kalerkantho

মঙ্গলবার । ২৪ চৈত্র ১৪২৬। ৭ এপ্রিল ২০২০। ১২ শাবান ১৪৪১

হারানোর গল্পে আরো ভারী বিস্মৃত রবিউলের জীবন

মাসুদ পারভেজ   

২৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



হারানোর গল্পে আরো ভারী বিস্মৃত রবিউলের জীবন

হারিয়ে যাওয়া এক ক্রিকেটারের জীবন অগোচরে আরো অনেক হারানোর গল্পেই কেবল ভারী হয়েছে। আগে সেগুলোই একটি একটি করে তাঁর মুখ থেকে শুনে নেওয়া যাক।

খেলা ছাড়ার পর কিছু একটা করতে হবে, তাই নিজের শহর সাতক্ষীরায় খুলে বসলেন এক রেস্তোরাঁ। নিজে জাতীয় দলের ক্রিকেটার ছিলেন। চলবে ভেবে শখ করে নামও দিলেন ‘ক্রিকেটার্স ক্যাফে’। সেটিও সাবেক পেসার রবিউল ইসলামের মতোই অতীত এখন, ‘লাভ তো হয়ইনি, উল্টো ব্যাপক আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ায় দুই মাস হলো বন্ধ করে দিয়েছি।’

বন্ধ করে দিতে হয়েছে পারিবারিক পরিবহন ব্যবসাও, ‘আমার ক্রিকেটার হওয়ার অনুপ্রেরণা বাবাকে হারাই ২০১৫-র ডিসেম্বরে। তখন পারিবারিক পরিবহন ব্যবসার দায়িত্ব আমাকেই নিতে হয়। সাতক্ষীরায় লোকাল বাস ছিল আমাদের। ওই ব্যবসা তেমন বুঝি না বলে মার খাই সেখানেও। বিশাল অঙ্কের ক্ষতি মেনে পাট চুকাই ব্যবসারও।’

টানা দুই বছর ঢাকা প্রিমিয়ার লিগে (ডিপিএল) দল না পাওয়ার অভিমান জমে জমে যখন পাথর হচ্ছে আর খেলাটি ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্তের দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন, তখন নিজের শহরে গিয়ে মন খুলে খেলতেও বিপত্তি! ‘পর পর তিন বছর সাতক্ষীরা জেলা দলেও সুযোগ পাইনি। আমারও কিছু ভুল ছিল। জেলা ক্রীড়া সংস্থার সাধারণ সম্পাদকের সঙ্গে বাজে ব্যবহার করে ফেলেছিলাম। সে জন্য আমাকে তিন বছরের জন্য সাসপেন্ড করা হয়।’ মাত্র ৯ মাসের মাথায় সেই নিষেধাজ্ঞা উঠে গেলেও নিজেকে ফিরে পাওয়ার লড়াইয়ে ততদিনে ক্ষান্ত দিয়ে ফেলেছেন রবিউল।

অথচ ২০১০ সালে লর্ডসে স্বপ্নের টেস্ট অভিষেকে উইকেটশূন্য থাকা এই পেসার দ্রুতই বিরুদ্ধ কন্ডিশনের চ্যালেঞ্জ নিতে শিখে গিয়েছিলেন। বিশেষ করে ২০১৩-র এপ্রিলে জিম্বাবুয়ে সফরের অবিশ্বাস্য বোলিং দিয়ে বিস্মৃতপ্রায় নাম হয়েও এখনো মাঝেমধ্যেই অক্ষত এক সাফল্য তাঁকে নিয়ে আসে আলোচনায়। সেই সফরে হারারেতে দুই টেস্টের সিরিজের প্রথমটিতে ৩৩৫ রানের হারে বিপর্যস্ত বাংলাদেশ দলের হয়ে আশার একমাত্র সলতে হয়ে জ্বলেছিলেন শুধু রবিউলই। তেমন গতিশীল বোলার নন, তবু সুইং দিয়ে ঠিকই প্রতিপক্ষের ব্যাটসম্যানদের নাকাল করে ছাড়া এই ডানহাতি পেসার ম্যাচে নিয়েছিলেন ৯ উইকেট। প্রথম ইনিংসে ৮৪ রান খরচায় নেন ৩ উইকেট। পরের ইনিংসে আরো বিধ্বংসী, ৬ শিকার ৭১ রানে। কিন্তু দলীয় খেলায় বাংলাদেশের ব্যাটিং ব্যর্থতা (দুই ইনিংসে ১৩৪ ও ১৪৭) বিসর্জনে পাঠায় হারারের পেস সহায়ক কন্ডিশনে রবিউলের ওরকম দুর্দান্ত বোলিং পারফরম্যান্স।

একই ভেন্যুতে পরের টেস্টে অবশ্য ঘুরে দাঁড়ান ব্যাটসম্যানরা। যথারীতি উজ্জ্বল রবিউলের পারফরম্যান্সও তাই আরেকবার বিফলে যায় না। ১৪৩ রানের জয়ে সিরিজ বাঁচায় সফরকারীরা। ৮৫ রানে ৫ উইকেট নিয়ে স্বাগতিকদের দুমড়ে-মুচড়ে দেওয়ার পথে রবিউল নিজের অফুরান প্রাণশক্তিরও জানান দেন ৩৩ ওভার বোলিং করে। ভুল পড়ছেন না। লম্বা স্পেলে বোলিং করতে অভ্যস্ত এই পেসারের পর প্রথম ইনিংসে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ১৯ ওভার করে বোলিং করেছিলেন দুই স্পিনার সাকিব আল হাসান ও সোহাগ গাজী। দ্বিতীয় ইনিংসে আরেক পেসার জিয়াউর রহমানের সাফল্যে ঢাকা পড়া রবিউল ৫৩ রান দিয়ে নেন ১ উইকেট। দুই টেস্টে ১৫ উইকেট, ইনিংসে ৫ উইকেট দুইবার। এর মধ্যে হারারেতে শেষ টেস্টের প্রথম ইনিংসের বোলিংই রবিউলকে বারবার স্মৃতিতে ফিরিয়ে আনে। তিনি ফিরে আসতেই থাকবেন, যতক্ষণ পর্যন্ত না বাংলাদেশের অন্য কোনো পেসার এক টেস্ট ইনিংসে ৫ উইকেট পাচ্ছেন।

সাত বছর হয়ে গেল তাঁর কীর্তির সমতুল্য কিছু আর কোনো পেসার করতে পারেননি। সেই জিম্বাবুয়ের বিপক্ষেই সদ্যসমাপ্ত ঢাকা টেস্টে খুব কাছাকাছি গিয়েছিলেন একজন। রবিউল অন্তত আশায় ছিলেন যে এবার তা হয়ে যাবেই, ‘খুব আশা ছিল (আবু জায়েদ) রাহি ভারতের (ইন্দোর টেস্টের প্রথম ইনিংসে নিয়েছিলেন ৪ উইকেট) সঙ্গেও ৫ উইকেট মারবে, জিম্বাবুয়ের বিপক্ষেও (প্রথম ইনিংসে ৪ উইকেট)। এমনকি পাকিস্তানের (রাওয়ালপিন্ডি টেস্টের প্রথম ইনিংসে ৩ উইকেট) সঙ্গেও পাওয়া সম্ভব ছিল। দুর্ভাগ্য যে হলো না।’ হয়নি বলেই দূর সাতক্ষীরায় হারিয়ে যাওয়া রবিউলের ফোন বেজে উঠল কালও। ২০১৩-র জিম্বাবুয়ে সফরে দারুণ ভবিষ্যৎ দেখা যাচ্ছিল যে পেসারের, তাঁর হারিয়ে যাওয়ার ব্যাখ্যাও দিলেন। কাঠগড়ায় যেমন দাঁড় করালেন নিজেকে, তেমনি অন্যকেও।

কে সেই অন্য লোক? শুনুন রবিউলের নিজের মুখেই, ‘আপনাদের নিশ্চয়ই এটিও মনে আছে যে ওই জিম্বাবুয়ে সিরিজের সেরা খেলোয়াড় হয়েছিলাম আমি। অথচ পরের বছর (২০১৪-র অক্টোবর-নভেম্বরে) সেই জিম্বাবুয়ের বিপক্ষেই তিন টেস্টের হোম সিরিজে আমি দলে নেই। চন্দিকা হাতুরাসিংহে আমাকে বাদ দেন। হয়তো আমি তাঁর পছন্দের খেলোয়াড় ছিলাম না।’ অপছন্দের খেলোয়াড় বনে যাওয়ার পেছনে নিজেরও দায় দেখেন কিছুটা, ‘আমি বোধহয় তাঁকে পাল্টা প্রশ্ন করেই নিজের বিপদ ডেকে এনেছিলাম।’

সেই গল্পের শুরু ২০১৪-র সেপ্টেম্বরে ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফর থেকে ফেরার পথে লন্ডনের গ্যাটউইক এয়ারপোর্টে। রবিউল তখন ঘুণাক্ষরেও বুঝতে পারেননি যে মাত্র কয়দিন আগেই সেন্ট লুসিয়ায় নিজের শেষ টেস্টটি খেলে ফেলেছেন, ‘‘লন্ডনের এয়ারপোর্ট লাউঞ্জে উনি আমাকে ডেকে বললেন, ‘ইওর বোলিং স্পিড ইজ নট গুড এনাফ ফর ইন্টারন্যাশনাল ক্রিকেট’। আমিও তাঁকে জিজ্ঞেস করি ‘ধরুন, একজন পেসার যদি ঘণ্টায় ১৪০ কিলোমিটার গতিতে বল করে এবং ওর বলে কোনো সুইং নেই। আরেকজন ১৩০-৩৫ কিলোমিটারে করলেও দারুণ সুইং করায় এবং ব্যাটসম্যানদের খেলতে সমস্যা হয়। সে ক্ষেত্রে কে ভালো? ১৪০-এর বোলার না ১৩০-এর?’ এই প্রশ্নের কোনো জবাব উনি আমাকে দেননি। এরপরই উনি উঠে চলে যান এবং দেশে ফিরেই আমি বাদ। সম্ভবত পাল্টা প্রশ্ন করেই ওনাকে ক্ষেপিয়ে দিয়েছিলাম।’’

যদিও এরপর আরো অনেক সমস্যাজর্জর রবিউল ফিরে আসার লড়াইয়ে নিজেকেও ক্ষেপিয়ে তুলতে পারেননি, ‘বাদ পড়ার পর আব্বুর অস্ত্রোপচার হলো। আম্মুর হলো বাইপাস সার্জারি। প্রিমিয়ার লিগ খেলতে গিয়ে আমার কাঁধের হাড় স্থানচ্যুত হলো। টেনশনে থাকতে থাকতে খেলাটির প্রতি অমনোযোগী হয়ে পড়েছিলাম। নিজেকে ফিরে পাওয়ার শক্তিও চলে গিয়েছিল তখনই।’ গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে নীরবে ক্রিকেটকে বিদায় জানিয়ে তাই কোচিংয়ে মন-প্রাণ সঁপে দেওয়ার অপেক্ষায় থাকা রবিউলের জীবনে এরই মধ্যে যোগ হয়ে গেছে আরো কত হারানোর গল্পও!

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা