kalerkantho

সোমবার । ১১ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭ । ২৫  মে ২০২০। ১ শাওয়াল ১৪৪১

ডাউন দ্য উইকেট

ক্রিকেটারদের সালাম

সাইদুজ্জামান

২৬ মার্চ, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



ক্রিকেটারদের সালাম

গত পরশু তামিম ইকবালের খোঁজ নিতে ফোন করেছিলাম। কুশল বিনিময়ের পর এটা-ওটা নিয়ে কথা বলার ফাঁকে জানতে চাইলেন, ‘আচ্ছা ভাই, আমি কিছু করতে চাই।’

তিনি করতে চান করোনাভাইরাস প্রতিরোধে সরকারি উদ্যোগের অংশীদার হতে। সংবাদকর্মী হিসেবে যদি কোনো পথ দেখাতে পারি।

বললাম, ভাই, এটা তো আপনার মাশরাফি ভাইয়ের মাধ্যমে অনায়াসে করতে পারেন। প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর তো তাঁর জন্য অবারিত।

অবারিত দ্বার অবশ্য তামিম ইকবালের জন্যও। গত এশিয়া কাপে এক হাতে ব্যাট করার পর প্রধানমন্ত্রীর ফোন পেয়েছিলেন। দেশের শীর্ষব্যক্তি বলেছিলেন দ্বিধাহীন চিত্তে যেকোনো প্রয়োজনে যেন ফোন করেন তামিম। কিন্তু বৈশ্বিক মহামারি নিয়ে ব্যস্ত প্রধানমন্ত্রী পর্যন্ত পৌঁছানো নিয়ে দ্বিধান্বিত তামিম দ্বারস্থ হন মাশরাফির। যিনি পরামর্শ দেন, ‘তুই এখন ক্যাপ্টেন। ক্যাপ্টেনের মতো সবাইকে (দলের বাকিদের) বল ফান্ড দেবে কি না।’

এরপর ক্রিকেটারদের  হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে বার্তা দেন তামিম। সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত হতেই সবাই সম্মতি জানিয়েছেন অধিনায়ককে। আনুষ্ঠানিকভাবে নেতৃত্ব পাওয়ার পর এখনো মাঠে নামা হয়নি তামিম ইকবালের। তবে করোনা প্রতিরোধে সতীর্থদের এমন ত্বরিত প্রতিক্রিয়ায় কৃতজ্ঞ তামিমের অনুভূতি, ‘দারুণ গর্ব হচ্ছে। মনে হচ্ছে যেন বড় একটা ম্যাচ জিতলাম!’ আর যাঁরা এ আহ্বানে সাড়া দিয়েছেন তাঁদের জন্য সুখবর হলো, ম্যাচ খেলার আগেই অধিনায়কের প্রভূত ভালোবাসা জয় করে নিয়েছেন তাঁরা।

টাকার অঙ্কটা খুব বেশি নয়। সবার এক মাসের বেতনের অর্ধেকটা ধরে আনুমানিক ২৫ লাখেরও বেশি বলেছিলেন তামিম। তবে পাই পাই হিসাবে অঙ্কটা ৩০ লাখ ১৫ হাজার। করোনাভাইরাস প্রতিরোধের মহাযজ্ঞে যা অতি সামান্য। তবে যে মানসিকতার প্রকাশ এ অনুদানে, তা ক্রিকেটারদের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ বাড়ানোর জন্য যথেষ্ট। শিরোনামেই তাই তাঁদেরকে সালাম জানিয়ে রাখা।

এটা এমন নয় যে, এবারই প্রথম কোনো মানবিক আবেদনে সাড়া দিলেন ক্রিকেটাররা। মাশরাফি বিন মর্তুজার তখন নতুন ফ্ল্যাটে কাজ চলছে। সে কাজের এক গরিব কর্মীর একদিন মন খুব খারাপ। তখনকার বাংলাদেশ অধিনায়ক খোঁজ নিয়ে জানতে পারেন যে, লোকটার কিশোরী মেয়ে কিডনির জটিল রোগে আক্রান্ত। অনেক টাকার দরকার। পরদিন জাতীয় দলের প্র্যাকটিসে গিয়ে সে অঙ্কটা তুলেও এনেছিলেন মাশরাফি, অধিনায়কের আবেদনে যে সাড়া দিয়েছিলেন অন্যরা।

দীনে দয়ার এমন আরো অযুত উদাহরণ আছে ক্রিকেটারদের। জাতীয় দলের প্রস্তুতিকালে একদা প্রায়ই দেখা যেত আর্থিক অনুদানের দাবি নিয়ে হাজির দুস্থরা। তাঁদের অনেকে সরাসরি সাহায্য পেয়েছেন। অন্তত নিজেদের স্বীকৃত ফেসবুক পেজে দুস্থের সাহায্যের আবেদন জানিয়ে পোস্ট দিয়েছেন জাতীয় তারকারা।

বিসিবির অধস্তন স্টাফরা ব্যক্তিগত সংকটে সবার আগে যান ক্রিকেটারদের কাছে। ঈদে, পালা-পার্বণে দানছত্রও খুলে বসেন কেউ কেউ। গত বিশ্বকাপে এক সিনিয়র ক্রিকেটারকে দেখেছি জিমে পাঁচ শ টাকার চারটা বান্ডেল নিয়ে বসেছেন। সামনে এ ফোর সাইজের একটি কাগজে তালিকা, ৬৯টি নামের। প্রতিজনের পাশে লেখা অঙ্ক ধরে ধরে ডাকছেন আর বিলি করছেন। ঈদের সময় তো তিনি থাকবেন ইংল্যান্ডে, ‘ঈদী’ তাই আগে দিয়ে গেলেন!

আরেক ক্রিকেটার সেন্টার উইকেটে প্র্যাকটিসের সময় গ্রাউন্ডসম্যানদের ফিল্ডিং পজিশনে দাঁড় করিয়ে দেন। ক্যাচ ধরতে পারলে মিলবে পাঁচ শ টাকা! ‘আমার প্র্যাকটিস হলো ওদেরও লাভ হলো’, তারকার এ ব্যাখ্যার পরের অংশটাই মনে হয় এমনতর প্র্যাকটিসের প্রধান কারণ।

সেই ক্রিকেটার নিজের বিয়েতে গ্রাউন্ডসম্যানদের নিমন্ত্রণ করেছেন। কিন্তু আর্মি গলফ কোর্সের শানদার ওই পার্টির মানানসই পোশাক তো আর তাঁদের নেই। তো, তিনি করলেন কি, সবাকেই পুরো সাজিয়ে নিয়ে গেলেন বিয়ের অনুষ্ঠানে। জেনে রাখা ভালো যে বিসিবির গ্রাউন্ডসম্যানদের সংখ্যা প্রায় এক শ!

বাংলাদেশ দল জিতলে সবাই আমরা খুব আনন্দ করি। ক্রিকেটাররা দাবি করেন যে ম্যাচের হার-জিতে সবচেয়ে বেশি আনন্দ-বেদনা হয় তাঁদেরই। কিন্তু আমার কেন যেন মনে হয় ঘরের মাঠে জাতীয় দলের হার-জিতে তীব্রতম প্রতিক্রিয়া হয় গ্রাউন্ডসম্যানদের মনে। দল জিতলেই যে তাঁদের ভাগ্যে বোনাস জোটে ক্রিকেটারদের তরফে। হাড়ভাঙা খাটুনিতে যুদ্ধের ময়দান তৈরি করা মানুষগুলোর প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা আছে ক্রিকেটারদের মনে, যাঁদের বেতন এবং প্রাতিষ্ঠানিক মর্যাদা নেই বললেই চলে।

এ ব্যাপারে পুরনো একটা ঘটনা মনে পড়ে গেল। মিরপুরের আউটফিল্ডের এতই দুর্দশা যে প্রতিদিনই মরা চাল বাছার মতো করে মাঠের বাজে ঘাস বেছে বেছে তুলতে হয় মাঠকর্মীদের। তো, একদিন দুপুরে আমরা কয়েকজন তৎকালীন বোর্ড সভাপতির রুমে বসে আছি নিউজের আশায়। কী মনে করে তিনি জানালার ব্লাইন্ডার সরিয়ে মাঠের দিকে দৃষ্টি প্রসারিত করে দেখেন মাঠকর্মীরা প্রচণ্ড রোদেও ঘাস বাছাইয়ের কাজ করছেন। দেখে আহত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘দেখেছেন, লোকগুলো কী কষ্ট করছে। অথচ খুব সামান্য বেতন পায়।’ বলেই বিসিবির প্রধান নির্বাহীকে ডেকে পাঠান তিনি, ‘এই, ওদের একদিনের বেতন বোনাস হিসেবে দিয়ে দাও। কী কষ্ট করছে ওরা।’ বিনয়ের সঙ্গে প্রধান নির্বাহী একটি তথ্য দেন, ‘স্যার, ওরা সংখ্যায় এক শ জনেরও বেশি।’ ‘ওহ, তাই? আচ্ছা এটা নিয়ে তাহলে পরে কথা হবে’, পলিটিক্যাল স্টেটমেন্ট বোর্ড সভাপতির। সে বোনাস আর কোনোদিন পাওয়া হয়নি মাঠকর্মীদের।

অথচ সাত বছর ব্যবধানে ওই সিনিয়র ক্রিকেটারের ঈদি দেওয়া দেখে মনে হচ্ছিল তিনি বুঝি বোর্ডের থেকেও বিত্তবান! সেবার বোর্ড সভাপতি জনপ্রতি এক হাজার টাকা করে দেওয়ার অভিপ্রায় ব্যক্ত করেছিলেন, যা বিশ্বকাপে যাওয়ার আগে ওই সিনিয়র ক্রিকেটারদের দেওয়া জনপ্রতি ঈদির চেয়েও কম!

যাক, এত কিছু বলার অর্থ একটাই—বাংলাদেশের ড্রেসিংরুমে চালু হওয়া মধ্যবিত্ত সংস্কৃতি মাশরাফির সঙ্গে সঙ্গে বিদায় নেয়নি। বরং মনে হচ্ছে এ চর্চার পরিধি আরো বাড়বে।

মধ্যবিত্তের সংস্কৃতি আবার কোনটা? মধ্যবিত্তের সংস্কৃতি হলো, নিজের অভাব আড়াল করে অন্যের পাশে দাঁড়ানোর মানসিকতা। তামিম নিজেই বলছিলেন, ‘যারা এ অনুদানে অংশ নিয়েছে তাদের কেউ কেউ চুক্তিতেও নেই। আমরা সারা বছর বেতন পাই। কিন্তু ওরা বেতন পায় শুধু দলে থাকলে। ওদের কাছে তাই এক মাসের অর্ধেক বেতন অনেক টাকা। তবু তারা উৎসাহিত হয়ে দিয়েছে। আমার খুব ইমোশনাল ফিল হচ্ছে। জীবনের তুলনায় ক্রিকেট অতি সামান্য ব্যাপার। আমাদের অনুদানের অঙ্কটাও খুব বেশি নয়। তবে এ মানসিকতা নিয়ে সমাজের প্রত্যেক মানুষ যদি এগিয়ে আসে, তাহলে আমরা জাতি হিসেবে যেকোনো সমস্যা সমাধানের পথ খুঁজে পাব।’

দুপুরের ফোনালাপে তামিমের বলা শেষ কথাটাই মনে ধরেছে বেশি, ‘আমরা এখন অন্যের সমালোচনা না করি, প্লিজ! আমি ঘরে বসে অনায়াসে বলতে পারি সরকার এটা করেনি কেন, অমুকে তো ওটা করতে পারত। তাতে কি সমস্যার সমাধান হবে? হবে না। আমি অনুরোধ করব সবাই যেন সমালোচনা ভুলে এগিয়ে আসেন। ১০ টাকা দেন, অনেকে ১০ কোটিও দিতে পারেন। অত চাই না। সবাই সবার জায়গা থেকে সামান্য হাত বাড়িয়ে দিলে অন্তত টাকার অভাবে করোনাভাইরাসের প্রতিকার করতে পারিনি, এ দুঃখটা অন্তত থাকবে না।’

ভাবছিলাম, এই ক্রিকেটারদের ভবিষ্যতে মাঠের ক্রিকেটের সমালোচনা করব কোন মুখে! নাহ, সমালোচনা তো করতেই হবে। ক্রিকেটে তো আমরা দর্শক-সাংবাদিকরাও স্টেকহোল্ডার, স্বার্থ আমাদেরও আছে। কিন্তু চেষ্টা করব সমালোচনার সে ভাষা যেন ক্রিকেটীয়ই হয়। কোনো ক্রিকেটার বাজে শট খেলে কিংবা বিনা রানে আউট হলে তো আর বানিয়ে ভালো কিছু লেখা যাবে না। তবে চেষ্টা থাকবে ভাষাটা যেন ক্রিকেটেই সীমাবদ্ধ থাকে, তাঁকে ব্যক্তিগত কিংবা পারিবারিকভাবে যেন আক্রান্ত না করি।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা