kalerkantho

সোমবার । ১৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭ । ১  জুন ২০২০। ৮ শাওয়াল ১৪৪১

ড্রেসিংরুমের সামনেই...

সেই টস, হেলমেট এবং বাদশার ‘পাগলামি’

এ প্রতিবেদনের সঙ্গে জুড়ে দেওয়া ছবিটিও দাম দিয়ে কেনা সে রকমই এক অমূল্য স্মৃতির ফ্রেম। ১৯৮৬ সালের আজকের দিনে (৩১ মার্চ) দেশের ইতিহাসের প্রথম ওয়ানডে ম্যাচে ইমরান খানের সঙ্গে টস করতে নামেন গাজী আশরাফ। ছবিটি নিশ্চয়ই এটি বুঝিয়ে দিচ্ছে যে টস যেখানে হওয়ার কথা, হয়নি সেখানে। ২২ গজেই তা হওয়ার রীতি। কিন্তু ইমরানের মতো ক্রিকেট ব্যক্তিত্বের চাওয়ায় সেই রীতিও বদলে যায় শ্রীলঙ্কায় হওয়া এশিয়া কাপের সেই ম্যাচে।

মাসুদ পারভেজ   

৩১ মার্চ, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



সেই টস, হেলমেট এবং বাদশার ‘পাগলামি’

নিজেরাও কোনো ক্যামেরা নিয়ে যাননি। আবার মোরাতুয়ার মাঠেও সংবাদমাধ্যমের কোনো আলোকচিত্রী নেই যে স্মৃতি ধরে রাখার বন্দোবস্ত করবেন তাঁরা। শুধুই মনের ফ্রেমে ধরে রাখার আফসোস নিয়ে ইমরান খানের সঙ্গে টস করতে যাওয়ার আগে গলায় ক্যামেরা ঝোলানো স্যুট-টাই পরা এক ভদ্রলোককে চোখে পড়ল গাজী আশরাফ হোসেনের। তাঁকেই ধরলেন এবং একের পর এক ছবি উঠতেও থাকল। সেসব ছবির ডেলিভারি আনতে গিয়ে হওয়া অভিজ্ঞতার কথা মনে করে ঘটনার ৩৪ বছর পরও হেসেই খুন আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে বাংলাদেশের প্রথম অধিনায়ক, ‘তখনই আমরা জানলাম যে ওই ভদ্রলোক পেশাদার আলোকচিত্রী। অন্য কোনো আলোকচিত্রী না থাকার সুযোগ নিতেই উনি ওখানে উপস্থিত। জানালেন, ছবি পেতে হলে কিনে নিতে হবে। আমরাও পয়সা দিয়েই ছবি কিনলাম।’

এ প্রতিবেদনের সঙ্গে জুড়ে দেওয়া ছবিটিও দাম দিয়ে কেনা সে রকমই এক অমূল্য স্মৃতির ফ্রেম। ১৯৮৬ সালের আজকের দিনে (৩১ মার্চ) দেশের ইতিহাসের প্রথম ওয়ানডে ম্যাচে ইমরান খানের সঙ্গে টস করতে নামেন গাজী আশরাফ। ছবিটি নিশ্চয়ই এটি বুঝিয়ে দিচ্ছে যে টস যেখানে হওয়ার কথা, হয়নি সেখানে। ২২ গজেই তা হওয়ার রীতি। কিন্তু ইমরানের মতো ক্রিকেট ব্যক্তিত্বের চাওয়ায় সেই রীতিও বদলে যায় শ্রীলঙ্কায় হওয়া এশিয়া কাপের সেই ম্যাচে। এত দিন পর যে ম্যাচের অনেক স্মৃতি ঝাপসা হয়ে গেলেও টসের ঘটনা এখনো সজীব গাজী আশরাফের মনে, ‘বাংলাদেশের প্রথম ওয়ানডে। অধিনায়ক বলে আমার উত্তেজনা আরো বেশি। যে পোশাকে যাওয়ার কথা, সেই সাদা পোশাকেই যাই। গিয়ে দেখি ইমরান খান ট্র্যাক স্যুট পরে এসেছেন। ওটা পরেই টস পর্ব সেরে ফেললেন তিনি।’

শুধু তাই নয়, বদলে ফেললেন টসের স্থানও, ‘‘টসের আগে ইমরান খান প্রস্তাব করলেন, ‘এত দূর হেঁটে গিয়ে কী করবে? চলো এখানেই টসটা সেরে ফেলি।’ ড্রেসিংরুমের কাছেই তাই ব্যাপারটি ঘটে গেল। আমার তাই উইকেটে গিয়ে টস করার অভিজ্ঞতা হলো না। এশিয়া কাপের মতো টুর্নামেন্টে ইমরান খান টস করলেন বাইরে। তখনো খেলা সরাসরি সম্প্রচার করা হতো। তবে এখনকার মতো টেলিভিশন ক্যামেরা তখন টসটা ধরত না।’’ সেই টস জিতে ইমরান ব্যাটিংয়ে পাঠান বাংলাদেশকে। ব্যাটসম্যানরা যে বড় কিছু করবেন ভেবে নেমেছিলেন, তাও নয়। এত দিন পর সেই সত্য স্বীকারেও কোনো দ্বিধা নেই গাজী আশরাফের, ‘খেলাই মুখ্য ছিল। ওদের হারাতে পারব, এ রকম চেতনা বা মন-মানসিকতা ছিল না। বাস্তবতাই সে কথা ভাবতে দিত না। কতটা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারি, সেটিই ছিল মুখ্য।’ সেই সময়ের বাস্তবতাও এ সুযোগে মনে করিয়ে দিতে ভুললেন না বাংলাদেশের প্রথম ওয়ানডে অধিনায়ক, ‘আমাদের কোনো কোচ ছিল না। কাইয়ুম রেজা চৌধুরী আমাদের ম্যানেজার ছিলেন। ওয়ার্ম আপ থেকে শুরু করে নেট সেশন, আমাদের খেলোয়াড়দেরই পরিচালনা করতে হতো। (অলরাউন্ডার জাহাঙ্গীর শাহ) বাদশা ভাই এ ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখতেন।’

যদিও এশিয়া কাপে যাওয়া দলটিকে ওই সময়ের সেরাই বলছেন তিনি, ‘তখনকার সেরা দল। (মিনহাজুল আবেদীন) নান্নুরা তখন উঠতি খেলোয়াড়। আমি নিজেও যে খুব পরিণত ছিলাম, তা নয়। ১৯৮২-তে প্রথম জাতীয় দলে খেলি। ১৯৮৬-তে অধিনায়ক। রকিবুল ভাই, বাদশা ভাই, সামি ভাই (সাবেক পেসার সামিউর রহমান)—এঁদেরই বলা যেত অভিজ্ঞ।’ তবে অভিজ্ঞতা আর তারুণ্যের মিশেলে গড়া দলের সবার জিভে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলার স্বাদ ও-ই প্রথম। কাজেই যা ঘটার কথা, ঘটেছিলও তাই। ৪৫ ওভারের ম্যাচে ব্যাটিংয়ে গাজী আশরাফরা সুবিধা করতে পারেননি একদমই।

ইমরান খান-ওয়াসিম আকরাম-জাকির খানের পেসত্রয়ী আর আব্দুল কাদিরের লেগস্পিনে টালমাটাল বাংলাদেশ ৩৫.৩ ওভারে গুটিয়ে যায় মাত্র ৯৪ রানেই। ব্যাট হাতে গাজী আশরাফের স্মৃতিও বিস্মরণযোগ্যই, ‘আমি নাম্বার থ্রিতে ব্যাট করতাম। তখন তো (উইকেটে) অত কাভারটাভার দেওয়া থাকত না। সকালে ভেজা উইকেট, স্যাঁতসেঁতে। ওয়াসিম আকরামের বল বুঝতে পারছিলাম যে ভেতরে আসছে। কিন্তু কত ভেতরে, সেটি বুঝলাম বোল্ড হওয়ার পর। আসলে হাফভলি বলই ছিল। অতিরিক্ত সুইং করার কারণে ব্যাট-প্যাডের ফাঁক দিয়ে ঢুকে গেল। আমি অবশ্য ভেবেছিলাম মাঝ ব্যাটে খেলেই বোলারের পাশ দিয়ে বের করে দিতে পারব। কোনো রান সংগ্রহ না করতে পেরেই আমার অভিষেক।’

তবু ম্যাচটি তাঁর জন্য স্মরণীয় হয়ে আছে এ জন্য, ‘ওরা অনায়াসেই জিতল (৭৭ বল বাকি থাকতে ৭ উইকেটে)। ওদের তিনটি উইকেট আমরা নিতে পারলাম। আমার জন্য মজার ব্যাপার হলো, আমি তখন পার্টটাইম বোলার (অফস্পিন)। মাঝেমধ্যেই বল করতাম। পার্টটাইমার হিসেবে সেটিই আমার খুব স্মরণীয় ম্যাচ হয়ে গেল। কারণ জাভেদ মিয়াঁদাদ বিশ্বে তখন খুব দামি খেলোয়াড়। তাঁর উইকেটই আমার জীবনের প্রথম আন্তর্জাতিক উইকেট হয়ে গেল।’ ওই আসরেই প্রথম জাভেদ মিয়াঁদাদকে রিভার্স সুইপ খেলতে দেখেন গাজী আশরাফ। দেখেন স্লেজিংয়ে সর্বকালের অন্যতম সেরা ব্যাটসম্যানের দক্ষতাও, ‘‘আব্দুল কাদিরকে দেখেশুনে খেলার চেষ্টা করছিলেন বাদশা ভাই। মিয়াঁদাদ তখন স্লিপ থেকে মজা করে উর্দুতে কিছু কথা বলেই যাচ্ছিলেন। বাংলাটা এ রকম, ‘যে বল ঠেকিয়ে খেলার চেষ্টা করবে, সে-ই আউট হবে। আউট হতে হলে বরং মেরেই আউট হও।’ অবশ্য একই ম্যাচে বাদশা ভাইয়ের পাগলামিও দেখেছি আমরা।’’

বিস্তারিত শুনলে সেই ‘পাগলামি’র গভীরতা পরিমাপও সহজ হবে, ‘চেস্ট বা থাই গার্ড, আমরা এসব পরে খেলতে অভ্যস্ত ছিলাম না। কিন্তু পাকিস্তান আর শ্রীলঙ্কার (পাকিস্তানের সঙ্গে রাজনৈতিক টানাপড়েনের কারণে ভারত ওই আসরে অংশ নেয়নি) দ্রুতগতির বোলারদেরও তো খেলতে হবে। আমরা তাই শ্রীলঙ্কায় গিয়ে সেগুলো কিনি। আমরা সবাই সাবধান থাকলেও বাদশা ভাই করলেন পাগলামি। হেলমেট পরে তিনি খেলতে চাইতেন না। পাকিস্তানের ওই পেস আক্রমণের বিপক্ষেও উনি ব্যাটিং করতে নেমে গেলেন হেলমেট ছাড়াই।’

ভাগ্যিস কোনো দুর্ঘটনা ঘটেনি। সৌভাগ্য যে ক্যামেরা ছাড়া গেলেও ঐতিহাসিক সেই ম্যাচের কিছু মুহূর্ত এখনো পুরনো ছবির অ্যালবাম খুললেই দেখা যায়!

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা