kalerkantho

শুক্রবার । ২২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭ । ৫ জুন ২০২০। ১২ শাওয়াল ১৪৪১

জাতীয় দল আর ক্লাবের দর্শন এক নয়

২ এপ্রিল, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



জাতীয় দল আর ক্লাবের দর্শন এক নয়

গত মৌসুমে অর্ধেকের বেশি সময় ইনজুরিতে কাটিয়ে এবার তপু বর্মণ বসুন্ধরা কিংসের জার্সিতে নতুন শুরু করেছেন। নতুন দলে ফেডারেশন কাপ জয়ে দারুণ শুরুর পর লিগে এসে হঠাৎ হয়েছে ছন্দঃপতন। ছয় ম্যাচে দুই হারের পর এরই মধ্যে প্রশ্নের মুখে পড়েছে কিংসের রক্ষণভাগ। তপু, ইয়াসিন, বিশ্বনাথ, সুশান্তকে নিয়ে গড়া জাতীয় দলের রক্ষণভাগ। জাতীয় দলে সুখ্যাতি ছড়ানো এই ডিফেন্সলাইন কেন ক্লাব দলে এত নাজুক হয়ে গেল, এ নিয়ে কিংসের এই সেন্ট্রাল ডিফেন্ডার খোলামেলা কথা বলেছেন সনৎ বাবলার সঙ্গে।  

প্রশ্ন : ছুটিতে সময় কাটছে কিভাবে?

তপু বর্মণ : ছুটিতে বাড়িতে থাকলেও ট্রেনিং কিন্তু চলছে। ক্লাবের ট্রেনার রোজকার ট্রেনিং শিডিউল পাঠিয়ে দেন, সেটা মেনেই নিজেকে ফিট রাখার চেষ্টা করি। আজ যেমন জগিং ও সাইক্লিং করেছি। খেলা শুরু হলেই যেন আমাদের ফিটনেস নিয়ে বাড়তি পরিশ্রম করতে না হয়, সেই ব্যবস্থা করেছেন স্প্যানিশ ট্রেনার।

প্রশ্ন : কিন্তু বসুন্ধরা কিংস তো একটু চাপে পড়ে গেছে। ছয় ম্যাচে চ্যাম্পিয়ন দল শেষ দুটিতে হেরেছে, একটি ড্র করেছে। ৮ পয়েন্ট হারিয়ে বসেছে এরই মধ্যে...

তপু : ৯ বছর ধরে আমি প্রিমিয়ার লিগ খেলছি। কিন্তু এ রকম প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ লিগ কখনো দেখিনি। শুধু আমরা কেন; দুই আবাহনী, শেখ রাসেল, সাইফ স্পোর্টিংয়ের মতো বড় দলগুলোও পয়েন্ট হারিয়েছে। এই লিগে হেলাফেলা করে খেলার সুযোগ নেই, যেকোনো ছোট দল হারিয়ে দিতে পারে বড় দলকে। সব দলে ভালো বিদেশি খেলছে, তারাই সুযোগ পেলে অঘটন ঘটিয়ে দিচ্ছে। এর পরও সব দিক থেকে ব্যালান্সড বসুন্ধরা কিংসের ৮ পয়েন্ট হারানো উচিত হয়নি। চট্টগ্রাম আবাহনীর সঙ্গে ম্যাচটি আমরা হেরেছি নিজেদের ভুলে।

প্রশ্ন : খেলোয়াড়রা ভুল না করলে তিন গোলে লিড নেওয়ার পর কোনো দল সাধারণত ম্যাচ হারে না। ভুলগুলো কী?

তপু : তিন গোলের লিড নেওয়ার পর চট্টগ্রাম আবাহনী একটি গোল শোধ করে। তখনো ম্যাচ আমাদের পক্ষে কিন্তু আমার ফাউলে একটা পেনাল্টি হলে ব্যবধান কমে হয় ৩-২। ওই পেনাল্টি না হলে হয়তো ম্যাচটা ৩-১ গোলে রেখেই জিততে পারতাম আমরা। পেনাল্টিটা আমার ভুল বলতে পারেন। এই গোলের পর সবাই মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিল। অথচ তখনো আমরা এগিয়ে আছি, মানসিকভাবে আমরা ইতিবাচক থাকলে হয়তো ম্যাচ বের করে নিতে পারতাম।

প্রশ্ন : এই ম্যাচের পরই আসলে কিংস ম্যানেজমেন্ট তাদের রক্ষণভাগ নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছে। জাতীয় দলের রক্ষণভাগ নিয়েও গোল বন্ধ করতে পারছে না। আপনি, ইয়াসিন, বিশ্বনাথ, নুরুল নাইম ফয়সাল, সুশান্ত—সবাই জাতীয় দলের ডিফেন্ডার। সমস্যাটা কী, কোথায় হচ্ছে?

তপু : প্রথমে বলি, আমাদের বোঝাপড়ায় কোনো সমস্যা হচ্ছে না। জাতীয় দলে আমরা করি ‘টিম ডিফেন্ডিং’ অর্থাৎ রক্ষণভাগকে সাহায্য করতে ফরোয়ার্ডরাও নিচে নেমে আসে। আমাদের ক্লাব দলে এটা হয় না। বেশির ভাগ গোলই আমরা খেয়েছি কাউন্টারে, সেখানে প্রতিপক্ষের বিদেশি ফরোয়ার্ডের সঙ্গে দেশি ডিফেন্ডারের লড়াই মানে ফিফটি-ফিফটি। তা ছাড়া জাতীয় দলের দর্শন আর ক্লাবের ফুটবল দর্শন এক নয়।


মাঝমাঠ যদি রক্ষণে আরেকটু সহায়তা করে, বিশেষ করে প্রতিপক্ষের কাউন্টারের কথা মাথা রেখে খেললে আমাদের জালে বল পাঠানো কঠিন হয়ে যাবে যেকোনো দলের। এ ক্ষেত্রে আমাদের আর্জেন্টাইন মিডফিল্ডার নিকোলাস দেলমোন্তের ভূমিকা খুব গুরুত্বপূর্ণ মনে হয় আমার কাছে।

প্রশ্ন : সেটা কী রকম?

তপু : আমরা যখন জাতীয় দলের হয়ে নামি, তখন প্রথম কথাই হলো গোল খাওয়া যাবে না। জেমির স্পষ্ট নির্দেশনা থাকে, ‘৯০ মিনিট লড়াই করো, ম্যাচে থাকো, গোলের সুযোগ আসবেই।’ তাই গোল করার চেয়ে সবার নজর থাকে গোল না খাওয়ার দিকে। এ কারণে জাতীয় দলে আমাদের ডিফেন্ডিং খুব ভালো হয়। কিন্তু বসুন্ধরা কিংসের দর্শন হলো অ্যাটাকিং ফুটবল, শিরোপার জন্য আমাদের প্রতিটি ম্যাচ জিততে হবে। তাই আমরা সবাই খুব আক্রমণাত্মক মেজাজে থাকি, গোল করাই হলো আমাদের আসল লক্ষ্য। রক্ষণভাগকে আলাদা ছায়া দেওয়ার ব্যাপারটি আর থাকে না। বিশেষ করে প্রতিপক্ষের পায়ে বল পড়লে মাঝমাঠে তাদের আক্রমণ শেষ করে দেওয়ার কাজটা ঠিকমতো হয় না।

প্রশ্ন : সোজা কথা হলো জাতীয় দলের ডিফেন্সিভ ফুটবল আর ক্লাবের অ্যাটাকিং ফুটবল। কিংসের আক্রমণাত্মক ফুটবলে কি রক্ষণভাগ সুরক্ষিত রাখা যায় না?

তপু : অবশ্যই রাখা যায়। মাঝমাঠ যদি রক্ষণে আরেকটু সহায়তা করে, বিশেষ করে প্রতিপক্ষের কাউন্টারের কথা মাথা রেখে খেললে আমাদের জালে বল পাঠানো কঠিন হয়ে যাবে যেকোনো দলের। এ ক্ষেত্রে আমাদের আর্জেন্টাইন মিডফিল্ডার নিকোলাস দেলমোন্তের ভূমিকা খুব গুরুত্বপূর্ণ মনে হয় আমার কাছে।

প্রশ্ন : অথচ গতবারের চেয়ে এবারের কিংস কাগজ-কলমে অনেক ব্যালান্সড। লিগে তারা সেই শক্তিটা এখনো দেখাতে পারেনি। শুধু এএফসি কাপের প্রথম ম্যাচেই তাদের শক্তির প্রকাশ ঘটেছে...

তপু : টিসি স্পোর্টস বেশ শক্তিশালী দল। তাদের বিপক্ষে আমাদের রক্ষণভাগ ভালো খেলেছে। তবে ওই ম্যাচে পার্থক্য গড়ে দিয়েছে বার্কোসই। সে দুর্দান্ত স্ট্রাইকার, দলে এ রকম একজন থাকলে গোল নিয়ে চিন্তা করতে হয় না। লিগে সেই স্ট্রাইকিং পজিশনে একটু ঘাটতি থাকায় গোল নিয়ে আমরা মাঝেমধ্যে চিন্তায় পড়ে যাই। তখন সবাই গোল করার দিকে মনোযোগী হয়ে পড়ি।

প্রশ্ন : এএফসি কাপে কি গ্রুপ পর্ব উতরে বসুন্ধরা কিংস নক আউটে পৌঁছাতে পারবে?

তপু : অবশ্যই পারবে। ভারতের চেন্নাই আর মাজিয়ার খেলা আমরা দেখেছি। আমাদের লিগের দলগুলোর মতোই তাদের শক্তি, অমন আহামরি কোনো দল নয়। গোলের সমস্যাটা থাকবে না এএফসি কাপে। তা ছাড়া আমাদের রক্ষণভাগের দুর্বলতাও সেরে যাবে তত দিনে। আমাদের স্প্যানিশ কোচ রক্ষণভাগ নিয়ে বেশ কাজ করছিলেন ছুটিতে যাওয়ার আগ পর্যন্ত। নিজেদের পোস্টে গোল আটকানোর চিন্তা এখন সবার।

প্রশ্ন : গৃহবন্দি অবস্থা থেকে কত দিনে মুক্তি মিলবে কেউ জানে না। এই লম্বা বিরতির পর নিশ্চয়ই ফুটবলের ঠাসা সূচি হবে।

তপু : লিগ, এএফসি কাপের সঙ্গে বিশ্বকাপ বাছাই পর্বের ম্যাচ থাকবে। তাই ফিটনেস ধরে রাখাটা খুব জরুরি আমাদের জন্য। আবারও বলি, এবার লিগটা দারুণ জমজমাট হওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছিল। কিন্তু লম্বা বিরতির পর দলগুলো কী অবস্থায় থাকবে তার ওপর নির্ভর করছে বাকি লিগ। আমার লক্ষ্য, লিগ শিরোপা ও এএফসি কাপে দুর্দান্ত খেলে মৌসুম শেষ করা।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা