। সে ছয় মাস শেষে এখন আমার মাঠে ফেরার অপেক্ষা’—কণ্ঠে আনন্দ-বিষাদের যুগলবন্দি ইয়াসিনের। আনন্দ ছয় মাস শেষ হওয়ার। আর করোনার কারণে বিষণ্নতা, ‘এখন আমার রিহ্যাব শুরু করার কথা। আবার সিটি স্ক্যান করে দেখার কথা ইনজুরি পুরোপুরি সেরে গেছে কি না। অথচ করোনায় সব এলোমেলো হয়ে গেল।’

ইয়াসিনের জন্য আবার তাই অপেক্ষার প্রহর গোনা। আর এ সময়ে স্মৃতির জাবর কাটায় অনুপ্রেরণা খোঁজা। ওই যে ২০১৬ সালে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে অভিষেক ম্যাচেই ইনিংসে ৫ উইকেট পাওয়া! কিংবা ২০১৮ সালে লিস্ট ‘এ’ ক্রিকেটে নিজের মাত্র তৃতীয় ম্যাচেই ৮ শিকার! বাংলাদেশের ইতিহাসসেরা সেই বোলিংয়ে প্রথম পাদপ্রদীপের আলোয় আসা। অথচ গাজী গ্রুপ ক্রিকেটার্সের হয়ে আবাহনীর বিপক্ষে সেই ম্যাচটি যে খেলবেন, ভাবেননি ইয়াসিন, ‘আগের ছয় ম্যাচে একাদশে ছিলাম না। আবাহনীর মতো বড় দলের বিপক্ষে কী আর আমাকে খেলানো হবে! সত্যি বলতে কী, আগের রাতে তাই অনেক দেরি করে ঘুমিয়েছি। সকালে কোচ সালাউদ্দিন স্যার ভেজা উইকেট দেখে যখন বললেন আমি খেলছি, আমার মাথা খারাপ। ফিজিওর কাছ থেকে দুটো স্যালাইন, অনেক গ্লাস পানি, ১০-১২টি কলা এবং বেশ কিছু তাজা ফল খেয়ে ক্লান্তি ঝেড়ে নিজেকে প্রস্তুত করি। এরপর তো ওই ৮ উইকেট।’ শুধু বাংলাদেশ না, ক্রিকেট ইতিহাসেরই মাত্র একাদশ বোলার হিসেবে লিস্ট এ ক্রিকেটে অমন কীর্তি ১৯ বছরের পেসারের।

তাতেই ২০১৮ সালে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে জাতীয় দলের ক্যাম্পে ডাক পান। টেস্ট স্কোয়াডে থাকার কথা ছিল। কিন্তু টাইফয়েডের কারণে স্বপ্নভঙ্গ। পরের বছর ‘এ’ দল এবং ইমার্জিং দলের হয়ে সাফল্যে আবার লাল-সবুজ জার্সি গায়ে চড়ানোর সুযোগ। ত্রিদেশীয় সিরিজে ডাক পাওয়াটা স্মৃতিতে সতেজ ইয়াসিনের, ‘একাডেমিতে সাইফউদ্দিন, মেহেদী হাসান রানা ভাইরা মিলে আড্ডা দিচ্ছিলাম। হঠাৎ দেখি মোবাইলে এক হোয়াটস অ্যাপ গ্রুপে আমাকে অ্যাড করেছেন ক্রিকেট অপারেশন্সের সাব্বির ভাই। যেখানে জাতীয় দলের সব ক্রিকেটার। ত্রিদেশীয় সিরিজের জন্য স্কোয়াড ঘোষণা করা হয়েছে, সবার শেষে আমার নাম। শুরুতে বিশ্বাস করতে পারিনি। সাইফউদ্দিন ভাই বললেন, তাঁর মোবাইলেও মাত্র মেসেজটি এসেছে। তখনই কেবল বিশ্বাস করি।’

এরপর আবার স্বপ্নের ক্যানভাসে রঙের খেলা। কিন্তু সব রং কালো রঙে লেপ্টে দেয় ইনজুরি। এই যে, দু-দুইবার জাতীয় দলের এত কাছে গিয়ে খেলা হলো না, সে জন্য নিজেকে দুর্ভাগা মনে হয় না ইয়াসিনের? পেসারের পরিশীলিত জবাবটা ২১ বছরের তুলনায় অনেক পরিণত, ‘জীবনে ভাগ্যের প্রয়োজন আছে, সেটি আমি বিশ্বাস করি। আবার স্টিভ জবসের মতো অনেকে পরিশ্রম দিয়ে নিজের ভাগ্য যে বদলেছেন, তাও সত্যি। নিজের দুর্ভাগ্য নিয়ে তাই পড়ে থাকতে চাই না। আমার অনেক সীমাবদ্ধতা ছিল, সে কারণেই বারবার ইনজুরি হচ্ছে। এবার তাই আবার শুরু করব শূন্য থেকে। জীবন যাপনের ধরন বদলে ফেলব পুরোপুরি। ক্রিকেট এবং একমাত্র ক্রিকেটই হবে আমার বন্ধু। তাহলে জাতীয় দলের বন্ধ দরজা একদিন খুলবেই খুলবে।’

নোয়াখালী থেকে উঠে আসা এ পেসার বিকেএসপির ট্রায়ালে প্রথমবার টেকেননি। জেদ করে পরেরবার নিজের জায়গা করে নেন ঠিকই। আর এটি তো জাতীয় দলে খেলার ব্যাপার। একজন ক্রিকেটারের সারা জীবনের স্বপ্ন। দুইবার সে স্বপ্নপূরণের অত কাছে গিয়েও খেলতে না পারার আক্ষেপ নিয়ে নিশ্চয়ই পড়ে থাকবেন না ইয়াসিন আরাফাত!

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা