kalerkantho

মঙ্গলবার । ২৪ চৈত্র ১৪২৬। ৭ এপ্রিল ২০২০। ১২ শাবান ১৪৪১

ডাউন দ্য উইকেট

ইনিংস ঘোষণার পরে

সাইদুজ্জামান

২৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



ইনিংস ঘোষণার পরে

মুলতানের চোখ-ধাঁধানো প্রেসবক্সে জোর আলোচনা হচ্ছে চা বিরতির পর থেকেই—কখন ইনিংস ঘোষণা করবেন রাহুল দ্রাবিড়।

কিন্তু ভারপ্রাপ্ত অধিনায়ক তিনি, তার ওপর পাকিস্তানের মাটিতে ডাবল সেঞ্চুরির দোরগোড়ায় শচীন রমেশ টেন্ডুলকার। সে ঘোষণা এলো শেষ ঘণ্টায়, বজ্রপাতের মতো সবাইকে চমকে দিয়ে। ভারত ৫ উইকেটে ৬৭৫, শচীন টেন্ডুলকার অপরাজিত ১৯৪! ১৬ বছর বয়স থেকে দেশের জার্সিতে একেকটা মাইলফলক পার হয়ে তত দিনে তিনি ভারতের ক্রিকেট ঈশ্বর। আর তাঁকেই কিনা ডাবল সেঞ্চুরির একটা স্ট্রোক আগে থামিয়ে দিলেন দ্রাবিড়!

দ্বিতীয় দিনের শেষ ঘণ্টায় কোনো উইকেট হারায়নি পাকিস্তান। তবে সেসবে মন নেই কারোর। প্রেসবক্সে সম্ভাবনার ছবি আঁকা হচ্ছে তখন—দ্রাবিড়কে কী বলতে পারেন শচীন? নাকি এ বঞ্চনার জন্য চোট নিয়ে ভিআইপি বক্সে বসে থাকা নিয়মিত অধিনায়ক সৌরভ গাঙ্গুলির ‘কুটকচালি’ আছে বলে সন্দেহ করছেন কি না তিনি? হতে পারে পাকিস্তানের মাটিতে প্রথম টেস্ট জয়ের জন্য দ্রাবিড়ের মরিয়া চেষ্টাকে সাধুবাদও জানিয়ে থাকতে পারেন শচীন।

দিনশেষেই সব জল্পনার অবসান ঘটিয়েছিলেন তিনি, প্রেসের সামনে। যুবরাজ সিং রান আউট হতেই দ্রাবিড়ের ইনিংস ঘোষণায় বিস্ময় নয়, সরাসরি অসন্তুষ্টির কথা বলেছিলেন শচীন। নিজের আত্মজীবনীতেও এ অসন্তোষ গোপন করেননি তিনি। তাতে ওই প্রথম ভারতীয় মিডিয়ার একটি অংশ ‘স্বার্থপর’ লিখে ফেলে টেন্ডুলকারকে। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে ভারতীয় শিবির দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে যাওয়ার শঙ্কায় সে রাত নির্ঘুম কেটেছিল জন রাইটের। জল অত দূর গড়ায়নি, টেন্ডুলকারের উষ্মার আঁচ সয়ে দ্রাবিড় একান্ত আলোচনার উদ্যোগ নেওয়ায়। বিস্তারিত নিজের জীবনীতে লিখেছেন ভারতের তৎকালীন কোচ রাইট।

যাক, টেন্ডুলকারের দলীয় চেতনাবিরোধী ঘটনাটির প্রসঙ্গ এত দিন পর চোখের সামনে চলে এসেছে বিশেষ একটি কারণে। সম্প্রতি বাংলাদেশের ক্রিকেটেও চমকপ্রদ ইনিংস ঘোষণার ঘটনা ঘটেছে তিনটি। প্রথমটি তামিম ইকবালের। বাংলাদেশ ক্রিকেট লিগের ম্যাচে তাঁকে অপরাজিত ৩৩৪ রানে থামিয়ে দেন ইসলামী ব্যাংক পূর্বাঞ্চলের অধিনায়ক মমিনুল হক। এর কয়েক দিন পর আশির ওপর স্ট্রাইকরেটে ২৫৩ রান করা নাজমুল হোসেন শান্তর ট্রিপল সেঞ্চুরির সম্ভাবনা উবে যায় তাঁর দল মধ্যাঞ্চলের অধিনায়ক শুভাগত হোম ইনিংস ঘোষণা করায়।

তো, প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটের বাংলাদেশের সর্বোচ্চ ইনিংস খেলা তামিমের ট্রিপলের জন্য যদি মমিনুল অপেক্ষা করতেন তবে সরাসরি জয়ের পথটা সরু হয়ে যেত পূর্বাঞ্চলের। নাজমুল অবশ্য ট্রিপল সেঞ্চুরির আক্ষেপ করতেই পারতেন, নিশ্চিত ড্রয়ের ম্যাচে ব্যক্তিগত মাইলফলকের পেছনে ছোটাকে কেউ স্বার্থপরতা বলে মনে করে না।

তামিমের জন্য ৩৩৪ থেকে ৩৫০ কিংবা ৪০০ খুব দূরের পথ নয়। যে গতিতে নাজমুল রান তুলছিলেন, তাতে গোটা কয়েক ওভার পেলে ট্রিপলও করে ফেলতে পারতেন তিনি। কিন্তু ২০৩ থেকে তিন শতে যেতে কত সময় লাগত, সেটি অননুমেয়। রানের ব্যবধান ৯৭ যে! অত দূরের পথ হাঁটতে গিয়ে হোঁচট খাওয়া অভাবিত নয়। তার পরও মুশফিকুর রহিম যখন বলেন, ‘ট্রিপল সেঞ্চুরি করা সম্ভব ছিল’, তখন একটু খটকা লাগেই। এটা ঠিক যে জিম্বাবুয়ের বোলিং অতটা বিষাক্ত নয়। উইকেটও আশ্বাস দিচ্ছিল ব্যাটসম্যানকে। কিন্তু ক্রিকেট এতটাই অনিশ্চয়তার খেলা যে পরের বলটাই বিষাক্ত হয়ে উঠতে পারে। আত্মবিশ্বাসে ভরপুর ব্যাটসম্যানেরও মনঃসংযোগে ব্যাঘাত ঘটে। সেখানে ডাবল সেঞ্চুরি পেরিয়েই তিন শকে সম্ভব বলে ফেললেন মুশফিক!

সেদিনের সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত কালের কণ্ঠর বিশেষ প্রতিনিধি নোমান মোহাম্মদ নিশ্চিত করেছেন যে, মুশফিক মোটেও মমিনুলের ইনিংস ঘোষণা নিয়ে উষ্মা প্রকাশ করেননি। হাসতে হাসতেই কথাগুলো বলেছেন। প্রথমে হাতে দুদিনেরও বেশি সময় বাকি থাকতে ইনিংস ঘোষণার সিদ্ধান্তে অবাক হওয়ার কথা বলেছেন। এরপর ট্রিপল সেঞ্চুরির উচ্চাশাও ব্যক্ত করেছেন। পরেরদিন দেশের সিংহভাগ সংবাদমাধ্যমের শিরোনামও হয়েছে মুশফিকের বিস্ময়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে গভীর সমবেদনাও পেয়েছেন টেস্ট রানে বাংলাদেশিদের শীর্ষস্থান দখল করে নেওয়া এ ব্যাটসম্যান।

এখানে ঢাকার ঘরোয়া ক্রিকেটের ‘কালজয়ী’ একটি গল্প বলার লোভ সামলাতে পারছি না। নয়ের দশকের শেষদিককার ঘটনা। তখন পাকিস্তান থেকে যে না সে এসে ঢাকা প্রিমিয়ার লিগে সেঞ্চুরি করতেন, টপাটপ উইকেট নিতেন। তখন আরেকটা অভাবিত ব্যাপার ছিল। ড্রেসিংরুমের দরজা খোলা থাকত। খেলোয়াড় কিংবা কর্মকর্তা—কারো একজনের সঙ্গে পরিচয় থাকলে ড্রেসিংরুমে বসেই পুরো ম্যাচটা দেখা যেত। তো, বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামে তেমনি এক ম্যাচ চলাকালে ব্যাটিং পক্ষের ড্রেসিংরুমে একজন ঢুকে দেখেন পাকিস্তানি তারকা মন খারাপ করে বসে।

—ক্যায়া হুয়া ভাই? ইতনা উদাস কিউ?

স (সেঞ্চুরি) মিস কিয়া!

—কিতনা কিয়া?

পাঁচ কিয়া।

খুব ভালো উইকেট ছিল বলেই কিনা ৫ রানে আউট হয়েও সেঞ্চুরির আক্ষেপে পুড়ছিলেন পাকিস্তানি ওই ব্যাটসম্যান।

মুশফিক অবশ্য ডাবল সেঞ্চুরি পেরিয়ে অপরাজিত ছিলেন। তাই তাঁর আরেকটি ল্যান্ডমার্ক পেরোনো নিয়ে উচ্চাশা ব্যক্ত করাতেও তুলনামূলক যুক্তির জোর বেশি। খটকা একটা জায়গাতেই। অধিনায়কের ইনিংস ঘোষণায় অবাক হওয়ার কি সত্যিই কোনো কারণ আছে? তৃতীয় দিনের দুপুর থেকেই আকাশ মেঘলা, গ্রাউন্ডসম্যানদের বারকয়েক পিচ ঢাকার প্রস্তুতি নিতে দেখা গেছে। পরের দুদিনে বৃষ্টির পূর্বাভাস আছে বিধায় দ্রুত ইনিংস ঘোষণা করে কেন জিম্বাবুয়েকে চেপে ধরছেন না—তৃতীয় দিনের মধ্যাহ্ন বিরতির পর এ নিয়েই বেশি আলোচনা হয়েছে প্রেসবক্সে।

জন রাইট সেই কবে ভারতের চাকরি ছেড়েছেন। তবু ২০০৬ সালে প্রকাশিত নিজের জীবনীতে আফসোস করেছেন, ‘আমার উচিত ছিল দ্রাবিড়কে বুঝিয়ে আরো আগে ইনিংস ঘোষণা করানো। ৬৭৫ পর্যন্ত যাওয়ারই দরকার ছিল না। টেন্ডুলকারের স্কোরটাও তখন ১৭০ এর মতো থাকত। ড্রেসিংরুমের অস্থিরতাও এড়ানো যেত।’

সংবাদ সম্মেলনে যেহেতু হাসিমুখে ইনিংস ঘোষণা নিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন এবং যেভাবে খেলছিলেন তাতে ট্রিপল সেঞ্চুরিও করে ফেলা সম্ভব বলা মুশফিকের কারণে বাংলাদেশের ড্রেসিংরুমের কারোর অক্সিজেন ঘাটতি বোধ করার খবর মেলেনি। তবে আমাদের সামগ্রিক ক্রিকেট চিন্তাশক্তিতে অক্সিজেন ঘাটতি দেখা দিচ্ছে কি না, সেটি নিয়ে আলোচনার সুযোগ সম্ভবত আছে।

এ জায়গাটায় বোধকরি ভারতীয়রা মাঠের ক্রিকেটের চেয়েও বেশি এগিয়ে। টেন্ডুলকার তখন ক্রিকেট অধীশ্বর। তাঁর উষ্মায় তো পুরো জাতি পুড়ে খাক হয়ে যাওয়ার কথা! কিন্তু কিসের কী? উল্টো কেন চালিয়ে খেলে ডাবল সেঞ্চুরি করে ফেললেন না, টিমগেমে ব্যক্তিগত ল্যান্ডমার্ক নিয়ে আহ্লাদের সুযোগ নেই—জাতীয় কথাবার্তায় নির্মমভাবে বিদ্ধ হন টেন্ডুলকার। একেবারে নির্ভেজাল ‘শচীন সৈনিক’ বাদে সবার অকুণ্ঠ সমর্থন পেয়েছেন রাহুল দ্রাবিড়। মুলতান টেস্ট যে সময়ে জিতেছে ভারত, তাতে আর গোটা দুয়েক ওভার অপেক্ষা করতেই পারতেন দ্রাবিড়। কিন্তু তখন কে জানত, মুলতানের অমন উইকেটে লড়াই বেশিদূর নিতে পারবে না পাকিস্তান?

তেমনি মিরপুর টেস্ট ঘিরেও একই অনিশ্চয়তা। মুশফিকের সম্ভাব্য ট্রিপল সেঞ্চুরির জন্য অপেক্ষা মানে চতুর্থ দিনের লাঞ্চ অবধি ব্যাটিং। ওদিকে বৃষ্টির শঙ্কা। তার ওপর ক্রিকেটীয় অনিশ্চয়তা অস্বীকার করার উপায় নেই। জিম্বাবুয়ে যে গোটা দুয়েক বড় জুটি গড়ে ফেলে আক্ষেপে পোড়াত না—সে নিশ্চয়তা কে দেবে?

সেরকম কিছু নেই বলেই ডেভিড ওয়ার্নারকে ৩৩৫ রানে রেখে অবলীলায় প্রথম ইনিংস ঘোষণা করেন টিম পেইন। যে গতিতে রানের চাকা ঘোরাচ্ছিলেন তখন ব্রায়ান লারার চার শ ছোঁয়াও অস্ট্রেলীয় ওপেনারের জন্য অসম্ভব এবং সময়সাপেক্ষ বলে মনে হচ্ছিল না। কিন্তু এ নিয়ে সৌজন্য আলোচনাও হয়নি অস্ট্রেলিয়ায়।

যাক, আশা করি অদূর ভবিষ্যতে এ ব্যবধান ঘুচিয়ে মুশফিকের এ ল্যান্ডমার্ক ছোঁয়া হয়ে যাবে। সেটি অন্য কেউও হতে পারেন। টিম গেমের প্রাথমিক অনুশীলন এটা।

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা