kalerkantho

সোমবার  । ১৬ চৈত্র ১৪২৬। ৩০ মার্চ ২০২০। ৪ শাবান ১৪৪১

অধ্যবসায় আর পরিশ্রমের প্রতিদান

সামীউর রহমান   

২৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



অধ্যবসায় আর পরিশ্রমের প্রতিদান

ছবি : মীর ফরিদ

ঠিক এক দশক আগে, বেঁটে-খাটো গড়নের এক ভারতীয় ব্যাটসম্যান নীল আর্মস্ট্রংয়ের চাঁদের মাটিতে পা রাখার কাছাকাছি পর্যায়ের একটা কীর্তি গড়েছিলেন। ২০১০ সালের আজকের দিনে, শচীন টেন্ডুলকার ওয়ানডে ক্রিকেটে প্রথম ডাবল সেঞ্চুরি করেছিলেন। ২০২০ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি মিরপুরের শেরেবাংলা ক্রিকেট স্টেডিয়ামে, টেন্ডুলকারের কাছাকাছি উচ্চতার মানুষটা যে কীর্তি গড়লেন, সেটার গুরুত্বও প্রেক্ষাপট বিবেচনায় ‘চন্দ্রবিজয়’ এর সমান না হলেও একেবারে কম নয়! প্রথম বাংলাদেশি ক্রিকেটার হিসেবে তৃতীয় ডাবল সেঞ্চুরি মুশফিকুর রহিমের, সেই সঙ্গে তামিম ইকবালকে ছাড়িয়ে টেস্ট ক্রিকেটে সর্বোচ্চ রানের মালিকও বনে গেলেন। প্রত্যাশা ছিল ত্রিশতকেরও, কিন্তু বাদ সাধল প্রকৃতি! বৃষ্টির সম্ভাবনা থাকাতেই জিম্বাবুয়েকে ফের ব্যাটিংয়ে পাঠানো, তা না হলে মুশফিক তো মনে করেন ইনিংসটা হতে পারত আরো বড়।

বছর দুই আগে, এই মাঠেই এই প্রতিপক্ষের বিপক্ষে ক্যারিয়ারের দ্বিতীয় ডাবল সেঞ্চুরিটা করেছিলেন মুশফিক। কালও যখন সম্ভাবনাটা জাগছে তখন মুশফিকের মনে হচ্ছিল এ যেন ‘দেজা ভ্যু’, ‘ওদের উইকেটরক্ষক চাকাভাকে বলছিলাম; আমার আগের ডাবল সেঞ্চুরিটার সময়ও এ রকম হয়েছিল। তখনো মমিনুলের সঙ্গে লম্বা জুটি হয়েছিল, সিকান্দার রাজা বল করছিল; মনে হচ্ছিল সব কিছুই আগের মতো হচ্ছে। তাই আরো আত্মবিশ্বাস পাচ্ছিলাম, ডাবল সেঞ্চুরিটা হয়েই যাবে।’ বাউন্ডারি মেরে ডাবল সেঞ্চুরির পর ‘ডায়নোসর’ উদ্যাপনের পরই ড্রেসিংরুম থেকে চলে আসার সংকেত পেয়ে কিছুটা অবাকই হয়েছেন মুশফিক, ‘ড্রেসিংরুম থেকে ইশারা পেয়েছিলাম যে আমরা আরো আট ওভারের মতো খেলব, তবে ডাবল সেঞ্চুরির পরপরই যে ইনিংস ঘোষণা করে দেওয়া হবে সেটা ভাবিনি। আরো দুই দিন সময় আছে, আমাদের যে বোলিং সামর্থ্য তাতে ওদেরকে অলআউট করতে একটা দিনই যথেষ্ট। আমি একটু অবাকই হয়েছি। কারণ উইকেটটা ব্যাটিংয়ের জন্য খুব ভালো ছিল; ওদের বোলিংয়েও খুব বেশি ধার বলেন কিংবা রহস্য বলেন কিছু ছিল না। তাই ইনিংসটা আরো বড় করা যেতেই পারত।’

৪৩৮ মিনিট ব্যাটিং করেছেন মুশফিক, খেলেছেন ৩১৮ বল। দীর্ঘ সময় ব্যাটিংয়ের জ্বালানিটা মুশফিক সংগ্রহ করেছেন দিনের পর দিন অনুশীলনে নিজেকে পুড়িয়ে পুড়িয়ে, ‘একেকজনের প্রস্তুতি নেওয়ার ধরন একেক রকম। আমি আমারটা বলতে পারি বা আমার কাছে যেভাবে মনে হয় আমি সবচেয়ে ভালো প্রস্তুতি নিতে পারি সেটা হচ্ছে লম্বা সময় ব্যাটিং করে। নেটে অনেকে ১৫-২০ মিনিট ব্যাটিং করে বেরিয়ে যায়, আমি প্রায় দুই ঘণ্টা ব্যাটিং করি। নানা রকম বোলারদের খেলি। তাদেরকে অনুপ্রাণিত করতে বলি যে আউট করতে পারলে এটা দিব, ওটা দিব। আউট হয়ে গেলে পরদিন আবার নতুন চ্যালেঞ্জ সেট করি। ব্যাটিংয়ের স্ট্যামিনাটা অন্য রকম। আপনি যখন লম্বা সময় ব্যাটিং করবেন, অনেক রকম বোলারদের খেলবেন তখন স্বাভাবিকভাবেই মাঠে গিয়ে কাজটা করা সহজ হয়ে যাবে।’

ক্যারিয়ারের তৃতীয় ডাবল সেঞ্চুরি করার পথে তামিমকে ছাড়িয়ে টেস্ট ক্রিকেটে বাংলাদেশের পক্ষে সর্বোচ্চ রানের মালিক হয়ে গেছেন মুশফিক। এই নিয়ে সতীর্থের সঙ্গে আলাপ না হলেও তামিম ব্যাপারটা ঠিকই জেনে গেছেন বলেই হাসতে হাসতে বললেন মুশফিক, ‘আমি এখন জানলাম (রেকর্ড) তবে তামিম জানে নিশ্চয়ই, ও সব কিছু জানে। তামিমের সঙ্গে আমার সব সময়ই একটা সুস্থ প্রতিযোগিতা হয়, দলের মধ্যে এটা থাকা খুব জরুরি। ও আমাকে খুব অনুপ্রাণিত করে, আমিও ওকে অনুপ্রেরণা দেওয়ার চেষ্টা করি। আমি চাই তামিম বাংলাদেশের হয়ে টেস্টে সর্বোচ্চ রান করুক, তবে আমি যেন ওর চেয়ে ১ রান হলেও বেশি করি!’ শুধু তা-ই নয়, সতীর্থদের মতো দারুণ সব শট খেলতে না পারার আক্ষেপটাও পোড়ায় তাঁকে, ‘আমি আমার সীমাবদ্ধতাটা বুঝি। আমি যখন টিভিতে আমার খেলার হাইলাইটস দেখি, তখন নিজের কাছেই নিজেকে খুব একটা ভালো মনে হয় না। মনে হয় তামিমের ড্রাইভ, সাকিবের কাট ওরকম শট যদি খেলতে পারতাম! আল্লাহ সবাইকে সব কিছু দেয় না, আমি মনে করি আমার মাথাটা একটু ভালো!’

দারুণ কীর্তি গড়ার দিনে একটা ছোট আক্ষেপের কথাও জানিয়ে গেলেন মুশফিক, ‘আমাদের ব্যাটসম্যানরা কোথাও ভালো উইকেট পায় না ব্যাটিংয়ের। দেশের বাইরে গেলেও পায় না আর দেশে অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, দক্ষিণ আফ্রিকা কিংবা ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে র‌্যাংক টার্নার উইকেট বানানো হয় যেখানে ব্যাটিং করা কঠিন। ভালো উইকেটে খেলা হলে আমরাও রান করতে পারতাম, আমাদেরও আত্মবিশ্বাস বাড়ত।’

প্রতিপক্ষ জিম্বাবুয়ের বোলিংটা যে সাদামাটা, সেটা নিজেই বলেছেন মুশফিক। তবে তাতে মোটেও ম্লান হয় না কীর্তির পেছনে তাঁর প্রস্তুতি, পরিশ্রম আর অধ্যবসায়। শারীরিক গড়নটা ছোটখাটো হলেও মুশফিকের তিনটি ডাবল সেঞ্চুরির কীর্তিটা কিন্তু আকাশছোঁয়া, সহসাই যেটা কারো ছাড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা খুব একটা নেই।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা